Arthoniti Chinta
Arthoniti Chinta

সম্পাদক পরিচিতি

রাজনীতিচিন্তার খন্ড সমূহ

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র প্রথম খণ্ডে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার সেন, আহমদ ছফা ও অন্নদাশঙ্কর রায়ের বেশকিছু প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালান্তর গ্রন্থের প্রবন্ধসমূহ এ খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হল। মননশীল এসব প্রবন্ধে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারার প্রেক্ষাপট ক্রমধারায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইংরেজদের আগমনের কারণে ভারতে সার্বিক যে পরিবর্তন হয়েছে তা-ও তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর এ-সব রচনায়। একই সঙ্গে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে লেখক ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় শক্তিপূজার আবির্ভাব, স্বরাজ আন্দোলন, জাতিভেদ প্রথা ও বর্ণবৈষম্য, নারী-স্বাধীনতার প্রতিবন্ধকতা, আন্তর্জাতিক ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, সভ্যতার সংকট ইত্যাদি বিষয়গুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ করেছেন। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ সমাজের প্রচলিত দণ্ডনীতির সমালোচনা করেন এবং দেখানোর চেষ্টা করেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশরাজ প্রণীত আইন ও দণ্ডবিধি কতটা নিবর্তনমূলক ছিল। কংগ্রেস পার্টির আবির্ভাব ও বিকাশ, নেতৃত্বের পালাবদল, কংগ্রেসকে নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য ও বিভেদ--বিশেষ করে ব্রিটিশরাজের শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিভাজনের যে রাজনীতি ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল; যে-জন্য কংগ্রেস থেকে বের হয়ে মুসলমান নেতারা মুসলিম লীগের গোড়াপত্তন ঘটান--সে বিষয়সমূহ রবীন্দ্রনাথের বিশ্লেষণে প্রতিফলিত হয়েছে। সেই সঙ্গে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনে সাধারণ জনগণের যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক নাজুকতা তৈরি হয় সে বিষয়গুলো বিশ্বব্যবস্থার আলোকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেন।

সুকুমার সেন ভারতবর্ষের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দ্রাবিড়, মোঙ্গল, কোল, আর্য, মৌর্য, গুপ্ত ও সেন রাজাদের শাসনকালের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ করেছেন।

আহমদ ছফা তাঁর লেখায় বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতির বিশ্লেষণ ও তীর্যক সমালোচনা করেছেন। তিনি তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন এদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই সরকারের দোসর হিসেবে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টায় নিয়োজিত। এমনকি এদের একটি অংশ কাপুরুষ এবং জড়বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি এদেশে বিজ্ঞানচর্চার অনুপস্থিতিকে এর অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বিশ্বের ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থান এবং তাদের অর্থনৈতিক লগ্নির মাধ্যমে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের কীভাবে রাষ্ট্রধর্মের মাধ্যমে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং অসহায় অবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে তার বিশ্লেষণ করেন। তিনি ভারতবর্ষের ওপর বিশ্বযুদ্ধ ও মহাশক্তির প্রভাবগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন, বিশেষ করে বিশ্বের ধনতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাসমূহ এবং এর প্রতিকারের বিষয়গুলো সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি তিনি বঙ্গভূমি আন্দোলন, ধর্মকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যবহারের নীলনকশাসহ গণমানুষের অনুভূতিসমূহকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ব্রিটিশরাজ ও তার তাঁবেদারগোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থকে চরিতার্থ করার বিষয়টি সূক্ষ্মভাবে তাঁর আলোচনায় তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে অন্নদাশঙ্কর রায় হিরোশিমা ও নাগাসাকির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিশ্ব-পারমাণবিক যুদ্ধের ফলাফল কতটা বিভৎস ও মর্মান্তিক হতে পারে তা তুলে ধরেন। সর্বোপরি স্বাধীন ভারতের শিখ, কাশ্মীর ও আসাম-সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে কীভাবে পাঞ্জাবে অশান্ত পরিবেশের মূলে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিকভাবে শিখ জনগোষ্ঠীকে দমনের মাধ্যমে তাদের শাসনতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তার বিশ্লেষণসহ কাশ্মীর সমস্যার মূল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণসমূহ তুলে ধরেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় চাপ সৃষ্টি করা হয় সে-বিষয়ে সূক্ষ্ম পর্যালোচনাসহ সংখ্যালঘুদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র দ্বিতীয় খণ্ডে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায়ের ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস বইটির রচনাসমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। সুপ্রকাশ রায় তাঁর বইয়ে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের পটভূমি আলোচনায় বলেন যে, ব্রিটিশরা নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থকে চরিতার্থ করতে গিয়ে যে মধ্যবিত্ত বুর্জোয়াশ্রেণি সৃষ্টি করেছিল তারাই পরবর্তীকালে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আত্মসচেতনতার মাধ্যমে প্রতিবাদী ও সংগ্রামী হয়ে ওঠেন। ভারতবর্ষের শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণি বুঝতে পারে যে, ইংরেজরা শোষণের হাতিয়ার হিসেবে মাতৃভূমি সুরক্ষার বিরুদ্ধে তাদেরকে ব্যবহার করছে। পাশাপাশি মধ্যবিত্তশ্রেণির মধ্যে সৃষ্টি হয় জোরালো শ্রেণিচেতনা ও নৈতিক আদর্শবোধ যা সমাজ ও রাজনীতিতে একটি প্রতিবাদের প্রেক্ষাপট তৈরি করে এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মধ্যবিত্তশ্রেণি বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করে এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ত্বরান্বিত করে। এই বিপ্লবকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে বড়লাট লর্ড কার্জন আন্দোলনকারী প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ কংগ্রেসকে ধ্বংস করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন তবে এতে বাদ সাধেন এদেশের বিপ্লবীরা। বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসীগোষ্ঠী এমনকি শ্রমিকরাও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এর আগে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ নবদিগন্তের সূচনা করে। উল্লেখ্য, ভারতজুড়ে সিপাহি বিদ্রোহ ব্রিটিশদের ভিত কাঁপিয়ে দেয়।

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ইংরেজদের আগমন আর দশটি সাধারণ ঘটনা থেকে স্বতন্ত্র। সমগ্র ভারতকে করায়ত্ত করাই নয়, বরং শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন, জমিতে ব্যক্তিমালিকানা প্রদান, বিভিন্ন কুসংস্কার বিলোপ ও সমাজ-সংস্কার সাধন, সর্বোপরি ভারতকে শোষণ করে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার কাজে ইংরেজরা ছিল অন্য শাসকদের তুলনায় অনেক ধূর্ত। ইংরেজদের শাসনব্যবস্থা যে ভারতবাসী মেনে নেয়নি আর তাদেরকে বিতাড়িত করতে ভারতবাসী যে বদ্ধপরিকর তা বলাই বাহুল্য।

জমিতে ব্যক্তিমালিকানা দেওয়ার নামে তারা ইংরেজ-চাটুকারদের দিয়ে ভারতবাসীকে শোষণ করতে চেয়েছিল তা অনুধাবন করতে সাধারণ কৃষকদের খুব বেশি কালক্ষেপণ করতে হয়নি। নীলবিদ্রোহ, আসামের কৃষক বিদ্রোহ, জয়ন্তিয়া বিদ্রোহ, লছিমার বিদ্রোহ প্রভৃতি এরই কিছু জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত, যা আমাদের আজও মনে করিয়ে দেয় যে প্রবাদ : ‘হয় ধান নয় প্রাণ’। এর সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ যা সিপাহি বিদ্রোহ নামে পরিচিত, পরে স্বরাজ আন্দোলন, ভারত ছাড় আন্দোলনসহ অন্যান্য বিদ্রোহ। এ যেন জাতীয় চেতনার নবউন্মেষ, ভারতবাসীর নবজাগরণ। শোষিত হতে হতে, ঘুরে দাঁড়াল এক নতুন জাতি। ভিনদেশি বেনিয়া শাসকদের অন্যায় শোষণের করাল গ্রাস থেকে দেশমাতৃকাকে রক্ষার নবজোয়ার বইতে থাকে প্রতিটি দেশপ্রেমিকের রক্তকণায়। তবে ভারতব্যাপী এই সিপাহি বিদ্রোহকে একই সূত্রে গ্রথিত করাই ছিল মূল বাধা। তাই ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ বিজয়ের আলো দেখেনি। কিন্তু একথা ভুললে চলবে না, সিপাহি বিদ্রোহের হাত ধরেই ভারতব্যাপী ইংরেজবিরোধী সকল আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল--যে কারণে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় থেকেও কিছুটা দুর্বল হতে বাধ্য হয়।

এছাড়া রাজা রামমোহন রায়, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিবনাথ শাস্ত্রী, প্রমথনাথ মিত্র প্রমুখ ব্যক্তিরা বাংলার মানুষকে করেছিলেন অধিকার-সচেতন। তারা বিভিন্ন সভা-সমিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের শক্তি ও প্রতিরোধকে একত্র করেছিলেন। এরই প্রভাবে তৈরি হয় বিভিন্ন গুপ্ত সমিতি যারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা ঘটায়। সাধারণ দেশি অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে তারা বুঝিয়েছিল যে, বীর বাঙালি বেনিয়া ইংরেজের আধুনিক অস্ত্রকে তোয়াক্কা করে না। পরিবর্তনের এই জোয়ারে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অগণিত বুদ্ধিজীবী।

