Arthoniti Chinta
Arthoniti Chinta

সম্পাদক পরিচিতি

শিল্পচিন্তার খন্ড সমূহ

ভ‚মিকা ‘বাঙালির শিল্পচিন্তা’র প্রথম খÐে তিনজন খ্যাতিমান লেখকের তিনটি গ্রন্থের অংশবিশেষ সংকলিত হয়েছে। এই তিনজনের প্রধান পরিচিতি বাংলাভাষায় ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে তাঁদের অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য, বস্তুতপক্ষে তাঁদেরকে বাংলাভাষায় বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস রচনার পথিকৃৎ অভিহিত করলেও অত্যুক্তি হবে না। শিল্পকলা তাঁদের বিবেচনার প্রধান দিক নয়, তবে বলা যেতে পারে যে বাঙালির শিল্পপ্রয়াস-বিষয়ে অনুসন্ধানী ও বিশদ আলোচনা আমরা প্রথম এঁদের রচনাতেই পাই। এঁদের সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত এখনো যে-কোনো গবেষকের গবেষণাকর্মের মূল্যবান উপাদান।

এঁদের মধ্যে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বয়োজ্যেষ্ঠ। তাঁর জন্ম ১৮৬১ সালে কুষ্টিয়ায় মাতুলালয়ে, যদিও পৈতৃক নিবাস রাজশাহী। মৃত্যু ১৯৩০ সালে। অক্ষয়কুমারকে আমরা বিশেষভাবে জানি তথাকথিত ‘অন্ধক‚পহত্যা’র অপবাদ দিয়ে ইংরেজ দখলদাররা নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে যে কলঙ্ক আরোপের চেষ্টা করেছিল, ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণের মাধ্যমে সেটিকে অসার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করবার জন্য (সিরাজদ্দৌলা, ১৮৯৮)। তাঁর আরো একটি পরিচিতি, রাজশাহীর ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ (১৯১০)-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। এই অনুসন্ধান সমিতির উদ্যোগে বরেন্দ্র অঞ্চলের যে বিশাল প্রতœ ও শিল্পসামগ্রী সংগৃহীত হয় তা ‘বরেন্দ্র জাদুঘর’ হিসেবে বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধশালী সংগ্রহশালা হিসেবে বিরাজমান। অক্ষয়কুমার আমৃত্যু এই সমিতির পরিচালক ছিলেন। রাজশাহী থেকে তিনি ঐতিহাসিক চিত্র (১৩০৫-১৩০৬ বঙ্গাব্দ) নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। সেটি সম্ভবত বাংলাভাষায় ইতিহাস-বিষয়ক প্রথম পত্রিকা।

শিল্পকলার প্রতি স্বভাবগত অনুরাগ ও অনুসন্ধিৎসা অক্ষয়কুমারকে চারু ও কারুশিল্প এবং শিল্পের নানান তাত্তি¡ক বিষয় সম্পর্কে লিখতে প্ররোচিত করে। বিশেষত প্রাচ্যদেশীয় শিল্পকলা-বিষয়ে পাশ্চাত্য পÐিতকুল ওই সময় যে তাচ্ছিল্যপূর্ণ অবমূল্যায়ন করতেন অক্ষয়কুমার তাঁর রচনার মাধ্যমে সে-সবের কড়া প্রতিবাদ জানান ও যুক্তিপূর্ণ মূল্যায়নে সে সব খÐন করেন। শিল্পকলা বিষয়ে তাঁর এসব ছোট ছোট নিবন্ধ পরবর্তীকালে ভারতশিল্পের কথা নামে গ্রন্থিত হয়, বর্তমান খÐে ওই গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত কয়েকটি নিবন্ধ সংকলিত হয়েছে। প্রতœ-উপাদান ও শিল্পনিদর্শন যে ইতিহাস নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, বলা যেতে পারে যে এ দেশে অক্ষয়কুমারই বিষয়টির প্রতি আগ্রহীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তবে এটি স্বাভাবিক যে, ওই সময়ের রীতিমাফিক অক্ষয়কুমারের দৃষ্টিভঙ্গিও ভারতশিল্পের প্রাচীন শাস্ত্র ও সূত্রসমূহ দিয়ে বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিল, শিল্পকে তিনি স্বাধীন নির্মাণ রূপে গণ্য না করে মূলত শাস্ত্রীয় বিধানের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তবে ভারতশিল্পে বহিরাগমনের প্রভাব, লৌকিক শিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন প্রভৃতি বিষয়ে তিনি যথেষ্ট অগ্রসর দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিচয় দিয়েছেন। দীনেশচন্দ্র সেনের প্রসিদ্ধি প্রধানত প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের সংগ্রাহক, প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সুশৃঙ্খল ও তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস রচনার পথিকৃৎ হিসেবে। এ বিষয়ে তাঁর শ্রম ও গবেষণার ফসল বিখ্যাত গ্রন্থ বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (১৮৯৬), যেটিকে বলা যায় বাংলা সাহিত্যের প্রথম যথার্থ ইতিহাসগ্রন্থ। তবে বিশেষ করে তাঁর সংগৃহীত মৈমনসিংহ গীতিকা (১৯২৩) ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা (১৯২৬) আগ্রহী মহলে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং তাঁকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি। দীনেশচন্দ্রের জন্ম ঢাকায় ১৮৬৬ সালে, মৃত্যু ১৯৩৯-এ, কলকাতায়। নিদারুণ দারিদ্র্য ও ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েও তিনি পূর্ববাংলার পল্লিতে পল্লিতে ঘুরে এসব গীতিকাব্য সংগ্রহ করেন।

দীনেশচন্দ্র সেনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান বৃহৎ বঙ্গ (১৯৩৫) নামে দুই খÐে সুবৃহৎ পরিসরে বঙ্গদেশের সকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে একটি আনুপূর্বিক ইতিহাস রচনা। বৃহৎ বঙ্গকে বলা যেতে পারে বাংলা অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক দর্পণ। বস্তুতপক্ষে নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালীর ইতিহাস (১৯৪৯) প্রকাশিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটিই ছিল বঙ্গ-ইতিহাসের আকরগ্রন্থ। এ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত শিল্পকলা-বিষয়ক আলোচনায় তৎকালে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে দীনেশচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য লক্ষণীয়। ভারতশিল্পের চারিত্রনির্মাণে দীনেশচন্দ্র আর্য ও বৈদেশিক প্রভাব অপেক্ষা ভারতের, বিশেষত বাংলা অঞ্চলের, আদিবাসী ও লৌকিক সমাজের শিল্পের প্রভাব ও অবদানের ওপর জোর দিতে চেয়েছেন। পুঁথি ও পল্লিগাথা সংগ্রহের জন্য পূর্ববাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিচরণের ফলে গ্রামজীবনের নানাবিধ চারু ও কারুশিল্প, ব্রত ও আচার, এমনকি গ্রামীণ কুঁড়েঘর নির্মাণশৈলী বা মিষ্টান্নপ্রস্তুত শিল্পও তাঁর নজর এড়ায়নি। এ সকলকেই তিনি উচ্চকোটির শিল্পের সমমর্যাদা দিয়েছেন। ফলে মৌর্য বা গুপ্তযুগের রাজসিক শিল্পের আলোচনার সঙ্গে একই কাতারে বাংলার গ্রামীণ মহিলার কাঁথাশিল্প, আলপনা বা কুমোরের মৃৎপাত্রকে তিনি স্থান দিতে কুণ্ঠিত হননি। এখানে সংকলিত দীনেশচন্দ্রের শিল্পকলা-বিষয়ক বিবিধ নিবন্ধ বৃহৎ বঙ্গ ১ম খÐ থেকে নেয়া হয়েছে।

