সম্পাদক পরিচিতি
সাহিত্যচিন্তার খন্ড সমূহ
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাংলা সাহিত্যচিন্তার ভুবনে দুই প্রধান কিংবদন্তি। বস্তুত বঙ্কিমচন্দ্রের হাতেই বাংলা সাহিত্যচিন্তার সূত্রপাত ঘটে। বঙ্কিমচন্দ্র বিশ্বাস করতেন, কোনও সাহিত্যকর্মের রস আস্বাদন করতে হলে তা সামগ্রিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করা উচিৎ। খণ্ডদৃষ্টি কখনওই সাহিত্যের প্রকৃত তাৎপর্য তুলে ধরতে পারে না। এ চিন্তার আলোকেই ‘উত্তরচরিত’ প্রবন্ধে তিনি বাল্মীকি ও ভবভূতির রাম-চরিত্রের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য আবিষ্কার করার প্রয়াস পেয়েছেন। ‘গীতিকাব্য’ প্রবন্ধের মৌল বিষয় গীতকবিতার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য নিরূপণ। প্রকৃত ও অতিপ্রকৃত উপাদান কীভাবে সাহিত্যসৃষ্টির মধ্য দিয়ে একাত্ম হয়ে যায়, সে-কথা ব্যক্ত হয়েছে ‘প্রকৃত ও অতিপ্রকৃত’ প্রবন্ধে। ‘বিদ্যাপতি ও জয়দেব’ প্রবন্ধে বিদ্যাপতি ও জয়দেবের কবি-প্রতিভার পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্য নিরূপিত হয়েছে। বঙ্কিম লিখেছেন: ‘...জয়দেবের কবিতা স্বর্ণহার, বিদ্যাপতির কবিতা রুদ্রাক্ষমালা।’ ‘অনুকরণ’ প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে অনুকরণের দোষ-গুণ।
ধর্ম ও সাহিত্যের মধ্যে সাদৃশ্য ও স্বাতন্ত্র্য বিশ্লেষিত হয়েছে বঙ্কিমের ‘র্ধম্ম ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে। নবীন লেখকদের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্যরচনার মৌল বৈশিষ্ট্য সূত্রাকারে উপস্থাপন করেছেন ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধে। ‘ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জীবনচরিত ও কবিত্ব’, ‘বাঙ্গালা সাহিত্যে প্যারীচাঁদ মিত্র’ ও ‘মৃত মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ শীর্ষক প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যসমালোচনার উৎকর্ষের পরচিয় পাওয়া যাবে। প্রবন্ধ তিনটিতে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, প্যারীচাঁদ মিত্র ও মাইকলে মধুসূদন দত্তের সাহিত্যপ্রতিভার যৌক্তিক মূল্যায়ন উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যচিন্তার জগতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের হাতেই গড়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যচিন্তার কেন্দ্রীয় অবয়ব। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের মতো তাঁর সাহিত্যচিন্তারও মূল বৈশিষ্ট্য মানবকল্যাণ চেতনা। তিনি বিশ্বাস করেন, সাহিত্যের মৌল বিষয় হচ্ছে মানব-হৃদয় ও মানব-চরিত্র। ভাবীকালের মানুষকে সন্দীপতি করে তোলাই সাহিত্যরে প্রধান কাজ। রবীন্দ্রসাহিত্যে মানবপ্রেম, সত্যনিষ্ঠা, সৌন্দর্যানুভূতি, আন্তর্জাতিক চেতনা এবং কল্যাণবোধের যে সুগভীর প্রকাশ ঘটেছে, তাঁর সাহিত্যচিন্তারও কেন্দ্রীয় লক্ষণ ওইসব প্রবণতা। রবীন্দ্রনাথও বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সাহিত্যের মাধ্যমে জাগ্রত করতে চেয়েছেন মানুষের চিত্তলোক। সাহিত্যকে রবীন্দ্রনাথ আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃন্তহীন কোনও কুসুম বলে মনে করেননি; তাঁর কাছে সাহিত্য হচ্ছে একটি সামাজিক কর্ম--দেশকালের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ঘটনার্বতের সঙ্গে তিনি সাহিত্যকে সংযুক্ত বলে ববিচেনা করেছেন। খণ্ডটিতে রবীন্দ্রনাথের লোকসাহিত্য গ্রন্থের চারটি (সবকটি), আধুনকি সাহিত্য গ্রন্থরে দশটসিহ মোট ষোলোটি প্রবন্ধ সংকলতি হয়েছে।
লোকসাহিত্য সর্ম্পকে স্বকীয় ভাবনা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তার বিশিষ্ট এক প্রান্ত। লোকছড়া বা এ জাতীয় রচনার সমাজতাত্ত্বিক বা নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করা রবীন্দ্রনাথের উদ্দশ্যে নয়; বরং তিনি ছড়ার ধ্বনিমাধুর্য ও সহজ হৃদয়ধর্ম ব্যাখ্যা করতে বেশি আগ্রহী। লোকসাহিত্য গ্রন্থভুক্ত ‘ছেলেভুলানো ছড়া: ১’ ও ‘ছেলেভুলানো ছড়া: ২’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের লোকসাহিত্যচিন্তার নিপুণ প্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, বাংলার লোকসাহিত্য এবং লোকসংস্কৃতি নারীদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই টিকে আছে। রবীন্দ্রনাথ ছেলেভুলানো ছড়াকে বাঙালির জাতীয় সম্পত্তি বলে আখ্যায়িত করেছেন। ‘কবি-সংগীত’ প্রবন্ধে অষ্টাদশ শতাব্দীর কবিগান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কবিগান উচ্চভাবসম্পন্ন সাহিত্য নয়। সাধারণ লোকের মনোরঞ্জনের জন্যই এ গান। অষ্টাদশ শতাব্দীর বিশেষ সামাজিক প্রেক্ষাপটেই উদ্ভব ঘটে কবিগানের। ‘গ্রাম্যসাহিত্য’ প্রবন্ধে গ্রামীণ সাহিত্যের বিষয় ও রচনাকৌশল নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ সাহিত্যকে বিশেষভাবে পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, গ্রাম্যসাহিত্যে কল্পনার তান অধিক থাক বা না-থাক, আনন্দের সুর অবশ্যই আছে। এই আনন্দই হচ্ছে সাহিত্যের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যচিন্তার বিশিষ্ট এক রূপ ধরা পড়েছে আধুনিক সাহিত্য গ্রন্থে। গ্রন্থটির মোট ষোলোটি প্রবন্ধের মধ্যে দশটি প্রবন্ধ এ সংকলনে গৃহীত হয়েছে। বাংলাসাহিত্যের বিশিষ্ট কয়েকজন লেখক ও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ সর্ম্পকে আলোচনা আধুনিক সাহিত্য গ্রন্থের মূল উপজীব্য। বঙ্কিমচন্দ্র, বিহারীলাল, সঞ্জীবচন্দ্র, বিদ্যাপতি--এসব সাহিত্যিক এবং রাজসিংহ, আর্যগাথা, আষাঢ়ে, মন্দ্র প্রভৃতি গ্রন্থ-সমালোচনা সূত্রে রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিক সাহিত্যভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। ‘জুবেয়ার’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ফরাসি ভাবুক জুবেয়ার-কে বাঙালি পাঠকসমাজে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য, ‘রচনাকলা’ বা ‘রচনাবদ্যিা’ ও নিজ সর্ম্পকে জুবেয়ারের কিছু মন্তব্য তুলে ধরে এসব বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। জুবেয়ার তাঁর নিজের রচনা সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘আমি কেবল বপন করি, নির্মাণ বা পত্তন করি না।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর সর্ম্পকে লিখেছেন, ‘কোনো কোনো মনস্বী আপনার মনটিকে ফলের বাগান করিয়া রাখেন, তাঁহারা বিশেষ বিশেষ চিন্তা ও চর্চার দ্বারা চিত্তকে আবৃত করনে, চতুর্দিকের নিত্যবীজবর্ষণ তাঁহাদের মনের মধ্যে অনাহূত ও অবারিতভাবে স্থান পায় না। জুবেয়ারের মন সে শ্রেণীর ছিল না, তাঁহার চিত্ত ফলের বাগান নহে, ফসলের ক্ষেত্র। সে ফসল নানাবিধ। ধর্ম কর্ম কলারস সাহিত্য কত-কী তাহার ঠিক নাই।’ ‘ডি প্রোফন্ডসি’ প্রবন্ধটি ইংরেজ কবি আলফ্রেড টেনিসনের ‘ডি প্রোফন্ডসি’ কবিতার মূল্যায়ন। ‘বিয়াত্রিচ, দান্তে ও তাঁহার কাব্য’ প্রবন্ধে মহাকবি দান্তের একান্ত ব্যক্তিগত জীবন ও কাব্যের মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। কালিদাসের মেঘদূত অবলম্বনে রবীন্দ্রকাব্যভাবনারই প্রকাশ ঘটেছে ‘নবর্বষা’ প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি তাঁর বিচিত্র প্রবন্ধ গ্রন্থ থেকে সংকলিত। প্রবন্ধগুলো থেকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তার প্রথম পর্যায় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। সামগ্রিকভাবে এই খণ্ডে সংকলিত প্রবন্ধসমূহে পাঠক বাঙালির সাহিত্যচিন্তার প্রথম যুগ সর্ম্পকে একটা স্বচ্ছ ধারণা পাবেন।
‘বাঙালরি সাহিত্যচিন্তা’র দ্বিতীয় খণ্ডের এই প্রবন্ধগুলোতে পাওয়া যাবে রবীন্দ্রসাহিত্যচিন্তার বিকাশ ও পরিণতির পরিচয়। এ র্পযায়ের সাহিত্যচিন্তার ক্ষেত্রে তাঁর তিনটি গ্রন্থের কথা আমরা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই--সাহিত্য (১৩১৪), সাহিত্যের পথে (১৩৪৩) এবং সাহিত্যের স্বরূপ (১৩৫০)। এই গ্রন্থত্রয়ের প্রায় সব প্রবন্ধ র্বতমান খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলোতে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তার সামগ্রিক রূপ ফুটে উঠেছে। যে-সব রচনার জন্য রবীন্দ্রনাথকে একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যচিন্তক হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তার অধিকাংশই সংকলিত হয়েছে তাঁর বিখ্যাত বই সাহিত্য-এ। মোট ছাব্বিশটি প্রবন্ধ থেকে এ সংকলনে গৃহীত হয়েছে উনিশটি।
সাহিত্যের পথে গ্রন্থের ‘পঞ্চাশোর্ধ্বম্’ ছাড়া ‘উৎর্সগপত্র’সহ সব প্রবন্ধ এই খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, রস সৃষ্টিই সাহিত্যের মৌল উদ্দেশ্য। তাই সাহিত্য বিচারের সময় সমালোচককে দেখতে হবে সাহিত্য রস সৃষ্টি করতে পেরেছে কি না। তা না হলে সমালোচনা যর্থাথ হবে না বলে রবীন্দ্রনাথ মত প্রকাশ করছেন সাহিত্যের পথে গ্রন্থের প্রথমেই সংকলিত ‘বাস্তব’ র্শীষক প্রবন্ধে। গ্রন্থের তৃতীয় প্রবন্ধ ‘সাহিত্য’। এ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তার ভিন্ন এক মাত্রা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মতে, উপনিষদে বর্ণিত ব্রহ্মের বিবিধ স্বরূপ--সত্যম্, জ্ঞানম্ এবং অনন্তম্ সাহিত্যেরও প্রধান বৈশিষ্ট্য। রবীন্দ্রনাথের মতে, চিরন্তনের এই তিনটি স্বরূপকে আশ্রয় করে মানবাত্মারও তিনটি রূপ তৈরি হয়েছে। তার একটি হল ‘আমরা আছি’; আর একটি ‘আমরা জানি’; আর তৃতীয়টি হচ্ছে ‘আমরা ব্যক্ত করি’। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘আমরা আছি’ এটি হচ্ছে ব্রহ্মের সত্য-স্বরূপের অর্ন্তগত; ‘আমরা জানি’ এটি ব্রহ্মের জ্ঞান-স্বরূপের অর্ন্তগত; আর ‘আমি প্রকাশ করি’ এটি ব্রহ্মের অনন্ত-স্বরূপের অর্ন্তগত। বিবিধ স্বরূপ মিলে তৈরি হয় আনন্দ এবং এই আনন্দই হচ্ছে সাহিত্যের মৌল লক্ষ্য। তথ্যের মধ্যে সত্যের প্রকাশই রবীন্দ্রনাথের মতে প্রকৃত প্রকাশ। এ অভিমতই ব্যক্ত হয়েছে ‘তথ্য ও সত্য’ প্রবন্ধে। ‘সৃষ্টি’ প্রবন্ধ এ ভাবনারই বিকশিত রূপ। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন--তথ্যের সংকীর্ণতা থেকে সত্যের অসীমতায় প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মানবজীবনের মহিমা সহস্রগুণ বৃদ্ধি পায়। তাঁর মতে, সাহিত্য এবং যে-কোনও সৃষ্টিকলার মূল্য নিহিত এই সত্য প্রকাশের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, সত্যের মূল্যেই সাহিত্য-শিল্পকলা মূল্যবান হয়ে ওঠে। সত্যকে রবীন্দ্রনাথ দুভাবে বিভাজিত করেছেন--সাধারণ সত্য এবং র্সাথক সত্য। সাধারণ সত্যে কোনও বাছ-বিচার নেই, র্সাথক সত্য একেবারে বাছাই করা। র্সাথক সত্য খুবই দুর্লভ--প্রকৃত সাহিত্যে ফুটে ওঠে ওই র্সাথক সত্যের রূপ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, র্সাথক সত্যকে রূপায়িত করাই সাহিত্যের প্রধান র্ধম। রবীন্দ্রনাথের মতে, সাহিত্য হচ্ছে বিশ্ব-নাগরিকতাবোধের অনন্ত উৎস। সাহিত্যে সর্বদেশ এবং সর্বকালের মানুষ এসে এক মলিন-মোহনায় সংহতি লাভ করে। সাহিত্য মানুষকে করে তোলে বিশ্বনাগরিক। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, সাহিত্যবিচারে ব্যক্তিগত উপলব্ধিই প্রধান। তবে তাঁর মতে ব্যক্তি কোনও একক মানুষ নয়, বরং যা স্বকীয় বিশেষত্বের মধ্যে ব্যক্ত হয়ে ওঠে--তা-ই ব্যক্তি। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যবিচারে শ্রেণির পরিচয় নয়, ব্যক্তির পরিচয়কেই বড় বিবেচনা করেন। সাহিত্যে আধুনকিতার লক্ষণ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য রূপায়িত হয়েছে ‘আধুনিক কাব্য’ প্রবন্ধে। রবীন্দ্রনাথের মতে, কালের কথা নয়, বরং ভাবের কথাই আধুনিকতার সবচেয়ে বড় লক্ষণ। নদীর মতো চলতে চলতে সাহিত্য যখন বাঁক পরিবর্তন করে, সেই পরিবর্তনটাই হচ্ছে আধুনিকতা। আলোচ্য গ্রন্থভুক্ত ‘সাহিত্যতত্ত্ব’ প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভাবনার স্বরূপ উপলব্ধির জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে, একলা-আমি আর বহু-আমি-এই চেতনাই মানুষকে বৈচিত্র্যময় করে রাখে, করে রাখে আনন্দময়। রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘আমি আছি’ আর ‘না-আমি আছি’--এই উভয় ধারণার মিলনই সাহিত্যের লক্ষ্য। বস্তুত, দুঃখ এবং আনন্দকে অঙ্গীকার করেই সাহিত্যের সৃষ্টিপথ তৈরি হয়। সত্যের অসীম রহস্য আর সৌর্ন্দযের অনির্বচনীয়তা প্রকাশ করাই সাহিত্যতত্ত্বের প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিৎ বলে রবীন্দ্রনাথ মনে করেন। সাহিত্য রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রতিদিনের প্রয়োজন সিদ্ধির কোনও উপায় নয়, বরং চিরকালের সম্পদ। রবীন্দ্রনাথের মতে, সাহিত্য হচ্ছে চিরন্তন অনুভূতির ভাষিক প্রকাশ, সেখানে সাময়িকতার কোনও স্থান নেই।
মোট বারোটি প্রবন্ধের সমবায়ে গড়ে উঠেছে সাহিত্যের স্বরূপ গ্রন্থটি। প্রবন্ধগুলো হল : ‘সাহিত্যের স্বরূপ’, ‘সাহিত্যের মাত্রা’, ‘সাহিত্যে আধুনিকতা’, ‘কাব্যে গদ্যরীতি’, ‘কাব্য ও ছন্দ’, ‘গদ্যকাব্য’, ‘সাহিত্যবিচার’, ‘সাহিত্যের মূল্য’, ‘সাহিত্যে চিত্রবিভাগ’, ‘সাহিত্যে ঐতিহাসিকতা’, ‘সত্য ও বাস্তব’ ও ‘সাহিত্য ও সর্বসাধারণ’। সবগুলো প্রবন্ধই এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র তৃতীয় খণ্ডে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর তিনটি রচনা সংকলিত হয়েছে। ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ র্শীষক প্রবন্ধে রামেন্দ্রসুন্দর বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য সর্ম্পকে সংক্ষিপ্ত বিবেচনা উপস্থাপন করেছেন। লেখক মনে করেন, বাংলা সাহিত্য ও বৃহৎ র্অথে সমগ্র বাঙালি জাতির ওপর বঙ্কিমচন্দ্র নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন। ‘সাহিত্য-কথা’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণকান্তরে উইল উপন্যাসের নায়ক গোবিন্দলাল-চরিত্রের স্বরূপ বিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছেন। গোবিন্দলালকে লেখক ম্যাকবেথ চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ম্যাকবেথের যেমন পদস্খলন হয়েছিল, সেইরূপ পদস্খলন ঘটেছিল গোবিন্দলালের। পঙ্কিল অবস্থা থেকে তারা কেউই আর স্বাভাবকি জীবনে প্রত্যাবর্তন করতে পারেনি। ‘মহাকাব্যের লক্ষণ’ প্রবন্ধে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মহাকাব্যের সংজ্ঞার্থ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশদ আলোচনা উপস্থাপন করেছেন।
র্বতমান খণ্ডে অর্ন্তভুক্ত দীনেশচন্দ্র সেনের লেখাগুলো থেকে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সর্ম্পকে বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা পাওয়া যাবে। দীনেশচন্দ্র সেনের তিনটি রচনা পত্রস্থ হয়েছে। রচনাগুলো তাঁর বৃহৎ বঙ্গ গ্রন্থ থেকে সংকলিত। ‘পাল শাসনামলে শিল্প-সাহিত্য’ রচনায় দীনেশচন্দ্র সেন পাল-শাসনামলে বাংলা সাহিত্যের প্রধান প্রধান প্রবণতা ও এ সময়ের শিল্প-সাহিত্য সর্ম্পকে আলোচনা করেছেন। এ রচনায় লেখক লোকগীতিকা ও রূপকথাকে কথাসাহিত্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। দীনেশচন্দ্র সেন মনে করেন, মধ্যযুগের এই পালাগান ও রূপকথাগুলোই কালক্রমে আধুনিক কথাসাহিত্যের বিকাশের পথ সৃষ্টি করে দিয়েছে। ‘সাহ জালালুদ্দিন তব্রেজ ও সেক শুভোদয়া’ রচনায় দীনেশচন্দ্র সেন সেক শুভোদয়া গ্রন্থের ঘটনাংশ, বিষয়স্বাতন্ত্র্য ও শিল্পমূল্য বিষয়ে আলোচনা করেছেন। অনেক অলৌকিক ঘটনা থাকলেও এ গ্রন্থ থেকে তৎকালীন সমাজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় বলে লেখক মত প্রকাশ করেছেন। প্রবন্ধের শেষাংশে লেখক বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন। ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎপত্তি-বিকাশ’ রচনায় দীনেশচন্দ্র সেন প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য়ের উৎপত্তি ও বিকাশ, সংস্কৃত-প্রভাবান্বিত বাংলাসাহিত্য, চৈতন্যযুগের বৈশিষ্ট্য ও বাংলাসাহিত্য এবং কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর পরবর্তী বাংলাসাহিত্যের প্রধান প্রবণতা--ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য আলোচনা সূত্রে এখানে বাংলাভাষার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ সর্ম্পকেও আলোচনা সংযুক্ত হয়েছে। চর্যাপদ, নাথগীতিকা, বিভিন্ন শাখার মঙ্গলকাব্য, লোকসাহিত্য, বৈষ্ণব ও শাক্ত-পদাবলি ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করে লেখক অবশেষে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলাসাহিত্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্যাবলি তুলে ধরেছেন। বাংলায় ইসলাম র্ধম প্রতিষ্ঠার পর এদেশের ভাষা ও সাহিত্যে কীভাবে তার প্রভাব পড়ে, সে-বিষয়ও এখানে আলোচিত হয়েছে। মধ্যযুগের সমৃদ্ধ অনুবাদ-সাহিত্যও লেখকের আলোচনার অর্ন্তগত হয়েছে।
প্রমথ চৌধুরীর এই কেন্দ্রীয় সাহিত্যভাবনার প্রকাশ ঘটেছে র্বতমান খণ্ডে সংকলিত তাঁর বারোটি প্রবন্ধে। ‘জয়দেব’ প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী সংস্কৃতসাহিত্যের বিখ্যাত কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যের শিল্পবৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। সনেটের শিল্পপ্রেরণা ও শিল্পরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘সনেট কেন চতুর্দশপদী’ প্রবন্ধে। সমকালীন সাহিত্য-প্রবণতার পরিচয় পাওয়া যাবে ‘বঙ্গ সাহিত্যের নবযুগ’ প্রবন্ধে। ‘সবুজপত্রের মুখপত্র’ প্রবন্ধে পাওয়া যাবে প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যচিন্তা-বিষয়ক নানা মতের উল্লেখ। ‘বস্তুতন্ত্রতা বস্তু কি’ প্রবন্ধে সাহিত্যে বস্তুতান্ত্রিকতাকে বিরক্তিজনক, অসহ্য ও অগ্রাহ্য বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। লেখকের মতে, ‘রিয়ালিজমের পুতুলনাচ ও আইডিয়ালিজমের ছায়াবাজি উভয়ই কাব্যে অগ্রাহ্য। কাব্য হচ্ছে জীবনের প্রকাশ।’ ‘অভিভাষণ’-টিতে প্রমথ চৌধুরী ভাষা সর্ম্পকে বিস্তারিত আলোচনা করে সাহিত্যের ধর্ম ও কর্মের বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘মনোজগতে বাতি জ্বালানো এবং ফুল ফোটানোই সাহিত্যের একমাত্র ধর্ম ও কর্ম।’
প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যচিন্তা-বিষয়ক একটি উল্লেখযোগ্য রচনা ‘সাহিত্যে খেলা’। তাঁর মতে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য পাঠককে আনন্দ দেওয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়। সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলেই সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে। সমকালীন বাংলাসাহিত্যের মৌল প্রবণতা ও গতি-প্রকৃতবিষিয়ক আলোচনা ‘র্বতমান বঙ্গ সাহিত্য’। ফরাসিসাহিত্যের মৌল প্রবণতা ও সাধারণ লক্ষণের ওপর তাঁর র্পযবেক্ষণ ধরা পড়েছে ‘ফরাসি সাহিত্যের র্বণপরচিয়’ প্রবন্ধে। তিনি লিখেছেন: ‘এককথায় বলতে গেলে ইংরেজি সাহিত্য রোমান্টিক এবং ফরাসি সাহিত্য রিয়ালিস্টিক।’ প্রমথ চৌধুরীর একটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ‘বাংলার ভবিষ্যৎ’। এ প্রবন্ধে লেখক বাংলা ভাষার বহুমাত্রিক সম্ভাবনা ও নানা সীমাবদ্ধতার কথা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর আর একটি বিশিষ্ট রচনা ‘বই পড়া’। এ প্রবন্ধে লেখক গ্রন্থাগারের উপযোগিতা এবং বই পড়ার গুরুত্বের কথা প্রকাশ করেছেন। ‘চিত্রাঙ্গদা’ প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরীর শিল্প-সমালোচনার নিপুণ প্রকাশ ঘটেছে। মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যের শেষ কবি ভারতচন্দ্রের কবিপ্রতিভা বিশ্লেষিত হয়েছে ‘ভারতচন্দ্র’ প্রবন্ধে। কাব্যে তথা সাহিত্যে শ্লীলতা বা অশ্লীলতা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনার অবতারণা করা হয়েছে ‘কাব্যে অশ্লীলতা--আলংকারিক মত’ প্রবন্ধ।
‘বাঙালরি সাহিত্যচিন্তা’র চর্তুথ খণ্ড কৌতূহলী পাঠককে পরিচিত হতে সাহায্য করবে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, কাজী মোতাহার হোসেন, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অন্নদাশঙ্কর রায় ও হুমায়ুন কবির--এই আট বাঙালি লেখক-সাহিত্যচিন্তকের শিল্প-ভাবনার সঙ্গে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রধানত কথাসাহিত্যিক। চিন্তামূলক গদ্যরচনায় তিনি সেভাবে আগ্রহী হননি। তবু মাঝে মাঝে এ ধারায় তিনি যেসব প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন, সেগুলি স্বদেশ ও সাহিত্য (১৩৩৯) বইয়ে সংকলিত হয়েছে। বইটিতে শরৎচন্দ্রের সাহিত্য ও শিল্পচিন্তার নানামাত্রিক প্রতিফলন ঘটেছে। এই বইয়ের ১৭টি প্রবন্ধ থেকে ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র চর্তুথ খণ্ডে গৃহীত হয়েছে ৭টি প্রবন্ধ। ‘ভবিষ্যৎ বঙ্গ-সাহিত্য’, ‘আধুনিক সাহিত্যের কৈফিয়ৎ’, ‘সাহিত্য ও নীতি’, ‘সাহিত্যে র্আট ও দুর্নীতি’, ‘সাহিত্যের রীতি ও নীতি’, ‘রবীন্দ্রনাথ’ প্রভৃতি প্রবন্ধে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে।
মানবমুক্তিই সাহিত্যের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করেন শরৎচন্দ্র। ‘ভবিষ্যৎ বঙ্গ-সাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন--‘সমাজের সঙ্গে মিলে-মিশি এক হয়ে তার ভিতরের বাসনা-কামনার আভাস দেওয়াই সাহিত্যের কাজ। ভাবে, কাজে, চিন্তায় মুক্তি এনে দেওয়াই তো সাহিত্যের কাজ।’ শরৎচন্দ্র মনে করেন মানুষের চিত্তলোকে মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করাই সাহিত্যিকের প্রধান র্কতব্য। এই মতকেই শরৎচন্দ্র নানা মাত্রায় ব্যাখ্যা করেছেন ‘আধুনিক সাহিত্যের কৈফিয়ৎ’ প্রবন্ধে। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যচিন্তামূলক প্রবন্ধের মধ্যে ‘সাহিত্য ও নীতি’ এবং ‘সাহিত্যে র্আট ও দুর্নীতি’ বিশেষভাবে ব্যাখার দাবি রাখে। শরৎচন্দ্রের মতে, বাস্তবতা ও কল্পনার সংমিশ্রণেই গড়ে ওঠে মহৎ কোনও সাহিত্যর্কম। শরৎচন্দ্র মনে করেন পাঠকের সাহিত্যরুচি তৈরির পেছনে সাহিত্যিকের পাশাপাশি সমালোচককেও সৎ ভূমিকা পালন করতে হয়।
বাঙালি সাহিত্যচিন্তক হিসেবে কিংবদন্তিপ্রতিম খ্যাতি অর্জন করেছেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ‘সাহিত্যের রূপ’, ‘পল্লী-সাহিত্য’, ‘সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা’--এসব রচনায় মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্বকীয় সাহিত্যচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। ‘সাহিত্যের রূপ’ প্রবন্ধে সাহিত্যের স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য, লক্ষ্য ও উপযোগিতা সর্ম্পকে তাঁর বিবেচনা উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি মনে করেন, সাহিত্যই মানুষের চিত্তের মুক্তি ঘটাতে পারে। সাহিত্যের র্মমে লুকিয়ে থাকে জাতির আত্মা। শহীদুল্লাহর একটি উল্লেখযোগ্য রচনা ‘পল্লী-সাহিত্য’। এ প্রবন্ধে লেখক পল্লিসাহিত্য বা লোকসাহিত্যের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। লেখকের মতে, পল্লিসাহিত্য দেশের আলো-জল-বাতাসের মতো সকলেরই সাধারণ সম্পত্তি। পল্লিসাহিত্যে বিশেষ কোনও সম্প্রদায়ের কথা থাকে না, থাকে না বিশেষ কোনও র্ধমমতের কথা। তিনি লিখেছেন--‘পল্লীসাহিত্যে হিন্দু-মুসলমান কোনো ভেদ নেই। যেমন মাতৃ-স্তন্যে সন্তান মাত্রেরই অধিকার, সেইরূপ এই পল্লীসাহিত্যে পল্লীজননীর হিন্দু-মুসলমান সকল সন্তানেরই সমান অধিকার।’ ‘সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতার রূপ সর্ম্পকে আলোচনা করেছেন। সাম্প্রদায়িক সাহিত্যই কোনও দেশে সাম্প্রদায়িক বিবাদসৃষ্টির প্রধান কারণ বলে লেখক মনে করেন। ধূর্জটিপ্রিসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘বিশ্ব-কবি’, ‘সমাজর্ধম ও সাহিত্য’ ও ‘সাহিত্যের কথা: মানদণ্ড’ প্রবন্ধ তিনটি এই খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। ‘বিশ্ব-কবি’ প্রবন্ধে লেখক ‘বিশ্ব’ কথাটির জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, সাহিত্যের চিরন্তন লক্ষণ ও তুলনামূলক বিচারকে বিবেচেনায় রেখে ‘বিশ্ব-কবি’ উপাধি সর্ম্পকে অভিমত ব্যক্ত করেছেন এবং রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি বলার যৌক্তকিতা ব্যাখ্যা করেছেন। ‘সমাজর্ধম ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে র্ধমের ব্যক্তিগত ও সমাজগত দিকের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। লেখক মনে করেন ব্যক্তিগত র্ধমই সমাজর্ধমরে প্রেরণা। র্ধম তাঁর কাছে শুধু ধারণ করবার শক্তিই নয় সৃষ্টি করবার প্রেরণাও। ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে সবসময় সামঞ্জস্য বজায় থাকে না। এই অসামঞ্জ্যসজনিত শক্তিকে সংস্কারের কাজে যিনি লাগাতে পারেন তিনিই নবযুগের পুরুষ। কোনও তত্ত্ব প্রচার না করেও যে লেখক মানুষের সঙ্গে বাইরের সমাজ ও প্রকৃতির নিত্য নতুন বিরোধকে রূপ দিতে পারেন তিনিই ‘নব্য-সাহিত্যিক’। ‘সাহিত্যের কথা: মানদণ্ড’ প্রবন্ধে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যের মানদণ্ড সর্ম্পকে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁর বিবেচনায় মতের কাঠামোর মধ্যে থাকলে সাহিত্যের র্সবনাশ হয়। বড় আর্টিস্টের মতামত হজম করার শক্তি থাকতে হয়। স্বাধীন ভারতে সাহিত্যিক মানদণ্ড পরাধীন ভারতরে সাহিত্যিক মানদণ্ডের চেয়ে নিচু বলে তিনি মনে করেন।
র্বতমান খণ্ডে কাজী মোতাহার হোসেনের ৬টি প্রবন্ধ গৃহীত হয়েছে। ‘মহাকাব্য রচনা আধুনিক সাহিত্যের উপযোগী কি না’ প্রবন্ধে লেখক এ-যুগে মহাকাব্য রচনা হতে পারে কি না এই প্রসঙ্গের অবতারণা করে ইসলামি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মধ্যে মহাকাব্য রচনার অনকে উপকরণ ছড়িয়ে আছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। এসব উপকরণ নিয়ে ‘বিশিষ্ট বেগবন্ত মহাকাব্য’ রচিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন। ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে সুফী-প্রভাব’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে সুফিদর্শনের প্রভাব বিষয়ে বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করা হয়েছে। “নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা” প্রবন্ধে কাজী মোতাহার হোসেন র্পযাপ্ত উদ্ধৃতি দিয়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শিল্পমূল্য ও গঠনসৌর্কয বিশ্লেষণ করেছেন। জীবনানন্দের সাহিত্যভাবনার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বিখ্যাত বই কবিতার কথায় অর্ন্তভুক্ত প্রবন্ধাবলিতে। র্বতমান খণ্ডে এই বইয়ের ১০টি প্রবন্ধ গৃহীত হয়েছে। তাঁর সাহিত্যচিন্তার সংিহভাগ অংশে পাওয়া যায় কবিতা-বিষয়ক ভাবনা। জীবনানন্দের মতে, যাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা আছে, তারাই কবি। তাঁর মতে, কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দুইরকম উৎসারণ মাত্র। জীবন থেকে আসে বাস্তবতার ধারণা আর কবিতা উদ্দীপ্ত করে কল্পনামনীষা। জীবনানন্দ দাশ সাহিত্যভাবনায় প্রবলভাবে জীবনবাদী--কন্তিু তাঁকে আপাত মনে হয় জীবনবিমুখ ব্যক্তি বলে। সাহিত্যকে তিনি জীবনরে সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত মনে করেন। তাঁর মতে, কবিতা ও জীবন পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। তাই কবিতা সৃষ্টির সময় কবির চেতনায় অজান্তেই আবির্ভূত হয় জীবন। জীবনানন্দ মনে করেন, কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা খুবই জরুরি। তাঁর মতে, কালজ্ঞান ও ইতিহাসচেতনা নিয়েই মানবতার ও কবিমানসের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। এই ‘ঐতিহ্য’কে সাহিত্যে বা কবিতায় রূপায়িত করতে হলে ভাব-প্রতজ্ঞিার প্রয়োজন--যা প্রজ্ঞাকে স্বীকার করে নিয়ে নানারকম ছন্দে অভব্যিক্ত হয়।