 ইংরেজদের বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহের পরে যে আন্দোলনগুলোর সূত্রপাত হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মহাজন, জমিদার ও ইংরেজবিরোধী কৃষক বিদ্রোহ। বিদ্রোহের প্রতিশোধস্বরূপ ইংরেজরাও ইলবার্ট বিল পাসসহ নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভারতবাসীকে দমিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব। মুসলিমরা মনে করত, তাদের কাছ থেকে ইংরেজরা ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। তাই তারা ইংরেজদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলত, যা পরিশেষে ওয়াহাবি বিদ্রোহে রূপ নেয়। ওয়াহাবি বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ, শ্রমিক আন্দোলন, গুপ্ত সমিতির আন্দোলন, বুদ্ধিজীবীদের সহযোগিতা সব মিলে ইংরেজরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তদুপরি  মহাবিদ্রোহ ও বাংলাদেশের অন্যান্য বিদ্রোহের প্রভাব পড়ে ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে-- যথা মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, মাদ্রাজ, উড়িষ্যা, ব্রহ্মদেশ ও বোম্বেতে। বিভিন্ন আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিশ্বপ্রেক্ষাপটে জার্মানির সাহায্যের মাধ্যমে বিপ্লবকে বাস্তবায়িত করার বাস্তব কর্মকৌশল অবলম্বন, আমেরিকায় বার্লিন কমিটির মাধ্যমে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা, প্রথম মহাযুদ্ধের পটভূমিকায় জাতীয় পরাধীনতার বিরুদ্ধে বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে বিপ্লবীদের তোড়জোড়ে ইংরেজশাসকরা তটস্থ হয়ে পড়ে। ইংরেজরা তাদের অন্যায়-অবিচারের স্টিমরোলার চালাতে নতুন নতুন ফন্দি বের করে। এর মধ্যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হয়। এ সময় ভারতে ব্রিটিশ শাসন দৃঢ় করতে ও ব্রিটিশ পণ্যের একচেটিয়া বাজার হিসেবে ভারতবর্ষকে ব্যবহার করার জন্য বড়লাট হয়ে ভারতে আসেন লর্ড কার্জন। তিনি এসেই বুঝতে পারেন শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে ভারতবাসী কতটা আত্মমর্যাদা-সচেতন হয়ে উঠেছে। নিজেদের অধিকার আদায়ে আজ তারা বদ্ধপরিকর।

লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ নীতিকে ১৯১১ সালে রদ করার মাধ্যমে দেশবাসী ইংরেজদের বুঝিয়ে দিয়েছিল সব ভারতবাসী এক ও অদম্য; তাদের ওপর অত্যাচারের দিন শেষের পথে। বঙ্গভঙ্গ ছিল ইংরেজদের জন্য কালস্বরূপ। বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিদ্রোহীদের সক্রিয় ভূমিকা ইংরেজদের শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলন, দেশব্যাপী স্বদেশী আন্দোলন, গুপ্তহত্যা প্রভৃতি ইংরেজদের শাসন ও শোষণ কর্মকাণ্ডকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।

দেশের এমন পরিস্থিতিতে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ইংরেজরা তখন ইউরোপকে রক্ষা করতেই ব্যস্ত। এ সুযোগকে কাজে লাগান দেশীয় আন্দোলনকারীরা। নতুন উদ্যমে জ্বলে ওঠে বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, বঙ্গপ্রদেশ, পাঞ্জাবসহ সর্বত্র প্রজ্বলিত হয় ইংরেজবিরোধী বিদ্রোহের অগ্নিশিখা। তবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা না পাওয়ায় এই স্বদেশী আন্দোলনও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। উল্লেখ্য, এই গুপ্ত আন্দোলন ছিল শিক্ষিতশ্রেণি কর্তৃক প্রভাবিত ও পরিচালিত, যেখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ না থাকায় আন্দোলনকারীরা একে একে ইংরেজদের হাতে ধরা পড়তে থাকেন এবং বিভিন্ন প্রদেশে এই আন্দোলন কোনও সন্তুষ্টিমূলক উপসংহার টানতে ব্যর্থ হয়।

তথাপি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দেশবাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। যাকে আরও আলোকিত করে রুশ বিপ্লব। যদিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেই ভারতের স্বাধীনতা আসে। তথাপি একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজরা উভয়সংকটে পড়ে ভারতকেও যুদ্ধরত দেশ হিসেবে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। তবে শেষরক্ষা না হওয়ায় তারা ভারতকে স্বায়ত্তশাসন দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।

মূলত বেনিয়া ইংরেজরা সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা ভারতকে শোষণ করে ইউরোপকে মাধুর্যমণ্ডিত করতে চেয়েছিল, তবে তারা ভুলে গিয়েছিল যে, বহু বিদ্রোহের জন্মভূমি বুলগাকপুর বা বিদ্রোহের নগরী বলে খ্যাত বাংলা তথা ভারতবাসীকে দমিয়ে রাখা কখনোই সম্ভব নয়। ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন পরিচালিত হয় তা আমাদের একথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বাঙালি তথা সমগ্র ভারতবাসীকে দমিয়ে রাখা বৃথা চেষ্টা মাত্র। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষের স্বাধীনতা।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র তৃতীয় খণ্ডে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের ওপর রচনার মধ্যে প্রথমে রয়েছে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আলোচনা। তিনি ভারতের পরাধীনতার কারণ বিশ্লেষণের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও জাতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নির্ণয়, সেই সঙ্গে ভারতের জনগণ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দাবিসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। অন্যদিকে নলিনীকিশোর গুহর রচনায় স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটসহ ভারতীয়দের গণজাগরণ, গণশক্তি প্রদর্শন, সাম্প্রদায়িকতার কারণ ও প্রভাবসমূহ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপরেখা ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ভারতের স্বাধীনতা দাবি, স্বদেশী আন্দোলনের রূপরেখা, স্বাধীনতাকামী ভারতবাসীর দৃঢ় প্রত্যয়, গণশক্তি, গণজাগরণ ও গণঅভ্যুত্থান, সাম্প্রদায়িকতা বনাম জাতীয়তাবাদের রূপরেখা--বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের উসকানির ক্ষেত্রে ব্রিটিশ প্রশাসকের ন্যক্কারজনক ভূমিকা, ভারতবাসীর সম্মিলিত বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ, রাজনীতিবিদদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে বদরুদ্দীন উমর ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিস্তারিত প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছেন। ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার প্রাপ্তির লক্ষ্যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালির যে ভূমিকা--তিনি তাঁর দীর্ঘ রচনায় তুলে ধরেছেন।

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্বদেশী আন্দোলনের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বিশেষ করে বরিশালের রাজনৈতিক সমাবেশ-সম্মেলন পরবর্তীতে নিষ্ক্রিয় রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও বঙ্গদেশে বিপ্লবী আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের কারণ ও তাৎপর্যসমূহ, ব্রিটেনের রাজন্যবর্গের ভারতবিরোধী মনোভাব ও কর্মকাণ্ড, ব্রিটিশ-ভারতীয় রাজনৈতিক প্রশাসকদের শাসন সংস্কারের নীলনকশা ও ভারতবাসীর মধ্যে চরমপন্থি মনোভাবের প্রসার-বিকাশ, ব্রিটিশ রাজন্যবর্গের সঙ্গে আলোচনার জন্য ভারতীয় রাজনৈতিক উদারপন্থিদের ইংল্যান্ডে প্রতিনিধিমণ্ডলী প্রেরণ, নিজের (সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়) মন্ত্রিত্বলাভ ও নানাবিধ সংস্কারমূলক কার্যক্রমে নিজেকে নিয়োজিত করা, প্রৌঢ় আইন সংশোধন ও বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা, দ্বৈতশাসনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। অন্যদিকে হেমন্তকুমার রাজনীতিতে ভারতবাসীর কর্মতৎপরতা, বিশেষ করে অভিন্ন বাংলার ধর্মমত নির্বিশেষে বাঙালিদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও আন্দোলনের কৌশলসমূহ বিশ্লেষণ করেছেন।

ভবানী সেনের লেখায় যে বিষয়গুলো ঠাঁই পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে আদিবাসীদের স্বরাজের সমস্যা ও প্রকৃতি, বঙ্গভঙ্গের সূচনা ও পরিণতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস ইত্যাদি। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সামন্তপ্রথার আবির্ভাব ও তার বিকাশের পেছনে ক্রিয়াশীল কারণগুলো পশ্চিমা বিশ্ব ও ভারতীয় উপমহাদেশে ছিল স্বতন্ত্র। এ কারণে পশ্চিমা রাজা ও প্রজা সম্পর্কের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার বোধ সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশে রাজা কর্তৃক প্রজা-শোষণ, অবিশ্বাস, ভয় আর প্রতিহিংসাপরায়ণতা জন্ম নেয়। ফলে ব্যবহারিক অর্থে এখানে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হলেও যে রাজা ও প্রজা বা ক্ষমতাশালী ও ক্ষমতাহীন শ্রেণি ছিল তারা কখনও একত্র হয়ে বহির্শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করতে পারেনি, বরং দেশ আক্রান্ত হলে ক্ষমতাধরেরা নিজেদের আখের গুছিয়েছে আর ক্ষমতাহীনরা নিজেদের সঁপে দিয়েছে ভাগ্যের হাতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিন্দু ধর্মের গোঁড়া বর্ণাশ্রম প্রথা ও উঁচু বর্ণাশ্রয়ীদের দুর্দমনীয় ক্ষমতালিঞ্ঝা।

ধর্ম মানুষকে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে সামাজিক সংহতি (social solidarity তৈরি করে বলে মত দেন সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্ধেইম। কিন্তু সেই ধর্মই যে মাঝে মাঝে হতে পারে পরাধীনতার প্রকৃত কারণ, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ভারতীয় উপমহাদেশে ক্ষমতাধর ব্রাহ্মণসমাজ কর্তৃক ক্ষমতাহীন নিম্নবর্গের হিন্দুদের শোষণ ও পরিণামে পরাজয়ের তীব্র গ্লানি। সাম্প্রদায়িকতাও মাঝে মাঝে জাতীয় চেতনাকে ম্লান করে দেয়। যে কারণে ইংরেজদের আগমনের পরও হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সম্ভব হয়নি।

এছাড়া ভারতীয় স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ সমাজকাঠামো ধ্বংসের পেছনের কারণগুলো আলোচনা করা হয়েছে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। ভারতে ইংরেজদের রাজস্ব সংগ্রহ নীতি ও শাসনব্যবস্থার কারণেই দীর্ঘদিনের স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-কাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। ইংরেজ বাণিজ্যনীতি, গ্রামীণ অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা, গ্রামীণ রাজনীতি ও পশ্চিমা সংস্কৃতি ভারতবর্ষের গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটায়।