বাংলার ইতিহাস-বিষয়ে যেটিকে অনায়াসে বলা যায় ক্ল্যাসিক গ্রন্থ সেই বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব) রচনার মাধ্যমে স্মরণীয় হয়ে আছেন ইতিহাসবিদ, শিল্প ও সাহিত্য সমালোচক নীহাররঞ্জন রায়। নীহাররঞ্জনের জন্ম বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জে, ১৯০৩ সালে। ১৯৮১ সালে তিনি কলকাতায় পরলোক গমন করেন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ভারতীয় রাজ্যসভার সম্মানিত সদস্য নীহাররঞ্জন রায় তাঁর জীবদ্দশায় বাংলার ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি এবং ভারতীয় শিল্পকলা-বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হন। বাংলা ও ইংরেজিতে অসংখ্য গ্রন্থের প্রণেতা নীহাররঞ্জনের সর্বাধিক সুখ্যাত গ্রন্থ বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব) প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। প্রাচীন বাংলার দৈনন্দিন জীবন (১৩৫৬ বাং) তাঁর আর একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব) গ্রন্থটিতে লেখক নীহাররঞ্জন রায় মুসলিম বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি পর্যালোচনা উপস্থিত করেছেন। যে কারণে গ্রন্থটি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে সেটি হল রচয়িতা কর্তৃক সকল নিদর্শন সরাসরি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অধ্যয়ন এবং সে-সবের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি, যুক্তি ও উদাহরণ প্রয়োগে নতুনতর মূল্যায়নের অবতারণা ও তার সপক্ষে তাঁর সারগর্ভ উপস্থাপন। বলা যেতে পারে, নীহাররঞ্জন রায়ের গ্রন্থটির মাধ্যমে বাঙালির প্রাচীন শিল্পকলা-বিষয়টি একটি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন, স্বচ্ছ ও মননশীল মূল্যায়ন লাভ করেছে। বর্তমান খÐে সংকলিত নিবন্ধগুলোতে বাংলার মৃৎশিল্প, তক্ষণশিল্প, নৃত্য ও গীত, রাগ ও তাল, নাট্যকলা, স্থাপত্যশিল্প প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ে নীহাররঞ্জনের গভীর পর্যবেক্ষণ লক্ষণীয়। যুগভেদে একই শিল্পধারার মধ্যেও যে প্রকৃতিগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তার লক্ষণগুলো তিনি চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশের ৮ম-৯ম শতাব্দীর পাহাড়পুর ও ময়নামতী বৌদ্ধবিহারের প্রস্তরমূর্তি ও মৃৎফলকগুলোতে লৌকিক শিল্পের প্রয়োগ ও প্রভাব বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আশা করা যায় উপরোক্ত তিনজন পথিকৃৎ ইতিহাসবিদের রচনার সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে পাঠক বাংলার চারু ও কারুশিল্প-বিষয়ে একটি সামগ্রিক ধারণা অর্জন করবেন। সেইসঙ্গে তিনজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদের বৈচিত্র্যপূর্ণ মতামতের আলোকে বাঙালির শিল্পদৃষ্টি-বিষয়ে আলোচনার সূচনাপর্ব কীভাবে পরিপুষ্টি লাভ করেছিল সেটিও অনুধাবন করবেন।

ভ‚মিকা  ‘বাঙালির শিল্পচিন্তা’র দ্বিতীয় খÐে চারজন লেখকের রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। এঁরা হলেন শ্রী অরবিন্দ, প্রবাসজীবন চৌধুরী, অন্নদাশঙ্কর রায় ও হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার। বলা যেতে পারে, এই খÐের চরিত্র মিশ্র প্রকৃতির। এখানে শ্রী অরবিন্দের মতো ঘোর জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির লেখক যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন প্রবাসজীবনের মতো একাডেমিশিয়ান এবং অন্নদাশঙ্করের মতো আধুনিক ও সমন্বয়বাদী চরিত্রের লেখক। সেই সাথে রয়েছে হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের মতো প্রবলভাবে পাশ্চাত্যপন্থী শিল্পীর রচনা।

বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী নেতা ও অধ্যাত্মসাধক অরবিন্দ ঘোষ শ্রী অরবিন্দ বা ঋষি অরবিন্দ হিসেবে সমধিক পরিচিত। তাঁর জন্ম কোলকাতায় ১৮৭২ সালে এবং মৃত্যু ১৯৫০ সালে। ক্ষুরধার মেধার অধিকারী অরবিন্দ ঘোষ অল্প বয়সেই শিক্ষালাভের জন্য ইংল্যান্ডে যান। ১৮৯০ সালে শীর্ষস্থান লাভ করে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৮৯২ সালে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রাইপস ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বরোদা ও কোলকাতায় কিছুকাল শিক্ষকতা করেন, পরে গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক ও কংগ্রেসের র‌্যাডিকাল গ্রæপের মুখপাত্র বন্দেমাতরম পত্রিকার সম্পাদকরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯০৮-এ ওই পত্রিকায় রাজদ্রোহমূলক রচনা প্রকাশের জন্য তিনি গ্রেফতার হন। মুক্তিলাভের পর শ্রী অরবিন্দ রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ সংশ্রব ত্যাগ করে ভারতের সনাতনধর্ম ও অধ্যাত্মবাদ প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এক পর্যায়ে তিনি পÐিচেরিতে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে সাধক জীবন গ্রহণ করেন।

শ্রী অরবিন্দ ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর কাছে ধর্ম ও জাতীয়তা ছিল সমার্থক। ভারতীয় শিল্পকলা-বিষয়ে তাঁর রচনাবলিতেও এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় রয়েছে। তাঁর শিল্পচিন্তা তীব্রভাবে অধ্যাত্মবাদী এবং ভারতীয় শিল্পকলা-বিষয়ে তৎকালীন ইউরোপীয় লেখকদের নেতিবাচক ও নিন্দাসূচক মূল্যায়নকে তিনি কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন। শ্রী অরবিন্দের দৃষ্টিতে ‘ভারতীয় শিল্পসৃষ্টি পূর্ণরূপে এবং সাক্ষাৎভাবে আধ্যাত্মিকতা এবং বোধিচেতনার উপর প্রতিষ্ঠিত’, ‘ভারতীয় মনের কাছে আত্মার সৃষ্টবস্তু হওয়া ছাড়া রূপের কোনো অস্তিত্বই নাই, রূপ তাহার সকল অর্থ সকল মূল্য চিদ্বস্তু হইতেই লাভ করে’। সংকলিত প্রবন্ধগুলো লেখকের ভারতীয় সংস্কৃতির ভিত্তি গ্রন্থ থেকে নেয়া।

প্রবাসজীবন চৌধুরী বাংলাভাষায় নন্দনতত্ত¡-বিষয়ে গ্রন্থ রচনায় অন্যতম পথিকৃৎ। পঞ্চাশের দশকে প্রকাশিত তাঁর সৌন্দর্যদর্শন বাংলাভাষায় রচিত এ বিষয়ে আদি গ্রন্থ এবং এর গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা এখনো সমান মূল্যবান। প্রবাসজীবন ১৯১৬ সালে পশ্চিম বঙ্গের হাওড়ায় জন্মগ্রহণ করেন ও ১৯৬১ সালে পরলোক গমন করেন। কৃতবিদ্য প্রবাসজীবন পদার্থবিদ্যা, ইংরেজি ও দর্শনশাস্ত্রে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন এবং জ্ঞানচর্চা ও লেখালেখির মাধ্যমে বিজ্ঞান ও দর্শনশাস্ত্রের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটাবার চেষ্টা করেন। দর্শন, বিজ্ঞান ও সৌন্দর্যতত্ত¡-বিষয়ে তিনি ইংরেজি ও বাংলায় বহু গ্রন্থের প্রণেতা। তাঁর প্রচুর রচনা দেশে-বিদেশে সুখ্যাত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