তিনি বিশ্বাস করেন, কবিতায় চিরপর্দাথ আছে--সমালোচনায়ও। সুতরাং সৎ সমালোচনা কবিতার প্রগতির জন্য খুবই জরুরি। জীবনানন্দের মতে, ভালো বা মহৎ কবিতা কোনও সুষ্ঠু এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পথে রচিত হয় না। সত্য, বিশ্বাস বা বিশেষ কোনও দর্শন অবচেতনভাবেই কবিতায় প্রতিভাসিত হয়। কবি তাঁর বিশ্বাসকে কবিতায় উপস্থাপন করবেন এমনভাবে, যাতে সর্তক পাঠক বুঝে নিতে পারেন কবির মূল লক্ষ্য। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘কাব্যের মুক্তি’ ও ‘ছন্দোমুক্তি ও রবীন্দ্রনাথ’ র্শীষক দুটি প্রবন্ধ ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র চর্তুথ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। ‘কাব্যের মুক্তি’ প্রবন্ধে কাব্য ও কবি প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। লেখক কবিতার ক্ষেত্রে বিষয় ও রূপ দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে ভাষা, ভাব আর ছন্দ এই তিনের সমন্বয়েই কবিতার র্সাথকতা। ভাষার শাসন থেকে কাব্যের মুক্তি নেই। তবে শব্দের ব্যবহার অবশ্যই কবির রূপদক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক কবির প্রধান প্রয়োজন ‘অবৈকল্য’ আর ‘অকপটতা’। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মনে করেন গদ্যের অবলম্বন বিজ্ঞান আর কাব্যের অন্বিষ্ট প্রজ্ঞান। কাব্য র্আট বলেই বৈরিতায় তার ভয় নেই। ‘ছন্দোমুক্তি ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, বিশেষভাবে কবিতা ও কবিতার ছন্দ বিশ্লেষণ করে প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন একমাত্র তাঁর অধ্যবসায়েই গদ্য-পদ্যের বিরোধ ঘুচেছে। রবীন্দ্রনাথই সক্ষম হয়েছেন ছন্দোমুক্তিতে পৗেঁছতে।
র্বতমান খণ্ডে অন্নদাশঙ্কর রায়ের নয়টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। ‘র্আট কী ও কী নয়’ প্রবন্ধে র্আট সর্ম্পকে ধারণা দেওয়া হয়েছে। লেখকের মতে আনন্দ দেওয়া ও পাওয়ার ছল বা উপলক্ষ্য বা মাধ্যমই র্আট। তবে র্আট ও র্আট-নয়-এর মাঝে কোনও সুনির্দিষ্ট সীমান্তরেখা নেই। ‘লক্ষ্য এবং উপলক্ষ’ প্রবন্ধে র্আটের লক্ষ্য ও উপলক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। দুই ডানা নিয়ে যেমন পাখি, দুই পার নিয়ে যেমন নদী, তেমনি দাতা ও গহীতা নিয়েই র্আট। যিনি দাতা তিনি শিল্পী লেখক, যিনি গ্রহীতা তিনি পাঠক, শ্রোতা, দর্শক বা বলা যায় রসিক। র্আটের লক্ষ্য মানুষের মন জানাজানি। আন্তরিক প্ররেণা থেকে চেনা-শোনাটাই লক্ষ্য, র্আট তার উপলক্ষ্য। ‘র্আটের মূল্য’ প্রবন্ধে লেখক র্আটের মূল্য বিচারে প্রকরণ, বিষয় ও আর্টিস্টকে সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘মুখ্য ও গৌণ’ প্রবন্ধে প্রকরণকে গুরুত্ব দিয়ে রসকে কাব্যের আত্মা বলে স্বীকার করলেও বিষয়কেই মুখ্য বিবেচনা করা হয়েছে। ‘রস আর রূপ’ প্রবন্ধে লেখক রস-রূপ দুটোকেই গুরুত্বর্পূণ বিবেচনা করেও রসকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ‘গতি ও স্থিতি’ প্রবন্ধে লেখক জানিয়েছেন জীবনযাত্রা পরিবর্তনশীল, জীবন নয়। সাহিত্যের সর্ম্পক জীবনযাত্রার সাথে নয় জীবনের সঙ্গে। ‘প্রমথ চৌধুরীর কবিতা’ প্রবন্ধে লেখক প্রমথ চৌধুরীর কবিতাকে যৌবনের কবিতা বলে অভিহিত করেছেন। বাংলা ভাষাকে প্রাদেশিকতার সীমা ছাড়িয়ে র্সবভারতীয় ভাষা হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা আছে ‘বাংলা সাহিত্যের গতি’ প্রবন্ধে। ‘রবীন্দ্রনাথ ও আমরা’ প্রবন্ধে অন্নদাশঙ্কর বাংলাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদানের নানা প্রান্ত চমৎকার ভাষায় তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্ট অবদান এই যে, তিনি এদেশে পাঠক তৈরির কাজ করেছেন। মানুষের চিত্তলোকে সংবেদনা সৃষ্টি করতে পারে বলেই রবীন্দ্রসাহিত্য সময়ের সীমা অতিক্রম করে কালোর্ত্তীণ র্মযাদায় অভিষিক্ত হবে বলে অন্নদাশঙ্কর মত প্রকাশ করেছেন।
হুমায়ুন কবিরের বাঙলার কাব্য বাংলা কবিতার ইতিহাস বিষয়ে একটি অসামান্য গ্রন্থ। লেখকের মতে, বহুজাতির বিচিত্র রক্তের সংমিশ্রণ হয়েছে বলে বাঙালিদের মধ্যে অনেক প্রতিভার আবির্ভাব সম্ভব হয়েছে। হুমায়ুন কবির অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, ভারতবর্ষে মুসলিম বিজয়ের ফলে হিন্দু-সংস্কৃতির সঙ্গে সংমিশ্রণে সমৃদ্ধতর নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের ফলে দুই সম্প্রদায়েরই মানসলোকে বিপ্লবকারী পরির্বতন সাধিত হয়েছে। লেখকের মতে, বৈষ্ণব কবিতা এই বিপ্লবকারী পরিবর্তনেরই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিণতি ও চিরন্তন সাক্ষ্য। লেখকের মতে, পশ্চিমবাংলার হিন্দুমানসে ইসলামের সংঘাতে জেগেছিল বৈষ্ণব কবিতা; র্পূববাংলার হিন্দুমানসে সে-সংঘাতে জেগেছে মনসামঙ্গল। বাংলায় সামন্ততন্ত্রের পরাভব এবং মধ্যশ্রেণির জাগরণের সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় র্বতমান গ্রন্থের চর্তুথ অধ্যায়ে। এই সমাজ-প্রেক্ষাপটে লেখক বিশ্লেষণ করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা। গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ে আছে রবীন্দ্র-কবিতার বিশ্লেষণ। হুমায়ুন কবির রবীন্দ্রনাথকে প্রগতি-চেতনার কবি হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। রবীন্দ্র-কবিতায় লেখক লক্ষ করেছেন সমন্বয়ের সজ্ঞান উপলব্ধি। তাঁর মতে, এই উপলব্ধির ফলেই রবীন্দ্র-কবিতায় দেখা দিয়েছে সহজ মানবরসের স্ফুর্তি। ষষ্ঠ অধ্যায়ে পাওয়া যায় রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতার মৌল প্রবণতা বিষয়ে একটি নির্যাসর্ধমী বিবেচনা।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র পঞ্চম খণ্ডে বুদ্ধদেব বসুর তেইশটি ও রণেশ দাশগুপ্তের চারটি সাহিত্যচিন্তা-বিষয়ক রচনা পত্রস্থ হয়েছে। বুদ্ধদেব বসু ও রণেশ দাশগুপ্ত বাংলা সাহিত্যচিন্তকদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। ‘এ-যুগের কবিতা’ প্রবন্ধে লেখক জানিয়েছেন এ যুগের কবিরা যান্ত্রিক ধ্বনিপুঞ্জের ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। ধ্বনি ব্যবহারে পল্লিপ্রকৃতিরই প্রাধান্য। আধুনিক কবিতা তাই যথেষ্ট আধুনিক নয়। বিষয় নয়, কাব্যিক গুণ দিয়েই কবিতার বিচার হবে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেছেন। ‘আধুনিক কবিতায় প্রকৃতি’ প্রবন্ধে কবিতায় প্রকৃতির ব্যবহারকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। র্দীঘদিন কবিতায় প্রকৃতির মহিমান্বিত রূপের প্রশস্তি থাকলেও আধুনিক কবিরা প্রকৃতি নয়, কবিতায় মানুষের সৃষ্টিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আধুনিক কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষের দ্বন্দ্বই মুখ্য।
‘বরিস পাস্টেরনাক’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু রুশ সাহিত্যিক বরিস পাস্টেরনাক সর্ম্পকে মননধর্মী বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেছেন। ‘বাংলা কবিতার স্বপ্নভঙ্গ: মানসী’ প্রবন্ধে বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথের অবদান প্রসঙ্গে মানসী কাব্যের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন মানসী থেকে বাংলা কবিতা মধুসূদনের পথ ছেড়ে রবীন্দ্রনাথের পথেই চলমান। মানসী থেকে বাংলা কবিতার জন্মান্তর। ‘কান্তা ও কবিতা’ প্রবন্ধে লেখক মানসী থেকে সোনার তরী র্পবের রবীন্দ্রকবিতায় রূপায়িত নারীসত্তার অন্তর্নিহিতি তাৎর্পয ও ক্রম রূপান্তরের সাথে কবির শিল্পপ্রকরণের রূপান্তরকে বিশ্লেষণ করেছেন।
‘জীবনানন্দ দাশ: ধূসর পাণ্ডুলিপি’ ও ‘জীবনানন্দ দাশ-এর স্মরণে’ প্রবন্ধ দুটিতে জীবনানন্দ দাশের ধূসর পাণ্ডুলিপি কাব্য ও তাঁর জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক আলোচনা করা হয়েছে। জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে লেখকের মন্তব্য ‘জীবনানন্দ প্রকৃত কবি ও প্রকৃতির কবি।’ ‘নজরুল ইসলাম’ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গানের মূল্যায়ন করা হয়েছে। ‘রামায়ণ’ প্রবন্ধে প্রাচ্য-মহাকাব্য সর্ম্পকে বুদ্ধদেব বসুর স্বকীয় চিন্তার পরিচয় ফুটে উঠেছে। রাম-চরিত্রের র্দুবলতা ও সীমাবদ্ধতার কথা তিনি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘মাইকেল’ প্রবন্ধে বুদ্ধদবে ব্যাখ্যা করেছেন মাইকেল-প্রতিভার অন্তর্বিরোধ, দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা।
‘বাংলা শিশুসাহিত্য’ প্রবন্ধে লেখক বাংলা শিশুসাহিত্য সর্ম্পকে একটি বিশ্লেষণাত্মক বিবেচনা উপস্থাপন করেছেন। ‘বাংলা ছন্দ’ প্রবন্ধে বাংলা ছন্দের রূপ ও বৈশিষ্ট্য সর্ম্পকে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক’ বুদ্ধদেব বসুর একটি উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ। আলোচ্য প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক কবিবৃন্দের সাহিত্যপ্রতিভা মূল্যায়ন করেছেন। বুদ্ধদেব মনে করেন--রবীন্দ্রানুসারী কবিসমাজ রবীন্দ্রনাথের কাব্য-ঐতিহ্যের আদলেই নিজেদের প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর কবি হিসেবে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা সচেতনভাবে রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র একটা জগৎ নির্মাণ করেছেন। ‘রবীন্দ্র-জীবনী ও রবীন্দ্র-সমালোচনা’ বুদ্ধদেবের একটি তাৎর্পযবহ রচনা। এ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু মত প্রকাশ করেছেন যে, রবীন্দ্রসাহিত্য সমালোচনার সবচেয়ে বড় অন্তরায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তিনি লিখেছেন--‘রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজের ব্যাখ্যাতা হয়ে পরবর্তীদের যে সুবিধে করে দিয়েছেন, সেই সুবিধেটাই বিপজ্জনক; তাঁর আপন ভাষ্যের সীমানার বাইরে তাঁকে দেখতে পাওয়া আজ র্পযন্ত সহজ হয়নি।’
সাংবাদিকতা, ইতিহাস ও সাহিত্য--এই তিনটি প্রত্যয়ের আন্তঃসর্ম্পক বুদ্ধদেব বিশ্লেষণ করেছেন ‘সাংবাদিকতা, ইতিহাস, সাহিত্য’ প্রবন্ধে। এখানে তিনি তিনটি বিষয়কে পরস্পর থেকে মুক্ত হয়ে যেমন সাবালক হতে বলেছেন; আবার একই সঙ্গে এগুলোর আন্তঃসম্পর্ককেও স্মরণে রাখার কথা বলেছেন। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তার বিশিষ্ট প্রকাশ ঘটেছে ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’ র্শীষক প্রবন্ধে। বুদ্ধদেব বসুর এই মত স্মরণীয়: ‘আমি শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।’ শিল্পকে বুদ্ধদেব বসু জীবনের অংশ বলেই বিবেচনা করেছেন। বুদ্ধদেব বসু গোষ্ঠীগতভাবে শিল্পচর্চায় বিশ্বাসী ছিলেন না।
‘চাই আনন্দের সাহিত্য’ প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন শিল্পনৈপুণ্যে শ্রেষ্ঠ হলেও পাশ্চাত্য লেখকেরা জীবনবিমুখ। বিশ শতকের শেষ লগ্নে তিনি বিশ্বসাহিত্যে জীবনমুখী রূপান্তর কামনা করেছেন; যার প্রত্যয় হবে ‘বাঁচো, ভালোবাসো, হও।’ ‘টোমাস মান’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু র্জামান কথাসাহিত্যিক টোমাস মান্কে নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর বিবেচনায় মান্ এমন একজন কথাসাহিত্যিক যাঁর লেখা কবিদেরও পাঠ ও আলোচনার যোগ্য। তিনি মনে করেন মান্-এর গ্রন্থ আধুনিক যুগের নতুন পুরাণ। তিনি এক শিল্পীদেবতা। ‘এক গ্রীষ্মে দুই কবি ডস্টয়েভস্কি ও বোদলেয়ার’ প্রবন্ধে রুশ কথাসাহিত্যিক ডস্টয়েভস্কি ও ফরাসি কবি বোদলয়োর সর্ম্পকে তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তার, বিশেষত কবিতাভাবনার বিশেষ ভাষ্য প্রকাশতি হয়েছে ‘কবিতার শত্রু ও মিত্র: একটি খোলা চিঠি’ প্রবন্ধে। এতে বুদ্ধদেব কবিতা সর্ম্পকে তাঁর অভিমত নানাভাবে তুলে ধরেছেন। কবিতা সর্ম্পকে যত বিরূপ অভিমতই উচ্চারিত হোক, বুদ্ধদেব বসুর কাছে তা চিরকালই সৌর্ন্দয ও আনন্দের আধার। কেননা, তাঁর মত, শিল্প তথা কবিতার অভজ্ঞিতা বিস্তীর্ণ ও সম্প্রসারিত করে আমাদের; কবিতার মধ্যইে আমরা উপলব্ধি করি জগতের সঙ্গে আকস্মিক এক সমানুকম্পন, এক পবিত্র বেদনাবোধ, কোনও ইন্দ্রিয়াতীত উদ্ভাস, কখনও-বা ক্ষণিকের সঙ্গে শাশ্বতের মলিনর্স্পশ। ‘কবিতা ও আমার জীবন’ বুদ্ধদেব বসুর আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার শব্দভাষ্য। ‘সংস্কৃত কবিতা ও আধুনকি যুগ’ প্রবন্ধে লেখক কালিদাস, মেঘদূত ও সংস্কৃত কবিতার সাথে আধুনিক যুগের বাঙালি পাঠকের সর্ম্পক বিশ্লেষণ করেছেন। ‘র্শাল বোদলেয়ার ও আধুনিক কবিতা’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু কবি র্শাল বোদলেয়ারকে ব্যাখ্যা করে আধুনিক কবিতায় তাঁর প্রভাবের বিশ্লেষণাত্মক পরিচয় তুলে ধরেছেন।
বাংলা সাহিত্যসমালোচনার ক্ষেত্রে রণেশ দাশগুপ্ত র্মাকসবাদী চিন্তক হিসেবে সমধিক পরিচিত। মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষাই তাঁর সাহিত্যচিন্তার কেন্দ্রীয় প্রবণতা। ‘কবিতার ভাষা মাতৃভাষা’ প্রবন্ধে লেখক, কবি ও দার্শনিকের সত্য সম্পর্কিত স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বিবেচনায় কবিতা ও ভাষা অবিচ্ছেদ্য। তিনি মনে করেন--‘মাতৃভাষা কবিতার প্রাণ এবং কবিতার সত্য মাতৃভাষাতে সম্পৃক্ত।’ ‘সাহিত্য’ র্শীষক প্রবন্ধে সাহিত্য-শিল্পকলা সর্ম্পকে রণেশ দাশগুপ্তের ধারণার স্ফটকিসংহত প্রকাশ ঘটেছে। রণেশ দাশগুপ্তের মতে, সাহিত্য হচ্ছে শব্দ এবং পদবিন্যাসের শিল্পকলা। বিশ্বপ্রকৃতির যে উপাদানরাশি মানুষের কামনা-বাসনার স্বাক্ষর বহন করে জীবনের ভঙ্গিমাকে ব্যঞ্জনা দয়ে, তা-ই শিল্পকলার উপাদান। লেখকের মতে, শিল্পকলার উৎস হচ্ছে র্অথনতৈকি সমাজ ও জীবিকা। আর মনন রয়েছে এদের সঙ্গে জড়িয়ে। শিল্পকলা তাই মননকে বাদ দিয়ে চলতে পারে না।
‘আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপ’ প্রবন্ধটিতে লেখকের এই প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে যে--দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই শিল্প-সাহিত্যের রূপ, অর্থ ও তাৎপর্য নির্ভর করে। বিশ্বব্যাপী শতাব্দীকালের সাহিত্যে মার্কসবাদ কীভাবে প্রতফিলতি হয়ছেে তারই পর্যালোচনা ‘মার্কসীয় বাতাবরণ: শতাব্দীকালের সাহিত্যে’ প্রবন্ধ। লেখক দেখিয়েছেন সাহিত্যে এই প্রতফিলন সৃষ্টিশীল ও তাত্ত্বিক এই দুই ধারায় ঘটেছে। র্বতমান খণ্ডে সংকলিত রচনাসমূহ পাঠ করে দুইজন বাঙালি লেখকের সাহিত্যভাবনা সর্ম্পকে কৌতূহলী পাঠক ধারণা লাভ করতে পারবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
শিবনারায়ণ রায় ও সুরেশচন্দ্র মৈত্র সাহিত্যচিন্তার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র ষষ্ঠ খণ্ডে তাঁদের সাহিত্যচিন্তামূলক রচনা পত্রস্থ করা হয়েছে।
চিন্তাবিদ শিবনারায়ণ রায়ের এগারোটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে এ খণ্ডে। ‘প্লেটোর সাহিত্যবিচার’ প্রবন্ধে পৃথিবীর আদি সাহিত্য-সমালোচক প্লেটোর সাহিত্যভাবনা ও নন্দনচিন্তা র্পযালোচনা করা হয়েছে। কবিদের বিরুদ্ধে প্লেটোর অভিমতকে খণ্ডন করে তিনি লিখেছেন, মানুষের জীবনে সাহিত্যস্বাদের কোনও তুলনা নেই এবং প্ররেণা শুধু সাহিত্যস্রষ্টাকেই মুক্তির স্বাদ দেয় না, সাহিত্যভোক্তাকেও সে-স্বাদে সমৃদ্ধ করে থাকে। প্লেটো নিজে এ স্বাদে অনভিজ্ঞ ছিলেন না, কিন্তু তাঁর আর্দশ-রাষ্ট্রের নাগরিকদের এ স্বাদ থেকে বঞ্চিত রাখতে চেয়েছেন--এখানেই প্লেটোর সাহিত্যচিন্তার ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা বলে মনে করেন শিবনারায়ণ রায়।
ক্লাসিক ও রোমান্টিক প্রবণতা সর্ম্পকে শিবনারায়ণ তাঁর বিবেচনা তুলে ধরেছেন ‘ক্লাসিক ও রোমান্টিক’ প্রবন্ধে। লেখকের মতে, ক্লাসিকের ধ্যেয় রূপ, রোমান্টিকের সাধনা প্রকাশ। ক্লাসিক-মানস ঐতিহ্যের অনুকর্ষে মার্জিত, রোমান্টিক-মানস স্বকীয়তার সাধনায় সিদ্ধিকামী। শিবনারায়ণের মতে, ক্লাসিক ও রোমান্টিকের উদ্ভব দ্বৈতে, র্সাথকতা অদ্বৈতে। ক্লাসিক ও রোমান্টিক পরস্পর থেকে ভিন্ন, এমনকি বিপ্রতীপ; তবু একে-অন্যের সহযোগ ছাড়া সার্থকতা অর্জন করতে পারে না। ‘কবিতার কান’ প্রবন্ধে লেখক কবিতার স্বাদ-আস্বাদনে শব্দের ধ্বনিগত চারিত্র্য নির্দেশ করেছেন। লেখকের মতে, রূপের পরিমিতির সঙ্গে গতিশীল প্রাণের অনির্দেশ্যতার সঙ্গমের ফলে ছন্দের জন্ম। ছন্দ কবির মন থেকে পাঠকের মনে শিল্প-আবেগের সঞ্চার ঘটায়, একই সঙ্গে বাক্যার্থের অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনাকেও ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে।
শিবনারায়ণ রায়ের একটি দৃষ্টি-উন্মোচনকারী প্রবন্ধ ‘রবীন্দ্রনাথ ও গোয়েটে’। এ প্রবন্ধে তিনি বিশ্বপ্রেক্ষাপটে তুলনামূলক বিচারের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ও গোয়েটের সাহিত্যপ্রতিভার স্বরূপ তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, গ্যোয়েটে এবং রবীন্দ্রনাথ উভয়েই আপন আপন দেশে রেনেসাঁসি ঐতিহ্যের প্রধান উত্তরসাধক। দুজনের মধ্যে আবার মৌলিক অমিলও রয়েছে--গ্যোয়েটে অস্তিত্ববাদী, রবীন্দ্রনাথ ভাববাদী। ‘নায়কের মৃত্যু’ প্রবন্ধে শিবনারায়ণ রায় রেনেসাঁস-পরর্বতী নায়ক-চরিত্রের বিবর্তন সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে, এ কালের সাহিত্যে নায়কের ছায়া ক্রমশ ধূসর হয়ে গেছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের দাপটে হিরো এখন অ্যান্টি-হিরো।
তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে আধুনিক কবিতার ব্যঞ্জনার্থ সম্পর্কে বিশ্লেষণ আছে ‘আধুনকি কবিতায় ব্যঞ্জনা’ প্রবন্ধে। শিবনারায়ণের মতে, আধুনিক কবিতায় ঐতিহ্যের সবচেয়ে ব্যঞ্জনাময় প্রয়োগ হল কাব্যদেহে র্পূবসূরি কবিদের স্বীকরণ। বাঙালি-মানসে রবীন্দ্রনাথের সাধনার মাত্রা কী, তার রূপ আর রূপান্তরই-বা কেমন--এসব বিষয় নিয়ে লেখা শিবনারায়ণের ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক মন’ প্রবন্ধটি। লেখকের মতে, রবীন্দ্রনাথ দুটি সম্পন্ন ঐতিহ্যের মধ্যে মিলন ঘটিয়েছেন। প্রথমটি ভারতবর্ষের ঔপনিষদিক ঐতিহ্য আর দ্বিতীয়টি রেনেসাঁস-উত্তর-পশ্চিমী মানবতন্ত্রী ঐতিহ্য। রবীন্দ্রনাথের কল্পনায় এই দুই ধারা পরস্পর যুক্ত হয়েছিল। তবু রবীন্দ্রসাহিত্য সমকালীন পাঠককে কতটুকু টানতে পারছে--সেটাই লেখকের প্রশ্ন এবং যার উত্তরও সন্ধান করা হয়েছে র্বতমান প্রবন্ধে। যুগসন্ধির কালে অন্তত কিছু মানুষের চেতনায় অন্য জাতি, গোষ্ঠী ও সংস্কৃতির আস্তিত্বিক বৈশিষ্ট্য র্পূবের তুলনায় তীক্ষ্মতর হয়ে ওঠে। চেতনার এই তীক্ষ্মতা এবং পরস্পরাশ্রয়ী প্রতিন্যাসের সংকীর্ণতা--এই দুই বিষয় শেকসপিয়রের নাটকে কীভাবে দেখা যায়, তা নিয়েই রচিত হয়েছে ‘শেক্সপিয়রের তিন বেগানা’ প্রবন্ধ।
‘সুধীন্দ্রনাথ দত্ত’ প্রবন্ধে সুধীন্দ্রনাথের কবিমানস ও কাব্যশিল্প সর্ম্পকে আলোকপাত করেছেন শিবনারায়ণ। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় প্রতিফলিত দার্শনিক চেতনার স্বরূপ অন্বেষাই এ প্রবন্ধে লেখকের প্রধান অন্বষ্টি। লেখকের মতে, সুধীন্দ্রনাথ প্রচলিত অর্থে দার্শনিক না-হলেও দার্শনিকতা তাঁর কাব্যের বিশিষ্ট লক্ষণ। “সাহিত্যিকের ‘দায়বদ্ধতা’ বা দায়িত্ব” প্রবন্ধে লেখক সাহিত্যিকের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁর বিবেচনায় পার্টি বা সরকার বা বিশেষ মতবাদের কাছে দায়বদ্ধ থাকা সাহিত্যের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। ‘ভারতীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্যে ধারাবাহিকতা’ প্রবন্ধে শিবনারায়ণ রায় সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সংজ্ঞা দিয়ে সংস্কৃতি ও সাহিত্যিক ধারাবাহিকতা বলতে কী বোঝায় তা ব্যাখ্যা করেছেন। বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন খ্রষ্টির্পূব পনেরো শতক থেকে খ্রিষ্টীয় আঠারো শতক র্পযন্ত বিস্তিৃত র্পযায়ের ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ধারাবাহিকতাকে। তাঁর মতে সাহিত্যের জন্ম ভাষার উৎর্কষ সাধন থেকে। উৎকর্ষের অভীপ্সা এবং উদ্যোগ ছাড়াও একধরনের সাহিত্য তৈরি হয়, যাকে তিনি বলেছেন বিনোদন সাহিত্য। এই সাহিত্যের আবেদন সাময়িক ও অগভীর।
সুরেশচন্দ্র মৈত্র রচিত বাংলা কবিতার নবজন্ম গ্রন্থে চারটি অধ্যায়ে ষোলোটি পরচ্ছিদে, তার মধ্যে নয়টি পরিচ্ছদে সংকলিত হয়েছে র্বতমান খণ্ডে। বাংলা কবিতা কীভাবে আধুনিক জীবনচেতনা অঙ্গীকার করছেে, লাভ করেছে নবজন্ম--এ গ্রন্থে তারই সন্ধান করেছেন লেখক। তাঁর মতে, বাংলাদেশ প্রধানত গীতিকবিতার দেশ। এদেশে গীতিকবিতাই উৎকৃষ্ট কবিতা। বাংলা কবিতার মূলস্রোত মানবতাবাদী চেতনায় বহমান। বাংলা কবিতার নবজন্মের ক্রমধারায় লেখক প্রথমেই আলোচনা করেছেন চর্যাপদ সম্পর্কে। লেখক বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন চর্যাপদের মানবীয় চেতনা। বৈষ্ণব পদাবলী সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক মন্তব্য করেছেন--‘বৈষ্ণব কাব্য-সাধনার প্রধান ফসল গীতিকবিতা।’ তাঁর মতে, বৈষ্ণব গীতিকাব্যের ঐতিহাসিক অবদান কম নয়। মধ্যযুগের আখ্যায়িকধর্মী কাব্য সর্ম্পকে লেখক মন্তব্য করেছেন--এগুলো মূলত পদ্যের মাধ্যমে গদ্যের অধিকার হরণ। উনিশ শতকে বাংলাদেশে দেখা দেয় নবচেতনার জোয়ার। উনিশ শতকে নবজাগরণের ফলে সৃষ্ট নতুন ধারণা যাঁরা সাহিত্য-শিল্পকলায় ব্যবহার করে এনেছেন গতির স্মারক--এ গ্রন্থে এই বিষয়েও আলোচনা সংযোজিত হয়েছে। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মিনী উপাখ্যান থেকেই বাংলাসাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত বলে লেখক মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, রঙ্গলালে যার সূচনা, মাইকেলে তার শ্রীবৃদ্ধি এবং রবীন্দ্রনাথে তারই অলোকসামান্য সৌর্ন্দয-র্পূতি। মধুসূদন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সুরেশচন্দ্র মৈত্র লিখেছেন যে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনে ও সাহিত্যে উনিশ শতকের নবজাগরণ চেতনার পরম প্রকাশ ঘটেছে।
বিহারীলাল চক্রবর্তীর সাধনাতেই খুলে যায় আত্মমুখীন বাংলা কবিতার বিশাল অর্গল। বাংলা কবিতায় বিহারীলালই প্রথম ব্যক্তির স্বরকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিহারীলাল-উত্তর বাংলা গীতিকবিতার বিকাশের ধারা বিশ্লেষণ বাংলা কবিতার নবজন্ম গ্রন্থের বিশেষ সার্থকতার দিক। রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাহিত্য বিশ্লেষণেও লেখক বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। রবীন্দ্র-সমসাময়িক কবিদের সর্ম্পকে চিত্তাকর্ষক আলোচনা বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে। র্বতমান খণ্ডে শিবনারায়ণ রায় ও সুরেশচন্দ্র মৈত্র--এই দুই বাঙালি লেখকের সাহিত্যচিন্তার পরচিয় পাওয়া যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
বাংলাসাহিত্য সমালোচনায় সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার কালান্তর এক গুরুত্বর্পূণ গ্রন্থ। ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র সপ্তম খণ্ডে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই গ্রন্থের সব প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। ‘বাংলা কবিতার কালান্তর’ র্শীষক প্রথম প্রবন্ধে লেখক আধুনিক বাংলা কবিতার উদ্ভবের ইতিহাস ও তার মৌল প্রবণতা তুলে ধরেছেন। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, আধুনিক কবিতা হচ্ছে আধুনিক জীবনের কবিতা। লেখকের মতে, আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান ধারা দুটো--প্রতীকী এবং আধুনিক। দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘কবিতার ভাষা’। শব্দ কবিতার ভাষাকে ধারণ করে। কবিতায় ব্যবহৃত একটি শব্দের একাধিক প্রতিশব্দ থাকতে পারে। ‘আধুনিক বাংলা কবিতার ভাষা’ প্রবন্ধে আধুনিক বাংলা কবিতার ভাষা প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। ‘র্অথের শব্দ’ একটি চমৎকার প্রবন্ধ। এতকাল জানা ছিল শব্দের র্অথ আছে, কিন্তু লেখক এখানে বলতে চেয়েছেন র্অথেরও শব্দ আছে। ‘ভাষার অতীতে’ প্রবন্ধও রচিত হয়েছে শব্দ ও ভাষা প্রত্যয় নিয়ে। শব্দ এবং শব্দকে আশ্রয় করে গড়ে-ওঠা ভাষা--এই দুটোই সাহিত্যের গুরুত্বর্পূণ উপাদান।
রবীন্দ্র-কবিতায় চিত্রকল্প ও প্রতীক নিয়ে তাৎর্পযর্পূণ বিবেচনা উপস্থাপিত হয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথের চিত্রকল্প ও প্রতীক’ প্রবন্ধে। রবীন্দ্র-কবিতায় কবিতা ও গানের যুগল-চারিত্র্য আলোচিত হয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথের গান: আধুনিক কবিতা’ প্রবন্ধে। ‘দুরূহতা ও আধুনিকতা’ প্রবন্ধে আধুনিক বাংলা কবিতার দুরূহতা ও আধুনিকতার পারস্পারিক সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখকের বিবেচনায় কালগত আধুনিকতা-ই কবিতার দুরূহতার উৎস। জীবনানন্দের কবিতা বিষয়ে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবেচনা উপস্থাপিত হয়েছে ‘তিরিশের যুগে বিস্ময়ের বিবর্ণতা: জীবনানন্দ’ র্শীষক প্রবন্ধে। ‘আধুনিক বাংলা কাব্যে তৃতীয় পাণ্ডবের প্রবেশ ও প্রস্থান’ র্বতমান খণ্ডের একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ রচনা। তিরিশের বাংলাদেশে সময়চেতনা ও সমাজবোধের সাযুজ্যে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন পুনর্জীবিত হলেন বিষ্ণু দে-র ‘পদধ্বনি’ কবিতায়। শুধু অর্জুন নয়, পুরাণের অনেক চরিত্রই একালে কবিতায় পুনর্নির্মিত হয়েছে কবিদের কালজ্ঞান ও বিশ্ববীক্ষা প্রকাশের উপায় হিসেবে। জীবনানন্দের হাতে বাংলার হেমন্তসন্ধ্যা নিরুদ্যমতাকে অতিক্রম করে ভিন্নতর অর্থে তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে ‘সময়গ্রন্থির কবি জীবনানন্দ’ প্রবন্ধে।
তিরিশের অন্যতম কবি অমিয় চক্রবর্তীর কবি-স্বভাব বিশ্লেষিত হয়েছে ‘নিঃশব্দ নীলিমা: কবি অমিয় চক্রবর্তী’ প্রবন্ধে। ‘বিষ্ণু দে-নদীতেই নিশ্চয় প্রতীক’ প্রবন্ধে ব্যাখ্যাত হয়েছে কবি বিষ্ণু দে-র স্বকীয় কবিস্বভাব। বিষ্ণু দে-কে লেখক তিরিশের একজন শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তাঁর মতে, কালের সাম্প্রতিক ছন্দে ধৃত দেশ এবং বিশ্বে বিষ্ণু দে প্রত্যক্ষ করেছেন ঘাতে-প্রতিঘাতে, সহযোগে এবং দ্বন্দ্বে আলোড়িত মানবিক চিদাকাশকে। কবি সুধীন্দ্রনাথের স্বকীয় কবিপ্রতিভার পরিচয় ফুটে উঠেছে ‘উদ্বিগ্ন বিষাদ ও কবি সুধীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে। লেখকের মতে--বিষাদ, গ্লানি, পরাভব অথচ জিজ্ঞাসার অপরাজেয় আবির্ভাবে সুধীন্দ্রনাথ বিশিষ্ট। ‘কবিত্বের অদ্বিতীয় ব্রত--বুদ্ধদেব বসু’ প্রবন্ধে কবি বুদ্ধদেব বসুর কবিচৈতন্যের স্বরূপ অঙ্কিত হয়েছে। বুদ্ধদেবের আমিত্বচেতনার ওপরেই এ প্রবন্ধে অধিক মনোযোগ লক্ষযোগ্য। লেখকের মতে, বুদ্ধদেব প্রবলভাবে আত্মসচেতন কবি। সমর সেনের কবিতায় উপনিবেশিত বাঙালি কীভাবে চিত্রিত হয়েছে, সে-কথার বিশ্লেষণ পাওয়া যায় ‘আধুনিক কবিতার আততি--সমর সেন’ প্রবন্ধে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার শ্রেণিচেতনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা উন্মোচিত হয়েছে সংকলিত গ্রন্থের ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়--প্রত্যয়ী পথিক’ প্রবন্ধে।
সন্জীদা খাতুনের দুটি প্রবন্ধ এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। ‘রবীন্দ্রনাথের লিপিকা’ ও ‘রবীন্দ্রকাব্যে প্রেম’। ‘রবীন্দ্রনাথের লিপিকা’ প্রবন্ধে লেখক রবীন্দ্রনাথের লিপিকা গ্রন্থের বিষয়বস্তু ও কাব্যসৌকর্যের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন। আলোচনা করেছেন গদ্যের ছন্দময়তার বিষয়টি; চিহ্নিত করেছেন গদ্য-পদ্যের বিভেদ ও সামঞ্জস্যকে। দেখিয়েছেন নিরাভরণ গদ্যকে কাব্যের বাহন করে তুলে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে মোহনীয় গীতছন্দ সৃষ্টি করেছেন। ‘রবীন্দ্রকাব্যে প্রেম’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রকাব্যে রূপায়িত প্রেমের স্বরূপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের প্রেমের কবিতা বাংলা কাব্যসাহিত্যে প্রচলিত ধারার অনুগামী হয়েও স্বতন্ত্র। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর সাহিত্যচিন্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বর্পূণ লেখক। তাঁর চারটি প্রবন্ধ এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। ‘মাইকলের জাগরণ’ প্রবন্ধে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যরীতি, ভাষা ও চেতনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখকের মতে বাকভঙ্গির লোকজ অভ্যাসের সাথে সংস্কৃতের ঐতিহ্যকে যুক্ত করে মাইকেল নির্মাণ করেছেন কাব্যিক শুদ্ধ ভাষা। কলোনির ধনতন্ত্র ও ব্যক্তির বিচূর্ণতাকে উপলব্ধি করে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন পুরাণের। দেশজ ঐতিহ্য পুর্নসৃষ্টির মাধ্যমে মাইকেল রুখে দাঁড়িয়েছেন স্বকালের কলোনি শাসনের বিরুদ্ধে। ‘যাত্রা অভ্যন্তরে: জীবনানন্দ দাশ’ প্রবন্ধে জীবনানন্দ দাশের কবিমানস ও কবিতা বিষয়ে লেখকের বিশ্লেষণাত্মক চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। বুদ্ধদেব বসুর চেতনা, ভাষা ও সাহিত্যিক পর্বান্তর নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে ‘বুদ্ধদেব বসু’ প্রবন্ধে। ‘সরলতা ও পতনের দ্বন্দ্ব’ প্রবন্ধে কবি আহসান হাবীব সর্ম্পকে লেখকের স্বতন্ত্র কাব্যভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর মতে আহসান হাবীব নিজেকে নির্মাণ করেছেন তিরিশের কাব্যাদর্শে এবং তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া সকল ঋণ তিনি কাব্যিক দক্ষতায় সফল করে তুলেছিলেন।