এসব পরিকল্পিত পরিবর্তন যে ভারতকে শোষণ করে ইউরোপকে সমৃদ্ধ করার একটি প্রক্রিয়া তা অনুধাবন করেই শুরু হয় জাতীয় আন্দোলন। সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, জনতা, শিক্ষিতশ্রেণি সবাই কমবেশি এতে অংশ নেয়। তবে লেখক এখানে জাতীয় আন্দোলনে কৃষকদের অগ্রণী ভূমিকাকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে যখন জাতীয় চেতনার জোয়ার আসতে শুরু করে, তার বহু আগেই কৃষকসমাজে জাতীয় স্বার্থ তথা নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে তারা জাতীয় আন্দোলনের বান ডেকে আনে।

জাতীয় সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক পার্থক্য ও দূরত্ব বিরাজমান ছিল লেখক এখানে তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তিনি তুলনামূলক আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, যেখানে হিন্দুসমাজে জাতীয় চেতনার সূত্রপাত হয় রাজা রামমোহন রায়ের মতো সমাজে উঁচুতলার লোকদের মধ্যে, সেখানে মুসলমান সমাজে জাতীয় পরিবর্তন আসে দরিদ্র ও নিম্নবিত্তশ্রেণির মধ্যে, যা ছিল মূলত ধর্মভিত্তিক আন্দোলন। তবে মুসলমান সমাজে পরবর্তীকালে এই আন্দোলন নতুন মোড় নিয়ে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত সমাজের দিকে প্রবাহিত হয়। একই সঙ্গে তা মুসলমানদের শিক্ষাদীক্ষা, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদার দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পরিচালিত হতে থাকে। লেখক এখানে কিছু মুসলিম সমাজসংস্কারকের দূরদর্শী ভূমিকার কারণে ব্রিটিশ শাসনকাঠামোর মধ্যে কীভাবে মুসলমান সমাজ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে তা দেখিয়েছেন। এক্ষেত্রে মুসলিমরা নানারকম সংগঠনের মাধ্যমে ইংরেজ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগও করতে থাকে।

তবু স্বাধীনতার সুবাতাস আসতে যে দীর্ঘ দুর্গম পথ ভারতবাসীকে অতিক্রম করতে হয়েছিল তার পেছনে প্রধান দুটি বিষয় ছিল। প্রথমত, ভারতবর্ষব্যাপী কোনও সুগঠিত আন্দোলন একই সঙ্গে চালানো সম্ভব হয়নি যার মূল কারণ ভৌগলিক বিশালতা। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক স্তরবিন্যাসগত দ্বন্দ্বের কারণে ভারতীয় জাতীয় চেতনা পরিপূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করতে পারেনি।

যখন ভারতীয় সমাজে সব বাধা অতিক্রম করে নতুন জাতীয় চেতনার সূচনা হয় তখন আবার ভারতীয় প্রগতিশীল সমাজের মধ্যে সৃষ্টি হয় আদর্শগত মতবিরোধ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুসলিমরা আবার হিন্দুদের থেকে কম সুবিধা পেত বা দাবি আদায়ে ব্যর্থ হত।

হিন্দু সমাজের তুলনামূলক অগ্রগতির পেছনে ক্রিয়াশীল যে কারণসমূহ কাজ করে তার মধ্যে রয়েছে ইংরেজ সাহচর্য ও পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করা। যার সম্পূর্ণ বিপরীত প্রান্তে অবস্থান নেয় তৎকালীন গোঁড়া ও আত্মাভিমানী মুসলিম সমাজ। তবে কালাতিক্রমে হিন্দু-মুসলিম উভয় শ্রেণি অনুধাবন করে যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভিন্ন জাতীয় মুক্তি অসম্ভব।

একই সঙ্গে সংযুক্ত হয় ভারতীয়দের প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য প্রশাসনিক আইন প্রণয়নে ইংরেজদের ওপর সম্মিলিত চাপ প্রয়োগ। শুরু হয় দেশব্যাপী জাতীয় চেতনার নতুন অধ্যায়। ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সমগ্র ভারতবর্ষজুড়ে যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা এটাই প্রমাণ করে যে, জাতীয় স্বার্থ আদায়ে শিক্ষিতশ্রেণির অংশগ্রহণ ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ।

এক্ষেত্রে কয়েকজন উদারমনা ইংরেজ ব্যক্তিত্বের অবদানের কথা উল্লেখ করতে হয় যাদের কারণে জাতীয় আন্দোলন আরও ত্বরান্বিত হয়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও তৎপরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে জাতীয়তাবোধের অবদানই ছিল মুখ্য। লেখক এখানে এই কথাটিই নিজস্ব ভঙ্গিমায় বিভিন্ন ঘটনাবলির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। যা পূর্ববর্তী অধ্যায়ের আলোচনায় ক্রমধারার সাথে সংযুক্ত হয়ে ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসকে দৃঢ়ভাবে অনুধাবনে সহায়তা করেছে।

ভবানী সেন স্বরাজের সঙ্গে আদিবাসীদের সম্পৃক্ততাকে তুলে ধরেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আদিবাসীরা নিজ নিজ স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও ভাষা, সংস্কৃতিগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও  ইংরেজদের বিরুদ্ধে যৌথভাবে স্বরাজ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, যা সত্যিই চমকপ্রদ।

এ সময় কংগ্রেস স্বরাজ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে বহু দেশপ্রেমিক নেতা দলে দলে স্বরাজ আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলনের কারণে জেলের সেলে ঠাঁই নিতে বাধ্য হন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন দেশবাসী আজ স্বাধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর। ইংরেজশক্তি পরাজিত হতে বাধ্য।

স্বদেশী আন্দোলন ও স্বরাজ আন্দোলনকে শুধু কাগজ-কলমে না রেখে বরং তা বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য শুরু হয় দেশব্যাপী বিদেশি পণ্য বর্জন ও স্বদেশী পণ্যের ব্যবহার। মহাত্মা গান্ধী চরকা কাটার মাধ্যমে খদ্দরের কাপড় ব্যবহার করতে সবাইকে উৎসাহিত করেন। দেশবাসীও এসকল জাগরণের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। দেশবাসী বিদেশি সাবান, কাপড় ও অন্যান্য দ্রব্য বর্জন করতে শুরু করে। দেশবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো হঠাৎ দিশেহারা হয়ে পড়ে।

স্বরাজ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল স্বায়ত্তশাসন আদায় করা। এ লক্ষ্যে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কর প্রদান বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নিজেদের নির্বাচিত স্বদেশীয় সরকারের কাছে সব ধরনের কর ও কমিশন প্রদানের ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা হলেও শেষপর্যন্ত ইংরেজ সশস্ত্রবাহিনীর হামলা ও সংঘাতময় পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়টি বিচেনায় নিয়ে স্বরাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়। বঙ্গভঙ্গ বাঙালিদের মধ্যে যে স্বদেশপ্রীতি সৃষ্টি করেছিল তার প্রভাব পড়ে স্বদেশী আন্দোলন ও স্বরাজ আন্দোলনের ওপরে।

১৯১৪ সালে শ্রীমতী অ্যানি বেসান্ত মাদ্রাজে কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দেন। ১৯১৫ সালে তিনি ‘হোমরুল লীগ’ গঠনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও পরবর্তীকালে ‘লীগ’ গঠন করেন এবং ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গ্রেফতার হন। শুধু শ্রীমতী বেসান্তই নন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার হলে দেশবাসী আরও সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

এসময় ভারতীয়দের স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার ব্যাপারে ইংল্যান্ডে বহু পত্রপত্রিকায় তীব্র বিতর্কের ঝড় ওঠে। এর মধ্যে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় একটি উদারপন্থি দল নিয়ে ইংল্যান্ডে যান, যারা মূলত ভারতের স্বায়ত্তশাসন ও অন্যান্য স্বার্থ-সংক্রান্ত বিষয়সমূহ নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করেন। একপর্যায়ে তারা চেমস্ মন্টেগুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যার ফলাফল ভারতীয় স্বরাজ তথা স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আলোচিত-পর্যালোচিত হতে থাকে।

তবে কাঠামোগত অবস্থা ও বিদেশি সরকারের দমন ও অসহযোগিতামূলক আচরণের কারণে পূর্ববর্তী অন্যান্য আন্দোলনের মতো স্বদেশী আন্দোলন ও স্বরাজ আন্দোলনও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। দেশবাসী যদিও দেশীয় পণ্য ব্যবহারে উৎসাহী ছিল তথাপি সরকারি সাহায্যের অভাব, দেশীয় পণ্য বাজারজাতকরণ ও উৎপাদনের যথেষ্ট সুব্যবস্থা না থাকায় বিদেশি পণ্য ক্রমে ক্রমে তাদের আগের বাজার দখল করতে সমর্থ হয়। এছাড়া স্বরাজ প্রতিষ্ঠা হলেও তা যে আদিবাসীদের অধিকার ও কৃষকদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে তার কোনও নিশ্চয়তা না থাকায় দেশের বৃহৎ কৃষকসমাজ ও আদিবাসী সমাজ স্বদেশী ও স্বরাজ আন্দোলনে যথেষ্ট তৎপর ছিল না।

অন্যদিকে সংখ্যালঘুরা এই আন্দোলনে কোনও আগ্রহ দেখায়নি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বলেন যে, স্বরাজ চাওয়া ও তা কার্যকর করা দুটি ভিন্ন বিষয়। কারণ স্বরাজ চাইলেই কাজ হবে না। বরং তা বাস্তবে কার্যকর করতে সমগ্র দেশবাসীকে তথা কৃষক, শ্রমিক, সর্বস্তরের জনগণকে একসূত্রে গ্রথিত করে আন্দোলনের মাধ্যমে স্বরাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে যার কোনো বিকল্প নেই। স্বরাজ মানেই ব্রিটিশ-বিরোধিতা নয়, বরং এর মাধ্যমে একটি নতুন সরকার ও শাসনপ্রণালির আবির্ভাব হবে, যাকে সর্বস্তরের জনগণের জন্য কার্যকরী করে গড়ে তুলতে হলে যথেষ্ট সময় ও বিচক্ষণতার দরকার। যা না থাকায় স্বরাজ আন্দোলন সফলতার আলো দেখেনি। এছাড়া ব্রিটিশ সরকারের দমননীতির কারণে বহু নেতা জেলে অন্তরিন হয়ে পড়েন যা সাধারণ জনগণের মধ্যে হতাশার জন্ম দেয়।