সৌন্দর্যদর্শন গ্রন্থে প্রবাসজীবন নন্দনতত্ত¡কে দর্শনশাস্ত্রের একটি অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করেছেন। প্রাচীনকাল থেকে দার্শনিক ভাবনার একটি অঙ্গ হিসেবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে সৌন্দর্যবিদ্যার যে-ধারাবাহিক তত্ত¡ ও শাস্ত্রসমূহ গড়ে উঠেছে তার উপস্থাপন ও উদাহরণ তাঁর গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। চিত্রশিল্প-বিষয়ে আলোচনায় তিনি ভারতীয় শিল্পশাস্ত্রের ‘ষড়ঙ্গ’ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন, এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ প্রমুখের শিল্পদর্শনও এতে আলোচিত হয়েছে। শিল্পের সত্যাসত্য, আনন্দানুভ‚তি, সুন্দরের সংজ্ঞা, শিল্পের সার্থকতা ইত্যাকার দার্শনিক প্রশ্নের ব্যাখ্যা ইতোপূর্বে বাংলাভাষায় এত প্রাঞ্জলভাবে অন্য কেউ পরিবেশন করেননি। বাংলাভাষায় লেখা নন্দনতত্ত¡-বিষয়ে একটি প্রয়োজনীয় গ্রন্থ হিসেবে এর গুরুত্ব এখনো অসীম।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের জন্ম উড়িষ্যায় ১৯০৪ সালে, মৃত্যু ২০০২-এ কোলকাতায়। বাংলাভাষার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রাবন্ধিক, ছড়াকার ও কথাসাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর আই.সি.এস. পরীক্ষায় প্রথমস্থান অধিকার করে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৫১ সালে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে সার্বক্ষণিক লেখকজীবন শুরু করেন। অন্নদাশঙ্কর ছিলেন মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী। সাহিত্যরচনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন তাঁর মতামতের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ। একজন বিবেকী কণ্ঠ হিসেবে তাই তিনি উভয় বাংলায় সমান সমাদৃত। অন্নদাশঙ্কর বিভিন্ন আঙ্গিকে বিপুল পরিমাণ সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। তবে বাংলাভাষায় শ্রেষ্ঠ ছড়াকার হিসেবে সম্ভবত তাঁর খ্যাতি সর্বাধিক। শিল্পের নান্দনিক স্বরূপ-বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁর রচিত বিক্ষিপ্ত ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে সংকলিত নিবন্ধগুলোতে। অন্নদাশঙ্করের শিল্পভাবনায় এক নিরন্তর অনুসন্ধিৎসু মনের পরিচয় পাই। নানা দিক থেকে আলোকপাত করে আর্ট বা শিল্পের প্রকৃত একটি চেহারা আবিষ্কার করার চেষ্টাতেই ‘আর্ট কী ও কী নয়’ নামে সংকলিত নিবন্ধসমূহ রচিত হয়েছে। আটপৌরে কথনরীতিতে লেখা তাঁর রচনা অনেকটাই অবনীন্দ্র-ঘরানার। অবনীন্দ্রনাথের মতো হালকা চালে শিল্পের রূপ, রস, অন্তঃসার, প্রাসঙ্গিকতা ইত্যাকার বিষয় অত্যন্ত সহজ কথায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন অন্নদাশঙ্কর। তাঁর কিছুটা ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে হয়তো সকলে সহমত হবেন না, কিন্তু তাঁর ভাষা ও বর্ণনারীতি যে-কোনো পাঠককে সহজেই মন্ত্রমুগ্ধ করতে পারে। শিল্পতত্তে¡র দুরূহ জগৎকে সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় রূপে পরিবেশনের কারণে এ রচনাগুলো পাঠকপ্রিয় হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও পাঠকের কাজে লাগবে বলে আশা করা যায়।  বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার চিত্রশিল্পী হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহে ১৩০১ বাংলা সনে, মৃত্যু ১৩৫০ বঙ্গাব্দে। কোলকাতা আর্ট স্কুলের প্রতিভাবান ছাত্র ছিলেন, তবে শিক্ষা সমাপ্ত না করেই স্কুল ত্যাগ করেন। ইউরোপীয় বাস্তবানুগ শৈলীতে সাদৃশ্যময় ও স্পর্শযোগ্য ধরনের চিত্ররচনায় হেমেন্দ্রনাথ অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। বিশেষ করে তিনি সিক্তবসনা রমণীর বাস্তবানুগ তৈলচিত্র অঙ্কন করে একাধারে বিপুল জনপ্রিয়তা ও সর্বভারতীয় স্বীকৃতি লাভ করেন। ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে তিনি পাঞ্জাবের পাতিয়ালা রাজ্যের রাজশিল্পীর পদে অধিষ্ঠিত হন। হেমেন্দ্রনাথ বিভিন্ন সময় চিত্রবিষয়ক সাময়িকী প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছেন। চিত্রকলা-বিষয়ে তাঁর ভাবনাসমূহ সংকলিত হয়েছে ১৯৯১ সালে আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত ছবির চশমা গ্রন্থে। এটি তাঁর লেখা একমাত্র গ্রন্থও বটে।

চারুশিল্প বিষয়ে শিল্পজ্ঞ পÐিতজনের রচনার সঙ্গে হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের ছবির চশমা গ্রন্থটির কিছু পার্থক্য রয়েছে। গ্রন্থটি একজন বিশিষ্ট ও সচেতন চিত্রশিল্পীর রচনা হওয়ায় এতে একদিকে যেমন শিল্পের ধরন ও কলাকৌশল-বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা রয়েছে, অন্যদিকে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে শিল্পীসুলভ স্পষ্টবাদিতা ও আবেগের প্রাবল্যও আছে। হেমেন্দ্রনাথ নিজে পাশ্চাত্যধারার শিল্পকৌশলে চিত্র রচনাকেই গ্রহণীয় বলে মনে করেছিলেন, তাই তাঁর লেখায় তিনি তথাকথিত প্রাচ্যবাদীদের তীব্রভাষায় আক্রমণ ও কটাক্ষ করেছেন। তাঁর ভাষা ও কথনভঙ্গির মধ্যে একধরনের সরস স্বাদুতা আছে যা তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সবসময় একমত না হয়েও উপভোগ করা যায়। তবে পাশ্চাত্যধারার শিল্পচর্চার পক্ষপাতী হলেও হেমেন্দ্রনাথ ভারতীয় ঐতিহ্যিক শিল্পের গুণাবলিকে যে একেবারে তাৎপর্যহীন মনে করেছেন তা নয়। শিল্প যে শুধুই বাস্তবের নকলনবিশি নয় তা-ও তিনি উপলব্ধি করতেন। তাঁর ভাষায় : ‘চারুশিল্পের উদ্দেশ্য\প্রকৃতির নকল করা নয়\তাহার আধ্যাত্মিক ভাবসৌন্দর্যের যথার্থ অভিব্যক্তি জগতের সমক্ষে বিকাশ করা...।’ অন্যদিকে আধুনিক ভারতীয় শিল্পীকে প্রাচীন ভারতশিল্পের অনুসরণে তথাকথিত ভারতীয় শিল্পরীতিতে ছবি আঁকতে হবে এ ধারণার তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। এ বিষয়ে তাঁর মন্তব্য যথার্থ বলে মনে হয় : ‘স্টাইল (র্ওহফণ) অর্থাৎ ঢঙ বা পদ্ধতি ব্যক্তিবিশেষের সামগ্রী\জাতির নহে।’ তবে হেমেন্দ্রনাথের বইয়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অংশ মনে হয় ‘চিত্রশিক্ষা’ অধ্যায়টি। এখানে তিনি চিত্ররচনার বিবিধ উপকরণ ও কৌশল বিস্তারিত এবং প্রাঞ্জলভাবে বর্ণনা করেছেন যা তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের মতো কৃৎদক্ষ ও খ্যাতিমান শিল্পীর কাছ থেকে এই ধরনের রচনা শিল্পশিক্ষার জগতে বিশেষ উপযোগী। 

বর্তমান খÐে সংকলিত রচনাসমূহের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গি ও বক্তব্যের পার্থক্য সত্তে¡ও এর কোনোটির গুরুত্বই কম নয়। এখানে শিল্পের দর্শন ও তত্ত¡, সৌন্দর্যতত্ত¡, শিল্পরুচি, শিল্পের শৈলী, সমকালে এর প্রাসঙ্গিকতা প্রভৃতি বিবিধ প্রসঙ্গের আলোচনা স্থান পাওয়ায় তা সামগ্রিকভাবে শিল্পের নানা দিকের মিশ্রণে বৈচিত্র্যের মধ্যে একটি ঐকতান নির্মাণ করবে বলে আশা করা যেতে পারে।


ভ‚মিকা  ‘বাঙালির শিল্পচিন্তা’র তৃতীয় খÐে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুবিখ্যাত বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী সম্পূর্ণ গৃহীত হয়েছে। শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচয় নিষ্প্রয়োজন। তিনি শুধু ভারতীয় শিল্প ও নন্দনতত্তে¡র পথিকৃৎ শিক্ষক ও ব্যাখ্যাতা-ই নন, আধুনিক ভারতের নব্য-শিল্পধারার অগ্রপথিক আর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন সেরা কথাশিল্পী। রবীন্দ্রনাথের পর ঠাকুর পরিবারের সবচেয়ে খ্যাতিমান সদস্য অবনীন্দ্রনাথ ১৮৭১ সালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন ও ১৯৫১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। অবনীন্দ্রনাথকে বিশেষভাবে নব্যবঙ্গীয় ঘরানার শিল্পরীতির উদ্ভাবক ও প্রধান শিল্পী হিসেবে স্মরণ করা হয়। কোলকাতা আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ ই. বি. হ্যাভেলের আহŸানে অবনীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে ওই স্কুলের সহ-অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। তিনি হ্যাভেলের অনুপ্রেরণায় ইউরোপীয় শিল্পরীতির চর্চা পরিত্যাগ করে ঐতিহ্যিক ভারতশিল্পের পুনর্জাগরণ তত্তে¡র অনুগামী হয়ে নব্যবঙ্গীয় শিল্পরীতির জন্ম দেন, পরবর্তীকালে যা ‘বেঙ্গল স্কুল’ নামে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। 