‘কবি নয় কিন্তু কবিতার মতো’ প্রবন্ধে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শেকসপিয়রের অ্যাজ ইউ লাইক ইট নাটকের নায়িকা রজালিন্ডের চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন। লেখকের বিবেচনায় রজালিন্ডই শেকসপিয়রের কমেডির সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র। রজালিন্ড চরিত্র বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে লেখক ট্রাজেডি ও কমেডির র্পাথক্য যেমন শনাক্ত করেছেন তেমনি উদ্ঘাটন করেছেন ট্রাজেডি ও কমেডির চরিত্র রূপায়ণের জেন্ডার বিশেষত্বকেও। রজালিন্ড চরিত্র বিশ্লেষণে লেখক সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টভঙ্গি ব্যবহার করেছেন। উন্মোচন করেছেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারী ও পুরুষের জীবনের সামগ্রিক ভিন্নতাকে। কবি হবার সকল যোগ্যতা সত্ত্বওে রজালিন্ড কবিতা রচনা থেকে বিরত রাখে নিজেকে। রজালিন্ড কবি না হলেও তার সমগ্র জীবনই কবিতার মতো।
আনিসুজ্জামান চিন্তার্চচার ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রজ্ঞার অধিকারী। ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র সপ্তম খণ্ডে তাঁর সাহিত্যবিষয়ক চারটি প্রবন্ধ পত্রস্থ হয়েছে। ‘নানা রবীন্দ্রনাথের মালা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের জীবন, সাহিত্য, গান, শিল্পকলা ও সামাজিক র্কমকাণ্ডের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখক বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথের নানা অসংগতি বা স্ববিরোধিতাকে চিহ্নিত করেছেন। তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রজীবনের নানা বাঁক ও বিবর্তনকে। লেখকের বিবেচনায় সংগতি-অসংগতির নানা রবীন্দ্রনাথের মালাকে--বিশ্লিষ্ট করে নয়--দেখতে হবে--যতটা সম্ভব, অখণ্ডরূপে। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি কাব্য, তার অনুবাদ, দেশে-বিদেশে এই নিয়ে নানা আলোড়ন সবকছিু সর্ম্পকে এক তথ্যসমৃদ্ধ রচনা ‘ইংরেজি গীতাঞ্জলি রচনা ও অর্ভ্যথনা’ প্রবন্ধ। ‘নজরুল ইসলাম ও তাঁর কবিতা’ কাজী নজরুল ইসলাম সর্ম্পকে লেখকের নিজস্ব মূল্যায়নের শিল্পসফল প্রকাশ। আনিসুজ্জামানের মতে নজরুলের কবিতায় চাঞ্চল্য, অস্থিরতা ও অসংযম থাকলেও তিনি গতি ও বন্ধনমুক্তির বাণী দিয়ে নির্জীব বাঙালিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। যা তাঁর মতো আর কেউ পারেনি। নজরুলের কবিতায় অর্নায, র্আয ও নবীন ইউরোপীয় ঐতিহ্যের সম্মিলিত সংস্কৃতির উত্তরাধিকারের লক্ষণ আছে বলেও লেখক অভিমত প্রকাশ করেন। কবি জসীমউদ্দীন সর্ম্পকে সামগ্রিক আলোচনা আছে ‘জসীমউদ্দীন’ প্রবন্ধে। লেখকের মতে--কবি হলেও জসীমউদ্দীন নিপুণ গদ্যশিল্পী। তিনি মাটির হৃৎস্পন্দনকে শিল্পিত, সুকুমার, সুন্দর কবিতায় রূপ দিয়েছেন। বাংলাভাষীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তা উপভোগ করবে।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র অষ্টম খণ্ডে মঞ্জুভাষ মিত্রের আধুনিক বাংলা কবিতায় ইউরোপীয় প্রভাব বইটি সর্ম্পূণ সংকলিত হয়েছে। বইটিতে মঞ্জুভাষ মিত্র আধুনিক বাংলা কবিতায় ইউরোপীয় প্রভাব বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, বোদলেয়ারের ক্লেদজ কুসুম কাব্য থেকেই আধুনিকতার যাত্রা শুরু। লেখকের মতে, আধুনিক ইউরোপীয় কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আত্মস্বরূপ বা সাবজেক্টিভিটি (Subjectivity)-র শিল্পভাষ্য নির্মাণ। আলোচনায় লেখক ইউরোপীয় আধুনিক কবিতা সর্ম্পকে সংক্ষিপ্ত সমীক্ষার পর বাংলা কবিতায় আধুনিকতা বিষয়ে তাঁর বিবেচনা উপস্থাপন করেছেন। লেখকের মতে, ইউরোপীয় আধুনিক কাব্য-আন্দোলন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে আধুনিক বাংলা কবিতা। আধুনিক বাংলা কবিতার পাঁচ প্রধান স্থপতির কাব্যধারা র্পযালোচনা করে মঞ্জুভাষ মিত্র এখানে দেখতে চেয়েছেন তাঁদের কবিতায় ইউরোপীয় কবিতার প্রভাবের স্বরূপ ও মাত্রা। লেখকের মতে ইউরোপের অনেক কবিই জীবনানন্দ দাশকে বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত করেছে, তবে এক্ষেত্রে ইয়েটস, বোদলেয়ার এবং অ্যালেন পো-ই তাঁকে প্রভাবিত করেছে সমধিক। তিনি লিখেছেন, জীবনানন্দের অনেক কবিতায় কিংবা বিচ্ছিন্ন অনেক পঙ্ক্তিতে, কিংবা বিশেষ কোনও স্তবকে ইয়েটস, বোদলেয়ার অথবা পো-র অনেক কবিতার প্রভাব আমরা বিশেষভাবে লক্ষ করি।
জীবনানন্দের কবিতায় এই তিন কবি ছাড়াও আরও যাঁরা প্রভাব বিস্তার করেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন পল ভেরলেন, র্যাবােঁ, ভ্যালেরি, এলিয়ট প্রমুখ। মঞ্জুভাষ মিত্র মনে করেন--কবি অমিয় চক্রবর্তীর ওপরওে প্রভাব বিস্তার করেছেন একাধিক ইউরোপীয় কবি। তবে এক্ষেত্রে জেরাল্ড ম্যানলি হপকিন্স এবং টি এস এলিয়টের প্রভাবের কথাই তিনি বিস্তৃতভাবে তুলে ধরেছেন। লেখকের মতে, অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় বিষয়চেতনা ও আঙ্গিক বৈশিষ্ট্যে হপকিন্সের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পক্ষান্তরে এলিয়টের কাছ থেকে তিনি গ্রহণ করেছেন শিল্পীর নৈর্ব্যক্তিকতাবিষয়ক ধারণা। মঞ্জুভাষ মিত্রের মতে, ইউরোপের অনেক কবিই সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত করেছেন; তবে এক্ষেত্রে টি এস এলিয়ট, বোদলেয়ার, মার্লামে, ভ্যালেরি এবং হাইনরিখ হাইনের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি।
সুধীন্দ্রনাথের কবিতায় এলিয়টের নানামাত্রিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। তিনি লিখেছেন--বোদলেয়ার, মার্লামে, ভ্যালেরি প্রমুখ ফরাসি আধুনিক কবিদের থেকে পরিগ্রহণের চিহ্ন সুধীন্দ্রনাথের কাব্যে আছে; তবে মার্লামে থেকে পরিগ্রহণই গুরুত্বর্পূণ। আবেগের সংগঠনে ভাব-বলয়ের বিস্তারে হাইনে দ্বারা সুধীন্দ্রনাথ প্রভাবিত হয়েছেন বলে লেখক মত প্রকাশ করেছেন। মঞ্জুভাষ মিত্রের মতে বুদ্ধদেব বসুর ওপর এজরা পাউন্ড, ডি এইচ লরেন্স, বোদলেয়ার, র্যাবােঁ, হ্যেল্ডারলিন, রাইনের মারিয়া রিলকে প্রমুখ কবির প্রভাবই সমধিক। তিনি লিখেছেন: ইয়োরোপীয় আধুনিক কবিতা আধুনিক বাংলা কবিতাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, এই কবিতা থেকে বাংলা কবিতা কীভাবে নতুন সৃষ্টিপথের সন্ধান পেয়েছে, তা অনুভব করতে হলে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়। বিষ্ণু দে-র কবিতায় এজরা পাউন্ড, এলিয়ট, এলুয়ার, আরাগঁ, লোরকা, নেরুদা প্রমুখ কবির প্রভাব লক্ষ করেছেন মঞ্জুভাষ। লেখকের মতে, কবিজীবনের প্রথমদিকে বিষ্ণু দে প্রভাবিত হয়েছেন এলিয়ট দ্বারা, তবে পরর্বতীকালে আরাগঁ, এলুয়ার এবং নরেুদা তাঁকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। মঞ্জুভাষ মিত্র মনে করেন, তিরিশের প্রধান পাঁচ কবির ওপর পাশ্চাত্যের কবিদের প্রভাব বড় কথা নয়, বরং গুরুত্বর্পূণ হলো তাঁদের সাধনার মধ্য দিয়েই বাংলাসাহিত্যে আধুনিকতার লক্ষণসমূহ ব্যাপকভাবে শিল্পরূপ লাভ করেছে।
বাংলাদেশের যেসব লেখকের রচনায় সাহিত্য সর্ম্পকে বিশেষ চিন্তার ছায়াপাত লক্ষ করা যায়, হায়াৎ মামুদ, আবুল কাসেম ফজলুল হক ও হুমায়ুন আজাদ তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বর্পূণ। ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র নবম খণ্ডে উল্লিখিত তিনজন চিন্তকের বারোটি প্রবন্ধ এবং ভানু ভূষণ জানার রোম্যান্টিকতা ও বাঙলা কাব্যে রোম্যান্টিক ধারার বির্বতন বইয়ের পাঁচটি অধ্যায় পত্রস্থ হয়েছে। হায়াৎ মামুদের সাহিত্যচিন্তামূলক পাঁচটি প্রবন্ধ এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো হল: ‘দুই যৌবনে কৃষ্ণ শোণিত’, ‘কবির দায়িত্ব: নজরুল ও দেশকাল পরিপ্রেক্ষিত’, ‘মৃত্যুচিন্তা: তিনজন অসর্বণ কবি’, ‘আইয়ুবের রবীন্দ্রনাথ: অন্য পাঠের নেপথ্যে’ ও ‘শামসুর রাহমানের কবিতা’। ‘দুই যৌবনে কৃষ্ণ শোণিত’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তা ও চিত্রশিল্পীসত্তার অন্তঃস্থিত অনুপ্ররেণার সূত্রটিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
‘মৃত্যুচিন্তা: তিনজন অসর্বণ কবি’ প্রবন্ধে দেশ, কাল ও মেজাজে ভিন্ন তিনজন কবি বোদলেয়ার, লোরকা ও জীবনানন্দ দাশ-এর মৃত্যুচিন্তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তিনজনের মৃত্যুচিন্তা প্রসঙ্গেই লেখক রবীন্দ্রমৃত্যুচেতনার তুলনামূলক র্পযালোচনা করেছেন। বোদলেয়ার-এর কাছে মৃত্যু পরিত্রাণবাহী, অমোঘ, প্রয়োজনীয় অথচ অমৃতহীন। রবীন্দ্রনাথের কাছে মৃত্যু কেবল র্পূণ করে দিতেই আবির্ভূত হয়। লোরকার বুকের গভীরে মৃত্যুর কুসুমিত শতদল হিল্লোলিত ও বিকশিত হয়ে কবিতায় রূপ পায়। রবীন্দ্রনাথের মতো মৃত্যুতে এসে লোরকার জীবন র্পূণতা পায় না। লোরকা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনকে দেখেন। মৃত্যুই তাঁর ‘দুয়েন্দে’। আর ‘জীবনানন্দ দাশের যাবতীয় ভাবনাই মৃত্যুমুখী; যা তিনি লিখবেন, সৃষ্টির র্গভিনী জরায়ু উন্মোচিত করে যা কিছু দেখবেন তিনি সবই মৃত্যু, বিষাদ ও ক্লান্তির রেখাপাতে স্বপ্ন-অনচ্ছ ছায়াঘন।’ মানববেদ্য অথচ আধ্যাত্মিক এই মৃত্যুবোধ র্সবজনীন।
‘আইয়ুবের রবীন্দ্রনাথ: অন্য পাঠের নেপথ্যে’ প্রবন্ধে আবু সয়ীদ আইয়ুবের রবীন্দ্রঅন্বেষা ও রবীন্দ্র-অবলম্বনকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। লেখকের বিবেচনায়: মানব-অস্তিত্বের র্অথ ও লক্ষ্য আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে ইতিহাসের শব ব্যবচ্ছেদের জন্য যে-ছুরিটি তিনি ব্যবহার করেছেন তা কোনো বিজ্ঞানসামগ্রী (instrument বা tool) নয়, জ্ঞানশাস্ত্রের কোনো শাখা-উপশাখা নয়, সেটি হলো রবীন্দ্রকাব্যের নন্দনদৃষ্টি। বিষয়টি একই সঙ্গে বিরল ও অদ্ভুত। ‘শামসুর রাহমানের কবিতা’ প্রবন্ধে শামসুর রাহমানের প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে ও রৌদ্র করোটিতে কাব্য অবলম্বনে কবির শিল্পীস্বভাবের ইতিবৃত্ত সন্ধান করা হয়েছে।
চিন্তক হিসেবে আবুল কাসেম ফজলুল হক নানাদিক থেকেই বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। শ্রেণি ও সমাজসচেতনতা তাঁর সাহিত্যচিন্তার প্রধান অবলম্বন। এ খণ্ডে তাঁর সাহিত্যচিন্তামূলক পাঁচটি প্রবন্ধ পত্রস্থ হয়েছে। প্রবন্ধগুলো হল: ‘রূপান্তরের মুখে আমাদের সাহিত্য’, ‘পূর্ব বাংলার সাহিত্য ও কণ্ঠস্বর’, ‘বাঙলা সাহিত্যের রূপান্তর: মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ’, ‘মধ্যশ্রেণীর জীবনভাবনা ও আধুনিক বাঙলা সাহিত্য’ ও ‘যুগসংক্রান্তির জীবনোৎকণ্ঠা: নবযুগের অভীপ্সা’। ‘রূপান্তরের মুখে আমাদের সাহিত্য’ প্রবন্ধে ষাটের দশকের শেষদিক পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ববাংলা বর্তমান বাংলাদেশের সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখক পাঁচটি ভাগ করে বিষয়বস্তুর পর্যালোচনা করেছেন। প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন প্রথম অংশে পূর্ববাংলার তৎকালীন লেখকদের বেশিরভাগই অভিজাত তথা উচ্চশিক্ষিত নাগরিক সমাজের অন্তর্ভুক্ত। অন্য অংশ ভদ্র সমাজের বাইরের গ্রামের অর্ধশিক্ষিত কবিয়াল, পুথিকার ও পদ্যকার। অভিজাতদের প্রথম ভাগ পশ্চিমা ক্ষয়িষ্ণু ধনতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী জীবনভাবনায় আক্রান্ত কলাকৈবল্যবাদের সমর্থক। দ্বিতীয়ভাগ অতীত-আশ্রয়ী ‘এছলামি জবানে’ আস্থাবান মধ্যযুগীয় সামন্ত যুগের জীবন-ভাবনায় আচ্ছন্ন রবীন্দ্রসাহিত্যসহ বাংলাসাহিত্যের এক বিরাট অতীতকে বর্জনের পক্ষপাতী। অভিজাতদের আরেকটি ক্ষুদ্র অংশ ধনবাদী, সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ধ্যান-ধারণার অন্তঃসারশূন্যতা বুঝতে সক্ষম। লেখকের বিবেচনায় মধুসূদন থেকে কল্লোল যুগ পর্যন্ত বাংলাসাহিত্য বিকশিত হয়ে বার্ধক্যে উপনীত হলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ববাংলার সাহিত্যের কোনও গুণগত পরিবর্তন আসেনি। তৎকালীন লেখকদের শ্রেণিগত ভূমিকা ও সাহিত্য পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে প্রবন্ধটিতে বিদ্যমান অন্ধকার যুগ থেকে পরিত্রাণের জন্য দেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
‘পূর্ব বাংলার সাহিত্য ও কণ্ঠস্বর’ প্রবন্ধে তৎকালীন পূর্ববাংলার সাহিত্যের হালহকিকত পর্যালোচনা ও এ বিষয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মত, পথ ও প্রবণতা তুলে ধরেছেন লেখক। সেই সময়ে প্রকাশিত আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত কণ্ঠস্বর সাময়িক পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্যিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার ভূমিকা বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। লেখকের বিবেচনায় কণ্ঠস্বর সাহিত্যক্ষেত্রে পুরাতন শৃঙ্খলাকে ভেঙে, নৈতিকতার প্রচলিত আদর্শের উৎখাত ঘটিয়ে, নতুন শৃঙ্খলা ও নতুন সাহিত্যাদর্শের প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল। ‘আন্তরিকতাহীনতার যুগে, চরিত্রহীনতার যুগে আন্তরিকতা ও চরিত্র নিয়ে দাঁড়াতে চেয়েছে কণ্ঠস্বর।’ ‘বাঙলা সাহিত্যের রূপান্তর: মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ’ প্রবন্ধে বাংলাসাহিত্যের মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে রূপান্তরের ধারা-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখকের বিবেচনায় মধ্যযুগের সাহিত্যের ধারাগুলো হল মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব-সাহিত্য, অনুবাদ-সাহিত্য ও লোকসাহিত্য। এর মধ্যে একমাত্র লোকসাহিত্যের ধারায়ই পাওয়া যায় মানব-জীবন-কেন্দ্রিক রচনা। বাকিগুলো মুখ্যত ধর্মবিষয়ক রচনা। মধ্যযুগের ধর্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করে আধুনিক যুগে আত্মপ্রকাশ করেছে গীতি কবিতা, আধুনিক কাহিনিকাব্য, মহাকাব্য, সমৃদ্ধ ও শিল্পিত গদ্যভাষা, প্রবন্ধসাহিত্য, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, ব্যঙ্গ রচনা ও রম্য রচনা। শুধু রূপগত দিক থেকে নয় বিষয়বস্তুগত দিক থেকেও আধুনিক যুগের বাংলাসাহিত্য স্বতন্ত্র। মধ্যযুগের সাহিত্যে পারলৌকিক জীবনই মুখ্য আর আধুনিক যুগের সাহিত্যের সম্পূর্ণ অবলম্বন ইহলৌকিক জীবনভাবনা। সাহিত্যে রূপায়িত হয় লেখকদের শ্রেণিচরিত্রসহ যুগের সামগ্রিক পরিচয়। তাই আধুনিক বাংলাসাহিত্যকে বুঝতে হলে এ-কালের সামাজিক রূপান্তর ও বিবর্তনকেও বুঝতে হবে।
‘মধ্যশ্রেণীর জীবন-ভাবনা ও আধুনিক বাঙলা সাহিত্য’ প্রবন্ধে আধুনিক বাংলাসাহিত্যের উন্মেষ, বিকাশ ও পরিণতির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে লেখক এই সাহিত্যের ক্রম রূপান্তরের সাথে মধ্যশ্রেণির রূপান্তরের সাদৃশ্য চিহ্নিত করেছেন। লেখকের বিবেচনায় মধ্যশ্রেণি তার শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও প্রৌঢ়কাল অতিক্রম করে বার্ধক্যের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। রামমোহন-ভবানীচরণ-ঈশ্বরগুপ্তের হাতে আধুনিক যুগের বাংলাসাহিত্যের শৈশব, প্যারীচাঁদ-বিদ্যাসাগর-মধুসূদন-দীনবন্ধুর হাতে কৈশোর, বঙ্কিমে যৌবনের উন্মেষ, রবীন্দ্রনাথে যৌবন এবং তিরিশের ও তিরিশোত্তর কালের লেখকদের হাতে প্রৌঢ়ত্ব ও বার্ধক্য অতিক্রান্ত হয়েছে, এবং এখন তার মুমূর্ষুদশা উপস্থিত। রুশবিপ্লবের পর বাংলাসাহিত্যেও একটা নবচেতনার ও নতুন ধারার সূত্রপাত লক্ষ করা গেলেও তার বিকাশ মোটেই উল্লেখযোগ্য নয় বলে প্রাবন্ধিক অভিমত ব্যক্ত করেছেন। যে মধ্যশ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশের সাথে আধুনিক বাংলাসাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে পাকিস্তানোত্তরকালে পূর্ববাংলায় সে-শ্রেণি চূড়ান্ত ধ্বংসের পর্যায়ে পৌঁছে। মানবতাবাদী বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক যে আদর্শ ও শ্রেয়োনীতি বাঙালি মধ্যশ্রেণির চিত্তকে উল্লসিত রেখেছিল--প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই পৃথিবীজুড়ে প্রগতিশীল বিদ্বৎসমাজের কাছে তা আস্থা হারায় এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে এই অনাস্থা ও অশ্রদ্ধা তীব্রতর হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পূর্বেই শাসক-শোষক শ্রেণিতে সবরকম আদর্শ, রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও শ্রেয়োচেতনার পতন ঘটে। সমাজব্যবস্থা নিক্ষিপ্ত হয় সার্বিক ধ্বংসের গহীন গহ্বরে। বাংলাদেশ আমলেও এ অবস্থার তেমন কোনও গুণগত পরিবর্তন হয়নি। তবে মধ্যশ্রেণির অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের গর্ভ থেকে নতুন শ্রেণির উত্থানের প্রয়াসও লক্ষ করা যাচ্ছে। দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েই অতীতের গর্ভ থেকে বর্তমানকে মুক্ত করে উজ্জ্বল নতুন ভবিষ্যতে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব বলে ‘যুগসংক্রান্তির জীবনোৎকণ্ঠা: নবযুগের অভীপ্সা’ প্রবন্ধে লেখক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
হুমায়ুন আজাদের সাহিত্যচিন্তা যুক্তির প্রখরতা ও বক্তব্যের স্পষ্টতায় বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর দুটি প্রবন্ধ ‘আদিম দেবতারা ও সন্ততিরা’ ও ‘শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ’ আলোচ্য খণ্ডে পত্রস্থ হয়েছে। ‘আদিম দেবতারা ও সন্ততিরা’ প্রবন্ধে বিশশতকী বাংলাসাহিত্যে আধুনিক কবিতা উদ্ভবের বিশেষত্ব ও আধুনিক বাংলা কবিতার গতিধারা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখকের বিবেচনায় কালগত দিক থেকে নয়, চেতনাগত দিক থেকে বিংশ শতাব্দী-ই আধুনিকতা। বাংলাসাহিত্যে বিংশ শতাব্দী ও আধুনিক কবিতা অনেকাংশে সমার্থক। ‘শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ’ প্রবন্ধটি আধুনিক শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ার নান্দনিক বিশ্লেষণ। লেখকের বিবেচনায় শিল্পকলার মানবিক উপাদানে আবিষ্ট থাকা প্রকৃত নান্দনিক আনন্দানুভূতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
আধুনিক শিল্পকলা মূলত মানবিক উপাদান ও বাস্তবতাহীন নয়। তবে এ শিল্পকলায় মানবিক উপাদান ও বাস্তবতা থাকবে সম্পূর্ণরূপে প্রচ্ছন্নভাবে। ভানু ভূষণ জানার রোম্যান্টিকতা ও বাঙলা কাব্যে রোম্যান্টিক ধারার বিবর্তন গ্রন্থে বাংলা কবিতায় রোমান্টিক প্রবণতা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। লেখকের মতে ক্ল্যাসিসিজমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে গিয়েই রোমান্টিসিজমের উদ্ভব হয়েছে। রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গির মূলে রয়েছে রহস্য ও বিস্ময়। তাঁর মতে, রোমান্টিক কবিতায় শব্দ-নির্বাচন, শব্দবিন্যাস, বাণীবন্ধ প্রধানত ব্যঞ্জনাসৃষ্টির উপযোগিতার দিক থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। প্রসাদগুণও রোমান্টিক কবিতার বিশিষ্ট কুলক্ষণ। বিষাদমুখিতা এবং অতীত-বিধুরতা রোমান্টিক কবিতার দুই প্রধান প্রবণতা। বাংলা কবিতায় এই দুই প্রবণতা কীভাবে শিল্পরূপ লাভ করেছে, লেখক নৈপুণ্যের সঙ্গে এখানে তা বিশ্লেষণ করেছেন। লেখক রোমান্টিক কবিতার ভবিষ্যৎ নিয়েও উপস্থাপন করেছেন বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা। তিনি লক্ষ করেছেন, রোমান্টিক কাব্যের অতি অভ্যস্ত বিহ্বলতাকে পরিহার করে আধুনিক কবিতা একটা সজ্ঞান পৌরুষে মণ্ডিত হয়ে উঠেছে। রোমান্টিসিজমের অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে আধুনিক কবিতা পাঠকের সামনে উপনীত হয়েছে নতুন দাবি নিয়ে। বর্তমান খণ্ডে সংকলিত প্রবন্ধগুলো থেকে বাঙালির সাহিত্যচিন্তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কৌতূহলী পাঠক ধারণা লাভ করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র দশম খণ্ডে উপন্যাসতত্ত্ব নিয়ে বিভিন্ন মনীষীর চিন্তাসূত্র সংকলিত হয়েছে। বাংলা উপন্যাসের কয়েকজন প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বের (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) উপন্যাসভাবনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এ খণ্ডে। এছাড়া এ খণ্ডে সন্নিবেশিত হয়েছে বাংলা উপন্যাসের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষকের অভিমত। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য : শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, অচ্যুত গোস্বামী, অরবিন্দ পোদ্দার ও রণেশ দাশগুপ্ত। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বাংলা উপন্যাস আলোচনায় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন তেমনি রণেশ দাশগুপ্ত উপন্যাসের শিল্পরূপ বিশ্লেষণে প্রথম স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। এ দুজনেরই ভূমিকা ঐতিহাসিক।
বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ কিংবা শরৎচন্দ্র উপন্যাসের তত্ত্ব নিয়ে স্বতন্ত্র কোনও প্রবন্ধ রচনা করেননি। তবে বিভিন্ন রচনায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের উপন্যাসবিষয়ক ভাবনারাশি। অন্য লেখকেরা ওইসব রচনা একত্রে সংকলিত করে বিশ্লেষণ করেছেন স্বতন্ত্র প্রবন্ধে; সেসব প্রবন্ধই আমরা এখানে সন্নিবেশ করেছি। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসবিষয়ক চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে একটি চিঠিতে, কল্পতরু উপন্যাসের আলোচনায়, কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের পাদটীকায় এবং ‘উত্তরচরিত’ প্রবন্ধে। কল্পতরু উপন্যাসের আলোচনায় বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাসের একটি প্রধান প্রবণতাকে চিহ্নিত করে স্পষ্টতই বলেছেন, উপন্যাসের অন্বিষ্ট হল মানুষ, মানুষের হৃদয়, তার সামগ্রিক চরিত্র, বিশেষত মানুষের যে দ্বিবিধ সত্তা অর্থাৎ তার ভেতরকার দেবত্ব ও দানবত্ব বা মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব--এই উভয়ই উপন্যাসকারের আরাধ্য।
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসভাবনাও প্রক্ষিপ্ত হয়ে আছে তাঁর চিঠিপত্র, বিভিন্ন রচনায়, উপন্যাস-সমালোচনায়, নিজ উপন্যাসের ভূমিকায় কিংবা নিজ উপন্যাসের সমালোচনার প্রত্যুত্তরে। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে, উপন্যাস হল দ্বন্দ্বময় মানুষের সামগ্রিক জীবনকথা। ঔপন্যাসিকের অন্তঃপ্রকৃতি ও আত্মবোধের সমগ্রতায় উদ্ভাসিত জগৎ ও জীবনের পরমার্থই উপন্যাসের বিষয়বস্তু। লেখকের জীবনদর্শনের সঙ্গে চরিত্র ও ভাষার সামঞ্জস্য সন্ধানেই উপন্যাস সার্থক। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে, যুগধর্ম উপন্যাসের প্রাণশক্তি। তাছাড়া উপন্যাসের ঘটনা ও চরিত্রের বিকাশ কার্যকারণশৃঙ্খলায় গ্রথিত হওয়া আবশ্যক।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসচিন্তাও ছড়িয়ে আছে তাঁর নানা চিঠিতে, নিজের লেখা সম্পর্কে নানা মন্তব্যে ও রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য খণ্ডনে। তিনি কাহিনির বিয়োগান্তক পরিণতির বিরোধী ছিলেন। নিজ রচনায় ভাবোচ্ছ্বাস থাকা সত্ত্বেও পরিমিতিবোধের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন; বলেছেন, সংলাপ সংক্ষিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাছাড়া বিস্তৃত বর্ণনারও তিনি পক্ষপাতী ছিলেন না। প্লট-পরিকল্পনা অপেক্ষা চরিত্র-পরিকল্পনার দিকেই ছিল তাঁর সজাগ দৃষ্টি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসচিন্তা ব্যক্ত হয়েছে তাঁর একটি প্রবন্ধে যেখানে তিনি বলেছেন, ঔপন্যাসিককে শুধু বিজ্ঞানমনস্ক হলে চলে না, তাঁর থাকা দরকার বৈজ্ঞানিক বিচারবোধ। বিজ্ঞানপ্রভাবিত মন যেমন উপন্যাস-রচনার জন্য অপরিহার্য, তেমনি ঔপন্যাসিকের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হওয়া আবশ্যক বলে তিনি মনে করেন।
শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, ইংরেজি উপন্যাসের প্রভাবে বাংলা উপন্যাস সৃষ্টি হলেও উপন্যাসসৃষ্টির বাস্তব পটভূমি এদেশেও ছিল। সংস্কৃত সাহিত্য ও প্রাচীন বাংলাসাহিত্যের মধ্যে বাস্তবতার সংকেত তিনি আবিষ্কার করেছেন। সংস্কৃত সাহিত্যে বাস্তব সমাজচিত্রের প্রতিফলন হিসেবে কথাসরিৎসাগর, পঞ্চতন্ত্র, জাতককাহিনীর কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে মধ্যযুগীয় বাংলাসাহিত্যে বিশেষত মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্য, চৈতন্যচরিতসমূহ, মৈমনসিংহ-গীতিকা প্রভৃতির মধ্যে বাস্তব সমাজচিত্রের পরিবেশন, দক্ষ চরিত্রাঙ্কন ও ঘটনাসন্নিবেশ তিনি লক্ষ করেছেন। মুকুন্দরাম একালে জন্ম নিলে ঔপন্যাসিক হতেন বলে তিনি নিশ্চিতভাবে মনে করেন। মৈমনসিংহ-গীতিকাকেও তিনি দেখেছেন উপন্যাসের পূর্বসূচনা হিসেবে।
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত দুটি উপন্যাস বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন, উপন্যাস সৃষ্টির ক্ষেত্রে উদ্ভাবনীশক্তি বা সত্যনিষ্ঠার চেয়ে বেশি প্রয়োজন ‘দুঃসাহসিক ভাবুকতা’। তিনি এক্ষেত্রে বুর্জোয়া সভ্যতার ফলে সৃষ্ট ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
অচ্যুত গোস্বামী মিথ, রূপকথা, উপকথা, ব্রতকথা, মঙ্গলকাব্য প্রভৃতির গল্পবৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, এগুলোতে ব্যক্তির চেয়ে তার আবেগ, উপদেশ, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষাই মুখ্য। আধুনিক উপন্যাস সৃষ্টি হয়েছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের যুগে যেখানে ব্যক্তিচরিত্র অনন্য মর্যাদায় বিভূষিত। মধ্যযুগের কাহিনিতে মূল দ্বন্দ্ব ব্যক্তি বনাম নিয়তি, আধুনিক যুগে তা ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি বা সমাজে রূপান্তরিত।
অরবিন্দ পোদ্দার বাংলা উপন্যাসের সাম্প্রতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর দৃষ্টি দিলেও তিনি উপন্যাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রবণতাকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে আগ্রহী। তাঁর মতে, মহৎ উপন্যাসের অন্বিষ্ট হল এমন মানুষ যারা মানবিক মহত্ত্বের চেতনায় দীপ্ত। মানবজীবনকে স্থানকালের সমগ্রতায় গ্রহণ করে তাকে রসময় করে তোলাই ঔপন্যাসিকের কর্তব্য।
রণেশ দাশগুপ্তের প্রবন্ধগুলো গৃহীত হয়েছে তাঁর উপন্যাসের শিল্পরূপ গ্রন্থ থেকে। বাংলা ভাষায় উপন্যাসের শিল্পরূপ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এটিই প্রথম স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। ইউরোপে আধুনিক উপন্যাস তার জন্মলগ্ন থেকে যে বিচিত্র মত-পথ পেরিয়ে বিশ শতকের মনস্তাত্ত্বিক মহাসমুদ্রে এসে পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয়েছে তার প্রতিটি ধাপকে তিনি সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এভাবে উপন্যাসের তত্ত্ব ও ইতিহাস আলোচনায় এ খণ্ডটি হয়ে উঠেছে বিপুলভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র একাদশ খণ্ডে উপন্যাসতত্ত্বের দ্বিতীয় পর্বে সংকলিত হয়েছে দেবীপদ ভট্টাচার্যের উপন্যাসের কথা গ্রন্থের দুটি অধ্যায় এবং শিশির চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস পাঠের ভূমিকা শীর্ষক গ্রন্থের আটটি অধ্যায়। বিশ্বসাহিত্যে উপন্যাসের উদ্ভব ও বিকাশ এবং বাংলাসাহিত্যে এই নতুন শিল্পপ্রকরণটির আগমন ও অগ্রসরতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করা হয়েছে এ দুটি গ্রন্থে। বাংলাসাহিত্যে উপন্যাসের তত্ত্ব আলোচনার ক্ষেত্রে এ দুটি গ্রন্থ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