এছাড়া বিভিন্ন স্তরের জনগণ স্বরাজ, বিপ্লব ও অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন দিলেও সরাসরি একাত্মতা ঘোষণা করে কোনো কার্যকরী আন্দোলনের জন্ম দিতে পারেনি। ফলে দেশব্যাপী অরাজকতা তৈরি হতে থাকে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশবাসী এটা অনুধাবন করতে পেরেছিল যে, সময় এসেছে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার। তাই শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও তারা ১৯৪৭ সালে ভারতীয় স্বাধীনতার পতাকাকে মুক্ত আকাশে মুক্ত হাওয়ায় ওড়াতে সক্ষম হয়।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র চতুর্থ খণ্ডে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের দেশবন্ধু রচনাসমগ্র থেকে দশটি প্রবন্ধ ও বারোটি বক্তৃতা সন্নিবেশিত হয়েছে। এছাড়া ইতিহাসবিদ যোগেশচন্দ্র বাগলের মুক্তির সন্ধানে ভারত বা ভারতের নবজাগরণের ইতিবৃত্ত বইটি এ খণ্ডে গ্রথিত হয়েছে।


দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর প্রবন্ধ ও বক্তৃতায় স্বদেশি আন্দোলনের বহুমুখী প্রভাবসমূহ বিশ্লেষণ করেছেন। বিশেষ করে স্বদেশি আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীরা কীভাবে এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশীয় পণ্যের বাজারকে সুরক্ষিত করে বিদেশি পণ্যকে হটানোর চেষ্টা করেছিলেন; তা তিনি নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি স্বরাজ আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব ও অনুসারীরা কীভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের মাধ্যমে শোষিত ও অত্যাচারিত হয়েছেন, কীভাবে আন্দোলনকে প্রতিহত করতে ব্রিটিশরাজের তাঁবেদারগোষ্ঠী এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অসংখ্য অনুসারীকে বিনা বিচারে কারাগারে প্রেরণ করেছে তা-ও বিশ্লেষণ করেছেন। লেখক কলকাতার শিক্ষার্থীসহ দেশবাসীর প্রতি আবেদন রেখেছেন যাতে করে স্বরাজ আন্দোলনকে সার্বিকভাবে সফল করার মাধ্যমে ব্রিটিশ অর্থনীতি ও রাজনীতিকে দুর্বল করা যায়। এছাড়া মহম্মদ আলী জিন্নাহ ব্রিটিশরাজের নিয়ন্ত্রণ থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় নানা ধরনের উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা দেন--যা জনগণকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে অনুপ্রাণিত করে, এসব প্রেক্ষাপট দেশবন্ধুর রচনায় উঠে এসেছে। এ খণ্ডে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রচনায় যে বিষয়সমূহ স্থান পেয়েছে সেগুলো হল : অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের মধ্যে উত্তেজনা, বিভেদ ও সংঘাতময় পরিবেশ-পরিস্থিতি, স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ভারতের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আন্দোলন, ভারত রক্ষা আইনের নিবর্তনমূলক প্রয়োগসমূহের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর সোচ্চার হওয়া, বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন, আসাম প্রাদেশিক খেলাফত সভা ও সিলেটের টাউন হল প্রাঙ্গণে একাধিক জনসমাবেশে ভারতবাসীকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করা, লর্ড লিটনের ভারতবাসীর স্বার্থবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ ইত্যাদি।


যোগেশচন্দ্র বাগলের মুক্তির সন্ধানে ভারত এবং ভারতের নবজাগরণের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে ভারতবর্ষের ১০০ বছরের (ইংরেজ-শাসনের দ্বিতীয় ভাগ) ইতিহাসকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখক এখানে বলেন, ১০০ বছরে ভারতের জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষায়, সাহিত্যে, রাষ্ট্রব্যবস্থায়, ধর্মে, লোকাচারে গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ধারা রয়েছে এবং ভারতীয় সমাজে এ পরিবর্তনে নবজাগরণ বা রেনেসাঁর অবদান রয়েছে। এই নবজাগরণের আগে ভারতবর্ষে আরেকটি নবজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল মোগল বাদশাহ আকবরের সময়। ঐতিহাসিক এবং সাময়িক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ও রাজ্যে নবজাগরণের পরিপূর্ণ বিকাশ দেখা যায়নি। এতদ্‌সত্ত্বেও বহু সমাজ-সংস্কারক ভারতের সমাজব্যবস্থায় অনেক ধরনের পরিবর্তনের ধারা সূচনা করেছেন যা লেখক বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান সম্পর্কে লেখক বলেন, তিনি ফরাসি বিপ্লব, আমেরিকার স্বাধীনতা প্রচেষ্টা এবং ইউরোপের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর স্বাধীনতা লাভ, খাস ইংল্যান্ডে ধর্মগত বৈষম্য দূরীকরণের চেষ্টার বিষয়গুলোর ব্যাপারে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন।


এছাড়া যোগেশচন্দ্র বাগল ভারতে নব্যদলের রাজনীতি, সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ, সিপাহি বিদ্রোহ, বাঙালির নবজাতীয়তাবোধ, ভারতসভার কার্যকলাপ, কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার অবদান, ব্রিটিশদের ভারতশাসনের প্রভাব, ব্রিটিশদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি যে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে স্বদেশি আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ, রাজনীতিতে আদর্শের সংঘাত, হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের সংঘাত ও মিলনের প্রক্রিয়া, স্বায়ত্তশাসনের প্রচেষ্টায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ভূমিকা, মহাত্মা গান্ধীর সার্বিক অবদান ও আন্দোলন, ভারতের জনজাগরণ, স্বরাজ দলের কার্যক্রম, গোলটেবিল বৈঠক, ভারতবাসীর সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলন, আদর্শ সংঘাত ও শাসননীতি, স্বায়ত্তশাসনের প্রচেষ্টায় কংগ্রেস-মুসলিম লীগের জোর রাজনৈতিক আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি, সত্যাগ্রহ ও দ্বৈতনীতি, সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণ ও সামাজিক বাস্তবতা, স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতীয় রাজন্যবর্গের ভূমিকা, বিশ্বযুদ্ধ, ভারতে ব্রিটিশ রাজনীতি-অর্থনীতির কূটকৌশল, ব্যক্তিস্বাধীনতার সংকট ইত্যাদি।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র পঞ্চম খণ্ডে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তি নেতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। এখানে শ্রীসুভাষচন্দ্র বসু রচনাবলীর দ্বিতীয় খণ্ড-এর সকল প্রবন্ধ সংকলন করা হয়েছে। এসব রচনায় ভারতে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের ক্ষেত্রে নেতাজির স্বচ্ছ দর্শন ও চিন্তাধারা পরিস্ফুট। ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভৌগোলিকভাবে, জাতিগতভাবে এবং ইতিহাসের বিচারে যে বৈচিত্র্য রয়েছে লেখক তার গভীরে প্রবেশ করেছেন এবং বলেছেন--ভাষা, বর্ণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার ও সাম্প্রদায়িক বৈচিত্র্যতা একদিকে যেমন ভিন্নতা সৃষ্টি করেছে--পাশাপাশি ঐক্যের পরিব্যাপ্তিও সৃষ্টি হয়েছে। আবার ভৌগোলিক দিক থেকে ভারতবর্ষ পৃথিবীর অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ধারা ও ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে।

লেখক বলেন, ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলন মূলত অতীতের চিন্তাচেতনা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিফলন। লেখক স্বরাজ বিদ্রোহের স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন এবং ভারতের রাজনীতির মঞ্চে দেশবন্ধুর অবদানকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বিশেষ করে স্বরাজ আন্দোলনের পুরোধা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অবদানকে লেখক আয়ারল্যান্ডের সিন ফিল দলের অবদানের সাথে তুলনা করেছেন। লেখক কংগ্রেসের অবদান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, কংগ্রেসের আন্দোলনের কারণেই ব্রিটিশরা ভারতে স্বায়ত্তশাসনের অঙ্গীকার করতে বাধ্য হয়--বিশেষ করে ১৯৩০ সালের শেষে এবং ১৯৩১ সালের গোড়ার দিকে সরকার ও কংগ্রেসের মধ্যে বোঝাপড়ার আবহাওয়া সৃষ্টি হয়। লেখক গান্ধীজি-আরউইন চুক্তির রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে বলেন, এই চুক্তির কারণে ইংরেজদের সাথে গান্ধীজির একটি দীর্ঘমেয়াদী লিখিত আপস-রফা হয় যা ভারতের স্বাধীনতার পূর্বাভাস হিসেবে অভিহিত করা হয়।

লেখক ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাত্মা গান্ধীর ভূমিকা বিশ্লেষণ করেন এবং তাঁর অহিংস ও শান্তি আন্দোলনকে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেন। লেখক ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ১৯৩৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। সর্বোপরি লেখক ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির পার্থক্য বিশ্লেষণ করে বলেন, পাশ্চাত্যের জাতিসমূহের সামাজিক-রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির মতো ভারতবর্ষেও সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন সফল হবে। পরিশেষে লেখক কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টির গোড়াপত্তনের বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বলেন, যে প্রেরণা থেকে কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টির উদ্ভব তা নির্ভুল, কিন্তু ওই দলের ভাবনা ও ধারণার মধ্যে যে স্পষ্টতার অভাব ছিল তা উদাহরণের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রচনায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনৈতিক দর্শন ও স্বপ্নের কথা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই সময় কংগ্রেসের প্রতি দেশবন্ধু আহ্বান জানান যে :