বাংলাভাষায় অবনীন্দ্রনাথের লেখার পরিমাণ কম নয়। প্রথমদিকে সংস্কৃতঘেঁষা প্রচলিত গদ্যে লিখলেও অচিরেই তিনি নিজস্ব একটি গদ্যশৈলীতে লিখতে শুরু করেন, যেটি ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে আশ্চর্যজনকভাবে আধুনিক। একেবারে আটপৌরে কথনরীতি ও সাধারণ জীবনের দৈনন্দিন চিত্রকল্পের ব্যবহারে তিনি গড়ে তোলেন এক ভিন্ন ঘরানার সাহিত্য। অবনীন্দ্রনাথের নানান স্বাদের রচনার উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে শিশু ও কিশোরসাহিত্য, উদ্ভটরসের যাত্রাপালা ও স্মৃতিকথা। শিল্প-সংশ্লিষ্ট-বিষয়েও তাঁর রচনার পরিমাণ কম নয়। এ বিষয়ে অবনীন্দ্রনাথের সবচেয়ে সুবিখ্যাত গ্রন্থ বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী। এটি আসলে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাণী বাগেশ্বরী অধ্যাপক’ হিসেবে ১৯২১ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত অবনীন্দ্রনাথের দেয়া বক্তৃতাসমূহের লিখিত রূপ। ১৯৪১ সালে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর কালে কালে বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী সৌন্দর্যতত্ত¡ বিষয়ে বাংলাভাষায় রচিত ক্ল্যাসিক গ্রন্থের মর্যাদা পেয়েছে। এ খÐে সংকলিত এর ২৯টি প্রবন্ধের প্রতিটির সূচনায় সারসংক্ষেপ উপস্থাপিত হয়েছে। সে কারণে ভ‚মিকাংশে গ্রন্থটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।

তবে বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলীর গুরুত্ব শুধু এর বিষয় ও বক্তব্যের কারণে নয়, এর ঘরোয়া ও আটপৌরে কথনরীতির সম্মোহনী শক্তির কারণেও বটে। অবনীন্দ্রনাথের স্বতন্ত্র গদ্যশৈলীর যে জাদুকরি আকর্ষণ রয়েছে তার একটি শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ আমরা দেখতে পাই বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলীতে। শিল্পের রূপ, রস ও তাৎপর্য বিষয়ে এ ধরনের সহজ ও সরস নিবন্ধ-সম্ভার বাংলাভাষা কেন বিশ্বের অন্য কোনো ভাষায় রচিত হয়েছে কিনা সন্দেহ। এ অমূল্য গ্রন্থ শিল্পপ্রেমিক প্রতিটি বাঙালির অবশ্যপাঠ্য। 

শিল্পকলা-বিষয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বাপেক্ষা পরিচিত বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী গ্রন্থটি ‘বাঙালির শিল্পচিন্তা’র তৃতীয় খÐে স্থান পেয়েছে। বাগেশ্বরী বক্তৃতা ছাড়াও অবনীন্দ্রনাথ শিল্পকলার নানান দিক নিয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর এ ধরনের তিনটি বই\ভারতশিল্পে মূর্তি, ভারতশিল্পের ষড়ঙ্গ ও শিল্পায়ন বর্তমান চতুর্থ খÐে সংকলিত হলো। অবনীন্দ্রনাথ যে কেবল শিল্পের নান্দনিক উপভোগ নিয়ে ভেবেছেন, যেমনটি আমরা দেখতে পাই বাগেশ্বরী প্রবন্ধাবলীতে, তা নয়, তিনি প্রাচীন ভারতীয় শিল্পবোধ, সৌন্দর্যজ্ঞান ও নির্মাণরীতি বিষয়ে লিখে সর্বসাধারণের মধ্যে তা প্রচার করার কথাও চিন্তা করেছেন। শিল্পবিচারে ভারতশিল্পের ষড়ঙ্গ-এর গুরুত্ব এবং ভারতীয় মূর্তিনির্মাণ কৌশল-বিষয়ে সম্ভবত বাংলাভাষায় তিনিই প্রথম নিবন্ধ রচনা করে এ বিষয়ে ভারতবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যদিও অবনীন্দ্রনাথ নিজে শিল্পের শাস্ত্রবদ্ধ নিয়মনীতি মেনে শিল্পনির্মাণ করেননি, তথাপি প্রাচীন শিল্পশাস্ত্রসমূহের অধ্যয়ন ও অনুধাবনকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। ভারতশিল্পে মূর্তি গ্রন্থে অবনীন্দ্রনাথের এ অনুসন্ধিৎসার প্রতিফলন রয়েছে। এখানে প্রাচীন শিল্পশাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী মূর্তি নির্মাণের প্রকরণ সবিস্তার এবং চিত্র-সহযোগে বিশ্লেষণ করা হয়েছে; শিল্পের রূপ ও রস বিষয়েও প্রাচীন ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণিত হয়েছে এবং সংস্কৃত সাহিত্য থেকে উদাহরণ প্রদানের মাধ্যমে তাকে প্রাঞ্জল করে তোলা হয়েছে।

ভারতশিল্পের ষড়ঙ্গ বা ছয়টি অঙ্গ বিষয়ে আজ আমরা মোটামুটি সকলেই অবহিত। বস্তুতপক্ষে অবনীন্দ্রনাথের ভারতশিল্পের ষড়ঙ্গ গ্রন্থটির মাধ্যমেই এই বিষয়টি সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছেছে। এখানেও অত্যন্ত সহজ ও উপভোগ্য ভাষায় অবনীন্দ্রনাথ ষড়ঙ্গের মর্মার্থ ব্যাখ্যা করেছেন। ভারতীয় ষড়ঙ্গের সাথে চীন ও জাপানের শিল্পচিন্তার সাদৃশ্য ও পার্থক্য আলোচনার ফলে রচনাটি আরো গুরুত্ববহ হয়েছে।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পায়ন গ্রন্থটি মূলত বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলীরই নির্বাচিত, সংক্ষেপিত ও পুনর্লিখিত রূপ। যেহেতু বাগেশ্বরী প্রবন্ধাবলী মুখের কথার ঢঙে রচিত তাই সেখানে মাঝে মাঝেই পুনরাবৃত্তি ও অতিকথন রয়ে গেছে। বইটি একসঙ্গে পড়তে গেলে ধৈর্যচ্যুতি ঘটবার আশঙক্ষা থাকে। অবনীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, ‘যাত্রীতে যাত্রীতে পথ চলতে-চলতে কথার মতো করে গাঁথা হয়েছিল এই সমস্ত প্রবন্ধ... যেমন খুশি, যা খুশি বলে যাওয়া চলে সহযাত্রীদের মধ্যে বলেই যে সেগুলো সেইভাবেই পাঠকদের সামনে বই ছাপিয়ে প্রকাশ করতে হবে তার কোনো কারণ দেখিনে’।

বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী থেকে বেছে এবং কাটছাঁট করে শিল্পায়ন সংকলনের কাজ অবনীন্দ্রনাথ নিজেই শুরু করেছিলেন, তবে এটি প্রকাশিত হয়েছে অবনীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর, ১৯৫৪ সালে। বলা যেতে পারে যে অবনীন্দ্রনাথের শিল্পচিন্তার একটি সংহত ও মেদহীন কিন্তু সার্বিক পরিচয় শিল্পায়নের প্রবন্ধগুলোর মধ্যে পাওয়া যাবে। পূর্ববর্তী এবং বর্তমান খÐের সমন্বয়ে শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পচিন্তার পরিপূর্ণ রূপ পাঠকের সামনে প্রতিভাত হবে এটি আশা করা যেতে পারে।