‘উপন্যাসের জন্ম’ শীর্ষক অধ্যায়ে দেবীপদ ভট্টাচার্য উপন্যাস যে বিশেষভাবে আধুনিক কালের সৃষ্টি সেই কালের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছেন। রেনেসাঁ ও শিল্পবিপ্লবের ফলে সৃষ্ট এই আধুনিককালের মৌলধর্ম ইহজাগতিকতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ ও মানবতাবাদ অর্থাৎ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’। কালের এই দর্শনের সঙ্গে যন্ত্রসভ্যতারও রয়েছে ঘনিষ্ঠ যোগ। মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের প্রসারের ফলে তৎকালীন ইংল্যান্ডীয় সমাজে তথ্যক্ষুধা ব্যাপকতা লাভ করে। লেখকের মতে, এই তথ্যস্পৃহা জনগণের মনে যে জীবনতৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে তা-ই উপন্যাসসৃষ্টির সহায়ক হয়।
দেবীপদ ভট্টাচার্য আঠারো ও উনিশ শতকীয় ইংরেজি, ফরাসি ও রুশ উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেছেন ‘উপন্যাসের বিকাশ’ শীর্ষক অধ্যায়ে। এ দুই শতকেই উপন্যাসের বিচিত্র প্রবণতার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। চরিত্র-প্রধান, বাস্তবতাধর্মী, যথাস্থিতবাদী, ঐতিহাসিক, মনস্তাত্ত্বিক--এরূপ প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসংবলিত উপন্যাসের পাশাপাশি আরও বিচিত্রধর্মী উপন্যাসের সৃষ্টি হয় এ দুই শতকে।
চরিত্র-প্রধান, বাস্তবতাধর্মী ও ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার জন্যে ইংরেজ ঔপন্যাসিকেরা বিখ্যাত। ফরাসি দেশে বাস্তবতাবাদের পাশাপাশি যথাস্থিতবাদী উপন্যাস বিকাশ লাভ করেছে। অন্যদিকে রাশিয়ায় পুশকিনের রোম্যান্টিকতা, গোগলের সমাজমনস্কতা, তুর্গেনেভের কাব্যময়তা ও দস্তয়েভস্কির মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ প্রভৃতির সমাহারে আবার তলস্তয়ের উপন্যাস পূর্ণতা অর্জন করেছে।
শিশির চট্টোপাধ্যায় ‘উপন্যাসের সংজ্ঞা ও স্বরূপ’ বিশ্লেষণে মনোযোগী হয়ে এর কাহিনি, চরিত্র ও ভাষার ওপর জোর দিয়েছেন। কাহিনিকে বলেছেন উপন্যাসের প্রাণ। চরিত্রকে তিনি রেখেছেন দ্বিতীয় স্থানে। চিন্তাভাবনার প্রধান ধারক-বাহক যেহেতু ভাষা, সেহেতু মানব-মনের সূক্ষ্মতর অনুভূতিকে রূপায়িত করার জন্য ঔপন্যাসিককে ভাষার বহুমুখী প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন হতে হয়। ‘চরিত্র বদলের কথা’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক বিশ শতকের উপন্যাসে যে নতুন আঙ্গিকের সূচনা ঘটে তার বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছেন। নতুন শতকে মানব-মনের অন্তর্বাস্তবতা চিত্রায়ণের ওপর গুরুত্ব আরোপের ফলে চৈতন্যপ্রবাহ রীতির উদ্ভব ঘটে। এ প্রসঙ্গে ভার্জিনিয়া উলফ, হেনরি জেমস, জেমস জয়েস প্রমুখ ঔপন্যাসিকের রচনা বিশ্লেষণ করে নতুন রীতিকে স্পষ্ট করে তোলা হয়েছে। ‘বাঙলা উপন্যাসে বাচনভঙ্গী ও বর্ণনাকৌশলের ধারা’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক রজনী, চতুরঙ্গ ও গৃহদাহ উপন্যাসের রচনারীতি বিচার করে দেখিয়েছেন, চরিত্রের মনোবিশ্লেষণের বিষয়টি পাশ্চাত্যের অনুসরণে বাংলা উপন্যাসেও আরাধ্য হয়েছে।
‘উপন্যাসে ভাষার কার্যকুশলতা’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক শিশির চট্টোপাধ্যায় ভাষার অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনাগত অর্থের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। শব্দকে অর্থদ্যোতনাময় করে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় বিভূষিত করা ঔপন্যাসিকের দায়িত্ব। ভাষার এই ব্যঞ্জনাশক্তি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখক জেমস জয়েসের ইউলিসিস উপন্যাসকে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করে দেখিয়েছেন, মনের মর্মমূলে প্রবেশের ক্ষেত্রে লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার শব্দচেতনা। অন্তর্গত মনের ভাবপ্রকাশে সহায়ক জয়েসের এই এপিফেনি-রীতিকে রবীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছেন ‘ক্ষণশাশ্বতী’। অর্থাৎ জয়েস জীবনের একেকটি ক্ষণমুহূর্তের মাধ্যমে জীবনের শাশ্বত রূপকে ব্যঞ্জিত করেছেন।
‘উপন্যাসে কালের সমস্যা, গতির সমস্যা’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক মূলত ভার্জিনিয়া উলফের উপন্যাসের দৃষ্টান্ত দিয়ে এই সমস্যার স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন। জেমস জয়েস চেতনাপ্রবাহ রীতির মাধ্যমে যে নতুন ভাষা সৃষ্টি করেছেন তা উপন্যাসের গতিকে বেগবান করেছে। এই গতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে উলফের উপন্যাস। অন্যদিকে কালের সমস্যা নিয়ে উলফ এক অন্তহীন গবেষণায় রত হয়ে কখনও স্মৃতিচারণ, কখনও উপসংহারের মাধ্যমে সূচনা ঘটানো, কখনও কাহিনি-পূর্ববর্তী অংশকে পরে এবং পরবর্তী অংশকে পূর্বে বিন্যস্ত করা প্রভৃতি পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন।
‘সাম্প্রতিককালের বাঙলা উপন্যাসের রীতি প্রকৃতি’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক শরৎচন্দ্র-পরবর্তী লেখকদের রচনারীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মূলত বিশ্লেষণধর্মী চেতনাপ্রবাহরীতির উপন্যাসগুলোকেই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই রীতির উপকরণ হল--তির্যক বাক্যবিন্যাস বা বক্রোক্তি, অনুচ্চ বচঃপ্রবৃত্তি, স্বগতভাষণ এবং অনুচ্চারিত আত্মকথন। তবে লেখক সচেতন যে, বাকচাতুর্য, বর্ণনাকুশলতা বাচনভঙ্গি বা টেকনিক দিয়েই উপন্যাস সার্থক হয় না। বিষয়ের প্রয়োজনেই আঙ্গিকের আবির্ভাব ঘটে।
উপন্যাসের তত্ত্ববিষয়ক এই দুই লেখকের আলোচনায় উপন্যাসের জন্মলগ্ন থেকে বিশ শতক পর্যন্ত এর প্রতিটি প্রবণতাই সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। ফলে পাঠকেরা এ খণ্ডের আলোচনা থেকে উপন্যাস সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক ধারণা লাভ করবেন বলে আশা করা যায়।
উপন্যাসের তত্ত্ববিষয়ক দ্বাদশ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান উপন্যাস-বিশ্লেষকের উপন্যাসের শিল্পরূপের বৈশিষ্ট্য-ব্যাখ্যামূলক গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রবন্ধ। এঁদের মধ্যে আছেন সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ রায়, অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ আকরম হোসেন ও পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশের তিনজন ছাড়া অন্যদের লেখাগুলো তাঁদের প্রণীত অখণ্ড গ্রন্থের অংশ।
এ খণ্ডে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গ্রন্থ বাংলা উপন্যাসের কালান্তর-এর প্রথম তিন অধ্যায়ে উপন্যাসের শিল্পরূপের বৈশিষ্ট্য, বিষয়বস্তুর তাৎপর্য ও ভাষারীতি বিশ্লেষিত হয়েছে। ওই তিন অধ্যায়ই এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। শিল্পরূপের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে লেখক সাহিত্যের নতুন প্রকরণ হিসেবে উপন্যাসের উদ্ভবের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। উপন্যাসের শিল্পরূপগত বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলেছেন, উপন্যাস সর্বগ্রাহী এবং ঔপন্যাসিক সর্বত্রচারী; উপন্যাস আধুনিক মানুষের হাতে রচিত কালের গদ্যময় প্রতিমা। উপন্যাসের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। উপন্যাসে লেখক জীবনের সামগ্রিক রূপ সন্ধান করেন। সে-কারণেই উপন্যাসে জীবনের রূপ ও জীবনের দর্শন উভয়ই প্রতিফলিত হয়। উপন্যাসে বিষয়বস্তুর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখক বলেছেন, কাহিনি বা আখ্যানই উপন্যাসের বিষয়বস্তু। ব্যক্তির সঙ্গে সভ্যতার সম্পর্কের বিশেষ প্রশ্ন এবং দেশকালগত আলোচনা বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ঔপন্যাসিকের বিষয়জ্ঞান মূলত তাঁর সমাজজ্ঞান, ইতিহাসজ্ঞান ও ব্যক্তিমানস-সংক্রান্ত জ্ঞানসমষ্টিরই সারাৎসার। অন্যদিকে, লেখকের মতে, একটি সার্থক উপন্যাসের ভাষা ঔপন্যাসিকের অখণ্ড কল্পনার অনুবর্তী। অর্থাৎ ঔপন্যাসিকের জীবনদর্শনের সঙ্গে ভাষার সম্বন্ধ গভীর। উপন্যাসের ভাষা বিষয়বস্তু থেকে পৃথক কিছু নয়। উপন্যাসের ভাষাকে হতে হয় সর্বত্রগামী অর্থাৎ জীবনের বাস্তবতা ও জীবনের কাব্য উভয়কেই ধারণ করতে হয়।
এ খণ্ডে সংকলিত সত্যেন্দ্রনাথ রায়ের বাংলা উপন্যাসে আধুনিকতা শীর্ষক গ্রন্থের মুখবন্ধ ও ভূমিকাসহ কয়েকটি অধ্যায়ে আধুনিকতার স্বরূপ বিশ্লেষিত হয়েছে। ‘মুখবন্ধ ও ভূমিকা’ অংশে বাংলা উপন্যাসে আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক বলেছেন, সর্বকালের আধুনিকতার ধারণাটি অস্বচ্ছ। উপন্যাসের ক্ষেত্রে নিজ কালে তার প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নটিই গুরুত্বপূর্ণ। স্বকালে আধুনিক হওয়াটাই উপন্যাসের স্বভাবধর্ম। তবে মানুষের জীবনের সমকালীন ও চিরকালীন উভয় সত্যকেই আমরা উপন্যাসে দেখতে চাই। ‘ভূমিকার অনুবৃত্তি’ শীর্ষক অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে মানুষের ব্যক্তিত্বের বিষয়টি যা আধুনিক জীবনদৃষ্টির ফল। মানুষের সামগ্রিক ব্যক্তিত্বই উপন্যাসের অন্বিষ্ট। ‘নতুন সমাজ ও তার নতুন শিল্পরূপ’ শীর্ষক অধ্যায়ে বিশ্লেষিত হয়েছে বাংলাসাহিত্যে আধুনিকতার জন্মসূত্র। বাঙালি মধ্যবিত্তের উদ্ভব ও বিকাশের সঙ্গে যেমন আধুনিকতার সূত্রপাত তেমনি উপন্যাসেরও জন্ম। বাঙালি মধ্যবিত্তের রূপান্তরের সঙ্গে উপন্যাসেরও রূপান্তর ঘটেছে। প্রসঙ্গত বিশ্লেষিত হয়েছে উপন্যাসে বাস্তবতার রূপচিত্রণের বিষয়টি। ‘রোম্যান্সের গ্রন্থিমোচন’ অধ্যায়ে লেখক উপন্যাসের সঙ্গে রোম্যান্সের মিল-অমিলের বিষয়টি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, উপন্যাসের সঙ্গে জন্মসূত্রে রোম্যান্সের কিছুটা আত্মীয়তা থাকলেও উপন্যাসের লজিক আর রোম্যান্সের ম্যাজিক পৃথক বিষয়।
‘উপন্যাসের রূপসন্ধান’ শীর্ষক রচনায় অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় এর জন্মেতিহাসের পাশাপাশি বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছেন। বাস্তবতাবোধ, জীবনান্বেষণ ও ব্যক্তিচেতনার জাগরণ--এই তিনের যোগফল উপন্যাস; যা চলমান জীবনের শিল্পরূপ এবং প্রবল জীবনপিপাসা যার মৌলধর্ম। ‘বাংলা উপন্যাসে আঞ্চলিকতা’ শীর্ষক রচনায় আঞ্চলিক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য হিসেবে আঞ্চলিক জীবনাভিজ্ঞতা, স্থানিক রং ও আঞ্চলিক ভাষাসহ অঞ্চলবিশেষের জীবন সম্পর্কে গভীর বোধের অপরিহার্যতার কথা বলা হয়েছে। ‘লেখকের উপনিবেশ’ শীর্ষক লেখাটিতে হাসান আজিজুল হক রচনামাত্রকেই বলেছেন একধরনের আত্মচরিত; উপন্যাসের ক্ষেত্রে যা অধিকতর সত্য। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ‘উপন্যাস ও সমাজবাস্তবতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে জন্মলগ্ন থেকে সমাজবাস্তবতার সঙ্গে উপন্যাসের নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ব্যক্তিমানুষের মুক্তিপ্রয়াসের সঙ্গেও এই শিল্পপ্রকরণটির সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। ‘উপন্যাসবিচারের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে সৈয়দ আকরম হোসেন উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ নির্মাণের প্রয়াসে বাঙালি ও পাশ্চাত্য উপন্যাসতাত্ত্বিকদের অভিমতের দ্বারস্থ হয়েছেন। লেখকের মতে, জীবন সমাজ ও সভ্যতার সামগ্রিক দ্বন্দ্ব, বৈচিত্র্য ও ক্রমবিকাশের রূপায়ণই ঔপন্যাসিকের কাছে প্রত্যাশিত। ঔপন্যাসিকের জীবন-সংক্রান্ত বোধ ও অভিজ্ঞতার সারাৎসারই উপন্যাসে বিধৃত হয়।
‘উপন্যাসের সমাজতত্ত্ব’ শীর্ষক প্রবন্ধে পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, অন্য সকল শিল্পপ্রকরণের চেয়ে উপন্যাস অধিক মাত্রায় সমাজ-ইতিহাস-মানবিক-প্রাকৃতিক পরিস্থিতি-সংলগ্ন। উপন্যাসেই মানুষ প্রথম ঐতিহাসিক ও সামাজিকভাবে সংজ্ঞায়িত। বাখতিনের ক্রনোটপ ও পলিফনি-সংক্রান্ত ধারণাটিও ব্যাখ্যাত হয়েছে এ প্রবন্ধে। বাখতিন-তত্ত্ব অনুযায়ী উপন্যাস সভ্যতার একটি বিশেষ সময়ের ডায়ালগ মাত্র। যে-বহুস্বর বা পলিফনি উপন্যাসের একান্ত বৈশিষ্ট্য--সভ্যতার বিশেষ স্তর তার উৎস। বাখতিন-তত্ত্বকে লেখক আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ‘মিখাইল বাখতিন : একজন বাঙালি পাঠক’ শীর্ষক প্রবন্ধে। বাখতিন-তত্ত্ব ইউরোপকেন্দ্রিক ধারণার বিপরীত। আমাদের নিজস্ব আধুনিকতার পথযাত্রায় বাখতিন একান্তভাবে প্রাসঙ্গিক। বাখতিনের দ্বি-বাচনিকতার চিন্তা, পলিফনি, কার্নিভাল-তত্ত্ব, ক্রনোটপ প্রভৃতি ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের মধ্যে অন্য এক বাস্তবকে স্পষ্ট করে। বহুস্বর বা দ্বিস্বর অথরের কর্তৃত্বকে ভেঙে দেয়। কার্নিভাল সরকারি সংস্কৃতির বিরোধী। দেশ-কাল-মূল্যবোধের ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের চেতনায় মূর্ত হয় যে ইতিহাসের বোধ, ক্রনোটপের ধারণায় তা সামনে আসে।
এভাবে খণ্ডটি উপন্যাসের তত্ত্ব আলোচনার ক্ষেত্রে অতিশয় সমৃদ্ধ হয়েছে। পাঠক উপন্যাসের শিল্পরূপগত বৈশিষ্ট্যকে নানা মাত্রায় এর মাধ্যমে অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন বলে আশা করা যায়।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র ত্রয়োদশ খণ্ডে উপন্যাসচিন্তা বিষয়ে দেবেশ রায়, পবিত্র সরকার, উদয়নারায়ণ সিংহ, অমিতাভ গুপ্ত, বীরেন্দ্র চক্রবর্তী, বিজিতকুমার দত্ত ও তপোধীর ভট্টাচার্যের বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। দেবেশ রায়ের প্রবন্ধগুলো বিচ্ছিন্নভাবে লেখা নয়; এগুলো তাঁর দুটি গ্রন্থ উপন্যাস নিয়ে ও উপন্যাসের নতুন ধরণের খোঁজে* বইয়ের অন্তর্ভুক্ত।
‘বাংলা উপন্যাস’ শীর্ষক প্রবন্ধে দেবেশ রায় বাংলাসাহিত্যের আধুনিকতাকে ইউরোকেন্দ্রিক চেতনার বাইরে থেকে দেখেছেন। তাঁর মতে, মধুসূদন-বঙ্কিমের দ্বারা নয়, বরং ঈশ্বর গুপ্ত-প্যারীচাঁদের মাধ্যমে সূচিত আধুনিকতাই প্রকৃত আধুনিকতা। এ প্রসঙ্গে তিনি মঙ্গলকাব্যের দেবখণ্ডে পুরাণকে ভেঙে দেওয়ার প্রবণতা এবং উনিশ শতকের কবিগান, তরজা, হাফ আখড়াই গান, লাচারি প্রভৃতিকে আধুনিকতার বিকল্প চিন্তা হিসেবে মূল্যবান মনে করেন। এডরনোর মিনিমা মোরালিয়া গ্রন্থ অবলম্বনে লেখক তাঁর ‘শিল্পের জনসংযোগ’ শীর্ষক প্রবন্ধটি রচনা করেছেন। এডরনোর কাছে শিল্প-সাহিত্যের ফর্মগুলো আসলে সমাজ-সভ্যতার সমগ্রতারই অংশ। ফলে এ বিষয়ক আলোচনা তাঁর কাছে সমাজেরই বিচার বা দর্শন। ‘কথোপকথন’ শীর্ষক রচনাটি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেবেশ রায়ের এক দীর্ঘ সংলাপ। তিনজনই একমত যে, পাশ্চাত্য-চেতনার বাইরে ঢোঁড়াইচরিতমানস আখ্যানের এক নতুন দিগন্ত উপহার দিয়েছে; তিস্তাপারের বৃত্তান্তও এই ধারার উপন্যাস। আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার আধুনিক উপন্যাসের আখ্যানকে কীভাবে বদলে দেয় তার দৃষ্টান্ত এ দুটি উপন্যাস। দেবেশ রায়ের মতে, আখ্যানের গতিপথটা উপন্যাস প্রসঙ্গে মূলকথা। ‘উপন্যাসের নতুন ধরণের খোঁজে’ প্রবন্ধে লেখকের দৃষ্টি ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে বদলে-যাওয়া মধ্যবিত্তের পরিবর্তে উপনিবেশ-পূর্ব চেতনার দিকে কেন্দ্রীভূত। তিনি আমাদের ঐতিহ্যের মূল অনুসন্ধানে আগ্রহী। ‘বিবিধ আখ্যান ও টেকনোলজি’ প্রবন্ধে লেখক আধুনিক টেকনোলজি কীভাবে শিল্পসাহিত্যের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে সবকিছুকে পণ্যে পরিণত করছে তার সারসত্য তুলে ধরার পাশাপাশি প্রতিআক্রমণের মধ্য দিয়ে আমাদের ঐতিহ্যে স্বকীয়তা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘বাংলা আখ্যানকাব্যে নিহিত উপন্যাস’ প্রবন্ধে লেখক প্রমাণ করতে চেয়েছেন, এখনকার উপন্যাসে যে-ধরনের বিবরণ আমরা চাই, মধ্যযুগের আখ্যায়িকা কাব্যে তা পাওয়া যায়। বঙ্কিমচন্দ্র ইংরেজি নভেলের আদর্শ অনুসরণ করায় আমরা এই পরম্পরা থেকে বিচ্যুত হয়েছি। উপনিবেশ-উত্তর ভাবনায় স্বকীয়তার সন্ধানে আমাদের উক্ত ঐতিহ্যের দ্বারস্থ হওয়া জরুরি। ‘উপন্যাসচিন্তা’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক বলতে চেয়েছেন, সমাজ-সময় বা ইতিহাসের চেয়েও উপন্যাসের অন্বিষ্ট হল ব্যক্তিমানুষ; অন্যকথায়, সমাজ-সময় বা ইতিহাসধৃত ব্যক্তিমানুষ। ব্যক্তিমানুষ ও সময়, এ দুয়ের মধ্যে সংগতি আবিষ্কার করাই ঔপন্যাসিকের শিল্পের দিক থেকে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।
পবিত্র সরকার ভোলোশিনফের মার্কসবাদ ও ভাষার দর্শন শীর্ষক গ্রন্থের তৃতীয় ভাগ অবলম্বনে বিবৃত সংলাপ-বিষয়ক রচনাটি প্রস্তুত করেছেন। বিবৃত সংলাপ আসলে সংলাপের বিষয়ে সংলাপ। দু-সময়ে দু-স্থানে সংগঠিত দুই বাচনকর্মের প্রথমটিতে শ্রোতা যখন দ্বিতীয়টিতে বক্তায় রূপান্তরিত হয়, তখন শোনা কথা বলার সময় ভিন্নরূপ ধারণ করে। তার মধ্যে প্রবেশ করে ইনার স্পিচ, ফ্যাকচুয়াল কমেনট্রি ও ইন্টারনাল রিপোর্ট। উপন্যাসের সাহিত্যতত্ত্ব শীর্ষক গ্রন্থের ভূমিকায় উদয়নারায়ণ সিংহ এ বিষয়ে বলেছেন, উপন্যাস পার্থিব ঘটনার দর্পণস্বরূপ। ভাষার জানালা দিয়ে উপন্যাস বিশ্লেষণের রীতিটি এসেছে বাখতিন, রোলা বার্থ প্রমুখের মাধ্যমে। ভূমিকায় লেখক উপন্যাস প্রসঙ্গে এই দুই মনীষীর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেছেন। বীরেন্দ্র চক্রবর্তীও বিশ্লেষণ করেছেন বাখতিনের উপন্যাসভাবনা। বাখতিনের মতে, ব্যক্তির বা জীবনের প্রতিমূর্তি অঙ্কনই উপন্যাসের বিষয়। ব্যক্তি যেহেতু স্বতন্ত্র, সেজন্য তার প্রতিমূর্তিও স্বকীয়। প্রতিটি কথাই জীবন ও জগৎ সম্পর্কে ব্যক্তির স্বতন্ত্র চেতনা বহন করে। সে-কারণে দুই ব্যক্তি যখন একই শব্দ ব্যবহার করে তখন একই অর্থে তা ব্যবহার করে না। ভাষায় তাই বহুমাত্রিকতার আবিষ্কারই একটি উপন্যাসের সার্থকতার জন্য অপরিহার্য। বিজিতকুমার দত্ত ঐতিহাসিক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, ঔপন্যাসিকের সত্যবোধ ও ইতিহাসবিদের সত্যনিষ্ঠা, এ দুয়ের মিলনেই ঐতিহাসিক উপন্যাস সার্থক। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসের পটভূমিও বিশ্লেষণ করেছেন।
এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে তপোধীর ভট্টাচার্যের চারটি প্রবন্ধ। ‘উপন্যাসের সময়’ শীর্ষক প্রথম প্রবন্ধে বাখতিনের ক্রনোটপ-সংক্রান্ত ধারণার দ্বারস্থ হয়েছেন লেখক। ক্রনোটপ মানে সময় ও পরিসরের বিন্যাসক্রম। একটি সার্থক উপন্যাসে এ দুয়ের সুসমন্বয় অপরিহার্য। ‘জটিলতার অ আ ক খ’ প্রবন্ধে লেখক বর্তমান সময়ের অর্থাৎ বিশ্বায়নের এই আগ্রাসী কালের বিপুলবিস্তৃত জটিলতার বিচিত্র মাত্রাকে অনুধাবন করতে চেয়েছেন। এ কালের ঔপন্যাসিকেরা যে সরলীকৃত আধুনিকতার বিশ্বস্ত বয়ান উপস্থিত করার পরিবর্তে অনেকান্তিক দ্বিবাচনিকতায় আবিষ্কার করছেন জটিলতার নিত্যনতুন বিষয়-আশয়--সাম্প্রতিক বিশ্বপরিস্থিতিই তার কারণ বলে লেখক দেখিয়েছেন। তৃতীয় প্রবন্ধে লেখক ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, আমাদের পরিচিত বাস্তব আমাদের আকাঙ্ক্ষা বা প্রত্যাশা-পূরণে অক্ষম হওয়ায় কল্পনা ফ্যান্টাসি বা বিকল্প-বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা স্বপ্ন-পূরণে তৎপর হলে সেটাই জাদুবাস্তবতা বা ঐন্দ্রজালিক-বাস্তবতার রূপ পরিগ্রহ করে। সর্বশেষ প্রবন্ধ ‘উপন্যাসের প্রতিবেদন’-এ লেখক দেখিয়েছেন, বাচন-প্রতিবাচন, বয়ন-অন্তর্বয়নের সূত্রে উপন্যাসকে ঘিরে জীবনভাবনার বহুমাত্রিক প্রতিবেদন নির্মিত হয়। উপন্যাসের প্রতিবেদন মানে সময় ও পরিসরের যুগলবন্দি। জীবন যেহেতু বহুস্বরিক সেহেতু তার প্রতিবেদনও ভিন্ন ভিন্ন।
এ খণ্ডে উপন্যাস-সম্পর্কিত সাম্প্রতিক তত্ত্বভাবনা বিচিত্রভাবে উপস্থাপিত ও বিশ্লেষিত হওয়ায় তা পাঠকদের অনেক নতুন জিজ্ঞাসার উত্তর জোগাতে সক্ষম হবে। এ কারণে খণ্ডটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান চতুর্দশ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম পর্যায়ের কতিপয় ঔপন্যাসিক ও তাঁদের উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিশ্লেষণ। এসব আলোচনার বিষয়বস্তু এবং ঔপন্যাসিক ও উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে : বাংলা উপন্যাসের আদিপর্ব, প্যারীচাঁদ মিত্রের (১৮১৪-৮৩) আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৭), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-৯৪) কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬), মীর মশাররফ হোসেনের (১৮৪৭-১৯১২) বিষাদ-সিন্ধু (১৮৮৫-৯১) এবং ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৪৯-১৯১১) কল্পতরু (১৮৭৪)। এ খণ্ডের লেখক-তালিকায় আছেন : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবীপদ ভট্টাচার্য, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, মুনীর চৌধুরী, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, রণেশ দাশগুপ্ত, আহমদ শরীফ, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ রায় ও হাসান আজিজুল হক।
বাংলা উপন্যাসের আদিপর্ব নিয়ে লিখেছেন শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবীপদ ভট্টাচার্য এবং সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়। এ পর্ব সম্পর্কে সকলেই যে একধরনের অভিমত ব্যক্ত করেছেন তা নয়। তবে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতা নগর সৃষ্টি, ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন, পত্রিকা প্রকাশ, সমাজ ও ধর্ম-সংস্কার আন্দোলন প্রভৃতির মধ্য দিয়ে জীবন সম্পর্কে নাগরিক সমাজের যে তীব্র ইতিবাচক আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় তা উপন্যাসসৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে সকলে মনে করেন। উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত প্রথম রচনা হিসেবে বাবু উপাখ্যান, নববাবুবিলাস (১৮২৩), কলিকাতা কমলালয় (১৮২৩), ফুলমণি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২) এবং আলালের ঘরের দুলাল-এর নাম উচ্চারিত হলেও সকলেই শেষোক্ত রচনাটিকেই প্রকৃত উপন্যাসের মর্যাদা দিয়েছেন। কেননা একটি যথার্থ উপন্যাসের লক্ষণ প্রথম এই গ্রন্থেই সুস্পষ্টতা অর্জন করেছে। দেবীপদ ভট্টাচার্য ‘বাংলা উপন্যাসের আদি-পর্ব’ শীর্ষক আলোচনায় বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ছাড়াও তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৪৩-৯১), প্রতাপচন্দ্র ঘোষ (১৮৪৫-১৯২১), শিবনাথ শাস্ত্রী (১৮৪৭-১৯১৯), ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৪৭-১৯১৯), রমেশচন্দ্র দত্ত (১৮৪৯-১৯০৯), ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যোগেন্দ্রনাথ বসু (১৮৫৪-১৯০৫), স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২) প্রমুখের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, রণেশ দাশগুপ্ত, আহমদ শরীফ, সত্যেন্দ্রনাথ রায় ও পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ শীর্ষক রচনাটিতে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের শৈলীগত বিশ্লেষণ করেছেন এবং সেইসঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন নভেল ও রোম্যান্সের বৈশিষ্ট্য। সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তও কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের শৈলীগত বিশ্লেষণে অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি কপালকুণ্ডলা-র কাহিনিকৌশলের একটি অংশ সম্পর্কে বলেছেন, এর তুলনা শেক্সপিয়রের নাটকেও বিরল। বঙ্কিমের উপন্যাস নিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও চিন্তা-উদ্রেককারী মূল্যায়ন করেছেন সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কপালকুণ্ডলা, বিষবৃক্ষ (১৮৭৩), কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮) ও রাজসিংহ (১৮৮২) সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। কপালকুণ্ডলা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, অভিনব ও দুঃসাহসিকতম বিষয় এবং আয়াসচিহ্নহীন শিল্পশ্রী এ উপন্যাসকে একটি উজ্জ্বল রসলোকে উত্তীর্ণ করেছে। নারীসৌন্দর্য-যে বিশ্বসৌন্দর্যের অংশ, তা এ উপন্যাসেই প্রথম স্পষ্ট হয়েছে। রণেশ দাশগুপ্ত বাংলা উপন্যাসের বৈপ্লবিক ধারা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পাঁচটি উপন্যাসের আলোচনায় প্রথমেই বঙ্কিমের আনন্দমঠকে (১৮৮২) অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ‘বঙ্কিম বীক্ষা : অন্য নিরিখে’ প্রবন্ধে আহমদ শরীফ লিখেছেন, বঙ্কিমের সকল কর্ম-চিন্তা ও ভাবের উৎসই ছিল মানুষের কল্যাণ-বাঞ্ছা। বঙ্কিমকে তিনি মূলত জগৎ ও জীবনরসিক হিসেবেই দেখেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ রায় বঙ্কিমচন্দ্রের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, সম্পূর্ণ নির্মোহ আধুনিক দৃষ্টি বা জীবনবোধ, নাগরিক মন বা সেক্যুলার দৃষ্টি বঙ্কিমের ছিল না। পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্কিমের উপন্যাসের শৈলীগত বিশ্লেষণের পাশাপাশি সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও উপস্থাপন করেছেন।
মুনীর চৌধুরীই প্রথম সম্পূর্ণ আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসটি ব্যাখ্যা করেছেন। লেখকের মতে, মধ্যযুগীয় ধর্মচেতনার জীবনবিমুখ আচ্ছন্নতাকে পরিহার করে ইহলোকের ইন্দ্রিয়পরায়ণ নরনারীর আনন্দবেদনার মহামূল্যকে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে মশাররফ হোসেনের সার্থকতা। হাসান আজিজুল হক বিষাদ-সিন্ধুকে কেবল উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করতেই আগ্রহী। তাঁর মতে, ঔপন্যাসিক যে বিরাট মানবীয় পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি করেছেন সেটাই পাঠককে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে।
কল্পতরু উপন্যাস আলোচনা প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাসের চরিত্রায়ণের বৈশিষ্ট্য গুরুত্বসহকারে বিশ্লেষণ করেছেন। লেখকের মতে, মনুষ্যচরিত্রই উপন্যাসের বিষয় এবং তা দ্বন্দ্বময়--এটি ঔপন্যাসিককে অবশ্যই মনে রাখতে হবে।
পাঠক এ খণ্ড থেকে বাংলা উপন্যাসের উনিশ শতকীয় পর্যায় সম্পর্কে একটি ধারণা লাভে সমর্থ হবেন বলে আশা করা যায়।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র পঞ্চদশ খণ্ডে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) উপন্যাস নিয়ে বিভিন্ন লেখকের মূল্যায়ন সংকলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বাংলাসাহিত্যের সকল প্রান্তকে আলোকিত ও সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর হাতে বাংলা উপন্যাসও তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিকাশ লাভ করেছে, সন্দেহ নেই। এই খণ্ডে রবীন্দ্র-বিশ্লেষকদের তালিকায় আছেন : রণেশ দাশগুপ্ত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, হাসান আজিজুল হক, অশ্রুকুমার সিকদার, সৈয়দ আকরম হোসেন, সত্যেন্দ্রনাথ রায় ও পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়।
রণেশ দাশগুপ্ত বাংলা উপন্যাসের অভ্যুত্থানমূলক ধারার অংশ হিসেবে যে পাঁচটি উপন্যাস বিশ্লেষণ করেছেন তার দ্বিতীয় পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করেছেন গোরা-কে (১৯০১)। লেখকের মতে, বিশ শতকের প্রথমদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনের যে ঢেউগুলো আমাদের আপাত-শান্ত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনের মধ্য থেকে স্ফুরিত হয়েছে, তাকেই এ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে রূপায়িত করেছেন।
এ উপন্যাসে দেশপ্রেম ও মানবধর্মকে একাকার করে দেখানো হয়েছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গোরা উপন্যাস বিশ্লেষণে অগ্রসর হয়ে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে এর তুলনা করেছেন। মহাকাব্যোপম এ উপন্যাসের কাহিনিকে তিনি বলেছেন, অসাধারণ। লেখকের মতে, ব্রিটিশদের সৃষ্ট মধ্যবিত্তশ্রেণি, জাতীয়তাবোধ ও কলকাতা নগর--এই সবকিছুই এ উপন্যাসের বিষয় হিসেবে অন্বিষ্ট হয়েছে। হাসান আজিজুল হক এ উপন্যাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করলেও স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এর প্রাসঙ্গিকতা ক্ষুণ্ন হয়নি। রবীন্দ্রনাথ এ উপন্যাসে ভারতবর্ষের বিশাল প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরেছেন এবং একই সঙ্গে বিশ্বমানবতা ও আন্তর্জাতিকতার পথেই খুঁজেছেন মুক্তি।
সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের ঔপন্যাসিক প্রতিভাকে সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। তিনিই লক্ষ করেছেন যে, শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের জগদ্বিষয়ক চেতনায় যে সমগ্রতার সন্ধান অপরিহার্য তা রবীন্দ্রনাথে বর্তমান ছিল। সমাজ-সভ্যতার গোটা চেহারাকে এবং তার গূঢ়ার্থকে রবীন্দ্রনাথ অনুধাবন করেছেন। আধুনিক ভারতবর্ষের দ্বান্দ্বিক সমগ্রতার বিষয়টিকে তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর ভাষা ব্যবহারেও ঔপন্যাসিকের নিরাসক্তি প্রবল। অশ্রুকুমার সিকদার রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি (১৯০৩), চতুরঙ্গ (১৯১৬), ঘরে-বাইরে (১৯১৬), যোগাযোগ (১৯২৯) ও দুই বোন (১৯৩৩) উপন্যাস বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁর উপন্যাসের আধুনিকতার স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। আধুনিক মনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে আত্মসচেতনতাকে তিনি রবীন্দ্র-উপন্যাসেরও উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করে দেখিয়েছেন, মানুষের ব্যক্তিত্বের সমস্যাই তাঁর উপন্যাসে প্রধান। রবীন্দ্র-উপন্যাসের আধুনিকতার একটা যে বড় প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেছেন তা তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন, স্বামী-সহবাসও-যে কখনো কখনো পরপুরুষ-সহবাসের মতো গ্লানিকর হতে পারে, যোগাযোগ-এর কুমুর অনুভূতিকে তিনি তার দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরে তা দেখিয়েছেন। সত্যেন্দ্রনাথ রায়ও রবীন্দ্র-উপন্যাসের আধুনিকতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন। চোখের বালি, গোরা, চতুরঙ্গ ও যোগাযোগ উপন্যাস বিশ্লেষণসূত্রে তিনি রবীন্দ্রনাথের আধুনিক মননের পরিমাপ করেছেন। দেখিয়েছেন, বিশ শতকীয় আধুনিকতার মানদণ্ডে চোখের বালি বা গোরা-র চেয়ে চতুরঙ্গ অনেক বেশি আধুনিক। এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি ফ্রয়েডীয় মনস্তাত্ত্বিক আবিষ্কারের অনুগামী নয়।
পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসকে ব্যাখ্যা করেছেন। লেখকের মতে, এখন পর্যন্ত বাংলা উপন্যাসের দুরূহতম পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজটি হয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়ে। ব্যক্তির সঙ্গে সমাজ, প্রকৃতি ও ব্যক্তির দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব--এই সবকিছু তাঁর উপন্যাসে অন্বিষ্ট হয়েছে। লেখক চতুরঙ্গ-কে আধুনিকতার সর্বলক্ষণাক্রান্ত বলে এবং যোগাযোগ-কে উনিশ শতকীয় বাঙালি ইতিহাসের একটি স্তরের যথাযথ বয়ান হিসেবে মন্তব্য করেছেন। শেষের কবিতা-কে (১৯২৯) বলেছেন বহুমাত্রিক, বহুস্বরিক ও পলিফোনিক।
এ খণ্ডে সংকলিত সৈয়দ আকরম হোসেনের দুটি প্রবন্ধে চতুরঙ্গ ও ঘরে-বাইরে উপন্যাস বিশ্লেষিত হয়েছে। উভয় প্রবন্ধে লেখক সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাস বিশ্লেষণের পাশাপাশি এর শৈলীগত সৌন্দর্যও ব্যাখ্যা করেছেন বিশদভাবে। লেখকের ভাষায়, ঘরে-বাইরে উপন্যাস বিপন্ন-অস্তিত্ব তিনটি চরিত্রের অন্তর্গত সংলাপ-স্রোতের কবিতাস্পর্শী শিল্পপ্রতিমান। অন্যদিকে চতুরঙ্গ হলো রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মরসে নিমজ্জনদশা থেকে সত্যকথা ও বিশ্বকর্ম উপলব্ধিজাত মনুষ্যত্ববোধে উত্তরণের নিগূঢ় ইতিকথা। চতুরঙ্গ আদৌ উপন্যাস কি না এই বিতর্কেরও সমাধান দিয়েছেন লেখক।
পাঠক এ খণ্ড থেকে বাংলাসাহিত্যে ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথের অবদান ও শক্তিমত্তার পরিচয়টি সম্যকভাবে উপলব্ধি করবেন বলে আশা করি।
উপন্যাসবিষয়ক ষোড়শ খণ্ডটিতে মোহাম্মদ নজিবর রহমান (১৮৬০-১৯২৩), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮), জগদীশ গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭) প্রমুখের উপন্যাসের বিশ্লেষণ এবং কল্লোল-যুগ ও দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তীকালের প্রবণতা নিয়ে আলোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে। এ খণ্ডের লেখক-তালিকায় আছেন : হুমায়ুন কবির, রণেশ দাশগুপ্ত, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, হাসান আজিজুল হক, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, যতীন সরকার, আবদুল হক, সুমিতা চক্রবর্তী, সত্যেন্দ্রনাথ রায় ও অশ্রুকুমার সিকদার।
হুমায়ুন কবিরের শরৎ-সাহিত্যের মূলতত্ত্ব গ্রন্থটি উপক্রমণিকা ও পরিশিষ্ট অংশ বাদে সম্পূর্ণভাবেই এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। কারণ এ গ্রন্থে লেখক গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে শরৎ-সাহিত্যের মৌল প্রেরণাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন। লেখক শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিমানস ও সমাজপরিবেশ বিশ্লেষণ করে বাংলাসাহিত্যে তাঁর অনন্যসাধারণ ভূমিকা চিহ্নিত করেছেন। ষোলোআনা বাঙালি-প্রকৃতির শরৎচন্দ্রের রক্তের মধ্যে একপ্রকার বিদ্রোহ ছিল যা সমাজপরিত্যক্ত ও নির্যাতিতদের প্রতি তাঁর সহানুভূতির মধ্য দিয়ে অভিব্যক্ত হয়েছে। লেখকের মতে, শরৎচন্দ্র উপলব্ধি করেছিলেন, যৌন-চরিতার্থতাই নারীপ্রবৃত্তির শেষ কথা নয়, তার পূর্ণ পরিতৃপ্তি মাতৃত্বের সার্থকতায়। তাছাড়া একটা গভীর সমাজবোধ শরৎচন্দ্রের রচনাকে যে-সুনিবিড় মানবতার সৌরভে সুরভিত করেছে সেটাই বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথ থেকে তাঁকে স্বতন্ত্র করেছে। শরৎচন্দ্র যে বাঙালি অ্যাভারেজ পাঠকমণ্ডলীকে আকৃষ্ট করে জনপ্রিয় হয়েছেন তার কারণ চিহ্নিত করে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, বাঙালি মধ্যবিত্তের যে-অংশে ক্ষুদিরাম, কানাই (পথের দাবী ছাড়া) সে-অংশ পরিহার করে যে-অংশে নিজেদের ম্লান অস্তিত্বটুকু মমতায় ঢেকে রাখার আকাঙ্ক্ষা, সে-অংশকেই তিনি পরিচর্যা করেছেন। পরিহার করেছেন শিল্পীর গভীর ও জটিল পরীক্ষার দিকটি। চোখের বালি-র (১৯০৩) বিনোদিনীর আদর্শে তিনি তাঁর নারীচরিত্রগুলোকে সাজাতে গিয়ে তার বহিরঙ্গ সাদৃশ্য যতটা নিখুঁতভাবে রূপায়িত করেছেন, তার ব্যক্তিত্বের মূলগত সমস্যাকে ততটা উপলব্ধি করতে চাননি। তবে লেখকের মতে, শরৎচন্দ্রই প্রথম বাঙালি ঔপন্যাসিক যিনি চরিত্রের সামাজিক স্তরগত বাচনিক বাস্তবতাকে রক্ষা করেছেন। এক্ষেত্রে বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথ থেকে তাঁর স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট। ভাষার মাধ্যমে উপন্যাসকে গতিশীল করে তোলা তাঁর প্রধান কৃতিত্ব।
রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর ‘বাংলা উপন্যাসের অভ্যুত্থানমূলক ধারা’ শীর্ষক প্রবন্ধে তৃতীয় উপন্যাস হিসেবে নির্বাচন করেছেন পথের দাবী-কে (১৯২৬)। লেখকের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার জন্য যে বৈপ্লবিক সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়, তারই পটভূমিতে রচিত এ উপন্যাসে বিপ্লবী আয়োজনের নির্মম সাধনা ও শ্রমিক-সচেতনতার পাশাপাশি উপস্থাপিত হয়েছে দুই নর-নারীর মমতা-ভালোবাসার কোমল ইতিবৃত্ত। হাসান আজিজুল হক নিরাসক্ত দৃষ্টিতে বিচার করতে গিয়ে শরৎ-সাহিত্যে একদিকে দেখেছেন মানুষের প্রতি তুলনাহীন দরদ, মায়া ও কল্যাণকামনা, অন্যদিকে দেখেছেন জীবনের সমগ্রতার অভাব। জীবন সম্পর্কে একপ্রকার ভাববাদী রোম্যান্টিক দৃষ্টি ও অগভীর অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তিনি বড় হয়ে উঠেছেন উদ্দেশ্যের অকপটতায়। পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার কারণ হিসেবে তাঁর সৃষ্ট নারীচরিত্রের বিভিন্নমুখী (সমাজ, পরিবার ও নিজের সঙ্গে) লড়াইয়ের কথা এবং সেইসঙ্গে বাস্তব জীবনসংলগ্ন ভাষার কথা উল্লেখ করেছেন। যতীন সরকার শরৎচন্দ্রকে বিশ শতকীয় বাংলার নতুন পাঁচালীকার বা কথক ঠাকুর হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, তাঁর চেতনায় আবহমান বাংলার লৌকিক ঐতিহ্য সক্রিয় ছিল।
মোহাম্মদ নজিবর রহমানের আনোয়ারা (১৯১৪) উপন্যাস বিশ্লেষণে আবদুল হক নিরপেক্ষ দৃষ্টির পরিচয় দিয়ে এর সবলতা ও দুর্বলতা উভয়কেই নিরাসক্তভাবে চিহ্নিত করেছেন। উপন্যাসটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও, লেখকের মতে, শিল্পগুণে উত্তীর্ণ নয়। অবাস্তবতা এর প্রধান দুর্বলতা, তবে চরিত্রচিত্রণে, সংলাপ রচনায়, শব্দ ব্যবহার ও ভাষার সাবলীলতায় লেখকের দক্ষতার পরিচয় রয়েছে।
সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ-প্রভাতকুমার-শরৎচন্দ্রের যৌথ প্রয়াসে গড়ে-ওঠা সাহিত্যরুচির বিরুদ্ধে প্রথম সার্থক প্রতিবাদ জগদীশ গুপ্তের। কল্লোলের মূল বৈশিষ্ট্য তাঁর রচনাতেই অভিব্যক্ত হয়েছে। সুমিতা চক্রবর্তী বলেছেন, বাংলা উপন্যাসে গল্প-উপভোগের সুখ থেকে জগদীশ গুপ্তই প্রথম পাঠককে বঞ্চিত করেছেন। নিয়তি বা দৈবশক্তির বিরূপতার সামনে মানুষের অসহায়ত্বকে পরিস্ফুট করেছেন তিনি। তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসেই আছে মানব-প্রবৃত্তির নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তার নির্মোহ বিশ্লেষণ।
ত্রিশের কালগত বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থভাবেই বলেছেন, উপন্যাসের পক্ষে যা একান্ত প্রয়োজনীয়--দেশকালের সঙ্গে উপন্যাসের ভাবমণ্ডলের যোগসাধন--কল্লোলগোষ্ঠীর লেখকদের মধ্যে তার অভাব ছিল। অন্যদিকে অশ্রুকুমার সিকদার কল্লোলীয় লেখকদের শিল্পাদর্শের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের শিল্পাদর্শের মিল খুঁজে পেয়েছেন। সত্যেন্দ্রনাথ রায় দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তীকালীন উপন্যাসের আধুনিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ কালপর্বকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেছেন। তিনি কল্লোলীয় সাহিত্যধারার যথার্থ পূর্বসূরি হিসেবে নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তকে (১৮৮২-১৯৬৪) চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে কঠোর রিয়ালিজমের অনুসারী জগদীশ গুপ্তকে বলেছেন মানিকের পূর্বসূরি ও কল্লোলীয়দের থেকে দূরবর্তী। তিনি বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর ও মানিককেই একালের সবচেয়ে খাঁটি ঔপন্যাসিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
রবীন্দ্র-পরবর্তী উপন্যাসের ধারা বিশ্লেষণে এ খণ্ড বিশেষ তাৎপর্যবহ।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র সপ্তদশ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৬১), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ও সতীনাথ ভাদুড়ীর (১৯০৬-৬৫) উপন্যাস নিয়ে নানা জনের বিশ্লেষণ। লেখক-তালিকায় আছেন : সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, রণেশ দাশগুপ্ত, আবদুল হক, শঙ্খ ঘোষ, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য, সত্যেন্দ্রনাথ রায়, সৈয়দ আকরম হোসেন, জহর সেনমজুমদার ও সুমিতা চক্রবর্তী।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী (১৯২৯), অপরাজিত (১৯৩১) ও আরণ্যক (১৯৩৮) উপন্যাসই সমালোচকদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় বিভূতিভূষণের শিল্পবৈশিষ্ট্য নির্দেশ করতে গিয়ে মূলত পথের পাঁচালী ও আরণ্যক উপন্যাসই বিশ্লেষণ করেছেন। লেখকের মতে, বিভূতিভূষণের কাছে কিছুই তুচ্ছ নয়, সবই পূর্ণ এবং পূর্ণেরই অংশ। শঙ্খ ঘোষ পথের পাঁচালীকে বলেছেন স্মৃতির কাব্য। তাঁর মতে, বিভূতিভূষণ বিশ্বাস করতেন জীবনে দারিদ্র্য আছে, কিন্তু জীবন দরিদ্র নয় বরং প্রতিটি জীবনেই আছে মহত্ত্বের সম্ভাবনা, নিখিল বিশ্ব-আত্মার স্পন্দন। পথের পাঁচালী ও অপরাজিত উপন্যাসের শৈলীবিচার করে সৈয়দ আকরম হোসেন প্রমাণ করেছেন, এটি আসলে একটি উপন্যাস। এর শরীর-গঠনে ও বিষয়-অন্তর্বয়নে অন্তর্লীনভাবে সক্রিয় থেকেছে অস্থিতে মিথ আর শোণিতে সমকাল। বাখতিনের তত্ত্ব অনুযায়ী, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় পথের পাঁচালীকে বলেছেন পলিফোনিক উপন্যাস। এর ভাষা বহুস্বরিক। এখানে অথরিয়াল ডিসকোর্সের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন চরিত্রের দ্বিস্বরিক সংলাপ। পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ইউরোকেন্দ্রিক চিন্তার বিপরীত ভাবনায়ই আরণ্যক আলোকিত। বিভূতিভূষণের প্রকৃতিচেতনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর ইতিহাসবোধ। আরণ্যক-এর প্রকৃতি শুধু মানবিক নয়, ঐতিহাসিকও। সুমিতা চক্রবর্তী অপরাজিত উপন্যাসে অপরাজিত জীবন-রহস্যের মধ্যে কালের বৃত্তাকার গতিপথের ও বৃত্তাকার জীবন-পরিক্রমার সন্ধান পেয়েছেন। জহর সেনমজুমদার পথের পাঁচালী উপন্যাসে দুর্গার অবহেলিত অবস্থানের মধ্যে পুরুষপ্রধান সমাজের মানসিকতা এবং সুদর্শন পোকার মাধ্যমে দুর্গার নারীসত্তার স্বপ্নকে বাক্সময় করে তুলেছেন।
ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্তঃশীলা (১৯৩৫) উপন্যাস বিশ্লেষণ করে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত দেখিয়েছেন, এতে ভাবালুতার কোনো স্থান নেই এবং এর চিন্তাপ্রধান বৈশিষ্ট্যটিই উপন্যাসটির মূল্য বৃদ্ধি করেছে।
বাংলা উপন্যাসের অভ্যুত্থানমূলক ধারার আলোচনায় চতুর্থ উপন্যাস হিসেবে রণেশ দাশগুপ্ত গণদেবতা-কে (১৯৪২) অন্তর্ভুক্ত করে বলেছেন, এর চুম্বকক্ষেত্র জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে ভারতের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী কৃষক সমাজের নতুন অস্থিরতা নিয়ে আত্মপ্রকাশের পটভূমিতে রচিত এ উপন্যাসে লোকভাষার ব্যবহারকে লেখক গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় তারাশঙ্করের উপন্যাসকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। একদিকে সমাজসচেতনামূলক. আরেকদিকে লোকজীবন-বিশ্লেষক উপন্যাস। লেখক কবি (১৯৪২) ও হাঁসুলী বাঁকের উপকথা (১৯৪৭) উপন্যাসকে তারাশঙ্করের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বললেও গণদেবতা-কে বলেছেন বিশ শতকের প্রথমার্ধের বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্যের একটা যুগ-পরিচায়ক উপন্যাস। প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য তারাশঙ্করের প্রথম উপন্যাস চৈতালী-ঘূর্ণি (১৯৩১) সম্পর্কে এক আণুবীক্ষণিক বিশ্লেষণ করেছেন। শ্মশান ও চৈতালী-ঘূর্ণি, এই দুই প্রতীকের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজের ভাঙন ও শোষিতের প্রতিরোধমুখর বিস্ফোরণকে লেখক তুলে ধরেছেন। উপন্যাস-বিশ্লেষণ কত সূক্ষ্ম ও অন্তর্ভেদী হতে পারে, এ লেখা তার উত্তম দৃষ্টান্ত।
জীবনানন্দের ১৯৩৩ ও ১৯৪৮-এ লেখা দুই পর্বের উপন্যাস নিয়ে এক দীর্ঘ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়। দেখিয়েছেন, এই দুই পর্বের উপন্যাস গঠনবিন্যাস ও বিষয়বস্তুতে পৃথক। প্রথম পর্বে নিঃসঙ্গ মানুষের বিপরীতে এবং দ্বিতীয় পর্বে বৃহত্তর সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের চিত্র এঁকেছেন জীবনানন্দ। প্রথম পর্বে কলকাতা ততটা নেই, দ্বিতীয় পর্বে কলকাতার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। তাঁর উপন্যাসে দাম্পত্য-সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল, প্রণয় পরিণতিহীন, ভবিষ্যৎ আশাহীন, কোনো মূল চরিত্রই আর্থিকভাবে সচ্ছল নয়। বাংলা উপন্যাস-পরম্পরায় জীবনানন্দের ব্যতিক্রমধর্মিতাকে লেখক তুলে ধরেছেন।
কাজী নজরুল ইসলামের উপন্যাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আবদুল হক দেখিয়েছেন, প্রচুর জীবনাভিজ্ঞতা সত্ত্বেও উপন্যাসগুলো শিল্পোত্তীর্ণ হতে পারেনি।
সত্যেন্দ্রনাথ রায়ের মতে, বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার তৃতীয় পর্যায়ের সময়সীমা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পনেরো-বিশ বছর। সতীনাথ ভাদুড়ীর ঢোঁড়াইচরিতমানস-কে (১৯৪৯-১৯৫১) তিনি এ পর্বের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ পর্বের বৈশিষ্ট্য আলোচনায় তিনি অ্যান্টি-নভেলের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এ ধরনের উপন্যাসে প্লটের ভাঙন, নায়কের পতন ছাড়াও আছে দৃষ্টির বিশেষত্ব, যেখানে শিল্পদৃষ্টির চেয়ে বিজ্ঞানবুদ্ধির আত্মীয়তা অধিক। সুমিতা চক্রবর্তী বলেছেন, নানা শ্রেণিভেদ, ধর্মভেদ, বর্ণভেদ ও জাতিভেদে বিভক্ত ভারতবর্ষের প্রকৃত সত্যরূপ ঢোঁড়াইচরিতমানস-এ-ই প্রকাশিত হয়েছে। ঢোঁড়াই যথার্থভাবে ভারতবর্ষের প্রতিনিধি।
এ খণ্ডে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষিত হওয়ায় তা তাৎপর্য অর্জন করেছে।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র অষ্টাদশ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-৫৬), জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী (১৯১২-৮২), কমলকুমার মজুমদার (১৯১৬-৮২), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৯২২-৭১) ও সমরেশ বসুর (১৯২৪-৮৮) উপন্যাস নিয়ে নানাজনের বিশ্লেষণ। বিশ্লেষকদের তালিকায় আছেন : রণেশ দাশগুপ্ত, আবু সয়ীদ আইয়ুব, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপিকানাথ রায়চৌধুরী, অশ্রুকুমার সিকদার, শিবনারায়ণ রায়, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ আকরম হোসেন, সরোজ দত্ত, আহমদ ছফা, সুমিতা চক্রবর্তী, সুতপা ভট্টাচার্য ও তপোধীর ভট্টাচার্য।
বাংলা উপন্যাসের অভ্যুত্থানমূলক ধারার আলোচনায় রণেশ দাশগুপ্ত পঞ্চম উপন্যাস হিসেবে নির্বাচন করেছেন মানিকের দর্পণ-কে (১৯৪৫)। এর পূর্বে যে চারটি উপন্যাস নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন তা থেকে এর ভিন্নতা হলো : এখানে বিপ্লবীদের চরিত্রের চেয়েও বেশি আলো ফেলা হয়েছে সাধারণ মানব-মানবীর ওপর। এটি চল্লিশের দশকের বিপ্লবাত্মক শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর যোগসূত্র স্থাপনেরও উপন্যাস। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ফ্রয়েড বা মার্কস দ্বারা মানিক প্রভাবিত কি না--এর চেয়ে তাঁর বিশিষ্ট মনোভঙ্গির লক্ষণগুলোর দিকে দৃষ্টি ফেরানোই জরুরি। যেখানে দেখা যায়, মানিক জীবনের উপরিতল অপেক্ষা গভীরতর চৈতন্যের প্রশ্নকে অন্বেষণ করেছেন, খুঁজেছেন অখণ্ড ব্যক্তিস্বরূপকে। তাঁর গদ্যরীতিই চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের শক্তিমান লেখকদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। তার চেয়েও বড় কথা তিনি বারবার নিজেকে অতিক্রম করতে সচেষ্ট হয়েছেন।
আবু সয়ীদ আইয়ুব চতুষ্কোণ (১৯৪২) উপন্যাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছেন, মানিকের মতো উচ্চমানের লেখকের বিরুদ্ধে যৌনতার বাড়াবাড়ি-সম্পর্কিত অভিযোগ অন্যায়। মানিক রাজকুমারের অস্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে সেক্স-সম্পর্কিত কোনো সস্তা ঘাঁটাঘাঁটির মধ্যে যাননি। গোপিকানাথ রায়চৌধুরী মানিকের বাস্তবতাবোধের স্বরূপ উন্মোচন করতে গিয়ে লিখেছেন, এ প্রসঙ্গে বাংলা উপন্যাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নামটিই মানিকের এবং বাংলাসাহিত্যে এক্ষেত্রে তিনি অদ্বিতীয়। তাঁর বাস্তবতাবোধের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির রয়েছে গভীরতর সম্পর্ক। পুতুলনাচের ইতিকথা (১৯৩৬) প্রসঙ্গে তার মন্তব্য, আধুনিককালের জটিল জীবনজিজ্ঞাসার নিগূঢ় তরঙ্গাবেগ সঞ্চারে, জীবনের গভীর স্বরূপসন্ধানের অনন্যতায় এটি মহৎ উপন্যাসের দুর্লভ মহিমাকে স্পর্শ করেছে। পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, শশীর জনসমাজে লড়াইটাই এ উপন্যাসের মুখ্য। শশীর ইতিকথাই যেন এ উপন্যাসে একটা সন্দর্ভ হয়ে উঠতে চায়। ঔপনিবেশিক পরম্পরায় আমাদের জনসমাজ যে নানা কারণে বিধ্বস্ত, তারই নায়ক ওই শশী। সুমিতা চক্রবর্তী শশীর মধ্যে নিয়তিবাদের পরিবর্তে কল্যাণমুখী সমাজচেতনতাই লক্ষ করেছেন।
পদ্মানদীর মাঝি (১৯৩৬) প্রসঙ্গে গোপিকানাথ রায়চৌধুরী লিখেছেন, সমাজের নিচুতলার শ্রমজীবী মানুষ সম্পর্কে অর্জিত আশৈশব অভিজ্ঞতার অসাধারণ এক শিল্পরূপ এ উপন্যাস, যেখানে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী উভয়ের জীবনকথা এক দুর্নিবার গতিশীলতার মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে। এ উপন্যাসে সংকলিত হোসেন মিয়ার গানটির নিহিতার্থ বিশ্লেষণ করে সরোজ দত্ত লিখেছেন, নিষ্ক্রিয় আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে হোসেন মিয়ার সামগ্রিক সংগ্রামশীল জীবনের সারার্থই এতে ব্যক্ত হয়েছে। হোসেন মিয়াকে মানিকের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি বা উপন্যাসের প্রাণ বলে অভিহিত করেছেন আহমদ ছফা। অন্যদিকে সুমিতা চক্রবর্তী তাকে যথার্থভাবেই চতুর ব্যবসায়ী ও নির্ভুল ক্যাপিটালিস্ট বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, পুঁজিবাদের ধর্মই বিত্তের বিস্তার সাধন। পুঁজিবাদীকে হতে হয় দানবের মতো কর্মক্ষম--হোসেন মিয়া চরিত্রে যা পরিস্ফুট।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতে, মধ্যবিত্তের ভোগ-নিরাময়ের স্বপ্ন থেকেই মানিক মার্কসবাদে আস্থা স্থাপন করেন। ফলে তাঁর লেখকসত্তার দুই পর্বের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। এ মত দেবেশ রায়েরও। তিনি মানিকের পর্বান্তরের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন লক্ষ করেন।
এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশবিভাগ প্রভৃতি যে কালের ওপর অন্ধকারের গভীর ছায়া সৃষ্টি করেছে, সেই কাল আবার সমাজের ভিত্তিতে এনেছে ভাঙন, সেই ভাঙনটাই জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর বারো ঘর এক উঠোন (১৯৫৫) উপন্যাসের উপজীব্য--এ অভিমত সুতপা ভট্টাচার্যের।
অন্তর্জলী যাত্রা (১৯৫৮/৫৯) উপন্যাসে চণ্ডাল বৈজুকে নায়ক করে তোলার মাধ্যমেই কমলকুমার মজুমদারের সতীদাহ-বিরোধী, হিন্দু-সংস্কারবিরোধী এবং ঘোরতর বাস্তববাদী মনোভাবের পরিচয় ব্যক্ত হয়েছে--লিখেছেন অশ্রুকুমার সিকদার। আর দেবেশ রায় লিখেছেন, কমলকুমারের ভাষা আমাদের অনুভূতির সম্প্রসারণ ঘটানোর ফলে বাংলাগদ্যের বিস্তার-ক্ষমতা বহুগুণে বেড়েছে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র প্রতিটি উপন্যাসকেই শিবনারায়ণ রায় অনন্য বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, তিনটির কোনোটিতেই পুনরাবৃত্তি নেই, প্রতিটিতেই আছে গঠনশৈলী নিয়ে নিরীক্ষা। সৈয়দ আকরম হোসেন ওয়ালীউল্লাহ্র তিনটি উপন্যাসে ব্যবহৃত ভয়ের প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, এর ভেতরে আছে লেখকের জীবননীতি ও শিল্পনীতির জটিল অভিপ্রায় এবং চরিত্রাবলির অস্তিত্ববোধের অভীপ্স। অন্য একটি প্রবন্ধে তিনি উপন্যাসের দৃষ্টিকোণ ও পরিচর্যারীতি ব্যবহারে ওয়ালীউল্লাহ্র অতিসূক্ষ্ম শিল্পবোধের পরিচয় উন্মোচন করেছেন। তপোধীর ভট্টাচার্য লিখেছেন, ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে প্রত্যাখ্যান যথার্থ সংস্কৃতি-স্বাধীনতায় উদ্ভাসিত হওয়ার জন্য উৎসে ফিরে যাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে লালসালু (১৯৪৮) স্বাতন্ত্র্যদীপ্ত।
সমরেশ বসুর শিল্পীসত্তা বিশ্লেষণ করে দেবেশ রায় অভিজ্ঞতার বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন। গঙ্গা (১৯৫৭) উপন্যাসে ঔপন্যাসিক অন্ত্যেবাসী মানুষের সামাজিক-মানবিক অভিজ্ঞতার ভেতর ঢুকে পড়তে সক্ষম হয়েছেন বলে লেখকের ধারণা। তপোধীর ভট্টাচার্য বিবর (১৯৬৫)-এর আলোচনায় লিখেছেন, ’৪৭-পরবর্তীকালের সংশয়, আত্মিক অবসাদ, নাগরিক অবক্ষয় ব্যাপকতর হয়ে এর পরিপ্রেক্ষিত রচনা করেছে। ফলে এটি হয়ে উঠেছে ক্ষয়িষ্ণুকালের রক্তাক্ত অনুসন্ধানের ইতিবৃত্ত। সুমিতা চক্রবর্তী বিবর-কে মহৎ উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এর সঙ্গে অস্তিত্ববাদী দর্শনের যোগ প্রত্যক্ষ।
বাংলাসাহিত্যের কয়েকজন আধুনিক ও শক্তিমান লেখকের উপন্যাসের বিশ্লেষণ সংকলিত হওয়ায় এ খণ্ডটি পাঠকের কাছে বিশেষভাবে আদৃত হবে বলে আশা করি।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র ঊনবিংশ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬), দেবেশ রায় (১৯৩৬-২০২০), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-৯৭) প্রমুখের উপন্যাসসহ সামগ্রিকভাবে ১৯৪৭-উত্তর বাংলাদেশের উপন্যাসের কিছু অন্তরঙ্গ ও সুগভীর বিশ্লেষণ। লেখক-তালিকায় আছেন : রণেশ দাশগুপ্ত, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ আকরম হোসেন, অরবিন্দ সামন্ত, সুদেষ্ণা চক্রবর্তী ও তপোধীর ভট্টাচার্য।
মহাশ্বেতা দেবীর কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু (১৯৬৭) শীর্ষক উপন্যাস বিশ্লেষণ করে সুদেষ্ণা চক্রবর্তী দেখিয়েছেন, মধ্যযুগে নিম্নবর্ণের উত্তরণ-প্রয়াসের সক্রিয়তা, বর্ণাশ্রম প্রথার আনুগত্য, চুয়াড়দের সংস্কার-বিশ্বাস প্রভৃতির চিত্রাঙ্কনের মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। লেখকের মতে, মিথ ও ইতিহাস, স্বপ্ন ও বাস্তব, নগর ও অরণ্য, কৌমজীবন ও বৃহত্তর সমাজ প্রভৃতির মধ্যকার টানাপড়েনের সূক্ষ্ম রূপায়ণের মাধ্যমে উপন্যাসটি অসামান্যতা অর্জন করেছে।
অরবিন্দ সামন্ত লিখেছেন, দেবেশ রায় ইতিহাস ও ঐতিহাসিকতার মধ্যে প্রবেশ করে তিস্তাকে ইতিহাসের অন্তর্গত করে তুলেছেন এবং উপন্যাসের ফ্রেমে নিম্নবর্ণের ইতিহাসকে ধরতে চেয়েছেন। ফলে তিস্তাপারের বৃত্তান্ত (১৯৮৮) হয়ে উঠেছে আধুনিক মানুষের মঙ্গলকাব্য। তপোধীর ভট্টাচার্য বলেছেন, দেবেশ রায়ের উপন্যাসের শিল্পরূপ তত্ত্ব ও প্রয়োগের দ্বিবাচনিকতায় ঋদ্ধ। লেখকের মতে, প্রাক-আধুনিক বাংলাসাহিত্যে কথক যে ভঙ্গিতে সরাসরি তাঁর শ্রোতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতেন, সেই ভঙ্গির একটি কালোপযোগী পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে দেবেশ রায় বহুস্বরিক ও বহুস্তরান্বিত ঔপন্যাসিক প্রতিবেদনের নতুন ধরন প্রতিষ্ঠা করেছেন।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৭) উপন্যাস প্রসঙ্গে তপোধীর ভট্টাচার্য লিখেছেন, তাঁর কোনো উচ্চারণই একার্থবোধক নয়, সেখানে ব্যক্ত স্বরের আড়ালে প্রচ্ছন্ন থাকে অব্যক্ত স্বরের আভাস। বহুস্বরিক কথাবয়নের দৃষ্টান্তসহ উপন্যাসের সন্দর্ভ বহুস্তরান্বিত বাস্তবতার নানা কৌণিকতা ছুঁয়ে যায়। উপন্যাসের শিল্পরূপ নির্মিত হয় দ্বিবাচনিকতার শক্তি ও লাবণ্যে। লেখক ইলিয়াসের দুটি উপন্যাস প্রসঙ্গে বলেছেন, ইলিয়াস সর্বদা সময়বোধের কাছে দায়বদ্ধ। দুটি উপন্যাসেই তিনি ব্যক্তিস্বর ও সামাজিক স্বরের অজস্র টানাপড়েন নিয়ে চিন্তিত। লেখকের মতে, চিলেকোঠার সেপাই যদি হয় সামাজিক সময়ের বয়ন যাতে রাজনৈতিক সময় প্রখর অন্তর্বয়ন হিসেবে উপস্থিত, তাহলে খোয়াবনামা-য় (১৯৯৬) রাজনৈতিক সময়ের বয়নে প্রবলভাবে জাগ্রত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের অন্তর্বয়ন।
রণেশ দাশগুপ্ত বাংলা উপন্যাসের অভ্যুত্থানমূলক ধারা নিয়ে পাঁচটি প্রবন্ধ রচনার ধারাবাহিকতায় ’৪৭-উত্তরকালের গণসংগ্রামকেন্দ্রিক তিনটি উপন্যাসকে তাঁর ষষ্ঠ প্রবন্ধে বিশ্লেষণের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এগুলো হল : শহীদুল্লা কায়সারের (১৯২৭-৭১) সংশপ্তক (১৯৬৫), জহির রায়হানের (১৯৩৫-৭২) আরেক ফাল্গুন (১৯৬৮) ও জহিরুল ইসলামের অগ্নিসাক্ষী।
হাসান আজিজুল হক ‘দুই যুগের দেশ মানুষের কথা’ প্রবন্ধে বিশ শতকের চল্লিশ-পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমিসহ একালে রচিত উপন্যাসের এক অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন পাঠকের চেতনায় আঘাত করে এমন এক সুতীক্ষ্ম ভাষায়। সৈয়দ আকরম হোসেন ১৯৪৭-৭০ কালপর্বে রচিত বাংলাদেশের উপন্যাসের বিষয়গত বৈচিত্র্য ও বৈভব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একে ১৯৪৭-৫৭ ও ১৯৫৮-৭০ এই দুই পর্বে বিভক্ত করে লিখেছেন, প্রথম পর্বের লেখকরা গ্রামকেন্দ্রিক, জীবনদৃষ্টিতে বুর্জোয়া মানবতাবাদী, প্রকরণে দ্বিধান্বিত (ব্যতিক্রম শুধু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্)। অন্যদিকে দ্বিতীয় পর্বের লেখকদের কাছে সমাজ প্রতিপক্ষ, তাঁদের লক্ষণ অন্তর্মুখিতা ও আত্মসর্বস্বতা। এই পর্বের উপন্যাসের আঙ্গিক বিবেচনায় লেখক এপিক ফর্ম, রূপক-প্রতীকধর্মিতা, চেতনাপ্রবাহ রীতি, মিথ-ঐতিহ্যের নবমূল্যায়ন, আঞ্চলিকতা প্রভৃতি কয়েকটি প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এক সৎ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমাদের দেশের সেরা ও সংখ্যাগুরু আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে চাকমাদের উপন্যাস লিখিত হোক, এই কামনা করেছেন তাদের আধুনিক ব্যক্তি-সমস্যা ও জীবনযন্ত্রণার স্বরূপ উপলব্ধির জন্য।