ভারতবর্ষকে প্রকৃত মহান করতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে একটি গণতান্ত্রিক সামাজিক বেদির উপরে রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। বর্ণাশ্রম একদা ভারতবাসীর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার জন্য কাজ করলেও সময়ের প্রেক্ষিতে আজ তা বিভেদের সৃষ্টি করছে। অতএব এখনই জাতিভেদ ও বর্ণভেদ প্রথা দূর করে একটি শ্রেণীহীন বর্ণহীন সমাজ গড়ে তুলতে হবে। ভারতবাসীর সামনে আজ স্বাধিকারের এক পবিত্র দায়িত্ব বর্তমান। তাই দেশপ্রেমের পবিত্র মশাল হাতে এগিয়ে যাওয়ার এখনই সময়। দেশপ্রেম, বিপ্লব এবং জাতীয়তাবাদের পবিত্র আগুনে সমগ্র দেশকে প্রজ্বলিত করতে হবে। শুধু গ্রেটব্রিটেন নয়, সমগ্র পৃথিবীর কোনও শক্তিই নেই ভারতবাসীর সামনে রুখে দাঁড়ায়।

দেশবন্ধুর এই দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নতুন প্রবাহ সৃষ্টি করে। তিনি দেশবাসীকে রাজনৈতিক স্বাধিকার আদায়ের জন্য অর্থনৈতিক স্বাধিকার আদায় তথা শিল্প-কারখানার ও বাজারনীতির পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্রিটিশ পণ্যকে ‘না’ বলতে হবে ও দেশীয় পণ্যকে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবকে সফল করার লক্ষ্যে ভারতের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের যে চিত্র তাঁর রচনায় তুলে ধরেন তার মধ্যে রয়েছে ভারতের সংস্কৃতি, জনগণের জীবন-জীবিকার উৎসসমূহ, ভারতে পরাশক্তিদের আগমন ও শোষণের বাস্তব চিত্র, অতঃপর জনগণের সংগ্রাম, প্রতিবাদ ইত্যাদি। একই সঙ্গে তিনি ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনের বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা এবং ভারতের বৈদেশিক নীতির বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা জাতির কাছে তুলে ধরেন। তিনি তাঁর আলোচনায় আরও যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন তার মধ্যে ভারতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন, সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের মাধ্যমে কীভাবে কংগ্রেসের শাসনতন্ত্রের ধারা ও কার্যক্রমসমূহ প্রভাবিত হয়েছিল, পাশাপাশি বসু-রোলাঁর সাক্ষাৎকারের প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো, ভারতের মুক্তিসংগ্রামের নানা ধরনের চ্যালেঞ্জসমূহ উল্লেখযোগ্য।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র ষষ্ঠ খণ্ডে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, সত্যেন সেন ও সুনীল সেনের রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সুভাষচন্দ্র বসুর রচনাসমূহ মূলত ভারতের স্বাধিকার আন্দোলন ও এ আন্দোলনকে সফল করার নানা ধরনের নীতি ও কৌশল সংক্রান্ত সুপারিশ। তিনি তাঁর আলোচনায় যুবসমাজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, যুব আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই নয় বরং তা সামাজিক কর্মও বটে। তিনি যুব আন্দোলনকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেন--যথা : রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, শারীরিক এবং সাংস্কৃতিক। তিনি যুবসমাজকে বলেন, স্বাধীনতাহীন, পরাধীন ও কূপমণ্ডূক জীবনযাপন মৃত্যুর শামিল--কাজেই আত্মাকে মুক্তির পথ দেখাতে হবে। স্বাধীনতার জন্য দুয়ার থেকে দুয়ারে, গ্রাম থেকে গ্রামে, শহর থেকে শহরে যেতে হবে। দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে হবে প্রতিটি নরনারীর অন্তরে। তবে তিনি ছাত্ররাজনীতিকে সমগ্র ভারতীয় কংগ্রেসের জাতীয় আন্দোলন থেকে পৃথক করার কথা বলেন। তিনি দেশের জন্য ছাত্রদেরকে আত্মত্যাগের কথা বলেন।

সুভাষচন্দ্র বসু নিজ জীবনে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন ছাত্ররাজনীতির কারণে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ভাসা ভাসা প্রতিকারের মাধ্যমে কোনও পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, বরং একটি সামগ্রিক প্রতিরোধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করতে হবে। তিনি ন্যায়, সাম্য, স্বাধীনতা, শৃঙ্খলা ও প্রেমের মাধ্যমে রাজনৈতিক মুক্তি আনতে সমগ্র দেশবাসীকে আহ্বান জানান। তবে তিনি সর্বদা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করতেন, যা তাঁর দেশপ্রেমের আদর্শকে অন্যদের থেকে ভিন্নতা এনে দেয়। পাশাপাশি তিনি বাংলাসহ ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে ব্রিটিশ-ভারতীয় রাজনৈতিক প্রশাসকদের অন্যায্য আন্তঃপ্রাদেশিক শুল্কব্যবস্থা আরোপের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিবাদী হন এবং ইতিহাস থেকে শাসকদের শিক্ষা নেওয়ার জন্য উপদেশ দেন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দেশপ্রেম তাঁর বিভিন্ন রচনায় ফুটে উঠেছে। তিনি বাংলার রাজবন্দিদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির যোগে বাংলার কংগ্রেস সংগঠনগুলোর পুনরুজ্জীবনের দায়িত্ব জাতীয় মাধ্যমে পালনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। নেতাজি তারুণ্যের করণীয় বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, তরুণদের উচিত সব প্রতিবন্ধকতা, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা। তিনি ইংরেজদের হাত থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সদা সোচ্চার ছিলেন। তিনি বলেন, জাতি গঠনের জন্য দরকার খাঁটি মানুষ এবং স্বদেশকে রক্ষার জন্য চাই দেশাত্মবোধ। তিনি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের জন্য--নির্যাতন, নিপীড়ন ও শোষণের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য অঙ্গীকার করেন এবং তা পূরণের লক্ষ্যে সর্বতোভাবে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি শুধু কতিপয় প্রাদেশিক অঞ্চলের হিন্দু-প্রাধান্যের ভিত্তিতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হিন্দুদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করেন। ভারতবর্ষের পরাধীনতাকে তিনি দাসত্বের সঙ্গে তুলনা করেন এবং এই দাসত্ব অবসানের লক্ষ্যে শ্রমিকসহ সকল জনগোষ্ঠীকে সংগ্রামী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সাইমন কমিশনের তীব্র সমালোচনা করেন এবং বলেন, একটি বিদেশি জাতির দ্বারা গঠিত কমিশনের ভারতীয় জাতিগোষ্ঠীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কোনও অধিকার নেই। তিনি ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য জনগণের কাছে আকুল আবেদন জানান। একই সঙ্গে দেশকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ--এ দুটি কৌশল অবলম্বনের জন্য দেশের মানুষের কাছে বিনীত অনুরোধ জানান। সুভাষ বসু তাঁর লেখার মাধ্যমে ঔপনিবেশিকতার স্বরূপ যথার্থ প্রক্রিয়ায় বিশ্লেষণ এবং যুবসমাজকে এই শোষণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। পাশাপাশি যুবসমাজের মধ্যে নতুন চিন্তাধারা ও কর্ম-মানসিকতা সৃষ্টির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের স্বরূপ বিশ্লেষণ করেন। ব্রিটিশদের শোষণমূলক নীতির কারণে ভারতের থানবস্ত্র কীভাবে অসম বাণিজ্যের সম্মুখীন হয় এবং ভারতের বাণিজ্যিক অর্থনীতি কীভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তা বিস্তারিত আলোচনা করেন।

সুভাষচন্দ্র বলেন, ভারতে বৌদ্ধিক, নৈতিক এবং পার্থিব সব ধরনের সম্পদ রয়েছে। ভারতবাসীকে উৎপাদনশীল কর্মে নিয়োগ করতে পারলে বিস্ময়কর সফলতা অর্জন করা সম্ভব। তবে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে নতুন সমাজ গড়তে হলে জাতিভেদ প্রথা দূর করতে হবে ও সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নারীর শৃঙ্খলকে ভাঙতে হবে, বর্ণবৈষম্য দূর করতে হবে এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে শিক্ষা এবং আত্মোপলব্ধির সমান সুযোগ দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, সামাজিক নীতিবোধসমূহ সমাজজীবনের ভিত্তি হওয়া উচিত, সেগুলো হচ্ছে ন্যায়, সাম্য, স্বাধীনতা, শৃঙ্খলা এবং দেশপ্রেম। তিনি আরও বলেন, সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবরকম সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক শৃঙ্খল থেকে নিজেদেরকে মুক্ত হতে হবে, সর্বোপরি পূর্ণভাবে স্বাধীন হতে হবে।

অন্যদিকে সত্যেন সেন তাঁর রচনায় মূলত ময়মনসিংহের হাজং আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা সম্পর্কে আলোচনা করেন। একই সঙ্গে তিনি নাচোলের কৃষক বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফলসমূহ বিশ্লেষণ করেন। তার বিশ্লেষণে দেখা যায়, কীভাবে দেশীয় জমিদারগোষ্ঠী ইংরেজদের প্রত্যক্ষ মদদ ও সহযোগিতায় সাঁওতাল কৃষকদের বিদ্রোহকে নির্মমভাবে দমন করে। অন্যদিকে ড. সুনীল সেন তাঁর লেখায় দেখান যে, ব্রিটিরা কীভাবে কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে কৃষকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এবং চরম শোষণ-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদিত কৃষিসামগ্রীর সিংহভাগ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। একই সঙ্গে তিনি ব্রিটিশশাসন ও শোষণব্যবস্থার বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের কৃষকদের সামষ্টিক আন্দোলন বিশেষ করে তে-ভাগা আন্দোলন, বর্গাদার বিল বিষয়ে প্রতিবাদী হওয়ার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেন। সর্বোপরি কৃষি উৎপাদনব্যবস্থায় তাঁবেদার জমিদারগোষ্ঠী ও ব্রিটিশ শাসকদের শোষণ ও নিবর্তনমূলক ভূমিকার বিষয়ে বিশ্লেষণমূলক তথ্যাদি তুলে ধরেন।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র সপ্তম খণ্ডে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকারী বিপ্লবী, খ্যাতিমান লেখক সুপ্রকাশ রায়-এর ভারতের কৃষক-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং ইতিহাসবিদ বিহারিলাল সরকার-এর তিতুমীর বা নারকেলবেড়িয়ার লড়াই বই দুটির রচনাসমূহ গ্রথিত হয়েছে। সুপ্রকাশ রায় তাঁর রচনায় অষ্টাদশ শতাব্দীর কৃষক-সংগ্রামের প্রেক্ষাপটসহ অভিন্ন বাংলার নানা ধরনের বিদ্রোহ যথা সন্ন্যাসী-বিদ্রোহ, মেদেনীপুরের বিদ্রোহ, ত্রিপুরার সমশের গাজীর বিদ্রোহ, কৃষক-তন্তুবায়গণের সংগ্রাম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বিদ্রোহ, নীলচাষির সংগ্রাম, লবণশিল্পকে কেন্দ্র করে মালঙ্গীদের সংগ্রাম, রেশমচাষিদের সংগ্রাম, আফিম ও আফিমচাষিদের শোষণের বৃত্তান্ত, রংপুর বিদ্রোহ, যশোর-খুলনার প্রজা বিদ্রোহ, বীরভূমের গণবিদ্রোহ, বীরভূম-বাঁকুড়ার পাহাড়িয়াদের বিদ্রোহ, বাখরগঞ্জের সুবান্দিয়া বিদ্রোহ, দ্বিতীয় চোয়াড় বিদ্রোহ, ময়মনসিংহের কৃষক বিদ্রোহ, সন্দীপের তৃতীয় বিদ্রোহ, ময়মনসিংহের হাতিখেদা ও পাগলপন্থি বিদ্রোহ, গারো বিদ্রোহ, ফরাজী বিদ্রোহ, ত্রিপুরার কৃষক বিদ্রোহ, সুন্দরবন অঞ্চলের বিদ্রোহ, সন্দীপের চতুর্থ বিদ্রোহ, সিরাজগঞ্জ বিদ্রোহ এবং যশোরের নীলচাষিদের বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট ও ফলাফল বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন।