‘বাঙালির শিল্পচিন্তা’র পঞ্চম খÐে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ লোকশিল্প-বিষয়ে তিনটি গ্রন্থ এবং একটি গ্রন্থের অংশবিশেষ। চারুকলা-বিষয়ে তাত্তি¡ক আলোচনার দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও গ্রামীণ লোকশিল্পীর স্বভাবশিল্পকে উচ্চকোটির শিল্পের সমান মর্যাদা দেয়া হয়নি বহুকাল। বস্তুতপক্ষে ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষপাদে লোকশিল্পের নান্দনিক মূল্য সম্পর্কে সচেতনতা দেখা দিতে শুরু করে এবং এই শিল্পের নিদর্শনসমূহ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রয়াস সূচিত হয়। বঙ্গদেশেও ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইউরোপীয় শিল্পের প্রতি মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্যের কারণে দেশীয় লোকশিল্পের বিশেষ সমাদর ছিল না। অবশ্য স্বল্প হলেও কিছু ব্যতিক্রম ছিল। কোনো কোনো রুচিশীল ভারতীয় পরিবারে লোকশিল্পের কদর ছিল, কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবেও এগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। লোকশিল্পের অগ্রণী সমঝদারদের অন্যতম ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। ঠাকুর পরিবারের সদস্যরাই, বিশেষত অবনীন্দ্রনাথ ভ্রাতৃত্রয়, সর্বপ্রথম বাংলার লোকশিল্পের নিদর্শন সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে কলাভবন প্রতিষ্ঠা করলে সেখানে লোকশিল্পের একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে গুরুসদয় দত্ত, অজিত ঘোষ ও আরো কেউ কেউ বাংলার লোকশিল্পকলার সংগ্রহ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ইতোমধ্যে বাংলার লোকশিল্প-বিষয়ে গবেষণামূলক বইও যথেষ্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে, যদিও এ ক্ষেত্রে ইংরেজি গ্রন্থের সংখ্যাই অধিক। নীহাররঞ্জন রায়, অর্ধেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, গুরুসদয় দত্ত, অজিত ঘোষ প্রমুখ এ বিষয়ে পথিকৃতের ভ‚মিকা পালন করেছেন। বর্তমান খÐে অবশ্য কিছুটা সাম্প্রতিক চারজন গবেষক-লেখকের রচনা সংকলিত হয়েছে। এরই ফলে সংকলনটিতে লোকশিল্পের চারিত্রলক্ষণ ও প্রেক্ষাপট-বিষয়ে একেবারে হাল-আমলের চিন্তনজগতের সঙ্গে আমরা পরিচিত হতে পারি। 

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর বাংলাদেশের অন্যতম সৃজনশীল লেখক, সমাজ-গবেষক ও শিল্পসমালোচক। তাঁর বাংলাদেশের লোকশিল্প গ্রন্থটি এখানে সংকলিত হয়েছে। একজন সমাজবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে শিল্পের আঙ্গিককে উপলব্ধি ও যাচাই করার প্রয়াস বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের শিল্পবিশ্লেষণকে দিয়েছে এক ভিন্নতর মাত্রা। লোকশিল্পের সামাজিক প্রেক্ষাপটের বিস্তৃততর ব্যাখ্যা তাঁর রচনায় পাওয়া যায়, যেন মসজিদ বা দোচালা বাড়ির বিন্যাসের এক অভিনব সামাজিক-লৌকিক বিশ্লেষণ। বাংলাদেশের খ্যাতিমান লোকসংস্কৃতি-গবেষক ও সংগ্রাহক তোফায়েল আহমদের লোকশিল্প গ্রন্থটি এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত। এ দেশের লোকশিল্প জগতের সঙ্গে গভীর ও সরাসরিভাবে দীর্ঘকাল সম্পৃক্ত থাকার ফলে আমাদের লোকশিল্পকলার চারিত্রিক বিশিষ্টতা, সামাজিক উপযোগিতা ও প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে তোফায়েল আহমদের পর্যবেক্ষণ বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। তদুপরি, এ বিষয়ে তাঁর বিস্তৃত পাঠ ও নিরলস গবেষণা তাঁকে বাংলাদেশের লোকশিল্প-বিষয়ে অন্যতম বিশেষজ্ঞের মর্যাদা দিয়েছে। তাঁর রচনায় বাংলাদেশ ও বিশ্বের আরো কিছু দেশের লোকশিল্পের গুণাগুণ চমৎকারভাবে বিবৃত হয়েছে। লোকশিল্প-গবেষক পল্লব সেনগুপ্তের আলোচনা তোফায়েল আহমদের তুলনায় অনেক বেশি তাত্তি¡ক ও একাডেমিক। তাঁর লোকসংস্কৃতির সীমানা ও স্বরূপ গ্রন্থে লোকসংস্কৃতির সংজ্ঞা, উৎস, চারিত্র ইত্যাদি বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। এই সংকলনে লোকসংস্কৃতির সীমানা ও স্বরূপ গ্রন্থ থেকে অষ্টম ও নবম অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পল্লব সেনগুপ্তের রচনায় মুখোশ, আলপনা, নকশি কাঁথা, পুতুল ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত রয়েছে। বিশেষ করে মুখোশ ও পুতুল বিষয়ে তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণ নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়।

মৃৎশিল্পকে বলা যেতে পারে বাংলার শিল্প-ইতিহাসের প্রাণ বা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই মৃৎশিল্প অতীতের সাথে আমাদের বর্তমানের সংযোগের সবচেয়ে বড় সাক্ষী যেমন, তেমনি আমাদের লোকশিল্প-জগতের সবচেয়ে সম্পদশালী শাখাও। মোহাম্মদ শাহজালাল বাংলাদেশের মৃৎশিল্প-বিষয়ে গবেষণায় রত রয়েছেন; তাঁর পর্যবেক্ষণ বিধৃত হয়েছে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বাংলাদেশের মৃৎশিল্প গ্রন্থে।  গ্রন্থটিতে মৃৎশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত যাবতীয় বিষয় আলোচিত হয়েছে, ফলে এই মাধ্যমের শিক্ষার্থী ও চর্চাকারী উভয়ের জন্য এটি বিশেষ উপযোগী। মোহাম্মদ শাহজালাল এই পুস্তকের পরিসরে মৃৎশিল্পের শ্রেণিবিন্যাস, আরদেনঅয়ার-স্টোনঅয়ার-পোর্সেলিন-সেরামিকস প্রভৃতির ভিন্নতা ও চারিত্র, মৃৎশিল্পের ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা, নির্মাণপদ্ধতি ইত্যাদি আলোচনা করেছেন। মাটিতে তৈরি পাত্র-পুতুল-খেলনা-ভাস্কর্য-উপাসনার বস্তু কিছুই এতে উপেক্ষিত হয়নি, ফলে মৃৎশিল্পের একটি সার্বিক পরিচয় এতে পাওয়া যায়। আশা করা যায় এ খÐে সংকলিত চারজন লেখকের রচনাসমূহে পাঠক বাংলাদেশের লোকশিল্প-বিষয়ে একটি সমসাময়িক ও সমন্বিত ধারণা লাভ করতে সমর্থ হবেন।

ভ‚মিকা  ‘বাঙালির শিল্পচিন্তা’র ষষ্ঠ খÐটি দু’টি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের সংকলন। দু’টি গ্রন্থই উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা হিসেবে চিহ্নিত ও বহুলভাবে পঠিত। লেখকদ্বয়\তোফায়েল আহমদ ও মণীন্দ্রভ‚ষণ গুপ্ত\শিল্পকলার জগতে কৃতবিদ্য ও সবিশেষ পরিচিত। 

তোফায়েল আহমদ বাংলাদেশের লোকশিল্প ও কারুকলার অন্যতম সংগ্রাহক ও গবেষক। এই লেখকের অন্য একটি গ্রন্থ লোকশিল্প ‘বাঙালির শিল্পচিন্তা’র পঞ্চম খÐে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমান খÐে গৃহীত হয়েছে তাঁর আমাদের প্রাচীন শিল্প। বাংলাদেশের জানা ও অজানা, সপ্রাণ ও বিলুপ্ত, নানাবিধ কারুশিল্প বিষয়ে অনবদ্য এই গ্রন্থ ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। বলা যেতে পারে, বিশ্বের এই অঞ্চলের সুদক্ষ কারিগররা অতি প্রাচীনকাল থেকে বিবিধ ব্যবহার্য দ্রব্য তৈরিতে যে উৎকৃষ্ট নির্মাণশৈলী ও সংবেদনশীল নান্দনিক গুণের সমন্বয় ঘটিয়ে আসছিলেন তার এত বিশদ ও যুক্তিপূর্ণ বয়ান এখনো দ্বিতীয়টি রচিত হয়নি। এই তাৎপর্যপূর্ণ গ্রন্থ আগ্রহীজনের অবশ্যপাঠ্য হিসেবে সংকলিত হল।