’৪৭-উত্তরকালে বাংলা উপন্যাসের বিশ্লেষণে এ খণ্ডে সংকলিত রচনাসমূহ নানাদিক থেকে পাঠকদের কৌতূহল মেটাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র বিংশ খণ্ডে বাংলা গদ্যরীতি নিয়ে লেখা বারোজন লেখকের দশটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। লেখক তালিকায় আছেন: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রণয়কুমার কুণ্ডু, পবিত্র সরকার, নীহাররঞ্জন রায়, অরুণকুমার বসু, বিনয় ঘোষ, অরবিন্দ পোদ্দার, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অম্লান দত্ত, অমিতাভ চৌধুরী, অমিয়ভূষণ মজুমদার ও অসীম রায়। এসব প্রবন্ধের পারম্পর্য বিধানে কোনো সুনির্দিষ্ট বা সূক্ষ্ম মানদণ্ডকে ভিত্তি করা হয়নি; কেবল মোটা দাগের বিচার হলো: এসব প্রবন্ধে বাংলা গদ্যরীতির কিছু তত্ত্বগত মীমাংসা আছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধটি বহুল আলোচিত এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন। এর শিরোনাম যদিও ‘বাঙ্গালা ভাষা’ কিন্তু ‘বাংলা গদ্যরীতি’ই লেখকের আলোচ্যবিষয়। উনিশ শতকের সত্তরের দশকে লেখক বাংলা গদ্যের দুই রীতির (একটি লেখার ভাষা হিসেবে প্রচলিত সংস্কৃতানুসারী ‘সাধু রীতি’, আরেকটি জনগণের মুখের ভাষা, সাধুভিন্ন ‘অপর রীতি’ হিসেবে গণ্য) কথা উল্লেখ করে বলেছেন, আসলে লেখার ভাষা হিসেবে এই ‘অপর রীতি’ই আরাধ্য হওয়া উচিত। তাঁর মতে, বাংলা ভাষার বিকাশ এই মৌখিক ভাষারীতির বিকাশের সঙ্গেই জড়িত। সে কারণে অধিকাংশ লোকের বোধগম্য ভাষাই হওয়া উচিত লেখ্যরীতির বাহন। এই সূত্রেই বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে এই বিখ্যাত উক্তিটি করেন: ‘রচনার প্রধান গুণ এবং প্রথম প্রয়োজন, সরলতা ও স্পষ্টতা’।
প্রণয়কুমার কুণ্ডু দেখিয়েছেন, সাহিত্যবিচারে রীতিবিষয়ক ধারণাটি প্রাচীন ভারত ও ইউরোপ উভয় অঞ্চলেই ছিল, কিন্তু রীতিবিজ্ঞানের ধারণা একান্তভাবে আধুনিক ইউরোপের। স্টাইলের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই রীতিবিজ্ঞানের উদ্ভব। ভারতবর্ষে রীতিবাদ একসময়ে উপেক্ষিত হয়ে প্রাধান্য পেয়েছে রসতত্ত্ব। কিন্তু ইউরোপের ক্ষেত্রে তা হয়নি। লেখক বিশদভাবে এই ইতিহাস এবং আধুনিক রীতিবিজ্ঞানের নানা দিক বিশ্লেষণ করেছেন। রীতিবিজ্ঞানকে একসময় শুধু সাহিত্যের ভাষাগত বিশ্লেষণ মনে করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে এই ধারণা পাল্টে গেছে। এরও যে একটা নন্দনতাত্ত্বিক মূল্যায়নের দিক আছে, একালের রীতিবিজ্ঞানীরা তা প্রমাণ করেছেন। এভাবে রীতিবিজ্ঞান সাহিত্য-সমালোচনার পরিধিকে প্রসারিত করেছে।
পবিত্র সরকার ইউরোপের আধুনিক রীতিবিজ্ঞানের আলোকে বাংলা গদ্যরীতি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি স্টাইলের ভালো-মন্দ সুন্দর-অসুন্দরবিষয়ক আলোচনা পরিহার করে এর লক্ষ্য বা বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে অগ্রসর হয়েছেন। লেখকের মতে, স্টাইলের কোনো সহজ সংজ্ঞা নেই। পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য লেখক কর্তৃক সচেতন বা অচেতনভাবে নির্মিত ভাষাভঙ্গিকেই তিনি স্টাইল বলেছেন। নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, বুদ্ধি, যুক্তি ও কার্যকারণ-শৃঙ্খলাই গদ্যের বৈশিষ্ট্য। সে কারণে গদ্যভাষা মানসিক শৃঙ্খলানির্ভর। এই শৃঙ্খলার মধ্যেই ভাষার শুচিতা ও প্রাণ নিহিত। লেখক গদ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিরুৎসাহী নন, তবে সাম্প্রতিক সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় গদ্যের শৈথিল্য দেখে তিনি শঙ্কিত। বিনয় ঘোষ বলেছেন, শতবর্ষের সাধনায় গদ্যভাষা অনেক পথ অগ্রসর হলেও ক্রমে তা ভঙ্গিসর্বস্ব হয়ে উঠেছে, প্রকট হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানসম্মত ভাবনার অভাব। কথাসাহিত্যের গদ্যেও তিনি লক্ষ করেছেন এই দৈন্য ও বিকারের নানা অনুষঙ্গ। অরবিন্দ পোদ্দারের অভিমত এর কিছুটা বিপরীত। তাঁর মতে, ক্রমশ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর বাংলা গদ্যের উনিশ শতকীয় প্রতিশ্রুতি বিশ শতকে পরিবর্তিত হলেও এর সম্ভাবনা এখনও অটুট। যদিও প্রথমটি ছিল সৃষ্টি ও নির্মাণের এবং পরেরটি অবক্ষয়ের ও আত্মক্ষয়ের, তবু একালের গদ্যসাহিত্য বোধের গভীরতর দীপ্তিতে, বাকসংযমে, ব্যাপকতর অধ্যয়নের পরিণতিতে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। তিনি বঙ্কিমচন্দ্র থেকে বিষ্ণু দে পর্যন্ত প্রবন্ধের চারটি দৃষ্টান্ত ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, বিষ্ণু-দে’র প্রবন্ধ অনেক বেশি তত্ত্বগভীর, বিষয়নিষ্ঠ ও ইতিহাসচেতনায় ঋদ্ধ; গদ্যরীতি পরিমিত ও সুসংবদ্ধ।
বাংলা গদ্যরীতি সম্পর্কে অত্যন্ত আশাবাদী ও ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন হীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁর মতে, ইংরেজি গদ্যসাহিত্যের তুলনায় বাংলা গদ্যসাহিত্য অনেক দ্রুত বিকশিত হয়ে এমন শক্তি অর্জন করেছে যা দিয়ে যে-কোনো দুরূহ বিদ্যাচর্চা সম্ভব। এর কারণ, রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো শক্তিমান মনস্বীর হাতে এর শক্ত ভিত্তি রচিত হয়েছে এবং বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের মতো সৃষ্টিশীল প্রতিভার হাতে তা বিকশিত হয়েছে। শব্দের লালিত্যে, ভাষাদেহের লাবণ্যে, চিন্তার গভীরতায় রবীন্দ্রনাথ গদ্যের দিগন্তকে প্রসারিত করেছেন। বিচিত্র বিষয়ে লিখতে গিয়ে অত্যন্ত ভাষাসচেতন এই শিল্পী নিজ প্রয়োজনেই ভাষার শক্তিবৃদ্ধির কথা ভেবেছেন। কাব্যভাষার চেয়ে তাঁর গদ্যভাষায় তাই রূপান্তরের চিহ্ন অনেক বেশি স্পষ্ট। গদ্যভাষায় বাকচাতুর্য, উইটের ক্ষমতা ও প্রসাদগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে তাঁর হাতে।
অম্লান দত্তের মতে, ভাবকে ভাষায় রূপ দেওয়া বা বাক্যকে ভাবের অনুরূপ করা সাধনার বিষয়। কেননা ভাবের জগতে তথ্য ও রস দুই-ই বিদ্যমান। সে কারণে ভাষার এই সাধনায় সামান্য সিদ্ধিলাভও সার্থক। যেমন, বক্তব্য ও বাগ্ভঙ্গি এই দুই মিলে সাহিত্য। বক্তব্য ভুল প্রমাণিত হলেও বাগ্ভঙ্গির সার্থকতা ভাষার সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। অমিতাভ চৌধুরী দেখিয়েছেন, উচ্চবর্ণের বাঙালি হিন্দুরা বাংলাভাষাকে ঘৃণা করেছে, বাংলাভাষায় বক্তৃতা দেওয়া তাদের জন্য ছিল অসম্মানজনক। উনিশ শতকের সংস্কৃতানুসারী বাংলাগদ্যের সঙ্গে সাধারণের যোগ ছিল না। লোকসাহিত্যের অধিকাংশ সৃষ্টি মুসলমানের হাতে। পূর্ববঙ্গের মুসলমান বিধায়করাই বাংলায় বক্তৃতা দেওয়ার দাবি করেন। অমিয়ভূষণ মজুমদারের মতে, উপন্যাসের গদ্যের সঙ্গে থিমের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তাঁর অভিযোগ : সাম্প্রতিক উপন্যাসের ভাষা অন্তর্মুখী না হয়ে সংবাদপত্রের মতো তথ্যসর্বস্ব হয়ে পড়েছে। অসীম রায় লিখেছেন, লেখকের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে উপন্যাসের ভাষার সম্পর্ক নিবিড়।
এ খণ্ডে সংকলিত বাংলা গদ্যরীতির বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধসমূহ বিচিত্রমুখী ভাব প্রকাশ করায়, আশা করি, তা পাঠককে সমৃদ্ধ করবে।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র একবিংশ খণ্ডে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬), মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-৬০), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) প্রমুখের গদ্যবৈশিষ্ট্য, সেইসঙ্গে প্রাক্-আধুনিক বাংলা গদ্য (১৬-১৮ শতক) ও ১৯৪৭-উত্তরকালের বাংলাদেশের গদ্যধারা নিয়ে বিভিন্ন লেখকের বিশ্লেষণ সংকলিত হয়েছে। লেখক-তালিকায় আছেন : শিশিরকুমার দাশ, শিবনারায়ণ রায়, সত্যেন্দ্রনাথ রায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, মুনীর চৌধুরী, অরুণকুমার বসু, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, আনিসুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, দেবেশ রায় ও বিজিতকুমার দত্ত।
আনিসুজ্জামান তাঁর পুরোনো বাংলা গদ্য গ্রন্থে ষোলো থেকে আঠারো শতকে রচিত বাংলা গদ্যের আদি রূপটিকে বিস্তৃত তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। লেখকের মতে, উনিশ শতকে সূচিত বাংলা গদ্যের নবযাত্রায় পূর্ববর্তী তিনশো বছরের গদ্যধারাকে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করা হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, আদি বাংলা গদ্য কেবল চিঠিপত্র ও দলিল-দস্তাবেজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ধর্মসাধনার তত্ত্বগত আলোচনা, ন্যায়শাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র ও চিকিৎসাবিষয়ক আলোচনা, নাটকের সংলাপ ও কাহিনি-বর্ণনার পাশাপাশি আইনের অনুবাদ ও ভাষাশিক্ষাকেও আশ্রয় করেছিল। এই তিনশো বছরে বাংলা গদ্য নানাভাবে পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়েছে। বিষয়ভেদে গদ্যের সারল্য ও প্রাঞ্জলতার হেরফের ঘটেছে। কেজো-গদ্য রচনায় যেমন ভূমিকা রেখেছে শাসকশক্তি ও বিত্তবানেরা, তেমনি ভাবের গদ্য রচনায় পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন বৈষ্ণব সাধক ও সাহিত্যিকেরা। ওই সময়ে গদ্যকে পদ্যের রূপ দেওয়ার পাশাপাশি পদ্যের কাঠামো থেকে গদ্যের বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টা-সংক্রান্ত দ্বিবিধ প্রবণতাই লক্ষণীয়।
শিশিরকুমার দাশ দেখেছেন, বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্যে সমগঠনের আন্বয়িক উপাদান বারবার লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। একটি অনুচ্ছেদের মধ্যে একধরনের বাক্য বা বাক্যাংশ, কখনও সমদৈর্ঘ্যরে বা সমগঠনের পদগুচ্ছ ফিরে ফিরে আসে। ভাষাগত উপাদান ব্যবহারের এই পৌনঃপুনিকতাকে বঙ্কিমের গদ্যরীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করে লেখক এর নাম দিয়েছেন : সমান্তরলতা। এর ফলে বঙ্কিমের গদ্যে একপ্রকার সুষমা বা বিশেষ সাংগীতিক ঐক্য সৃষ্টি হয়। শিবনারায়ণ রায় রবীন্দ্র-প্রতিভার কথা স্মরণে রেখে লিখেছেন : সরসতায়, ওজস্বিতায়, দার্ঢ্য, যাথার্থ্য, তীক্ষ্মতায়, শব্দচয়ন ও বাক্যগঠনের নৈপুণ্যে এবং বিষয় ও রীতিবৈচিত্র্যে বঙ্কিমের গদ্য বাংলাসাহিত্যে অপ্রতিম।
সত্যেন্দ্রনাথ রায় রবীন্দ্রনাথের গদ্যকে কালগত ও বিষয়গত নানা ভাগে বিভক্ত করে এর বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, তাঁর গদ্যভাষা প্রথম থেকে পরিণত, একান্তভাবে নিজস্ব ও ব্যক্তিত্ব-প্রকাশক। চলিত রীতির প্রতিই তাঁর পক্ষপাত। সর্বত্রই তাঁর গদ্য সৃজনধর্মী ও প্রতিমাময়, তবে তাতে কাব্যিকতা যে সুলভ তা নয়। তাঁর গদ্যের প্রতিমা বাচ্যার্থের অনুগত। রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ গদ্যগ্রন্থ লিপিকা-র ভাষা নিয়ে যে পরীক্ষা লেখক করেছেন তার মর্মোদ্ঘাটন করে অরুণকুমার বসু দেখিয়েছেন, গদ্যরচনার একটি আন্তঃশৃঙ্খলামূলক পদ্ধতি প্রবর্তনে এখানে লেখক সচেতন ছিলেন। এতে ব্যবহৃত হয়েছে মৌখিক বাগ্ভঙ্গিরই শিষ্টীকৃত রূপ, যাতে আছে টোনাল কোয়ালিটি, থিমের সঙ্গে বাক্যগঠন ও বাক্যের প্যাটার্নের একটা গভীর সংযোগ।
দেবেশ রায় গবেষকের দৃষ্টি নিয়ে দীর্ঘ পরিসরে রবীন্দ্রনাথের ১৮৭৫ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে লেখা গদ্যের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছেন। এই আদিপর্বে রবীন্দ্রনাথের গদ্য কীভাবে বঙ্কিমী প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেছে, লেখক তা দেখিয়েছেন। নবার্জিত শব্দবিন্যাস পদ্ধতি, উপমার অনায়াস অদ্ভুত চমক, তথ্যসংগ্রহ ও তথ্যসজ্জার নির্ভার শৃঙ্খলা, কাহিনিশিল্পের অন্তর্লীন নাটকীয়তা প্রভৃতির মাধ্যমে রবীন্দ্র-গদ্য তার আদিপর্বেই স্বকীয়তা লাভ করেছে।
অন্নদাশঙ্কর রায় একাধিক প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরীর গদ্যবৈশিষ্ট্য এবং তাঁর মাধ্যমে প্রবর্তিত চলিত রীতির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, প্রমথ চৌধুরী ক্ল্যাসিক রীতির অনুসারী, যার প্রধান লক্ষণ প্রসাদগুণ। প্রমথ চৌধুরী বাংলাভাষাকে সংস্কৃতানুসারী রীতি থেকে মুক্ত করে দেখিয়েছেন, কথ্যভাষায় লঘু-গুরু-সরস-গম্ভীর যে-কোনও ধরনের প্রবন্ধ লেখা সম্ভব। এদিকে বিজিতকুমার দত্তের মতে, প্রমথ চৌধুরীর গদ্যভাষার বৈশিষ্ট্য হল : সংযমের প্রাধান্য, মার্জিত বুদ্ধিপ্রয়োগে রচনাকে সুশ্রী দান, শিল্পগুণের ওপর গুরুত্বারোপ, চিন্তা ও ভাষার মুক্তি, চলিত রীতির প্রবর্তন, মননশীলতার পাশাপাশি ব্যঙ্গবিদ্রুপের সমাহার, প্রবাদ-প্রবচন ও অনুপ্রাসের ব্যবহার প্রভৃতি।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের মতে, বুদ্ধদেব বসুর গদ্যবৈশিষ্ট্যের লক্ষণ হল : শুরু থেকে শেষপর্যন্ত জাগরচৈতন্যের উপস্থিতি, সাধারণের কাছে বোধগম্যতা, অব্যর্থ বিশেষণ ও ক্রিয়াবিশেষণ প্রয়োগ, যুক্তিধর্মী উপমা, দুরূহ-সহজের মিশ্ররস সৃষ্টি প্রভৃতি।
মুনীর চৌধুরী ১৯৪৭-উত্তরকালের বাংলাদেশের গদ্য নিয়ে নানা সংস্কার প্রস্তাব মূল্যায়ন করে বাংলা গদ্যের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত নবরূপায়ণের ওপর জোর দিয়েছেন এবং প্রধান প্রধান সৃজনশীল লেখকদের রচনারীতির মধ্যেই অনুসন্ধান করেছেন ভাষাপ্রবাহের মৌল প্রবণতাসমূহ। আবু হেনা মোস্তফা কামাল বাংলাদেশের বিশ শতকের পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশকের গদ্য সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে এর তিনটি গুণগত মান নির্দেশ করেছেন : তৎসম শব্দবহুল রীতি, কথ্য শব্দবহুল সৌন্দর্যসচেতন রীতি এবং নানা নিরীক্ষাপ্রবণ সৃজনশীল রীতি।
বহুলাংশে অসম্পূর্ণ হলেও প্রাক্-আধুনিক পর্যায় থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা গদ্যের যেসব আলোচনা-বিশ্লেষণ এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে, তা থেকে পাঠক বাংলা গদ্যের রূপান্তরের ধারা সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পাবেন বলে আশা করা যায়।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র দ্বাবিংশ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে মনোমোহন ঘোষের বাংলা গদ্যের চার যুগ শীর্ষক সম্পূর্ণ গ্রন্থ এবং শ্যামল চট্টোপাধ্যায়ের বাংলা গদ্যের ক্রমবিকাশ গ্রন্থের অংশবিশেষ।
১৯৪৭-পূর্বকালে লেখা মনোমোহন ঘোষের বাংলা গদ্যের চার যুগ গ্রন্থে বাংলা গদ্যকে চার যুগে বিভক্ত করা হয়েছে : রামমোহন যুগ (১৮০১-৪৩), তত্ত্ববোধিনী যুগ (১৮৪৩-৭২), বঙ্কিমযুগ (১৮৭২-৯২) ও রবীন্দ্রযুগ (১৮৯২-পরবর্তী)। প্রধান এই চারটি যুগকেও লেখক নানা উপ-যুগে বিভক্ত করেছেন এবং প্রতিটি যুগেরই প্রধান প্রধান লেখকের গদ্যবৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা করেছেন। তাছাড়া
প্রাক্-আধুনিক বাংলা গদ্য নিয়েও তিনি দুই পর্বে (১৫৫০-১৭৫০ ও ১৭৫০-১৮০১) আলোচনা করেছেন। রামমোহন যুগের মধ্যে ফোর্ট উইলিয়াম পর্ব (১৮০১-১৫), স্কুলপাঠ্য ও অন্যান্য পুস্তক-পর্ব (১৮১৭-২৯), সংস্কার উদ্যোগের পর্ব (১৮১৫-২৯) ও সাময়িকপত্র পর্ব (১৮২৯-৪৩) নিয়ে লেখক পৃথকভাবে তার বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের লেখা তেরোটি গ্রন্থের গদ্যবৈশিষ্ট্য বিচার করে এর দুটো দিককে--আরবি-ফারসি শব্দের আধিক্য ও তৎসম শব্দবহুলতা--চিহ্নিত করেছেন লেখক। পাঠ্যপুস্তক পর্যায়ে প্রকাশিত মৌলিক ও অনূদিত উভয় ধরনের গ্রন্থের ভাষায় সারল্যের অভাব ছিল। লেখকের মতে, বাংলা গদ্যের ধ্রুব আদর্শ গড়ে উঠেছিল রামমোহন রায়েরই (১৭৭২-১৮৩৩) হাতে। বাংলা ভাষার অনন্যসাধারণ প্রকৃতি তাঁর ভালোই জানা ছিল। ১৮৩৩-এ রামমোহনের মৃত্যু হলেও ১৮৪৩-এ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশের আগ পর্যন্ত রামমোহন-প্রবর্তিত গদ্যের প্রভাব অক্ষুণ্ন ছিল। বাংলা গদ্যের বিসদৃশ অবস্থা দূরীকরণে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এর দুই কর্ণধারের একজন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫)। তাঁর গদ্য ছিল দীর্ঘ সমাসবিরল, জটিলতাহীন, অলংকৃত বাক্যের সরসতায় পূর্ণ। এর প্রভাবে অস্বাভাবিক সংস্কৃত অনুসারিতা থেকে মুক্ত ছিল অক্ষয়কুমার দত্তের (১৮২০-৮৬) রচনাও। একালের আরেকজন উল্লেখযোগ্য গদ্যলেখক রাজনারায়ণ বসু (১৮২৬-৯৯)। অন্যদিকে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮১৩-৮৫) গদ্যের বড় গুণ প্রাঞ্জলতা, সরলতা, একই সঙ্গে গাম্ভীর্য।
লেখকের মতে, প্রথম রচনা বেতালপঞ্চবিংশতিতেই (১৮৪৭) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গদ্য সুশ্রাব্য, সরস, ছন্দোময় ও গাম্ভীর্যপূর্ণ। শকুন্তলা (১৮৫৪) ও সীতার বনবাস (১৮৬০) তাঁর এই কীর্তিকে আরো উজ্জ্বল করেছে। রাজেন্দ্রলাল মিত্রের (১৮২৪-৯১) ভাষা সংস্কৃতঘেঁষা হলেও তা ক্রমে হালকা ও সরল হয়ে আসছিল, এবং তাতে রসবোধেরও পরিচয় ছিল। প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-৮৩) কলকাতা ও নিকটবর্তী অঞ্চলের কথ্যভাষার ওপর জোর দিলে তা জনপ্রিয় হয়। তাঁর মাসিক পত্রিকা ও আলালের ঘরের দুলাল-এ (১৮৫৭) এমনকি মুসলমানদের ভাষাও স্থান পেয়েছে। চলিত ভাষাকে সাহিত্যে যথাযোগ্য মর্যাদাদানের গৌরব তাঁরই প্রাপ্য। এ যুগের আরেক কৃতী গদ্যকার ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮২৪-৯৮)।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪) গদ্যে নতুন শ্রী সঞ্চার করেন, অলংকার প্রয়োগে মাত্রাজ্ঞান ও সুরুচির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বিষবৃক্ষ (১৮৭৩) থেকে তাঁর নীতি, গদ্য যত সুখবোধ্য হবে সাহিত্য তত উন্নতিকারক হবে। সংস্কৃতবহুল ভাষা পরিত্যাগ না-করলেও দীর্ঘসমাসযুক্ত গদ্যের মোহ তিনি কাটিয়েছেন। বাক্যকে শ্রুতিমধুর করার জন্য অনুক্তক্রিয় বাক্যের প্রয়োগ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাক্যের ব্যবহার, প্রশ্নসূচক ও আশ্চর্যবোধক বাক্যের ব্যবহার ঘটিয়েছেন তিনি। কেশবচন্দ্র সেনের (১৮৩৮-৮৪) গদ্যভঙ্গি ছিল সাদাসিধে, সহজ-সরল, রীতি-পারিপাট্যময়। কালীপ্রসন্ন ঘোষের (১৮৪৩-১৯১০) গদ্যে ছিল লালিত্য ও ওজস্বিতা। শিবনাথ শাস্ত্রীর (১৮৪৭-১৯১৯) ভাষা ছিল সহজবোধ্য এবং মীর মশাররফ হোসেনের (১৮৪৭-১৯১০) রচনায় ছিল উচ্চাঙ্গের শিল্পকৌশল। রমেশচন্দ্র দত্তের (১৮৪৮-১৯০৯) রচনায় দীর্ঘ সমাস ও অলংকারবাহুল্য অনুপস্থিত।
লেখকের মতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) হাতেই ঘটেছে বাংলা গদ্যের সর্বোত্তম বিকাশ। এর সাধারণ লক্ষণ হল : অতিদীর্ঘ সমাসের বর্জন, শব্দপ্রয়োগের লালিত্য, অনুচ্ছেদ-অন্তর্গত বাক্যপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি, শ্রুতিমাধুর্য, উপমা ও বিশেষণ প্রয়োগে নৈপুণ্য প্রভৃতি। বাংলা গদ্য তাঁর হাতে অভাবনীয় সমৃদ্ধি লাভ করেছে। সবুজপত্র (১৯১৪) প্রকাশের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র-গদ্যে চলিত ভাষারীতির ব্যবহার সুনিশ্চিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ চলিত রীতিকে সাহিত্যিক রূপসৃষ্টির অন্যতম সাধন ও চিন্তাযুক্তি প্রকাশের বাহন করে তোলেন। রবীন্দ্রযুগের গদ্যলেখকদের মধ্যে চার জনের নাম উল্লেখযোগ্য--স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬২-১৯০৩), প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬), অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১-১৯৫১) ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)। প্রমথ চৌধুরীর গদ্যে রয়েছে সাধারণ কথ্যভঙ্গি, সরসতা, wit-এর সার্থক ব্যবহার প্রভৃতি।
শ্যামল চট্টোপাধ্যায়ের গ্রন্থে তিনটি কালপর্ব (১৭৭৮-১৮১৫, ১৮১৫-১৮৭৮ ও ১৮৭৮-পরবর্তী)-সম্পর্কিত আলোচনা সংকলিত হয়েছে। উনিশ শতকের প্রথম পনেরো বছরের গদ্যকার হিসেবে উইলিয়াম কেরি (১৭৬১-১৮৩৪), রামরাম বসু (১৭৫৭-১৮১৩) ও মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারকে (১৭৬২-১৮১৯) লেখক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছেন। এর মধ্যে প্রথমজনের বৈশিষ্ট্য তৎসম শব্দপ্রীতি, দ্বিতীয়জনের মধ্যে রয়েছে আরবি-ফারসি শব্দপ্রীতি এবং তৃতীয়জনের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ তাঁর ভাষা ঋজু, দৃঢ় ও সুসংহত। লেখকের মতে, বাংলা গদ্যের সাধুরীতি ১৮১৫-৭৮ কালপর্বেই পরিপুষ্টি লাভ করে। এর কৃতিত্ব রামমোহন রায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। প্রথম ও শেষোক্ত জনই এর মধ্যে যুগন্ধর।
তবে এই পর্বেই প্যারীচাঁদ মিত্র, মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-৭৩), দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-৭৩) ও কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০-৭০) গদ্যভাষায় লঘু কথ্যভঙ্গি সঞ্চার করেন। লেখকের মতে, রামমোহন রায়ের বাক্যগুলো প্রায়ই দুরন্বয় দোষে দুষ্ট। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অনুসারী। অক্ষয়কুমার দত্তের বাক্যবিন্যাস অনেক ঋজু এবং তাঁর গদ্য প্রসাদগুণবিশিষ্ট ও শৈথিল্যহীন। বাংলা গদ্যে নিখুঁত পদবিন্যাসরীতি বিদ্যাসাগরের শ্রেষ্ঠ প্রবর্তনা। আদর্শ সাধু গদ্যভাষা দেহসংস্থানের দিক থেকে তাঁর হাতে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। পদবিন্যাস রীতি, উপযুক্ত বিরামচিহ্নের ব্যবহার, গদ্যছন্দের আবিষ্কার, সাহিত্যগুণসম্পন্ন রচনা প্রভৃতি বিদ্যাসাগরেরই দান।
১৮৭৮-পরবর্তী কালপর্বের আলোচনাকে লেখক বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। এ আলোচনায় বাংলাভাষার সাধুরীতি থেকে চলিত রীতিতে রূপান্তরিত হওয়ার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সাধু ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক হয়েও বঙ্কিম কথ্যরীতির সমর্থক ছিলেন। ১৮৭৩ সাল থেকে এর প্রভাব বাড়তে থাকে। বঙ্কিমি গদ্যের বৈশিষ্ট্য হল : অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত বাক্য রচনা, সৌন্দর্য আভায় দ্যুতিময় চিত্রকল্পনা, অন্তরঙ্গ বিবৃতি, রোম্যান্টিক চেতনা ও ঐন্দ্রজালিক মোহের বিস্তার, শব্দ-ব্যবহারে গোঁড়ামিমুক্ত থাকা প্রভৃতি।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ বারবার তাঁর গদ্যরীতির রূপান্তর সাধন করেছেন। ১৮৭৮ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে তাঁর গদ্যরীতিতে চারবার রদবদল ঘটলেও ১৯১৫ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত বাধাহীনভাবে তিনি চলিতরীতির চর্চা করেন। সব ধরনের গদ্য লেখার উপযোগী চলিত রীতির সন্ধান দেন রবীন্দ্রনাথই। চলিত রীতির পরম বিকাশ ঘটে প্রমথ চৌধুরীর গদ্যভাষায়। অন্যদিকে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৭৩-১৯৩২) ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁদের গদ্যভাষায় রূপরচনা ও ঐশ্বর্যবিধানের চেয়ে সরলতা ও ভাবসমৃদ্ধি আনার চেষ্টা করেছেন।
এ খণ্ডে আদিকাল থেকে বিশ শতকের মধ্যবর্তী পর্যায় পর্যন্ত বাংলা গদ্যের বিকাশ সম্পর্কে দুজন বিশিষ্ট গদ্য-গবেষকের যে অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণ সংকলিত হয়েছে তা এ বিষয়ে পাঠকের ধারণাকে সমৃদ্ধ করবে।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র ত্রয়োবিংশ খণ্ডে শহীদ অধ্যাপক আনোয়ার পাশার রবীন্দ্র-ছোটগল্প সমীক্ষা গ্রন্থের একটি অংশকে ‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প-ভাবনা’ শিরোনাম দিয়ে সংকলন করা হয়েছে। এছাড়া ত্রিশোত্তরকালের খ্যাতিমান ছোটগল্পকার নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটগল্প বিষয়ক দুটি প্রবন্ধের বই থেকে ১৪টি রচনা গৃহীত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প-ভাবনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাঁর বিভিন্ন রচনায় : ‘বর্ষাযাপন’ কবিতা, লিপিকা-র ‘গল্প’ নামক কথিকা, ‘অসম্ভব কথা’ গল্পের অংশবিশেষ, ‘শেষ কথা’ গল্পের পাঠান্তর প্রভৃতিতে। এসব রচনাকে একত্র করে আনোয়ার পাশা তাঁর রবীন্দ্র-ছোটগল্প সমীক্ষা গ্রন্থে ছোটগল্পের আঙ্গিক সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের তত্ত্ব-ভাবনা বিশ্লেষণ করেছেন। ওই অংশটিই এ খণ্ডে সংকলন করা হয়েছে। অন্যদিকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ সাহিত্যে ছোটগল্প ও ছোটগল্পের সীমারেখা-য় অভিব্যক্ত হয়েছে ছোটগল্প-বিষয়ক তাঁর চিন্তারাশি। এ দুই গ্রন্থে তিনি ছোটগল্পের জন্মবৃত্তান্ত ও তার সংজ্ঞার্থ বিশ্লেষণ করেছেন। ছোটগল্পের সঙ্গে উপন্যাস, কবিতা ও একাঙ্কিকার আন্তঃসম্পর্কও তাঁর বিশ্লেষণের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
পাঠক, আশা করি, এসব রচনা থেকে ছোটগল্পের স্বরূপ ও এর জন্ম-ইতিহাস সম্পর্কে একটি বিস্তৃত ও পরিচ্ছন্ন ধারণা লাভ করবেন। এ খণ্ডের দুই লেখকই একই সঙ্গে ছোটগল্পকারও। ছোটগল্প রচনাসূত্রেই এর গঠনবৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাঁদের প্রতিনিয়ত সচেতন থাকতে হয়েছে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার আশ্রয় নিতে হয়েছে। সুতরাং ছোটগল্পের সংজ্ঞার্থ নির্ধারণে তাঁদের এই বাস্তব অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষাযাপন’ কবিতাই এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই কবিতায় ছোটগল্প সম্পর্কে যে বৈশিষ্ট্য ও বোধের কথা ব্যক্ত হয়েছে তা তাঁর রচিত ছোটগল্পের শরীরেই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। যেমন : বর্ণনার বাহুল্য বর্জন, তত্ত্ব-তথ্য-দর্শন-উপদেশের ভারাক্রান্তহীন কাহিনির একমুখী গতি, উপসংহারের অনিশ্চিত ব্যঞ্জনা, মানবজীবনের খণ্ডরূপ বিন্যাসের মধ্যে সামগ্রিকতার আভাস সৃষ্টি প্রভৃতি রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পেরও বৈশিষ্ট্য। প্রসঙ্গত স্মরণীয় যে, পাশ্চাত্য ছোটগল্পের গঠনবৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং সচেতনভাবেই নিজের গল্পকে তিনি ওইরূপ গঠনশৈলী দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় উনিশ শতকের এই ‘বিশেষ সৃষ্টি’টির মূলে সক্রিয় আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কারণগুলো ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন মনীষীর বক্তব্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্ট করেছেন। তিনি ছোটগল্পের সঙ্গে উপন্যাস, কবিতা ও একাঙ্কিকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে এই শিল্পপ্রকরণের স্বরূপ তুলে ধরেছেন। এরূপ তুলনায় ছোটগল্পের সংজ্ঞার্থ বিশেষভাবে স্বচ্ছতা লাভ করেছে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল, তিনি ছোটগল্পের এক সমৃদ্ধ উৎসভূমি হিসেবে প্রাচীন ভারতবর্ষকে চিহ্নিত করে দেখিয়েছেন, কীভাবে এখানকার কাহিনি ইরান-ইরাক হয়ে ইউরোপে পৌঁছে ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। প্রাচীন ভারতের এসব কাহিনির মধ্যে আছে : জাতকের গল্প, পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ, কথাসরিৎসাগর, দশকুমার-চরিত, শুকসপ্ততি প্রভৃতি। এসবের রচনাকাল খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে খ্রিষ্টপরবর্তী দ্বাদশ শতক। আর আরব্যোপন্যাসের সামগ্রিক রূপ গড়ে উঠেছে দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে। লেখক প্রমাণ করেছেন, আরব্যোপন্যাসের কাহিনির মধ্যে পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ, কথাসরিৎসাগর, শুকসপ্ততি প্রভৃতির প্রভাব, প্রতিবিম্ব বা প্রতিধ্বনি লক্ষ করা যায়। অন্যদিকে ইউরোপে ছোটগল্পের আদি জন্মদাতা হিসেবে যে তিনজন (ইতালির বোক্কাচ্চো, ব্রিটেনের চসার ও ফ্রান্সের রাবল্যা) বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁদের রচনায়ও (যথাক্রমে দেকামেরন, দি ক্যান্টারবেরি টেলস এবং গারগাতুঁয়া ও পাঁতাগ্রুয়েল) ভারতীয় কাহিনির দূরবর্তী প্রভাব লক্ষণীয়। লেখকের মতে, দেকামেরন-এর অনেক গল্পের উৎস শুকসপ্ততি।