উল্লেখ্য, ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুধু শিক্ষিত ও সুধীসমাজকে সম্পৃক্ত করেনি বরং সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও আদিবাসীরাও নিজ নিজ অধিকার আদায়ে সোচ্চার হন। তারা নানা ধরনের প্রতিবাদ, সংগ্রাম ও বিপ্লবের মাধ্যমে শোষণ ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদী হন। সুপ্রাচীন কাল থেকেই বিদেশি শক্তির লোলুপ দৃষ্টির শিকার হয়েছে এই উপমহাদেশের সাধারণ কৃষক-শ্রমিক সমাজ। তাই প্রতিবাদের প্রাথমিক সূচনাও হয় এই কৃষকসমাজের মাধ্যমে।

লেখক তার বিশ্লেষণে বলেন, বাংলা-বিহারের কৃষক আন্দোলনের পেছনে রয়েছে করুণ ও ঘৃণ্য স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ইতিহাস। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উপমহাদেশের প্রধান রাজশক্তিগুলোর মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতায় গিয়েই তারা দেশীয় কিছু তাঁবেদারকে দিয়ে বাংলার সাধারণ কৃষকদের শোষণ করতে শুরু করে। ভূমিব্যবস্থায় পরিবর্তন ও কর প্রদানের নতুন নিয়ম করে, সর্বোপরি করের পরিমাণ বাড়িয়ে সাধারণ কৃষক-শোষণের চরমতম পর্যায়ে পৌঁছায় তারা। ব্রিটিশদের শোষণের কারণে ১৭৭৩ সালে সমগ্র বাংলাজুড়ে শুরু হয় ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ। ফলে শোষণের বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে ওঠে সাধারণ কৃষকসমাজ।

 কৃষকদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে সাধারণ কারিগরশ্রেণি। তবে ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে একাধিক বিদ্রোহ ঘোষণা করে ভারতবাসী--যার মধ্যে ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ অন্যতম। অনেকেই এই বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদেরকে বাংলা ও বিহারের বাইরের থেকে আগত ডাকাত-দস্যু বলে দাবি করে। তবে উইলিয়াম হান্টার বলেন, ‘এরা কোনও দস্যু দল তো নয়ই বরং এরা ছিল বেকার, বুভুক্ষু ও শোষিত সাধারণ মোগল সেনা ও কৃষকশ্রেণি, যাদের সাথে যুক্ত হয় ভূমিহীন এবং গৃহ ও জীবিকাহীন চাষির দল।’ এই বিদ্রোহের বিভিন্ন পর্যায়ে ফকির মজনু শাহ, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী প্রমুখ নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন।

এদিকে ব্রিটিশ সরকার গারো পাহাড় অঞ্চলকে করায়ত্ত করতে ব্যর্থ হয়ে ছলে, বলে, কৌশলে অত্যাচার ও নিপীড়ন অব্যাহত রাখে। হাজংরা তাদের অধিকার রক্ষায় তীব্র আন্দোলন শুরু করে। ব্রিটিশ সরকার ১৮৬৯ সালে ‘গারো পাহাড় অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে রাতারাতি পাহাড়ি সম্পদ নিজেদের করায়ত্ত করে নেয়। সাধারণ জমিদারশ্রেণি এতে তাদের অধিকার হারালে তা পুষিয়ে নিতে গারো পাহাড়ের হাজংদের ওপর খাজনার হার বাড়িয়ে দেয়। জমিদাররা ‘টংকপ্রথা’সহ বিভিন্ন নিয়মনীতির নাগপাশে হাজংদের শোষণ করতে থাকে। ফলে ১৮৯০ সালে গোঁড়া চাঁদের নেতৃত্বে এই হাজং বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। এখানে রাজপরিবারের নিকটাত্মীয় মণি সিং-এর কথা উল্লেখ্য, তিনি নিজ স্বার্থ ত্যাগ করে সাধারণ হাজংদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদেরকে সংঘবদ্ধ করেছিলেন। এদের আন্দোলনের প্রভাবে জমিদারশ্রেণি ‘টংকপ্রথা’ তুলে দিয়ে খাজনা প্রথা আরোপ করতে বাধ্য হয়। কৃষকরা প্রাথমিক পর্যায়ে সাফল্য পেলেও সরকার জমিদারদের পাশে দাঁড়ালে হাজং আন্দোলন বাধার সম্মুখীন হয়।

 সুপ্রকাশ রায় ঊনবিংশ শতাব্দীর কৃষক বিদ্রোহের নেপথ্যের কারণসমূহ তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরেন। ইংরেজরা তাদের আগমনের শুরুতেই এদেশের ভূমিব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল জমির ওপর রাষ্ট্রের আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কৃষক ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর জমিতে ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠা করে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থব্যবস্থায় পরনির্ভরশীলতার সূচনা করে। পাশাপাশি তারা স্থানীয় বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য পশ্চিমা পণ্যের আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করে। এদেশ থেকে তারা কাঁচামাল সংগ্রহ করে নিজেদের দেশে নানা ধরনের পণ্য-সামগ্রী প্রস্তুত করে সেগুলোকে ভারতবর্ষে বাজারজাতকরণের মাধ্যমে ভারতের রপ্তানিমুখী ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পূর্ণ ধ্বংস করেন। জমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মাধ্যমে ভূমির ওপর সাধারণ মানুষের আইনগত ও ঐতিহ্যগত অধিকার কেড়ে নিয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত ভারসাম্য নষ্ট করে। এছাড়া ‘সূর্যাস্ত আইন’-এর মতো কঠোর আইনের মাধ্যমে তারা জমিদারশ্রেণিকে সাধারণ কৃষকের ওপর নির্যাতন করার সংস্কৃতি চালু করে। তবে নির্যাতিত কৃষকসমাজ যখন আত্মসচেতন হতে শুরু করে তখনই ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে এদেশে নতুন মধ্যবর্তীশ্রেণির জন্ম হয়। এরাই মূলত বঙ্গ রেনেসাঁর সূচনা ঘটায়।

১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ ছিল প্রথম সর্বজনবিদিত, যা ছিল সুসংগঠিত ও সশস্ত্র আন্দোলন। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এই আন্দোলনই প্রথম এদেশবাসীকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তোলে। তবে নেতৃত্বের বিরোধ, গণসচেতনতার অভাব, জমিদারদের অসহযোগিতা, ইংরেজ সামরিক শক্তির প্রভাব, কৌশল নির্ধারণে ব্যর্থতা প্রভৃতি কারণে এই মহাবিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

 তবে এ কথা স্বীকার্য সিপাহি-বিদ্রোহসহ অন্যান্য বিদ্রোহের ফলে ইংরেজশাসকের ভিত নড়ে ওঠে। এর ফলে ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারতীয় শাসন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। আপাতদৃষ্টিতে শোষণের অভিঘাতে দেশবাসী চরমভাবে শোষিত ও নির্যাতিত হলেও অত্যাচারের ভেতর থেকেই তারা আহরণ করেছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংঘবদ্ধ শক্তি--যা বাস্তবে স্বাধীনতার পূর্বশর্ত।

বিহারিলাল সরকার তিতুমীরের অভূতপূর্ব অবদান--বিশেষ করে মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত ও বেগবান করার জন্য তাঁর যে বিপ্লবী ভূমিকা--সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিতুমীর বা নারকেলবেড়িয়ার লড়াই গ্রন্থে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নানা দিক আলোকপাত করেছেন লেখক। লেখক এখানে দেখিয়েছেন, আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিতুমীর যে বাঁশের কেল্লা তৈরি করেছিলেন তা মূলত ছিল ভারতের ব্রিটিশশাসনকে প্রতিহত করার একটি পরিকল্পিত পরিকল্পনা। তিনি কেবল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হননি, বরং স্থানীয় জমিদার যারা ব্রিটিশরাজের তাঁবেদার হিসেবে গ্রামের কৃষকদের ওপর অমানবিক শোষণ ও নির্যাতন চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি গ্রামের কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদারদের ও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি বড় গণবাহিনী গড়ে তোলেন, যারা মূলত বাঁশের লাঠি এবং দেশীয় অস্ত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ-শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ব্রিটিশ-শাসকদের বিরুদ্ধে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং একপর্যায়ে নদীয়া ও ফরিদপুর জেলাকে মুক্ত করেন। এই সময় তিনি একটি বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন এবং ব্রিটিশ বাহিনীকে বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত এবং পর্যুদস্ত করেন। তিতুমীর স্থানীয় জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে প্রতিকার দাবি করে কোনো ন্যায়বিচার না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন, যার অবসান ঘটে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর, যখন ব্রিটিশ বাহিনী ব্যাপক সৈন্য-সমাবেশের মাধ্যমে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করে তিতুমীর এবং তার বাহিনীর সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে। তবে তিতুমীর এদেশবাসীকে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হন যে, অধিকার আদায়ে প্রতিবাদ ও সংগ্রামের কোনও বিকল্প নেই।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র অষ্টম খণ্ডে সুপ্রকাশ রায়, সখারাম গণেশ দেউস্কর, শ্রী অরবিন্দ ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। সুপ্রকাশ রায় মুক্তি-যুদ্ধে ভারতীয় কৃষক বইয়ের রচনাসমূহে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার লক্ষ্যে যেসব বিদ্রোহ সংগঠিত হয় যথা বারাণসী বিদ্রোহ, ওয়াহাবি বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, মোপলা বিদ্রোহ, ছোটনাগপুরের কোল বিদ্রোহ, নাগা বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, ত্রিপুরার রিয়াং বিদ্রোহ, হাজং বিদ্রোহ, ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের প্রজাবিদ্রোহ, তেলেঙ্গানা বিপ্লব ও কাকদ্বীপ, সোনারপুর, ভাঙরের কৃষক সংগ্রামের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন।