অন্যদিকে মণীন্দ্রভ‚ষণ গুপ্ত খ্যাতিমান শিল্পী, শিক্ষক ও শিল্পকলা বিষয়ে লেখক। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত তাঁর শিল্পে ভারত ও বহির্ভারত ভারতীয় শিল্প-ইতিহাস-বিষয়ে একটি অতুলনীয় প্রামাণ্য পুস্তক। বলা যেতে পারে, এ বিষয়ে এটি আধুনিক ও পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা অন্যতম আদি রচনা। বিশেষ করে ভারতের বাইরে ভারতীয় শিল্পশৈলীর বিস্তার-বিষয়ে মণীন্দ্রভ‚ষণের আলোচনার গুরুত্ব অপরিসীম। এই খÐে গ্রন্থটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আশা করা যায় শিল্পকলা-বিষয়ে এ দু’টি তাৎপর্যপূর্ণ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্তি ষষ্ঠ খÐকে পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে।


ভ‚মিকা  ‘বাঙালির শিল্পচিন্তা’র সপ্তম খÐে তিনটি ভিন্নধর্মী গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে। এতে রয়েছে সুবোধ ঘোষ রচিত শিল্পভাবনা, কমলকুমার মজুমদারের বঙ্গীয় শিল্পধারা ও অন্যান্য প্রবন্ধ এবং শোভন সোমের গ্রন্থ চিত্রভাবন। চারুশিল্পের বিবিধ শাখা ও দিক নিয়ে নানাবিধ ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে এ খÐটিতে। এতে অবশ্য লেখকদের মতাদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে বেশি, পাঠক সে-সবের সঙ্গে নিজের অভিমত মিলিয়ে হয়তো ভাবনার কিছু অবকাশ পাবেন।

সুবোধ ঘোষের শিল্পভাবনা গ্রন্থটি তাঁর অন্যান্য সাহিত্যকর্মের ফাঁকে চারুশিল্প-বিষয়ে বিক্ষিপ্ত কিছু রচনার সমাহার। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি ১৯৯৬ সালে এ-সব রচনা সংকলিত করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে। লেখক ভারত ও ইউরোপের স্থাপত্য-ভাস্কর্য-চিত্রকলা থেকে আরম্ভ করে শিল্পের তত্ত¡কথা ও সামাজিক ভ‚মিকা, রবীন্দ্রনাথ ও যামিনী রায়ের ছবি থেকে আলপনা, জাতীয় আর্ট ইন্ডাস্ট্রি, কোহিনুর হীরকখÐ ও অন্যান্য প্রতœসম্পদ পুনরুদ্ধারে করণীয় প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁর অধ্যয়নের ব্যাপ্তি ও ভাবনার গভীরতা রচনাগুলোকে বিশেষভাবে অভিনিবেশ প্রদানের উপযুক্ত করে তুলেছে।

কমলকুমার মজুমদার বাংলা সাহিত্যে তাঁর ভিন্নধর্মী অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। বিশেষ করে তাঁর ভাষারীতির বিশিষ্টতা তাঁকে এক অনন্য কথাশিল্পীর মর্যাদা দিয়েছে। তাঁর অনুসন্ধিৎসার আর একটি এলাকা বাংলা অঞ্চলের লোকশিল্প এবং সংস্কৃতিধারার উৎস ও তাৎপর্য। এ বিষয়ে কমলকুমারের কাজের পরিমাণ স্বল্প হলেও একেবারেই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমÐিত। এ কারণে বাংলার লোকসংস্কৃতির উপলব্ধিতে কমলকুমারের পর্যবেক্ষণকে কখনোই অবহেলা করা যাবে না। বঙ্গীয় শিল্পধারা ও অন্যান্য প্রবন্ধ কমলকুমারের লোকসংস্কৃতি-বিষয়ক পর্যবেক্ষণের ফসল। ঢোকরা শিল্প, বাংলার মৃৎশিল্প, গ্রন্থচিত্রণ, প্রতিমাশিল্প, শোলার কাজ\প্রতিটি বিষয়েই লেখকের মৌলিক চিন্তা পাঠককে চমৎকৃত করে। এ গ্রন্থ অনুসন্ধিৎসু শিল্পানুরাগীর অবশ্যপাঠ্য।

শোভন সোম দীর্ঘকাল রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুশিল্পে শিক্ষকতা করেছেন। চারুকলা-বিষয়ে গবেষক ও সমালোচক হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি সর্বভারতীয়। তাঁর প্রকাশনার সংখ্যাও কম নয়। চিত্রভাবন তাঁর কিছুটা প্রাথমিক রচনা, ১৯৮৬ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এটি প্রকাশ করে। শোভন সোমের রচনায় এমন একটি প্রস্তুতি, পঠনপাঠন ও পরিশ্রমের স্বাক্ষর রয়েছে যে বহু বছর পরেও গ্রন্থটির মূল্য ও প্রাসঙ্গিকতা ¤øান হয়নি। বইটিতে নানান প্রবন্ধে মূলত চারুশিল্পের ভাষা এবং অন্যান্য সুকুমার শিল্পের সঙ্গে দৃশ্যশিল্পের ভাষাগত তারতম্য, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিল্পচিন্তার তফাৎ, মুঘল অনুচিত্রের বিবর্তনে বিভিন্ন প্রভাব ও পর্যায় ইত্যাকার নানান বিষয়ে ঐতিহাসিক ও বস্তুগত উদাহরণের মাধ্যমে আলোচিত হয়েছে।

এ তিনজন সৃজনশীল আলোচকের রচনায় যে বৈচিত্র্যময় কিন্তু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শিল্পালোচনার ধারা এখানে সংকলিত হয়েছে; তা বাংলাভাষায় শিল্পকলা-বিষয়ক রচনাকে পরিপুষ্ট করেছে। পাঠকের কাছেও নিশ্চয় সেগুলো মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হবে।

ভ‚মিকা  শিল্প-ইতিহাসের শিক্ষক ও গবেষক অশোক ভট্টাচার্য রচিত বাংলার চিত্রকলা এবং খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী অতুল বসুর লেখা বাংলায় চিত্রকলা ও রাজনীতির একশ বছর\এ দু’টি গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে অষ্টম খÐে। দু’টি পুস্তক একেবারেই ভিন্নধর্মী কিন্তু দু’টিরই বিষয়বস্তু বাংলার চিত্রশিল্পের বিকাশ। তাই আশা করা যায়, এই খÐে পাঠক বাংলা অঞ্চলের প্রাচীনকাল থেকে একেবারে বর্তমান পর্যন্ত চিত্রকলার বিবর্তনের একটি কালানুক্রমিক পরিচয় পাবেন, পাশাপাশি ঔপনিবেশিক যুগে ভারতের আধুনিক চিত্রশৈলী বিষয়ে বিবিধ মতের সঙ্গেও পরিচিত হবেন।

অশোক ভট্টাচার্যের বাংলার চিত্রকলা গ্রন্থে পাল যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা অঞ্চলের চিত্রশিল্পের ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। বাংলার চিত্রশিল্পের আলোচনায় ইতিহাসের নানা সময়ের যেসব উদাহরণ বিশেষ গুরুত্ব পায়নি অশোক ভট্টাচার্য সেসব শিল্পকর্ম বিষয়েও আলোকপাতের চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে বাংলায় মুসলিম সুলতানদের শাসনকালের চিত্রশিল্প, চৈতন্যদেব অনুপ্রাণিত বৈষ্ণবচিত্র, মুর্শিদাবাদ ও কোম্পানি চিত্রশৈলীর বিবিধ পর্যায় তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন যা ইতোপূর্বে এতটা গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়নি। এ ছাড়া ঔপনিবেশিক কাল ও স্বাধীনতার অনতি-পরবর্তী সময়ের আধুনিক শিল্পান্দোলনসমূহের আলোচনা পুস্তকটিকে সম্পূর্ণতা দান করেছে। ফলে এটি বাংলার চিত্রকলা-বিষয়ে পাঠকের সার্বক্ষণিক সহায়কগ্রন্থের মর্যাদা পাবে বলে আশা করা যায়। অন্যদিকে অতুল বসুর লেখা বাংলায় চিত্রকলা ও রাজনীতির একশ বছর আগের গ্রন্থটির তুলনায় একেবারেই ভিন্নধর্মী। এটি একইসঙ্গে একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীর স্মৃতিকথা ও শিল্পশৈলী এবং শিল্প-ঐতিহ্য বিষয়ে তাঁর মতামত। গ্রন্থটির সময়-পরিধি ঔপনিবেশিককাল এবং বিষয় প্রধানত ওই সময়ের ঐতিহ্যবাদী বনাম পাশ্চাত্যপন্থী শিল্পধারার বিবাদ। পুস্তকটিতে শিল্পীর পক্ষপাত ও তাঁর মতের পক্ষে শিল্পীসুলভ আবেগ পরিপূর্ণভাবে উপস্থিত। তিনি স্পষ্টবাদী ও পাশ্চাত্যপন্থার প্রতি তাঁর সমর্থন প্রকাশে নিঃসঙ্কোচ। অতুল বসুর পুস্তকটি তাঁর সময়ের মানসিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিভিন্ন ঘটনার উপস্থাপন এবং সে সব বিষয়ে লেখকের তীব্র কিন্তু সরস মন্তব্য অত্যন্ত উপভোগ্য। তাঁর সমালোচনার কশাঘাত থেকে দেশের বরেণ্য ও সর্বজনমান্যরাও রেহাই পাননি। গ্রন্থটি ভারতের আধুনিক শিল্পের অবয়ব নির্মাণের ক্রান্তিলগ্নে ওই সময়কার শিল্পজগতের পরিচয় অবলোকনে পাঠককে সাহায্য করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।