আলোকায়নের যুগ-পরবর্তী ইউরোপ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে-সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, অর্থাৎ ইউরোপই বাকি বিশ্বকে আলোকিত করেছে, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়-উদ্ঘাটিত তথ্য তার বিপরীত সত্য তুলে ধরছে। এদিক থেকেও এ খণ্ডটি গুরুত্বপূর্ণ।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র চতুর্বিংশ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে এর সংজ্ঞার্থ-নির্দেশক বিভিন্ন লেখক ও গবেষকের গুরুত্বপূর্ণ রচনা। লেখক-তালিকায় আছেন : আবুল ফজল, সরোজমোহন মিত্র, ভূদেব চৌধুরী, অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, রথীন্দ্রনাথ রায়, বীরেন্দ্র দত্ত, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও তপোধীর ভট্টাচার্য। এঁদের অধিকাংশই ছোটগল্পের ওপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেখানে ছোটগল্পের সংজ্ঞার্থ নির্দেশসহ ইউরোপ ও ভারতবর্ষে এর জন্ম-ইতিহাস বিবৃত করার পাশাপাশি বাংলা ছোটগল্পের বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে। এসব গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : ছোটগল্পের বিচিত্র কথা (সরোজমোহন মিত্র), বাংলাসাহিত্যের ছোটগল্প ও গল্পকার (ভূদেব চৌধুরী), কালের পুত্তলিকা (অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়), ছোটগল্পের কথা (রথীন্দ্রনাথ রায়), বাংলা ছোটগল্প : প্রসঙ্গ ও প্রকরণ (বীরেন্দ্র দত্ত) এবং ছোটগল্পের অন্তর্ভুবন (তপোধীর ভট্টাচার্য)।
আবুল ফজল বিষয়বস্তুর চেয়ে ছোটগল্পের আঙ্গিকের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এই যুক্তিতে যে, ছোটগল্পের ক্ষেত্রে গঠনবৈশিষ্ট্যের মূল্যই বেশি; কারণ, সেখানে রয়েছে কেবল প্রতীক, সংকেত, আভাস বা ইঙ্গিতেরই প্রাধান্য। সরোজমোহন মিত্রের মতে, ছোটগল্পের পরিসর যেহেতু স্বল্প সেহেতু বহু ক্রিয়ার স্থান সেখানে নেই, আছে একটি ক্রিয়ারই প্রাধান্য। ছোটগল্পে জীবনের খণ্ডমুহূর্ত বিধৃত হলেও তাতে উদ্ভাসিত হয় অসীম রহস্যের ইঙ্গিত। এই ইঙ্গিতধর্মিতা গল্পের পরিসমাপ্তিতেও পরিব্যাপ্ত। এছাড়া গল্পের অন্যতম আকর্ষণীয় শক্তি তার ভাষা, যেখানে প্রতিটি শব্দই সুপরিকল্পিত। ভূদেব চৌধুরী ছোটগল্পের জন্ম-ইতিহাস বিবৃত করতে গিয়ে প্রাচীন ভারতবর্ষ, মিশর ও ইউরোপে তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টির আলো ফেলেছেন। তিনি মনে করেন, ছোটগল্পের প্রথম শর্ত : তাকে গল্প হতে হবে; দ্বিতীয় শর্ত : আকৃতিতে ছোট হতে হবে। তিনি উপন্যাস, গীতিকবিতা ও নাটকের সঙ্গে ছোটগল্পের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছোটগল্পের সংজ্ঞাকে স্বচ্ছ করেছেন। অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় স্পষ্ট করে বলেছেন, সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে যে গল্প আমরা পাই, আধুনিক ছোটগল্প তা থেকে মূলে-স্থলে পৃথক। উনিশ শতকে উদ্ভূত ছোটগল্প মূলত আধুনিক জীবনজিজ্ঞাসার ফল। আধুনিক ছোটগল্পে রয়েছে একটিমাত্র রসমুহূর্ত, একমুখী ভাব, খণ্ড জীবনচিত্রের রূপায়ণ এবং যা এক বৈঠকেই উপভোগ্য।
রথীন্দ্রনাথ রায় কিন্তু প্রাচীন গল্পের সঙ্গে আধুনিক ছোটগল্পের যোগসূত্র সন্ধানে ব্রতী হয়ে জাতককাহিনী, পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ, আরব্যোপন্যাস, দেকামেরন, ক্যান্টারবেরি টেলস-এর পারস্পরিক সম্পর্ক আবিষ্কার করেছেন। তিনি গীতিকার সঙ্গেও ছোটগল্পের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছেন। তিনি ছোটগল্পের স্বর্ণযুগ হিসেবে উনিশ শতককে চিহ্নিত করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি রুশ-গল্পকেও তাঁর আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ছোটগল্পের স্বরূপধর্ম বিশ্লেষণে অগ্রসর হয়ে লেখক অ্যাডগার অ্যালেন পো, হাডসন, ম্যাথুজ, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের বক্তব্য উদ্ধারের পাশাপাশি বিভিন্ন গল্প ব্যবচ্ছেদ করেও একে স্বচ্ছ করে তুলেছেন। রথীন্দ্রনাথ রায় ছোটগল্পের রূপগত বৈচিত্র্যও ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বিষয় ও গঠনবিন্যাস উভয় দিক থেকে এর শ্রেণিগত বিভক্তিকে চিহ্নিত করেছেন। আধুনিক ছোটগল্পের উদ্ভবসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, উপন্যাসের জন্ম না-হলে ছোটগল্পের জন্মও ছিল অসম্ভব। অন্যদিকে ছোটগল্পের সমৃদ্ধির পেছনে সাময়িকপত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টিও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। বীরেন্দ্র দত্ত গভীর বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন আধুনিক ছোটগল্পের স্বরূপ, বিশ্বপরিসরে তার উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলাসাহিত্যে তার সৃষ্টি ও রূপান্তরের নানা দিক। লেখকের মতে, ছোটগল্পের বিষয়ে যে বৈচিত্র্য, তা সাহিত্যের অন্য কোনো শাখায় দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। তিনি রবীন্দ্র-ছোটগল্পের স্তর-পরম্পরা ও বিষয়বৈচিত্র্য মূল্যায়ন করেছেন।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখাটিতে বাংলা ছোটগল্পের অতিসাম্প্রতিক সংকট বিশ্লেষিত হয়েছে। তিনি লক্ষ করেছেন, উপন্যাসের চেয়ে ছোটগল্প রচিত হয় কম। সারাবিশ্বেই উন্নত উপন্যাসের তুলনায় ছোটগল্পের সৃষ্টি পরিমাণগতভাবে স্বল্প। উপন্যাসের তুলনায় ছোটগল্পের পাঠকও কম। তিনি ছোটগল্পের গঠনবৈশিষ্ট্যের মধ্যেই এই সংকটের কারণ অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর মতে, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের ক্রমবৃদ্ধির পটভূমিতে মানুষের জীবনকে একটিমাত্র সমস্যা দিয়ে চিহ্নিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ায় ছোটগল্প রচনার কাজটি জটিল হয়ে উঠেছে। তপোধীর ভট্টাচার্যও সাম্প্রতিক ছোটগল্পের সংকটকে অনুধাবন করতে চেয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিটি উত্তর-আধুনিক। তিনি বিশ্বরাজনীতি-অর্থনীতিতে যে সংকট ও সংস্কৃতিতে বিনোদনের যে আগ্রাসন চলছে তার পটভূমিতে দেখতে পাচ্ছেন, ছোটগল্প তার পুরোনো বা সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা মেনে চলতে ব্যর্থ হচ্ছে। সমকালীন পরিবর্তনসমূহ ছোটগল্পের টেক্সটে নানা বিকল্প বাস্তব বা নন্দনের জন্ম দিচ্ছে। ফলে ছোটগল্পের পরিসর, সময়চেতনা, আখ্যানগ্রন্থন-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন হয়ে উঠেছে অনিবার্য। এ খণ্ডে ছোটগল্পের সংজ্ঞার্থ ও ইতিহাস নিয়ে যেসব বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা সংকলিত হয়েছে তা পাঠকের জন্য ছোটগল্প সম্পর্কে একটি সামগ্রিক বোধ সৃষ্টির সহায়ক হবে বলে আশা করি।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র পঞ্চবিংশ খণ্ডে ছয়জন বিখ্যাত লেখকের মননশীল ও সৃজনশীল রচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন : অতুলচন্দ্র গুপ্ত, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অন্নদাশঙ্কর রায়, আবু সয়ীদ আইয়ুব এবং বিকাশ চক্রবর্তী।
বাঙালির চিন্তাচেতনার জগতে অতুলচন্দ্র গুপ্ত একটি বলিষ্ঠ ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। তাঁর রচিত কাব্যজিজ্ঞাসা গভীর পাণ্ডিত্য ও মননশীলতার পরিচয় বহন করে। গ্রন্থটি এ সংকলনে সংকলিত হয়েছে। এ গ্রন্থে ‘ধ্বনি’, ‘রস’, ‘কথা’, ‘ফল’, ‘সাহিত্য’--এই পাঁচটি শিরোনামে প্রাচীন আলঙ্কারিকদের কাব্য ও কাব্যের নন্দনতত্ত্ব-প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। মূলত মৌলিক চিন্তাসমৃদ্ধ এই গ্রন্থে রস প্রসঙ্গে আলঙ্কারিকদের অভিমত তুলে ধরেছেন লেখক।
ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতিকুমারের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী। এ সংকলনে তাঁর দুটি অভিভাষণ সংকলিত হয়েছে। একটি হচ্ছে ‘আসামের সমস্যা : বাঙ্গালা সাহিত্য’, অন্যটি ‘জাতীয় জীবন গঠনে সাহিত্যের স্থান’। ‘আসামের সমস্যা : বাঙ্গালা সাহিত্য’ অভিভাষণে তিনি আসামে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির পাশাপাশি অসমিয়াদের অবস্থান, তাদের সাহিত্য ও ভাষা প্রসঙ্গে সম্প্রীতিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। অন্য অভিভাষণটিতে সাহিত্যক্ষেত্রে মেদেনীপুরের স্থান প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসের যৌক্তিক আলোচনা করেছেন। সংক্ষিপ্ত এ রচনার মধ্যে তিনি তুলে ধরেছেন ইসলাম ধর্ম কেন ও কীভাবে বাঙালির জীবনস্রোতে মিশে গেছে। অভিভাষণ দুটি মৌলিক চিন্তাসমৃদ্ধ ও প্রাসঙ্গিক।
কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সৃষ্টিশীল প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন। এ সংকলনে তাঁর একটি প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘উক্তি ও উপলব্ধি’ প্রবন্ধটি মূলত বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্য মূল্যায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এ প্রবন্ধে তিনি বুদ্ধদেব বসু প্রসঙ্গে লেখেন : ‘বুদ্ধদেব বসুর মতো সাবলীল লেখক এদেশে বেশি জন্মায়নি।’ প্রবন্ধটি মৌলিক চিন্তাসমৃদ্ধ ও সৃজনশীল।
সব্যসাচী লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর মননশীল চিন্তা দিয়ে প্রবন্ধ-সাহিত্যে নিজস্ব অবস্থান করে নিয়েছেন। এ সংকলনে তাঁর ১৪টি প্রবন্ধ সংকলিত হল। সৃজনশীল ও মৌলিক চিন্তাসমৃদ্ধ এই প্রবন্ধগুলো আমাদের চিন্তনজগৎকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছে। তিনি ‘সাহিত্যিকের দৌড়’ প্রবন্ধে সাহিত্যিকের সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া ‘সাহিত্যের সৌন্দর্য’, ‘সাহিত্যিকের সঙ্কট’ প্রভৃতি প্রবন্ধে সাহিত্যের উপযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। অমিয় চক্রবর্তী, রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে তাঁর মৌলিক চিন্তা তুলে এনেছেন দুটি প্রবন্ধে। অন্নদাশঙ্করের পঠন-পাঠনের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা ও মননশীল চেতনাসমৃদ্ধ এইসব রচনা বাঙালির চিন্তার নিজস্ব পথরেখা।
বিশিষ্ট রবীন্দ্রানুরাগী ও গবেষক আবু সয়ীদ আইয়ুবের আধুনিক কবিতা প্রসঙ্গে বেশকিছু মূল্যবান প্রবন্ধ এ সংকলনে সংকলিত হয়েছে। ‘অমঙ্গলবোধ ও আধুনিক কবিতা’ প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন ফরাসি কাব্যে কীভাবে অমঙ্গলবোধ আধুনিকতার শৈলী হিসেবে উপস্থিত। ‘শ্রেয়োনীতি ও সাহিত্য নীতি’তে তিনি কান্ট, রবীন্দ্রনাথ, বোদলেয়ারের দার্শনিক, নৈতিক চিন্তার সঙ্গে তাঁর মৌলিক চিন্তার সংযোজন ঘটিয়েছেন। ‘কবিতা ও প্রেম’ প্রবন্ধে তিনি কবিতার নন্দনতাত্ত্বিক তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। সাহিত্যিকের সমাজচেতনা, কবিতার ভাষা, সাহিত্যিকের উপকরণমূল্য প্রভৃতি প্রসঙ্গ নিয়েও বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ এ সংকলনে সংকলিত হয়েছে, যা বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যামোদীদের চিন্তার খোরাক যোগাবে।
উল্লেখ্য, এ সংকলনে অতিরিক্ত সংযোজন হিসেবে বিশিষ্ট গবেষক বিকাশ চক্রবর্তীর একটি রচনা ‘আবু সয়ীদ আইয়ুব ও ট্র্যাজিক চেতনা’ সন্নিবেশিত হয়েছে, যা থেকে আবু সয়ীদ আইয়ুবের মনন প্রসঙ্গে পাঠক সাবলীল ধারণা পাবেন। রচনাটি আবু সয়ীদ আইয়ুবের গ্রন্থ ‘ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক’-এর পরিশিষ্ট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
এই ধরনের সংকলন বিষয়ের দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ করে তোলা খুব সহজ নয়। তাই লেখকদের মননশীল প্রয়াসের দিকে নজর রেখে বয়ঃক্রম অনুসারে তাঁদের রচনা বিন্যস্ত করা হয়েছে। পাঠকদের সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া ও সুচিন্তিত মতামত পেলে এ সংকলন প্রকাশের উদ্দেশ্য পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
বাঙালির প্রবন্ধ-সাহিত্য বিষয়বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। সামগ্রিক বাংলাসাহিত্যের ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে বাঙালির প্রবন্ধ-সাহিত্য হয়ে উঠেছে সৃজনশীল বৈচিত্র্যে ভরা মননশীলতার দলিল। বাঙালি জীবনের চিন্তাভাবনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, দার্শনিক উপলব্ধি, সৌন্দর্যচেতনা রূপায়িত হয়েছে প্রবন্ধের মাধ্যমে। সাহিত্যের বিভিন্ন দিক, সংস্কৃতি, জীবনী, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনি, রম্যরচনা, বিজ্ঞান, ইতিহাসচেতনা ইত্যাদি বিষয়াবলম্বনে প্রবন্ধ-সাহিত্যের সম্প্রসারণ ঘটেছে। এর মধ্যে সাহিত্য সম্পর্কিত প্রবন্ধ ও প্রবন্ধের গ্রন্থের সংখ্যাই অধিক।
বাঙালির প্রবন্ধ-সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য ও গুরুত্ব তার বিষয়বস্তু নির্বাচনে ও উপস্থাপনায়। বহু লেখক-মনীষীর অনুসন্ধানের ফলে প্রাচীন ও মধ্যযুগের অবহেলিত বিষয় আলোচনায় এসেছে; সেসব আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়বস্তুর নবপরিচয় উদ্ঘাটন সম্ভবপর হয়েছে এবং সেইসঙ্গে আধুনিক সাহিত্যের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন সম্ভব হচ্ছে। বাংলাসাহিত্যের অনুসন্ধান, উদ্ঘাটন ও মূল্যায়নে সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও আহমদ শরীফ সযত্ন প্রয়াস ও অনুসন্ধানী ভূমিকা রেখেছেন। ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র ষড়বিংশ খণ্ডে এই দুজনের এ বিষয়ক রচনা সংকলন করা হল।
চল্লিশ দশকের অন্যতম কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর মননশীল চিন্তার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রবন্ধ-সাহিত্যে। বাংলাসাহিত্যের সেকাল ও একাল গ্রন্থটিতে তিনি বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের আলোকে অত্যন্ত সৃজনশীল ধারায় উপস্থাপন করেছেন। মঙ্গলকাব্য, প্রাচীন মহাকাব্য, চৈতন্য-জীবনী, বাংলা গদ্যের অনুশীলন, নাটক ও নাট্যশালা, বাংলা উপন্যাস ও গল্প, কাব্য ও কবিতা ইত্যাদি প্রসঙ্গগুলো নিয়ে তিনি প্রচলিত তত্ত্ব, চিন্তা ও গবেষণার সঙ্গে তাঁর নিজস্ব ভাবনা প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপন করেছেন ওই গ্রন্থে। যেমন বাংলায় প্রাচীন মহাকাব্যের জন্মকথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি অনুভব করেছেন প্রায় হাজার বছর আগে বাংলায় গান বাঁধা হলেও, উঁচুসমাজে বাংলাভাষা আমল পায়নি। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে হিন্দুপণ্ডিতেরা ভালো চোখে দেখতেন না। পণ্ডিতদের ভাষা ছিল সংস্কৃত। সেসময় সংস্কৃতে না লিখলে জাতে ওঠা যেত না। কাজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে পণ্ডিতদের একটা বড় রকমের তফাত দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। সংস্কৃতে যেসব ভালো ভালো প্রাচীন সাহিত্য ছিল, বাংলাভাষায় তার প্রচারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বাংলাসাহিত্যে রুচি ও ভাবের উৎকর্ষ জন্মেনি। চর্যাগানের পর চারশো বছর ধরে বাংলাভাষায় যে সাহিত্য গড়ে উঠেছিল তার কোনো লিখিত দলিল নেই। সুভাষ মুখোপাধ্যায় মনে করেন মুখে মুখে তৈরি হয়ে হয়তো মুখে মুখেই তা হারিয়ে গেছে। সেই সময়টা ছিল রাষ্ট্রীয় ভাঙা-গড়ার যুগ। হিন্দু রাজাদের পরাহত করে বাংলাদেশে মুসলমান রাজাদের থিতিয়ে বসতে অনেক সময় লেগে গিয়েছিল। এই তোলপাড়ের ভেতর দিয়ে সমাজের উপরতলা আর নিচের তলার মধ্যে বাংলাভাষার সেতু বাঁধার দরকার পড়ে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতে সেই সেতু বাঁধার কাজে যিনি সকলের আগে এগিয়ে এলেন, তিনি হলেন বাংলার আদি মহাকবি কৃত্তিবাস। এ তো গেল তাঁর বাংলায় প্রাচীন মহাকাব্য জন্ম সম্পর্কে অভিমত। আবার বাংলাসাহিত্যে গদ্যের সূত্রপাত সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি এ গ্রন্থে জানান : ‘অন্যকে স্বমতে আনা, পথ দেখানো--এই প্রয়োজনবোধ থেকেই বাংলার গদ্যের সূত্রপাত হয়েছিল।’ মূলত হাজার বছরের বাংলাসাহিত্যের রূপ-রূপান্তর অনুসন্ধানে আকর এ গ্রন্থ প্রভূত সহায়ক। এ বিবেচনা নিয়েই এ দীর্ঘ রচনাটি সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্ঞান-মনীষা ও পাণ্ডিত্যের জগতে আহমদ শরীফ অন্যতম ব্যক্তিত্ব। উপাত্তে মধ্যযুগ, কিন্তু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্পূর্ণ আধুনিক--এই চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বের বেশকিছু রচনা ‘প্রবন্ধগুচ্ছ’ নামে এ খণ্ডে সংকলিত হল। এর মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন, নজরুল, বঙ্কিম প্রমুখের ওপর তাঁর নিজস্ব অভিমত ও দৃষ্টির মূল্যায়ন সম্বলিত প্রবন্ধসমূহ এবং তাঁর উপযোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মূল্যায়িত কবিতা ও সাহিত্যের স্বরূপ, সাহিত্যের রূপকল্প ও রসকল্পের বিবর্তনের ধারা, কথাসাহিত্য প্রসঙ্গ, বৈষ্ণব ও বাউল সাহিত্য-বিষয়ক কিছু প্রবন্ধ। এছাড়া তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ‘বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের খসড়াচিত্র’ সংকলিত হল। এ রচনায় তিনি বাংলাভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভব-বিকাশ, বাঙালির ধর্মীয় সাংস্কৃতিক চেতনা-ঐতিহ্য এবং বাংলাসাহিত্যের সৃষ্টি, পুষ্টি ও বৈচিত্র্যদানে মুসলমানদের অবদান সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এছাড়া তিনি এ রচনায় রাজকীয় প্রতিপোষণ অনুচ্ছেদে মন্তব্য করেন : ‘এ কথা না বললেও চলে যে মুসলিম সুলতান-সুবাদারের প্রতিপোষণেই প্রকৃতপক্ষে বাংলাভাষা ও সাহিত্য লেখ্যরূপ লাভ করে।’ প্রবন্ধকার এ রচনায় ‘মুসলিম রচিত বাংলাসাহিত্য’ নামে একটি পরিচ্ছেদ লিখেছেন, যেখানে তিনি বাঙালি মুসলমান রচিত উপাখ্যান, জীবনীসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়া দোভাষীরীতি, বাঙালির জীবন ও মননধারা আলোচনার মধ্য দিয়ে আহমদ শরীফ বাঙালি হিন্দুদের পাশাপাশি বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের বিশেষ সাধনা ও দান নিয়ে সার্বিক আলোকপাত করেছেন। এসব রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর মানবতাবাদী এবং সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের চিন্তামূলক রচনার এগুলো অন্যতম দলিল। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এগুলো সংকলন করা হয়েছে।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র সপ্তবিংশ খণ্ডে ছয়জন লেখকের বেশকিছু মননশীল প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। এর থেকে বাঙালির সমসাময়িক মনন-চিন্তার ধারণা পাওয়া যাবে। এই ছয়জন লেখক হচ্ছেন : আবদুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, যতীন সরকার, আনিসুজ্জামান, আহমদ ছফা এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ। প্রবন্ধগুলোতে সমকালীন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বহুবর্ণিল অবয়ব ধরা পড়েছে।
বাংলাদেশের মননশীল প্রবন্ধ-সাহিত্যে আবদুল হক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ থেকে ‘বেগম রোকেয়া’, ‘কাজী আবদুল ওদুদ’, ‘প্রত্যয়ের সাহিত্য’, ‘আধুনিক কবিতা’, ‘মূল্যায়নের মরীচিকা’, ‘সাহিত্য ও সরকার’, ‘সমাজ ও সাহিত্য’--এসব ভাবনা-উদ্দীপক প্রবন্ধ এই খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও প্রগতিবাদী লেখক আলাউদ্দিন আল আজাদ। তাঁর অন্যতম মননশীল গ্রন্থ শিল্পীর সাধনা। এ গ্রন্থের নাম-প্রবন্ধে তিনি শিল্পীর জীবন, সাধনা; তার দৃষ্টিভঙ্গি, শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং শিল্পবিচারের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
গ্রন্থটির ‘শিল্পীর সাধনা’, ‘আমপাতা জামপাতা আন্দোলন’, ‘উপন্যাসের উত্তরণ’, ‘রবীন্দ্র জিজ্ঞাসা’, ‘সাহিত্য ও অন্যান্য শিল্পকলা’, ‘সমকালীন উপন্যাসের কথা’ ও ‘সভ্যতার সংকট ও শিল্পী’ শীর্ষক ৭টি প্রবন্ধ গৃহীত হয়েছে বর্তমান খণ্ডে। প্রবন্ধগুলোতে সাহিত্যের নানা বিষয়ে লেখকের চিন্তা, মত ও দৃষ্টিভঙ্গি ধরা পড়েছে।
মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ববিদ যতীন সরকার তাঁর প্রবন্ধ-সাহিত্য দিয়ে বাংলাসাহিত্যে নিজস্ব অবস্থান করে নিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা। লেখক মার্কসীয় চিন্তার মননশীল প্রয়োগবাদী এই গ্রন্থে সামাজিক মনস্তত্ত্বের বস্তুবাদী চেতনা দিয়ে বাংলা কবিতার মূল্যায়ন এবং সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের প্রয়োগ প্রসঙ্গে তাঁর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। এ বই থেকে বেশকিছু প্রবন্ধ এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলোতে পাঠক বাঙালির সাহিত্যের মননচর্চায় মার্কসীয় প্রভাব সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবেন।
প্রথিতযশা শিক্ষক, লেখক ও গবেষক আনিসুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ স্বরূপের সন্ধানে। এ গ্রন্থে আনিসুজ্জামান ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে তখনকার পূর্ব-পাকিস্তানে যেসব বিতর্ক দেখা দিয়েছিল তার একটা সারসংকলনের চেষ্টা করেছেন। এছাড়া সৃষ্টিধর্মী সাহিত্যে রাষ্ট্রীয় ভাবনার যে প্রকাশ ঘটেছিল তার কিছু সূত্র উপস্থাপনের প্রয়াস পেয়েছেন। বাঙালি মুসলমানের আধুনিক সময়ের মননচর্চার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে জানতে হলে এ গ্রন্থের ‘স্বরূপের সন্ধানে’ প্রবন্ধটি অবশ্যপাঠ্য। এ বিষয় বিবেচনা করে সংকলনে প্রবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, প্রথাবিরোধী লেখক আহমদ ছফার তিনটি প্রবন্ধ এ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রবন্ধ তিনটি হচ্ছে : ‘বার্ট্রান্ড রাসেল’, ‘রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতি সাধনা’ ও ‘দস্তয়েভস্কি’। প্রবন্ধ তিনটিতে রাসেল, রবীন্দ্রনাথ ও দস্তয়েভস্কির রচনা সম্পর্কে আহমদ ছফার পঠন-পাঠন ও উপলব্ধিজাত মননশীল চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। প্রচলিত ধারার বাইরে তাঁর এই মূল্যায়ন তিনজন শিল্পীর সৃষ্টিশীল ধারার নতুন মাত্রা উন্মোচনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
সব্যসাচী ও সৃষ্টিশীল কোবিদ আবদুল মান্নান সৈয়দ। তাঁর রচিত জীবনানন্দ দাশ প্রসঙ্গে একটি অন্যতম গ্রন্থ শুদ্ধতম কবি। এই গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘জীবনানন্দ ও বাংলা কবিতা’। এখানে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশকে তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে দেখান : জীবনানন্দ রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধাচরণ করেননি, বরং তিনি আশ্চর্যভাবে ধরেছিলেন নতুন সময়-স্বভাবের গতিপথকে। কাব্যবিচ্যুত হয়ে রবি-কাব্যলোক থেকে সরে যেতে চাননি জীবনানন্দ, বরং গিয়েছিলেন কবিতার অন্তঃসারের ভিতর। এ প্রবন্ধে তিনি জীবনানন্দের ওপর মোহিতলাল ও নজরুলের প্রভাব বিষয়েও অনুসন্ধানী দৃষ্টি প্রসারিত করেছেন। জীবনানন্দ দাশকে বাংলা কবিতার প্রবহমান ধারার আলোকেই বিবেচনা করার প্রয়াসী হয়েছেন তিনি। জীবনানন্দের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবন্ধ তাই ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র এ খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। এছাড়া আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলনের নানা রচনায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ওয়ালীউল্লাহ, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ, অন্নদাশঙ্কর রায়, ধূর্জটিপ্রসাদ মুধোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখের রচনা নিয়ে তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছেন। ছোটগল্প, কবিতা-বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা উপস্থাপিত হয়েছে বেশকিছু প্রবন্ধে। সেখান থেকে বেশকিছু প্রবন্ধ এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে, যে প্রবন্ধগুলো দিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দের নান্দনিক মননচেতনাকে উপলব্ধি করা সহায়ক হবে।
শ্রেষ্ঠ বাঙালি লেখকেরা যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন এর অন্যতম সাহিত্য। বাঙালি চিন্তাবিদেরা ধারাবাহিকভাবে সাহিত্যবিষয়ক বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। লক্ষণীয় যে, এক্ষেত্রে শুধু কৃতী প্রাবন্ধিক ও গবেষকেরা ভূমিকা পালন করেননি, কবি ও কথাসাহিত্যিক হিসেবে যাঁরা খ্যাতিমান তাঁরাও সরব ভূমিকা পালন করেছেন। অর্থাৎ সৃজনশীল ও মননশীল উভয় ধারার লেখক সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁদের সৃজনশীলতা ও মনস্বিতার দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সাহিত্যবিষয়ক রচনাসম্ভার। বাঙালি ভাবুকদের সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা শুধু বাংলাসাহিত্যকে ঘিরে আবর্তিত হয়নি, বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কেও তাঁরা ভেবেছেন। বিশ্বসাহিত্য ও বাংলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের সম্পর্কে তাঁরা প্রাঞ্জল আলোচনা করেছেন। এসব বিশ্লেষণে বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের মূল্যায়ন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাহিত্যের বহুমাত্রিক গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনাও। ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র বর্তমান অষ্টাবিংশ ও পরবর্তী দুই খণ্ডে তৎকালীন পূর্ববাংলা অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশ নামে পরিচিত ভূখণ্ডের প্রাবন্ধিকদের উল্লেখযোগ্য রচনার অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে। সাহিত্যবিষয়ক আলোচনায় নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের লেখকেরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। পাশাপাশি পূর্ববাংলার লেখকেরাও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁদের রচনাবলি ব্যতীত বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ অপূর্ণ থেকে যেতে বাধ্য। চল্লিশের দশক থেকেই এ ভূখণ্ডের লেখকেরা সাহিত্যবিষয়ক আলোচনায় তাঁদের মননশীল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। পরবর্তী দশকগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত থেকেছে। এই লেখকদের সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ শুধু বাংলাদেশের সাহিত্যকে নয়, সমগ্র বাংলাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। জীবন ও সমাজের সাথে সংলগ্নতাই সাহিত্যের ধর্ম। অন্য কথায় জীবন বা সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে সাহিত্য রচনা সম্ভব নয়। আলোচ্য তিন খণ্ডের লেখকেরা স্বভাবতই সাহিত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অনুষঙ্গ উপস্থাপন করেছেন। সাহিত্যের দর্শন, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী মনোবিজ্ঞানের প্রভাব, কবিতার নানামাত্রিকতা, রেনেসাঁসের ভূমিকা, সাহিত্যের বাস্তব এমনকি সাহিত্যের আড্ডার মতো বিষয়ও এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে সাহিত্যসংক্রান্ত আলোচনায় ইতিহাস, দর্শন, সমাজতত্ত্ব, রাষ্ট্রচিন্তা ও মনস্তত্ত্বের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এভাবে বাঙালি লেখকদের সাহিত্যচিন্তা বৈচিত্র্যে ও বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বলতর হয়েছে। এমন বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ক্ষেত্রে লেখকদের মধ্যে সাদৃশ্যের পাশাপাশি বৈসাদৃশ্যও রয়েছে। সন্দেহ নেই, মতভিন্নতা বা বিতর্ক তাঁদের চিন্তাপ্রবাহকে আরও প্রাণবন্ত করেছে।