 লেখক তাঁর বিশ্লেষণে বলেন, ব্রিটিশরা বিভিন্ন প্রদেশের দুর্বল রাজাদের গদিচ্যুত করে তাদের পছন্দমতো বিশেষ ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। পরে সেই ব্যক্তি ব্রিটিশদের চাহিদামতো অধিক খাজনা আদায় করতে শুরু করে। ফলে ওই তাঁবেদারগোষ্ঠী কৃষকদের ওপরে যে অকথ্য নির্যাতন শুরু করে তার ফলে হিন্দু-মুসলিমসহ সব সম্প্রদায় ও শ্রেণিই ফুঁসে ওঠে। এর মাঝে শুরু হয় ওয়াহাবি আন্দোলন। প্রায় একই সময়ে ব্রিটেনে কাপড়কলের আবিষ্কারে অধিক নীলের চাহিদা সৃষ্টি করে, যার প্রভাব পড়ে স্থানীয় ধান-পাটচাষিদের ওপর। ইংরেজরা নীলকরদের সহায়তায় অমানুষিক নির্যাতন চালায় স্থানীয় কৃষকদের ওপর। এই অত্যাচারের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষায় ওয়াহাবি আন্দোলন, হাজি শরিয়তউল্লাহ ও তাঁর পুত্র মহসিনউল্লাহ দুদু মিয়ার সংগ্রাম, তিতুমীরের নারকেলবাড়িয়ার আন্দোলন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সম্ভবত তিতুমীরই প্রথম ব্রিটিশ সৈন্যের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত ও সশস্ত্র আন্দোলন পরিচালনা করেন। তবে এই আন্দোলনের প্রেরণা এসেছিল নীল বিদ্রোহের সাধারণ কৃষকদের মধ্য থেকে।

 এছাড়া এই সময়ে সিধু, কানু, ভৈরব ও চাঁদ নামক সাঁওতাল নেতাগণ জোতদার, মহাজন ও অত্যাচারী পুলিশের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ শুরু করে তা ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ময়মনসিংহের হাজং আন্দোলন গারো পাহাড়ের আদিবাসীদের স্বাধিকার আন্দোলনে আরেক দৃষ্টান্ত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাজং আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। এ সময় ভারত স্বাধীন হলেও হাজংরা জমিতে তাদের অধিকার ফিরে পায়নি। মুসলিম লীগ সরকার হাজংদের দমন করতে কঠোর নীতি অবলম্বন করে। অতঃপর হাজংরা দেশত্যাগে বাধ্য হয়।

ব্রিটিশ শাসনের সময় হতেই নাচোলের কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্য অধিকার দাবি করে আসছিল। ১৯৪৮ সালে ‘তেভাগা আন্দোলন’-এর মাধ্যমে তা সাংগঠনিক রূপ পরিগ্রহ করে। সাঁওতাল তেভাগা আন্দোলন প্রাথমিক পর্যায়ে সফলতা পায় ইলা মিত্রের যোগ্য নেতৃত্বের কারণে। তবে সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে পাঁচজন পুলিশ সদস্য নিহত হলে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। হত্যা করা হয় বহু সাঁওতাল নারী-পুরুষকে। অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান নেত্রী ইলা মিত্র। এভাবে সাঁওতাল বিদ্রোহের আগুন দেশ থেকে নিভিয়ে ফেলা হলেও সাধারণ মানুষের অন্তরে তা আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের তীব্র শক্তি জোগায়।

এ খণ্ডে আরেকজন খ্যাতনামা লেখক সখারাম গণেশ দেউস্করের দেশের কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লেখক তাঁর রচনায় অভিন্ন বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশেষ করে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং উৎপাদনব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, ব্রিটিশদের ভারতবর্ষে শাসন ও শোষণের কারণে এদেশের সাধারণ মানুষ শুধু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়নি বরং তাদেরকে মানসিকভাবেও রীতিমতো নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে। কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তায় নাজুকতা সৃষ্টি করা, পাশাপাশি ভারতের পণ্য-সামগ্রী বিশেষ করে শিল্পের কাঁচামাল ব্রিটেনে পাচার করার মাধ্যমে দেশীয় শিল্প ধ্বংসের যে নীলনকশা ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল তার বিবরণ পাওয়া যায় লেখকের সার্বিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে। তিনি আরও বর্ণনা করেন যে, ব্রিটিশদের শোষণমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে ভারতের অর্থনীতিতে আয় ও ব্যয়ের বড় ধরনের ব্যবধান সৃষ্টি হয়। 

 অন্যদিকে শ্রী অরবিন্দ ভারতের রাষ্ট্রনীতিক প্রতিভায় দেখান যে, কীভাবে ইংরেজ শাসনে ভারতবাসীর ভাগ্যে চরম দুর্দশার সূচনা হয়। পাশাপাশি তিনি প্রাচীন ভারতে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূল নীতি ও স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করেন এবং ভারতীয় রাষ্ট্র বিকাশের ক্রমধারাকে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেন। এছাড়া ভারতীয়দের মধ্যে অনৈক্য কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসকদের ভিত্তিকে শক্ত করে এবং ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলে তার বিশদ বিশ্লেষণ করেন লেখক।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর লেখায় একদিকে স্বদেশি আন্দোলন, অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলন সম্পর্কে বিশ্লেষণ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর স্বাধিকার আন্দোলনে এই সত্যাগ্রহ আন্দোলন প্রত্যক্ষভাবে সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতার পক্ষে এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে। লেখক স্বরাজ সাধনার ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন, এটি হচ্ছে একধরনের মানসিক উপলব্ধি, যা নির্ভর করে আমাদের জাতীয়তাবাদী মন-মানসিকতার ওপর। বিশেষ করে এটি জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনায় নিজেদের মধ্যে একধরনের সংহতি তৈরির মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন বেগবান করার এবং দেশীয় পণ্য-সামগ্রী ব্যবহার ও বিদেশি পণ্য বর্জন করার মতো একটি মানসিক অবস্থা তৈরি করায়।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র নবম খণ্ডে ইতিহাসবিদ রজনীকান্ত গুপ্তর অসামান্য কর্মযজ্ঞ সিপাহী-যুদ্ধের ইতিহাস বইটির পাঁচ ভাগ-এর মধ্যে তিন ভাগ সন্নিবেশ করা হয়েছে। প্রায় দেড়শ বছর আগে প্রথম প্রকাশিত এই বইটির গুরুত্ব অপরিসীম। রজনীকান্ত গুপ্ত ভারতবর্ষে সিপাহি যুদ্ধের পূর্বাপর প্রেক্ষাপটকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম, বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিনির্ভর বিষয়বস্তুর আলোকে বিশ্লেষণ করেন। তিনি শুরুতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ কোম্পানির প্রথম অভ্যুদয়ের প্রাক্কালে যে লোমহর্ষক ও ভয়ংকরভাবে অন্ধকূপ হত্যা সংঘটিত হয় তার বিবরণ তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে লর্ড ডালহৌসীর আট বছরের শাসনকালে কীভাবে পাঞ্জাবে বসবাসরত শিখদের পরাজিত করে তাদেরকে ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধিদের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য করা হয় তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ পাওয়া যায় এ বইয়ে। একই সঙ্গে কীভাবে বিনা বিচারে রনজিৎ মহিষী বিন্দনকে রাজ দণ্ডাদেশ প্রদানের মাধ্যমে দেশকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন ষড়যন্ত্র ব্রিটিশ-শাসকরা চরিতার্থ করে তা ব্যাখ্যা করেন। পাশাপাশি ডালহৌসী কীভাবে সেতারা, ঝাঁঝী ও নাগপুর ধ্বংসে মত্ত হন সে বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। রজনীকান্ত তাঁর লেখায় আরও বলেন, নাগপুরের উৎপাদিত তুলা না পেলে ম্যানচেষ্টারের বণিক সম্প্রদায় বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। সেই সঙ্গে বিরার, পইনঘাট, তুঙ্গভদ্রা ও কৃষ্ণার মধ্যবর্তী অঞ্চলের অসংখ্য জনপদ ও রাজ্য কীভাবে জোরপূর্বক ব্রিটিশরাজের সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসা হয় সে বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ দেন।