ভ‚মিকা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের এমন কোনো দিক নেই যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভার স্পর্শে আলোকিত হয়নি। আমরা জানি যে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক ভারতের শিল্পজগতেরও এক পথিকৃৎ শিল্পী। তিনি সৃষ্টি করেছেন সম্পূর্ণ অভিনব ও নিজস্ব ঢঙের এক শিল্পধারা যা বিশ্বব্যাপী কলারসিকজনের স্বীকৃতি লাভ করেছে। এমন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেননি। প্রধানত সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে হলেও সৌন্দর্যবোধ, নন্দনতত্ত¡, শিল্পের রস ও উপভোগ-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রচুর প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেছেন। এ ছাড়া রয়েছে তাঁর ডায়েরি ও চিঠিপত্রের বিপুল ভাÐার যেখানে এসব বিষয়ে আলোচনা যথেষ্ট পাওয়া যাবে। নিজে চিত্রচর্চা করলেও সুনির্দিষ্টভাবে দৃশ্যকলা-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের রচনা বা মন্তব্যের পরিমাণ কিন্তু খুব বেশি নয়। তবে এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে রবীন্দ্রনাথের মতো বিরল প্রতিভা ও মৌলিক চিন্তার মানুষের রচনা বা মন্তব্য যত স্বল্পই হোক-না কেন তার মূল্য অপরিসীম।

‘বাঙালির শিল্পচিন্তা’র নবম খÐে চেষ্টা করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা, ডায়েরি ও চিঠিপত্র ঘেঁটে চিত্র-ভাস্কর্য বিষয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য মন্তব্যকে এক জায়গায় গ্রথিত করবার। এখানে যেমন রয়েছে ছিন্নপত্র-র মতো নিতান্ত অল্প বয়সের রচনার অংশ, তেমনি সংকলিত হয়েছে ১৯৪১ সালে মৃত্যুর বছর লেখা পত্রে চিত্রকলা-বিষয়ে আলোচনা। আরো রয়েছে নিজে চিত্রী হয়ে ওঠার পর নিজের ছবি বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে দৃশ্যশিল্প-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য। প্রতিটি রচনার সূচনায় সম্পাদকের মন্তব্য রয়েছে, তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিচিতির প্রয়োজন নেই। তবে এটুকু বলা যায় যে দৃশ্যকলা-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য স্বল্প হলেও এগুলোর মধ্যে তাঁর আধুনিক ও অত্যন্ত প্রাগ্রসর চিন্তার পরিচয় প্রোজ্জ্বল হয়ে আছে। 

তাঁর সমকালে একদিকে জাতীয়তাবাদের উগ্র ও আচ্ছন্ন মতবাদ এবং অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিল্পরীতির প্রতি অন্ধ পক্ষপাতে শিল্পবোধ ও শিল্পচেতনা যখন দিকভ্রান্ত তখন রবীন্দ্রনাথ, বিশেষ করে বিদেশ থেকে লেখা চিঠিপত্রে, এক আশ্চর্য সংহত, পরিশীলিত ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিচ্ছেন। তাঁর নিজের শিল্পে এবং শান্তিনিকেতনের কলাভবনে তাঁর সূচিত শিল্পান্দোলনে এর বাস্তব প্রয়োগ আমাদের চমকিত করে। তাঁর রচনার মধ্যেও পাঠক সেই অনন্য বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ ক্ষণে ক্ষণেই পাবেন। বস্তুতপক্ষে রবীন্দ্রনাথই আধুনিক ভারতবর্ষে প্রথম শিল্পী ও শিল্পচিন্তক যাঁর কাজে ও কথার শিল্পভাবনার জগতে এক কালান্তরের পরিচয় প্রতিভাত হয়ে রয়েছে। অতএব, দৃশ্যকলা-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত আমাদের পূর্ণ অভিনিবেশ দিয়ে আত্মস্থ করা অবশ্য প্রয়োজন।

ভ‚মিকা  শিল্পকলা-বিষয়ক দশম খÐে আধুনিক ভারতশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ চিত্রশিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় (১৯০৪-১৯৮০) রচিত ও বহুলপঠিত দু’টি গ্রন্থ চিত্রকথা ও চিত্রকর সংকলিত হয়েছে। বিনোদবিহারী শুধু চিত্রশিল্পী নন, দৃশ্যশিল্প-বিষয়ে একজন অগ্রগণ্য তাত্তি¡ক ও সমালোচকও বটে। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা রয়েছে। বস্তুতপক্ষে চিত্রকর গ্রন্থটির জন্য তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাশিল্পীর মর্যাদাও দেয়া হয়ে থাকে। প্রকাশিত হওয়ার পরপরই গ্রন্থ দু’টি পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বর্তমানে এ দু’টি বই শিল্পকলা-জগতে ক্লাসিক রচনা হিসেবে বিবেচিত। শিল্পকলা-বিষয়ক যে-কোনো বাংলা সংকলন, অতএব, বিনোদবিহারীর রচনার অন্তর্ভুক্তি ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না।

চিত্রকথা গ্রন্থটি মূলত বিনোদবিহারীর মনের নানাবিধ শিল্পজিজ্ঞাসার ফসল। ভারতশিল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে যেমন এখানে তিনি তাঁর মত প্রকাশ করেছেন তেমনি পুরাণ, শিশুচিত্র, জনশিক্ষা বা রন্ধনশিল্পের মতো বিচিত্র বিষয়ে নিজস্ব ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এ বইতে ভারতশিল্পের বিভিন্নমুখী প্রকাশ উদাহরণসহ আলোচনা করে বিনোদবিহারী এদের নান্দনিক গুণ ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। রন্ধনকে শিল্পের মর্যাদায় ভ‚ষিত করেছেন তিনি। তাঁর রচনাটি উপস্থাপন-গুণে উপভোগ্য। মহাভারত ও রামায়ণ-এর মতো অতিপরিচিত পৌরাণিক কাহিনি বিষয়ে বিনোদবিহারীর পর্যবেক্ষণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমÐিত, তিনি মহাভারতকে তুলনা করেছেন হিমালয় পর্বতের গাম্ভীর্যের সঙ্গে আর রামায়ণকে তুলনা করেছেন নদীর প্রবহমানতার সঙ্গে। সব মিলিয়ে চিত্রকথা গ্রন্থটিতে পাঠক একজন প্রজ্ঞাবান চিন্তাশীল মানুষের পরিচয় যেমন পাবেন তেমনি একজন শিল্পীর সৃজনশীল উপলব্ধির প্রকাশও অনুভব করবেন।