সাহিত্যস্রষ্টাবিষয়ক আলোচনায় স্বভাবতই প্রাধান্য পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যের এমন বিশ্লেষক খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব যিনি কখনও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু লেখেননি। নজরুল সম্পর্কেও আলোকপাত করেছেন কোনও কোনও প্রাবন্ধিক। এছাড়া আরও কয়েকজন খ্যাতিমান বাঙালি ও অবাঙালি সাহিত্যস্রষ্টা সম্পর্কে মূল্যায়ন রয়েছে কয়েকজনের রচনায়। এসব মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে এই সাহিত্যস্রষ্টাদের সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি তাঁদের কাল ও সমাজ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। বাংলা সৃজনশীল সাহিত্যের চেয়ে মননশীল সাহিত্য তুলনামূলকভাবে অনগ্রসর। ফলে সাহিত্যসমালোচনার কোনও বলিষ্ঠ ধারা আমাদের সাহিত্যে তৈরি হয়নি। ঊনবিংশ শতাব্দীর মহাপ্রতিভাবান সাহিত্যিকদের হাতে সাহিত্যসমালোচনার উদ্ভব হলেও ধীরে ধীরে এই ধারা ক্ষীণকায় হয়েছে। এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধাবলির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ শ্রেষ্ঠ সাহিত্যসমালোচনার উদাহরণ। এই সংকলনটি পাঠককে বাংলাসাহিত্যের মননশীল ধারা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। সৃজনই মননের উৎস ও মননেই সৃজনের সমৃদ্ধি। বাংলাসাহিত্যের আরও সমৃদ্ধির জন্য সৃজনশীল ধারার পাশাপাশি মননশীল ধারার সাহিত্য শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে এই সংকলন যদি অনুসন্ধিৎসু প্রাবন্ধিক ও গবেষকদের অনুপ্রাণিত করতে পারে তবে আমাদের শ্রম সার্থক হবে।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র ঊনত্রিংশ খণ্ডে বাংলাদেশের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় প্রাবন্ধিকের সাহিত্যবিষয়ক রচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন--যতীন সরকার, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর ও আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তাঁদের মননশীল সাহিত্যচর্চার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে সাহিত্যবিষয়ক নানা বিবেচনা। এই লেখকদের রচনার মধ্য দিয়ে তাঁদের সাহিত্যভাবনার স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। যতীন সরকার সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অগ্রণী চিন্তক। এই খণ্ডে তাঁর পাঁচটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। তিনি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী। তাঁর প্রবন্ধে এই জীবনদর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে। ‘বাঁধতে পারিনি কোনো সাঁকো’ প্রবন্ধে তিনি সাহিত্যিকের সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কবি শামসুর রাহমানের একটি কবিতা থেকে পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে এই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করেছেন যতীন সরকার। কবির সাথে জনগণের বিচ্ছিন্নতার জন্য তাদের কাব্যবোধের অভাব দায়ী নয়। কবিদের গণভাষা বিচ্যুতির জন্যই কবি ও জনতার মধ্যে সাঁকোহীন ব্যবধান রচিত হয়। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন : বাংলা কবিতা ওই একান্ত বাঞ্ছিত অবস্থানে কিছুতেই উন্নীত হতে পারবে না, যদি-না গণবিচ্ছিন্ন ও উৎপাদন-বিচ্ছিন্ন কবিকুল তাঁদের সত্তায় গণদর্শনকে ধারণ করতে পারেন। কবিতার মূল উপাদান যেমন শ্রমঘনিষ্ঠ মানুষ কবিতার আদি স্রষ্টাও তারাই। কিন্তু সামাজিক শ্রেণিবিভাজনের পর্যায়ে পর্যায়ে তারা যেমন শ্রমফল বঞ্চিত হয়েছে, তেমনি বঞ্চিত হয়েছে কবিতার রসসৃষ্টি ও রস উপভোগের অধিকার থেকেও। একালে পৃথিবীর এই অংশে সেই বঞ্চনা যেমন কদর্যতার চূড়া স্পর্শ করেছে, অপর অংশে তেমনি প্রত্যক্ষ করি সে বঞ্চনার চির অবসানে রক্তিম সূর্যোদয়। সে সূর্যের আলো পৃথিবীর অনালোকিত অংশেও দ্রুত ছড়িয়ে গিয়ে নতুন যুগকে প্রত্যাসন্ন করে তুলছে। সে আলোতে পথ চলছে যে জনতা, কবিতাকে তার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েই কবিকে বেঁচে থাকতে হবে। অন্য কোনও পথ নেই, অন্য কোনও কৌশল নেই। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলাদেশের অন্যতম কৃতী প্রাবন্ধিক। এই খণ্ডে তাঁর ছয়টি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সমাজতন্ত্রে আস্থাশীল সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাহিত্যচিন্তায় সাম্যবাদী জীবনদর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি সাহিত্যকে শ্রেণিবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী মনে করেন। সাহিত্য মানুষের বিবেক তথা সংবেদনশীলতাকে জাগ্রত রাখে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বা গণআন্দোলনে সাহিত্য কোনও জোরালো ভূমিকা পালন করেনি বলে তিনি আক্ষেপ করেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে : সাতচল্লিশের পরে আমাদের সাহিত্য ছিল কবিতাপ্রধান। আমাদের প্রধান কবিরা রাষ্ট্রের মহিমাকীর্তন করে অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। সে ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে কোনও গ্লানি দেখা যায়নি। ফরাসি কিংবা রুশ বিপ্লবের পিছনে যেমন সাহিত্যের একটা ভূমিকা ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পশ্চাৎভূমিতে তেমন কোনও সাহিত্যিক ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের ব্যাপারটিকে গভীর ও প্রবল করতে না পারাটা সাহিত্যের জন্য অবশ্যই একটা দুর্বলতা। সে দুর্বলতা সেদিন ছিল; আজও রয়েছে। এই খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর ও আবু হেনা মোস্তফা কামালের প্রবন্ধে কয়েকজন অসাধারণ বাঙালি সাহিত্যিক ও তাঁদের সাহিত্যকর্মের পরিচয় উদ্ঘাটিত হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, সংকলিত ষোলোটি প্রবন্ধ পাঠের মধ্য দিয়ে পাঠকরা বাঙালির সাহিত্যচিন্তা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা অর্জন করবেন।
‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র ত্রিংশ খণ্ডে বাংলাদেশের কয়েকজন বিশিষ্ট লেখকের রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মূলত কবি, কেউ সাহিত্যসমালোচক, কেউ প্রাবন্ধিক। সন্দেহ নেই, তাঁদের এই রচনাসমূহ আমাদের প্রবন্ধসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এই লেখকদের মধ্যে অন্যতম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এ খণ্ডে তাঁর বিভিন্ন বই থেকে পাঁচটি প্রবন্ধ গৃহীত হয়েছে। একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়, জনপ্রিয়তা শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়। এই ধারণা কতটুকু যৌক্তিক তা স্পষ্ট হয়ে যায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘লেখক ও জনপ্রিয় লেখক’ প্রবন্ধে। বাংলাদেশে সৃজনশীল বই প্রকাশনার জগৎ বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা হিসেবে স্বীকৃত। এই প্রকাশনা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে জনপ্রিয় লেখকদের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। এর বাইরে সাহিত্যের উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে জনপ্রিয় লেখকদের উল্লেখযোগ্য অবদান নেই--আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এমনই মনে করেন। রম্যতা ও বিনোদন-সক্ষমতা তাদের জনপ্রিয়তার উৎস। তাঁর পর্যবেক্ষণের সত্যতা প্রশ্নাতীত : একজন লেখক ‘জনপ্রিয়’ হন দুটো কারণে। এক. বড় লেখকদের মতো বোধের সমৃদ্ধজগৎ তাঁদের ভেতর থাকে না বলে (যার ফলে তাঁদের পক্ষে আপামর পাঠকের হৃদয়ে অনুভূত হওয়া সম্ভব হয় যা অন্যথায় সম্ভব হত না); দুই. তাঁদের মধ্যে অপরিণত ও সীমিতমাত্রার শিল্পক্ষমতা থাকলেও শিল্পের উচ্চতর সম্পন্নতা থাকে না বলে (এজন্যেই সাধারণ পাঠক তাদের আস্বাদ করতে পারে, তাঁদের ভেতরকার সামান্য শিল্পমাধুরী চেটেপুটে নিজেদের বিত্তহীন শিল্পপিপাসার স্বাদ মেটাতে পারে)। দুটো জায়গাতেই দেখা যাচ্ছে শৈল্পিক অক্ষমতা-ই তাদের ‘জনপ্রিয়’ হবার কারণ। কাজেই বলা যায়, লেখক হিসেবে ব্যর্থতার কারণেই--লক্ষ লক্ষ সাধারণ পাঠকের মনোরঞ্জনকারী হয়ে ওঠা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়।
হাসান আজিজুল হক বাংলাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী। এখানে তাঁর তিনটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মূলত গল্পকার হলেও তিনি বেশকিছু উজ্জ্বল প্রবন্ধ লিখেছেন। এসব প্রবন্ধের বড় অংশজুড়ে তাঁর সাহিত্যভাবনা বিস্তৃত। আমাদের কথাসাহিত্যের দুর্বলতা তিনি নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন কথাসাহিত্যিকের কাজ ভাঁড় হয়ে পাঠকের মনোরঞ্জন করা নয়, তার দায়িত্ব হওয়া উচিত শল্যচিকিৎসকের নিষ্ঠুর নিস্পৃহ ভূমিকা পালন করা : চাই বিনোদন ও আনন্দের সাহিত্য--এই জিগির প্রায়ই শোনা যায়। আমার ধারণা শিল্প বা সৌন্দর্যের প্রশ্নটিকে সুকৌশলে এই ধ্বনির সঙ্গে সচরাচর জুড়ে দেওয়াও হয়, যেন শিল্প বা সৌন্দর্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি বিষয়, যেন সাহিত্যের শিল্প ও সৌন্দর্য আনন্দ বিতরণেই নিঃশেষিত, তারা শুধু বাস্তবকেই ভুলিয়ে দেয়, আমাদের টেনে নিয়ে যায় স্বপ্নের কুহকে।...লেখক তখন হয়ে দাঁড়ান ভাঁড় বা ময়রা। ভাঁড় হয়ে সাহিত্যপাঠকের মনোরঞ্জন করা, না-হয় ময়রা হয়ে রসালো খাদ্যের জোগান দিয়ে যাওয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় থাকে না।...কথাসাহিত্যিকের কাজ তাই জাদুর কাঠি বুলিয়ে বাস্তবকে ভুলিয়ে দেওয়া হতে পারে না বরং তাঁর পালন করা উচিত শল্যচিকিৎসকের নিষ্ঠুর নিস্পৃহ ভূমিকা। সমকালীন জীবনের বাস্তবতার ছবি আঁকাই নয় শুধু, এমনকি সামগ্রিক ছবি দেওয়াও নয়, তাঁর কাজ সমকালীন জীবনকে আমূল কেটে কেটে বিশ্লেষণ করে দেখানো, সবকটি স্তর, সবরকম আঁশ, তার গভীরতম স্বরূপ, জীবনের সমস্ত তন্তু আলাদা করে ফেলা এবং একেবারে চোখের সামনে আনা।
বাংলাসাহিত্যের ভূগোলে তৎকালীন পূর্ববাংলা গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতত্ত্বে আক্রান্ত হয়েছিল। এই প্রবণতাকে হুমায়ূন আজাদ প্রতিক্রিয়াশীলতার বিষবৃক্ষ নামে অভিহিত করেছিলেন। দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে গঠিত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসক মুসলিম লীগের রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছিল এই সাহিত্যতত্ত্ব। এ সম্পর্কে এ খণ্ডে সন্নিবেশিত হুমায়ুন আজাদের ‘পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতত্ত্ব : প্রতিক্রিয়াশীলতার বিষবৃক্ষ’ প্রবন্ধে অভিমত...তাঁরা (পাকিস্তানবাদীরা)... ...ভাষাকে ক’রে তুলতে চেয়েছিলেন আরবি-ফারসি-উর্দুর মিশ্রণে অপরিস্রুত। তাঁদের তত্ত্ব অবলম্বন ক’রে বাঙলাদেশের সাহিত্যের মুক্তি ঘটা সম্ভব ছিলো না। তাই দেখা গেছে, পাকিস্তানবাদী লেখকেরা, বিশেষ ক’রে কবিরা--এঁরাই ছিলেন উগ্র--কবিতা থেকে দূরে স’রে গেছেন, বা কালাতিক্রমণদুষ্ট পদ্য তৈরি করেছেন। সমাজের প্রতি লেখকের কোনো দায় রয়েছে কিনা, শুধু শিল্পসৃষ্টি করাই লেখকের উদ্দেশ্য কিনা--এ সম্পর্কে সারা বিশ্বেই বিতর্ক হয়েছে। এ খণ্ডে গ্রথিত ‘শিল্পের খনন : লেখকের দায়’ প্রবন্ধে সেলিনা হোসেন এ বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তিনি মনে করেন, লেখকের মৌলিক দায়িত্ব নিজের প্রতি সৎ থেকে ভালো লেখা। বক্তব্য ও শিল্পের সমন্বয় সেই লেখাকে কালোত্তীর্ণ করে : লেখকের মৌল দায়িত্ব ভালো লেখা। নিজের প্রতি সৎ থেকে নিজের অনুভবকে শক্ত মেরুদণ্ড দেওয়া লেখকের কর্তব্য। তিনি যেন কখনো পরগাছা না হন, অন্যের ইচ্ছে-অনিচ্ছের দাসত্ব না করেন। জনপ্রিয়তা ভালো লেখকের বিবেচনার বিষয় নয়। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট লেখকের মানসিক আশ্রয়, মানবিক উচ্চারণ লেখকের প্রাথমিক শর্ত, দেশকাল তাঁর জীবনযাপনের অষ্টপ্রহর যন্ত্রণা। এতকিছুর পরও শর্ত ভালো লেখা--বিপ্লবী দায়িত্ব ভালো লেখা। যে লেখা বক্তব্যের সঙ্গে শিল্পের নির্মাণের এক মহাকালিক অগ্রযাত্রা।
এই খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য লেখক হচ্ছেন--শামসুজ্জামান খান, গোলাম মুরশিদ, আবুল কাসেম ফজলুল হক, সনৎকুমার সাহা, আবদুশ শাকুর ও কামাল চৌধুরী। তাঁরা প্রত্যেকেই মনস্বী চিন্তাবিদ। সংকলিত প্রবন্ধসমূহ পাঠের মধ্য দিয়ে পাঠকগণ বাঙালির সাহিত্যচিন্তা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা অর্জন করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর চৌদ্দজন এবং বিংশ শতাব্দীর নয়জন মোট তেইশ জনের তেত্রিশটি লেখা ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র একত্রিংশ খণ্ডের নাটক বিষয়ক সংকলনে গৃহীত হল। বাঙালির নাট্যচিন্তার ইতিহাস এক দীর্ঘ, বিবর্তনশীল এবং বৈচিত্র্যময় ধারায় গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন যুগের সাহিত্যিক, নাট্যকার এবং চিন্তকদের সৃজনশীলতায় এই ধারা সমৃদ্ধ। বাংলা নাটক ও থিয়েটারের বিভিন্ন দিক, তার ইতিহাস, বিবর্তন এবং প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে লেখকগণ আলোচনা করেছেন। তারা বাংলা নাটকের মৌলিক কাঠামো, অভিনয়ের গুরুত্ব এবং নাট্যশালার সংস্কৃতির বিশ্লেষণ করেছেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারভাবনা সমকালীন নাট্যকারদের ওপর বেশ প্রভাব ফেলে। মধুসূদন দত্তের নাট্যচিন্তা বাংলা নাটকে পিরামিড উচ্চতায় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নাটককে সৃষ্টিশীল শিল্প হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে অভিনয়শৈলী ও অন্তর্দ্বন্দ্ব একত্রে কাজ করে। তিনি সংস্কৃত নাটকের চিরন্তন ধারা থেকে সরে এসে ইউরোপীয় নাট্যশৈলী গ্রহণ করেন এবং একে বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে এক নতুন ধারা গড়ে তোলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নাটক লেখেননি। তবে নাটক সম্পর্কে এক ধরনের ভাবনা তার মধ্যে ছিল। অস্বাক্ষরিত এবং অসম্পূর্ণ নাটকের পাণ্ডুলিপির কয়েকটি পাতা সে সাক্ষ্য বহন করে। কথোপকথনমাত্রই যে নাটক নয় বঙ্কিম সে ধারণা পোষণ করতেন। দীনবন্ধু মিত্রকে তিনি শ্রেষ্ঠ নাটককার বললেও বাংলাদেশে প্রকৃত নাটককার নেই বলে মনে করতেন। পাশ্চাত্য ধারার নাটকের প্রতিও তার কোনও উচ্ছ্বাস ছিল না। টেম্পেষ্ট বা শকুন্তলাকে তিনি কাব্যনাট্য বা নাট্যকাব্য বলছেন না, বলছেন উপাখ্যানকাব্য। তিনি মনে করতেন নাটককারের লেখা সাহিত্যের পাঠ কতটা অভিনয়যোগ্য তার ওপর নির্ভর করে নাটকের চরিত্র। চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ রচনা কিংবা চরিত্রের তুলনামূলক আলোচনায় তার অন্তর্জগতে নাট্যভাবনা কাজ করে।
গিরিশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন একাধারে অভিনেতা, নাট্যকার, পরিচালক। সমকাল এবং উত্তরকালে বাংলা নাট্যচিন্তায় ছিল তার প্রবল প্রভাব। তার সময়কালকে গিরিশ যুগ বলে অবহিত করা হয়। গিরিশ ঘোষের পর থেকে মঞ্চের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষদের নানা লেখায় নাট্যচিন্তার প্রকাশ ঘটে। বিনোদিনী দাসী, অহীন্দ্র চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রমুখ স্মৃতিকথায় নাট্যস্মৃতির মধ্য দিয়ে নাট্যচিন্তা তুলে ধরেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নাটকগুলোর মধ্যে যে দেশ, কাল, সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের মৌলিক অনুভূতি তুলে ধরেন সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রবন্ধে প্রকাশিত। শিশিরকুমার ভাদুড়ী নাটককে এমন এক মাধ্যম হিসেবে দেখতে পছন্দ করতেন, যা মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
নাটকের সাহিত্যমূল্যের বাইরে রয়েছে এর কারিগরি দিক। সেট, আলো, আবহ যা শিল্পের আবেগমূল্য তৈরি করে। বাংলা নাট্যে আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন সতু সেন। তার ভাবনা সমকাল এবং উত্তরপ্রজন্মের আলোক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলেছে।
এছাড়া এই সংকলনভুক্ত অন্যান্য লেখক থিয়েটারের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছেন। এ সমস্ত চিন্তা ও বিশ্লেষণ বাংলা নাটকের ইতিহাসকে নানাদিক থেকে সমৃদ্ধ করেছে। নাট্যজ্ঞদের এই সৃজনশীল যাত্রা শুধু বিনোদনমূলক শিল্প নয় বরং এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মাধ্যম, যা সমাজের বিভিন্ন দিক, আবেগ ও বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। একই লেখকের প্রক্ষিপ্ত অনেক লেখা প্রলুব্ধ করলেও সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে হয়েছে।
আশা করা যায়, বাংলা নাটক ও থিয়েটারে উৎসাহী পাঠক ও দর্শক, গবেষক ও ছাত্রছাত্রী, সৌখিন ও পেশাদার নাট্যকর্মী সকলের কাছে এই সনিষ্ঠ সংকলন অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
মোট পনেরো জনের ত্রিশটি লেখা ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র দ্বাত্রিংশ খণ্ডের নাটক বিষয়ক সংকলনে গ্রহণ করা হয়েছে। সংকলনভুক্ত লেখকগণ ১৯১৫-২৫ এই দশ বছরের কালপরিধিতে জন্মগ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাদের কারও কারও কাজের ব্যাপ্তি বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেও সচল ছিল। লেখাগুলো নাটক ও থিয়েটারের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তৃত ও গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। নাট্যশিল্পের তত্ত্ব বিচার, সাহিত্য ও সামাজিক বাস্তবতা, শিল্পের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিনয়ের শিল্পগত গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি তুলে ধরে। যেখানে নাট্যশিল্পীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সমাজের অবস্থা, শিল্পের চাহিদা এবং মঞ্চের ভাষা—সবকিছু একত্রে নাট্যচিন্তার বিকাশ ঘটায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশবিভাগ ইত্যাদি এ-খণ্ডে গৃহীত লেখকগণের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতায় ছিল। যা কেবলমাত্র সাহিত্য বা শিল্পের অঙ্গ নয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচিত। এই রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতি তাদের অভিজ্ঞতায় যে প্রতিফলন দিয়েছে তা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে নাট্যচিন্তার বিকাশে প্রভাব ফেলেছে। মঞ্চের নানাদিক যেমন নির্দেশনা, অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, আলোর ব্যবহার, আবহ সংগীত ইত্যাদি শিল্পগত উপকরণ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে শম্ভু মিত্র এবং বাদল সরকার অভিনয়কলা এবং থিয়েটারের ভাষা নিয়ে কথা বলেছেন। খালেদ চৌধুরী এবং তাপস সেন মঞ্চসজ্জা এবং আলো বিষয়ে অভিজ্ঞান তুলে ধরেছেন। এছাড়া আবদুল হক, কবীর চেীধুরী, মোহাম্মদ জাকারিয়া এবং আসকার ইবনে শাইখের লেখা থেকে পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের নাট্যচর্চা ও নাটকের ধারা সম্পর্কে জানা যাবে। শোভা সেন এবং তৃপ্তি মিত্র স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে সেই নাট্য অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন যেখানে অভিনেত্রীদের ভিতরের লড়াই দগদগে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে মানুষের অন্তর্নিহিত সমস্যা ও অনুভূতি নাট্যশিল্পীরা কীভাবে শিল্পগতভাবে তুলে ধরেছেন সেই প্রয়োগকৌশলের কিছুটা আঁচ পাওয়া যাবে।
সংকলনভুক্ত অধিকাংশ লেখক ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে গ্রুপ থিয়েটার চর্চা তাদের হাত ধরেই শুরু হয়। গণনাট্য থেকে নবনাট্য-সৃজনশীলতার দিকগুলো একত্রিত হয়ে নাট্যচিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছে। পরিশীলিত নাট্যচিন্তার ফলে—শুদ্ধ অভিনয়, অভিনব মঞ্চভাষা এবং নাট্যশিল্পীদের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি নাট্যশিল্পকে শক্তিশালী করেছে।
এই সংকলন-খণ্ডে আলোচিত প্রসঙ্গগুলো শুধু ভারতীয় বা বাংলাদেশের নাট্যচিন্তার বিষয় নয়। থিয়েটার একটা আন্তর্জাতিক শিল্পমাধ্যম। সে হিসেবে অন্যান্য দেশের নাট্যচিন্তার বিস্তৃতি ও গভীরতা সম্পর্কেও একটা দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে। কথিত ভাষণ, বক্তৃতা, স্মৃতিচারণ, সাক্ষাৎকারসমূহ বাংলা থিয়েটারের একটা রেখাচিত্র তৈরি করে দেয়, যা থিয়েটারের ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে কাজে লাগতে পারে। গত শতাব্দীর বাংলা নাট্যচিন্তাসমূহ অনেক জিজ্ঞাসা এবং ভাবনার উদ্রেক করতে সক্ষম।
আশা করা যায়, বাংলা নাটক ও থিয়েটারে উৎসাহী পাঠক ও দর্শক, গবেষক ও ছাত্রছাত্রী, সৌখিন ও পেশাদার নাট্যকর্মী সকলের কাছে এই সনিষ্ঠ সংকলন অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
বিশ জনের একত্রিশটি লেখা ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র ত্রয়স্ত্রিংশ খণ্ডের নাটক বিষয়ক সংকলনে গ্রহণ করা হয়েছে। সংকলনভুক্ত লেখকগণ ১৯২৫-৩৬ এই এগারো বছর কালপরিধিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে তিনজন এখনও সক্রিয় কাজ করে চলেছেন। থিয়েটার একটি চলমান প্রক্রিয়া যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে, সাথে সাথে নাট্যচিন্তার পরিবর্তন ঘটছে এবং নতুন নতুন আঙ্গিকের উদ্ভাবন হচ্ছে। লেখাগুলো বর্তমান বাস্তবতা এবং সমাজের সাথে তার সম্পর্কের বিশদ আলোচনা করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক অখণ্ড রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে যায়। ফলে রাজনীতি-অর্থনীতির সাথে দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের পরিবর্তন আসে। সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব-প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তিত রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতি তাদের অভিজ্ঞতায় যে প্রতিফলন ফেলেছে তা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে নাট্যচিন্তায় প্রভাব ফেলে। সারা পৃথিবীব্যাপী বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে শিল্প-সাহিত্যের ভূমিকা পাল্টে যায়। এর ধারাবাহিকতায় পঞ্চাশের দশকের পর থেকে নাটকের ঐতিহ্য, আঙ্গিক, ধরন এবং বক্তব্য পাল্টে গিয়ে প্রাচীন রীতির জায়গায় নতুন ধরনের নাট্যকর্মের উত্থান ঘটে। রাজনৈতিক মতবাদ সমাজের বাস্তবতা ও জনগণের চাহিদা তুলে ধরে। নাটক সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। নাট্যকারদের দায়িত্ব হয়ে ওঠে সমাজের চলমান পরিস্থিতি, মানুষের সংগ্রাম, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়নের প্রতি মনোযোগ দেয়া।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর পূর্ববঙ্গের নাট্যকাররা রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার নতুন ধারা তৈরি করছিলেন। যা পরবর্তী বাংলাদেশের নাট্যকারদের জন্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে সেই সময়ের নাট্যকাররা মানসম্পন্ন এবং গভীর ভাবনার নাটকের অভাব বোধ করছিলেন যা তাদের নাট্যচিন্তায় প্রভাব ফেলে।
সমাজের বাস্তবতা ও জনগণের চাহিদা বিবেচনায় এসময় নাট্যচর্চায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটে। রাজনৈতিক নাট্যচিন্তা প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে ওঠে। মানুষের সংগ্রাম, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন নাট্যকারদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। মূকাভিনয়ও নাট্যচর্চার শক্তিশালী ভাষা হিসেবে প্রকাশ পায়। সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে নাট্যচিন্তা গুরুত্ব পায়।
আধুনিক নাটকে প্রযুক্তির প্রভাব উল্লেখযোগ্য। ষাটের দশকের গ্রুপ থিয়েটার পশ্চিমি নাট্যধারার কাঠামো এবং চরিত্রের গভীরতার মধ্যে বাংলা নাটকের প্রতিচ্ছায়া খুঁজেছে। আবার ঔপনিবেশিক লেজুড়বৃত্তি ছেড়ে থিয়েটারের ভাষা, নাট্যরীতি এবং অভিনয়শৈলীর সৃজনশীলতার জন্য নাট্যচিন্তা মৌলিক কাঠামো ভেঙে নতুন ধরনের নাটক সৃষ্টি এবং দর্শকের সংযোগ ও চেতনায় পরিবর্তনের কথা ভেবেছে। থিয়েটার ও রাজনীতি এবং শিল্পসৃষ্টি একটা মর্যাদার উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। পৃথিবীর থিয়েটারের ইতিহাস ঘেঁটে একটার পর একটা বিকল্প নাট্যধারা থেকে বাংলা নাটকের সম্ভাবনা এবং পথসন্ধান সংকলনভুক্ত রচনাসমূহে প্রকাশ পেয়েছে।
আশা করা যায়, বাংলা নাটক ও থিয়েটারে উৎসাহী পাঠক ও দর্শক, গবেষক ও ছাত্রছাত্রী, সৌখিন ও পেশাদার নাট্যকর্মী সকলের কাছে এই সনিষ্ঠ সংকলন অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
মোট বাইশ জনের ছাব্বিশটি লেখা ‘বাঙালির সাহিত্যচিন্তা’র চতুস্ত্রিংশ খণ্ডের নাটক বিষয়ক সংকলনে গ্রহণ করা হয়েছে। সংকলনভুক্ত লেখকগণ দ্বিখণ্ডিত ভারতবর্ষে বেড়ে উঠেছেন। সত্তরের দশকের পশ্চিমবঙ্গ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভিত্তি এদের হাতে গড়া। সংকলনভুক্ত পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের লেখক প্রায় আধাআধি। এদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশেরও কমসংখ্যক লেখক বর্তমানে সক্রিয় আছেন। বর্তমান ও আগামীর থিয়েটার, নাটক রচনা, নাটকের ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের দৃষ্টিকোণ, রাজনৈতিক ভূমিকা নানাবিধ বিষয়ের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে সমসাময়িক নাট্যচিন্তায়।
পাকিস্তানি শাসনের অধীনে পূর্ববঙ্গের সংস্কৃতি প্রগতি-বিপ্রগতির ধারায় বন্ধুর পথ অতিক্রম করছিল। নাট্যচর্চা এবং নাটকের ধারা এক উত্তরণের পথ খুঁজছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে এই নতুন ধারার সৃষ্টি হয়। অন্ধতা ও মুক্তবুদ্ধির লড়াইয়ে শাসন-শোষণ-পেষণ ও প্রতিবাদ উভয় বাংলার থিয়েটারে গুরুত্ব পায়। শিল্পমূল্যে অকিঞ্চিৎকর বিষয়ও প্রতিবাদ এবং চেতনায় প্রেরণা জোগায়। নাট্যচিন্তায় সংলাপ, আঙ্গিক, অনুভূতি, সংগ্রাম মানুষের মুক্তির জন্য সামাজিক আন্দোলনের সহায়ক হয়ে ওঠে।
দেশবিভাগ বা যথাযথভাবে বললে বাংলাভাগের পর পূর্ববঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক লড়াই প্রধানত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়। স্বকীয় সৃষ্টিশীল নাট্যনির্মাণের শক্ত ভূমিতে দাঁড়িয়ে মনোজ-অশোক-শমীকরা নাট্যচিন্তা করেন। আল মামুন-মামুনুর রশীদ-সেলিম আল দীনরা ঔপনিবেশিক প্রভাব, লোকনাট্যের ঐতিহ্য, সমাজবদল, জাতীয় নাট্যআঙ্গিক তথা নাট্যভাষার সন্ধানে পথ খোঁজেন। বাংলার বর্তমান থিয়েটারচর্চায় নাটকের আঙ্গিক ও ভাষার পরিবর্তনে নতুন চিন্তা এবং সৃজনশীলতা পশ্চিমা নাট্যচিন্তার প্রভাবে অনেক সময় শিকড়হীন হয়ে পড়ছে।
কিছু লেখায় নাটকের ভবিষ্যৎ রূপ সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। আর্থিক সংকট, পাঠক বা দর্শকের অভাব এবং কাজের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নাটককে শুধু বিনোদনের মাধ্যম না ভেবে শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন হিসেবে বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে কিছু লেখায়। সমাজের প্রতিক্রিয়া, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং মানুষের সংগ্রামকে সুরক্ষা ও প্রচারের জন্য নাটক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
শিল্পীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় পেশাদার শিল্পীর অভাব ঘটে। যার ফলে উন্নত নাট্যচর্চার অগ্রগতিতে বাধার সৃষ্টি হয়। ফলত অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম শিল্পের সমৃদ্ধির পথ রুদ্ধ করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে সীমিত এবং অভিজ্ঞতাহীন দর্শক নাটকের যথাযথ গ্রহণ এবং মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। নাট্যচিন্তার কয়েকটি লেখার মধ্য দিয়ে এই বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
খণ্ডভুক্ত লেখাগুলো নাটকের ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পথচলা, থিয়েটার এবং এশিয়ান নির্দেশকদের ভাবনা—রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতায় তুলে ধরেছে। যা থেকে স্পষ্ট হয় নাটক যেমন শিল্প অন্যদিকে সমাজের উন্নয়ন, মানুষের মুক্তি এবং সচেতনতার জন্য একটি হাতিয়ার।
আশা করা যায়, বাংলা নাটক ও থিয়েটারে উৎসাহী পাঠক ও দর্শক, গবেষক ও ছাত্রছাত্রী, সৌখিন ও পেশাদার নাট্যকর্মী সকলের কাছে এই সনিষ্ঠ সংকলন অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