বিনোদবিহারীর চিত্রকর গ্রন্থটিকে বলা যায় অনেকখানি আত্মজৈবনিক। চারটি রচনার সমাহার এটি\‘চিত্রকর’, ‘কত্তামশাই’, ‘কীর্তিকর’ ও ‘শিল্পজিজ্ঞাসা’। ‘শিল্পজিজ্ঞাসা’ বাদ দিলে বাকি তিনটি রচনাই শিল্পীর জীবনের নানান ঢঙের খÐ-চিত্র। ‘চিত্রকর’ রচনাটিকে বলা চলে বিনোদবিহারীর মোটামুটি জীবনচিত্র। এখানে বাল্যকাল থেকে শান্তিনিকেতন-জীবন হয়ে তাঁর পূর্ণ-অন্ধত্বের সময় পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ বিধৃত হয়েছে। ‘কত্তামশাই’ ও ‘কীর্তিকর’ আত্মজৈবনিক হলেও এখানে রূপকের আড়ালে গল্পের ছলে বক্তব্যকে উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘কত্তামশাই’তে বিনোদবিহারীর দু’টি সত্তা যেন পরস্পরের সঙ্গে বিতর্কের মধ্য দিয়ে পাঠকের জন্য ছেঁকে তুলেছে জীবন ও শিল্পের গভীরতম সত্য। এ রচনাটি সাহিত্য হিসেবেও একটি অনুপম সৃষ্টি। ‘কীর্তিকর’ সংক্ষিপ্ত আকারে অনেকটাই অনুরূপ রচনা। ‘শিল্পজিজ্ঞাসা’ নিবন্ধে বিনোদবিহারী মূলত শিল্পের নান্দনিক ব্যাখ্যা ও উপলব্ধি এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যশিল্পের চারিত্রিক বিশেষত্ব ও পার্থক্যকে নির্দেশ করার চেষ্টা করেছেন। এ রচনাটি ‘চিত্রকথা’র পর বিনোদবিহারীর শিল্পবিচার ও উপলব্ধির সংবেদনশীল ক্ষমতার আর একটি প্রকাশ।

শান্তিনিকেতনে তিন শিল্পগুরুকে তিনটি মার্গের সাধক হিসেবে দেখা হত। নন্দলাল ভক্তিমার্গের, রামকিঙ্কর কর্মমার্গের আর বিনোদবিহারী পরিচিত ছিলেন জ্ঞানমার্গের সাধক হিসেবে। বিনোদবিহারীর রচনায় শিল্পজ্ঞান ও শিল্পবিচারে তাঁর যে প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটেছে, শিল্পানুরাগী পাঠক তাতে শিল্পরস আস্বাদনের নানান পথের হদিশ পাবেন।


‘বাঙালির শিল্পচিন্তা’র একাদশ খÐে ছয়জন লেখকের রচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে অশোক ভট্টাচার্য ও বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পকলা বিষয়ক লেখক যেমন রয়েছেন তেমনি প্রথাগতভাবে শিল্পকলা বিষয়ে লেখক হিসেবে পরিচিত নন এমন প্রাবন্ধিকদের রচনাও স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের চিত্রশিল্প : বাংলাদেশের সম্পূর্ণ গ্রন্থ ও আধুনিকতা ও উত্তর-আধুনিকতার অভিজ্ঞতা গ্রন্থের অংশবিশেষ এবং অশোক ভট্টাচার্যের গ্রন্থ অবনীন্দ্র-চিত্রকলা সম্পূর্ণ সংকলিত হয়েছে। রণেশ দাশগুপ্ত বাংলাদেশে প্রগতিবাদী মননশীল প্রাবন্ধিকদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তাঁর শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশ্নে গ্রন্থটি বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে প্রকাশিত হলেও এটির পাঠ এখনো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচিত। এখানে তার অংশবিশেষ সংকলিত হয়েছে। আবুল ফজল বাংলাদেশের অন্যতম সমাজসচেতন ও স্পষ্টবাদী সমালোচক-প্রাবন্ধিক হিসেবে খ্যাতিমান। তিনি মূলত সমকালীন রাজনীতির পশ্চাদমুখিতা ও সমাজের নানান কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করেছেন। চিত্রকলা-বিষয়ে তাঁর ছোট প্রবন্ধটি একটি ব্যতিক্রমী নজির। একইভাবে আহমদ ছফাও মূলত ইতিহাস-সমাজ-রাজনীতি-সংস্কৃতি বিষয়ে নিজের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির এক ক্ষুরধার প্রাবন্ধিক। শিল্পী এস. এম. সুলতানের সাথে তাঁর সাময়িক সখ্যের পটভ‚মিতে চিত্রকলা-বিষয়ে তাঁর আগ্রহের সাক্ষী সংকলিত প্রবন্ধটি।

 অশোক ভট্টাচার্যের ‘অবনীন্দ্র-চিত্রকলা’ রচনাটি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও শিল্পকর্ম-বিষয়ে একটি সম্পূর্ণ ও আনুপূর্বিক আলোচনা হিসেবে মূল্যবান। এতে আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার বিকাশের পটভ‚মিতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টির গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। ভারতীয় শিল্পের পরম্পরায় অবনীন্দ্রনাথের অবদানকে অনুধাবন করবার জন্য এ পুস্তক বিশেষ সহায়ক হবে বলে মনে করা যায়।

 বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের চিত্রশিল্প : বাংলাদেশের এদেশের আধুনিক শিল্পকলা ও প্রধান শিল্পীদের বিষয়ে প্রথম গ্রন্থ। সে হিসেবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব যেমন রয়েছে তেমনি এতে আমরা প্রথমবারের মতো এদেশীয় আধুনিক শিল্পের বিকাশ ও আধুনিক শিল্পবিচারের দৃষ্টিভঙ্গিটিকেও জানতে পারি। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের অপর রচনা ‘আধুনিকতা এবং উত্তর-আধুনিকতার অভিজ্ঞতার মধ্যে জয়নুল আবেদিন’ মূলত একেবারে সাম্প্রতিক শিল্প-দর্শনের আলোকে শিল্পী জয়নুল আবেদিনকে প্রত্যক্ষ করবার একটি প্রয়াস। এ রচনাও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিকতার কারণে বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ‘কামরুল হাসান বইটি লেখার পটভ‚মি’ প্রবন্ধে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর সমাজের প্রতি শিল্পীর দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। 

 রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর ‘আধুনিক চিত্রকলা ও জনগণ’ নিবন্ধে প্রধানত ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষপাদ থেকে সমসাময়িক শিল্পে যে বাস্তবতাবিমুখ নানান প্রবণতা দেখা দিয়েছিল মার্কসবাদী তত্তে¡র আলোকে সেগুলোকে বিশ্লেষণ ও বিচার করার চেষ্টা করেছেন। ভ্যান গঘ ও পিকাসোর শিল্পকর্মের উদাহরণ টেনে তিনি এ-সব শিল্পীর নবভাষ্যের শিল্পকর্মকে বুঝতে চেয়েছেন, কট্টর মার্কসবাদীর মতো এক কথায় বাতিল করে দেননি। মার্কসবাদী তত্তে¡ তাঁর গভীর জ্ঞান ও শিল্পের প্রতি সংবেদনশীল মনোভাবের দ্বারা তিনি এসব শিল্প অনুধাবনে অত্যন্ত সূ² উপলব্ধিবোধের পরিচয় দিয়েছেন।

 আবুল ফজলের ‘চিত্র-কলা’ নিবন্ধটি তাঁর অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি রচনা। সম্ভবত এ বিষয়ে এটিই তাঁর আগ্রহের একমাত্র উদাহরণ। প্রবন্ধটি তাঁর অল্প বয়সের রচনা, কিন্তু ভারতীয় চিত্রকলা বিষয়ে তাঁর জানাশোনার পরিমাণ পাঠককে বিস্মিত করে। শুধু তা-ই নয়, ঔপনিবেশিক সময়কালেই আবুল ফজল চিত্রকলার বিকাশ ও উপলব্ধির জন্য বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে শিল্পকলা-বিষয়ক পঠন ও জাতীয় চিত্রশালা স্থাপনের সুপারিশ করেছেন। ঐতিহাসিক বিচারে এ ক্ষুদ্র রচনাটির অসীম মূল্য রয়েছে। আহমদ ছফার ‘বাংলার চিত্র ঐতিহ্য : সুলতানের সাধনা’ নিবন্ধটি বাংলাভাষায় কোনো চিত্রশিল্পী-বিষয়ে একটি অনন্য রচনা। শিল্পী এস. এম. সুলতানের চিত্রসাধনার তাৎপর্যকে উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ করতে যেয়ে লেখক বাংলায় আধুনিক চিত্রশিল্পের বিকাশকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তাঁর স্বভাবসুলভ স্বাতন্ত্র্যমÐিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। ভাষার ওজস্বিতায় ও যুক্তি উপস্থাপনায় নিবন্ধটি পাঠককে আবিষ্ট করতে সক্ষম। ফলে বাংলাভাষায় শিল্পকলা-বিষয়ক উল্লেখযোগ্য রচনা হিসেবে এর গুরুত্ব ও পাঠযোগ্যতা বজায় থাকবে।