রাজনীকান্ত গুপ্ত সিপাহি বিদ্রোহের বিস্তারিত বিবরণ দিতে যেয়ে বলেন, ভারতের ইতিহাসে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের ঐতিহাসিক ঘটনাটি মূলত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অবিচ্ছিন্ন অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়। সিপাহি বিদ্রোহ মূলত পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরে শুরু হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। এই বিদ্রোহে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি হলেন ৩৪ বেঙ্গল রেজিমেন্টের পদাতিক ইউনিটের সিপাই মঙ্গল পান্ডে। ২৯ মার্চ তিনি তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ শুরু করেন। এ সময় অন্যান্য সামরিক অফিসার তাকে এই আক্রমণ বন্ধের জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু তিনি তাদের আদেশ অমান্য করে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে এই সিপাহি বিদ্রোহ গোটা উত্তর ও মধ্য ভারতে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে মিরাটে ১০ মে কমপক্ষে ৮৫ জন সিপাহি এই বিদ্রোহে সামিল হন। উল্লেখ্য, এই যুদ্ধের নেপথ্যে অন্যতম যে বিষয়গুলো কাজ করেছিল তার মধ্যে একটি হলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদের হাতে ভারতীয় সেনারা বিশেষ করে সিপাহিরা নানাভাবে নিগৃহীত হতেন। এমনকি বিনা কারণে এবং বিনা অপরাধে তাদেরকে অমানুষিক শাস্তি ভোগ করতে হত। দ্বিতীয়ত : এই যুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের একটি ঘটনা সিপাহিদের প্রচণ্ডভাবে উত্তেজিত করে, যার মূল কারণ ছিল বন্দুকে ব্যবহৃত কার্তুজ শুকরের চর্বি দিয়ে আচ্ছাদিত থাকত বলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সৈন্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। তৃতীয়ত : ভারতীয় সিপাহিরা ব্রিটিশ শাসনের অবসানের জন্য এই বিপ্লবের সূত্রপাত করেছিল। চতুর্থত : ভারতীয় সাধারণ সেনারা মনে করতে শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ-শাসন ভারতবর্ষের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতিনীতিসহ সামগ্রিক মূল্যবোধকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্রিটিশ-সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এদেশের সমাজ ও সভ্যতাকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। পঞ্চমত : ব্রিটিশ-শাসনের মাধ্যমে এ দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব চিরদিনের জন্য ভারতবাসীর হাতছাড়া হয়ে যাবে। এতে পরবর্তীতে ব্যবসা-বাণিজ্য, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর ওপর ভারতবাসীর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ষষ্ঠত : ব্রিটিশ শাসকদের ‘বিভাজনের মাধ্যমে শাসননীতি’ সাম্প্রদায়িক সংহতিতে বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরাবে। সর্বোপরি, ব্রিটিশ সামরিক কমান্ড ভারতীয় সৈন্যদের নিজস্ব বাহিনীর অধীনস্ত করার নীলনকশা বাস্তবায়ন করার জন্য ভারতের বিভিন্ন সেনা রেজিমেন্টের সদস্যদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছিল।

রজনীকান্ত গুপ্ত তাঁর লেখায় আরও দেখানোর চেষ্টা করেন যে, ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধিরা দেশীয় সৈন্যদের অসন্তোষের কারণ নিরূপণপূর্বক ঘৃণিত এবং অশ্রদ্ধেয় সকল নিয়ম পরিহারে বাধ্য হয়। এর ফলে যে হিংসা এবং ক্রোধ সিপাহিদের মধ্যে দেখা দেয় তা ধীরে ধীরে প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের পর্যায়ে রূপান্তরিত হয়--যা পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে বর্বরতা ও লোমহর্ষক কর্মকাণ্ড সংগঠিত করে ভারতের সিপাহিরা তার জবাব দেবার জন্য প্রস্তুত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি, মিরাট ও বারানসিতে ইংরেজ সৈন্যরা কৌশলগতভাবে সিপাহিদের কেবলমাত্র নিরস্ত্র করেই থেমে থাকেনি, সেই সঙ্গে নিরপরাধ শিশুসহ অগণিত সাধারণ মানুষের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেই সঙ্গে দিল্লি, কানপুর এবং লখনৌতে ভারতীয় সিপাহিদের নিরস্ত্রিকরণের পাশাপাশি অসংখ্য সেনাসদস্যকে হত্যা ও চাকুরিচ্যুত করা হয়। তবে সিপাহি বিদ্রোহের ফলাফলের মধ্যে যে ইতিবাচক বিষয়টি ছিল তা হল ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান এবং ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধির মাধ্যমে সরাসরি ভারত-শাসনের ব্যবস্থা প্রবর্তন। দ্বিতীয়ত : ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধিবৃন্দ ভারতের প্রশাসনিক ও আর্থিক সংস্কারের নিমিত্তে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। তৃতীয়ত : ভারতীয় সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠন করা হয়। চতুর্থত : ভারতীয় জনগণের প্রত্যাশার বিষয়গুলো নিয়ে ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধিদের সাথে সরাসরি আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পঞ্চমত : ভারতের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম যথা--সড়ক, রেল, টেলিগ্রাফ ও কৃষিতে পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোতে বড় ধরনের হস্তক্ষেপ না করে ভারতবাসীর ওপর ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। তবে সিপাহি বিদ্রোহের পরবর্তীতে ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধি অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে ভারতীয়দের ওপর কতগুলো সাংবিধানিক বিধিনিষেধ জারি করে যা ভারতীয় হিন্দু ও মুসলিম সমাজকে আরও নাজুক অবস্থার দিকে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে ভারতের ঐতিহ্যগত সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে এবং ব্রিটিশ ধারায় ভারতবর্ষে একটি নব্য মধ্যবৃত্তিশ্রেণির বিকাশ ঘটে--তবে এরাই পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সৃষ্টির পরিবেশকে ত্বরান্বিত করে।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র দশম খণ্ডে যাঁদের লেখা সংকলিত হয়েছে তাঁরা হলেন ড. অতুল সুর, সালাহ্উদ্দিন আহ্‌মদ, আহমদ ছফা, শওকত ওসমান, ভূদেব মুখোপধ্যায়, আবদুল হক, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আবু জাফর শামসুদ্দীন, অজয় রায়, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, খোন্দকার আবদুল হামিদ, এনায়েতুল্লাহ খান, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ও অন্নদাশঙ্কর রায়।

ড. অতুল সুর তাঁর রচনায় মূলত বাংলায় মুসলিম রাজত্বের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, বাংলা দখল করার পর থেকে প্রায় ৫০০ বছর ধরে বহু বহিরাগত মুসলিম-শাসক ধর্মীয় উন্মাদনায় মত্ত হয়ে স্থানীয় হিন্দু ও বৌদ্ধদের ধর্মান্তরকরণে অভিযান চালায়। পাশাপাশি বহু হিন্দুরাজ্য দখল, মঠ-মন্দির ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি মুসলিম শাসকেরা নানাধরনের প্রজাহিতকর পদক্ষেপ যথা রাস্তাঘাট নির্মাণ, পুকুর খনন, বাঁধ ও সেতু নির্মাণ ইত্যাদি উদ্যোগ গ্রহণ করে। অন্যদিকে সালাহ্উদ্দীন আহ্‌মদ তাঁর লেখায় ১৮৫৭-১৯০৬ সালের মধ্যে বাঙালি মুসলিমসমাজে রাষ্ট্রচিন্তা ও জনমতবিষয়ক আলোচনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেন। সেই সঙ্গে উনিশ শতকে বাংলার মুসলমানদের শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়গুলো আলোকপাত করেন। তিনি আরও বলেন যে, এই সমাজের অর্থনৈতিক ভিত ছিল বড় দুর্বল। বেশির ভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল হিন্দু বণিক ও মহাজনদের হাতে।

আহমদ ছফা তাঁর লেখায় বাঙালি মুসলমানের ভবিষ্যৎ ভাবনা, তাদের মন-মানসিকতা এবং একুশে ফেব্রুয়ারির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের সূক্ষ্মদর্শী বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দুর্দশা, মৃত্যু ও বিভাষিকার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উনিশ শতকের মুসলমানদের মধ্যে ধর্মচিন্তার দুটি ধারা সৃষ্টি হয়। প্রথমটি হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি স্বতন্ত্র মূল্যবোধ তৈরি হয় এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদ। এই দুটি ধারা কালক্রমে বাঙালি জাতির স্বাতন্ত্র্যবোধকে জাগ্রত করতে অনেকটা সাহায্য করে। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের পর আবদুল লতিফ, সৈয়দ আহমদ, আমীর আলীর মতো সংস্কারকরা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে মধ্যবিত্তশ্রেণির বিকাশে রাজনৈতিক মাঠে নিজেদের সংগঠিত করে তোলেন। আহমদ ছফা মুসলমানদের লেখা বিভিন্ন পুথির কড়া সমালোচনা করে বলেন, এইসব লেখকদের বাংলা, আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষায় কোনও জ্ঞান ছিল না। কখনও কখনও তাঁরা হিন্দুদের দেবদেবীদের কটাক্ষ করছেন। এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে তাঁদের চিন্তা-চেতনায় মননশীলতা ও যুক্তিবাদী জ্ঞানচর্চার বিকাশ ঘটেনি। তদুপরি বাংলাদেশকে যারা শাসন করতেন তাদের মধ্যে ছিল বাঙালি ব্রাহ্মণ, কায়স্থ এবং বৈদ্য শ্রেণির লোক--যারা মুসলমান নয়। এমনকি হিন্দু মধ্যবিত্তরা ইউরোপীয় ভাবধারা গ্রহণ করলেও মুসলমান সমাজ তা গ্রহণ করেনি।

আহমদ ছফা ভবিষ্যতের ভাবনা সম্পর্কে বলেন, অতীতে জাতিসমূহ যেমন উৎকট আত্মকল্যাণ বোধের তাগিদে যুদ্ধ করেছে, বর্তমানেও একই বোধের উন্মাদনায় যুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে। লেখক বলেন, পাকিস্তানি আমলের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিকে মুক্তি অর্জনের পথ দেখায়। পরবর্তীতে পশ্চিম-পাকিস্তানের শাসকদের চক্রান্ত, হঠকারী নীতি এবং কর্মসূচি শেষপর্যন্ত বাঙালি জাতিকে মুক্তিসংগ্রামের এক অনন্য পথের সন্ধান দেয়।

শওকত ওসমান ‘মুসলমান মানসের রূপান্তর’ প্রবন্ধে বলেন, নানা উপাদানের প্রভাবে সমাজকাঠামোর মধ্যে পরিবর্তনের ধারা সৃষ্টি করে। তবে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর যারা সবচেয়ে সুবিধা পায় তারা হচ্ছে মুসলিম সমাজ। কিন্তু ধর্মতত্ত্বকে পুঁজি করে সেনাবাহিনীর যোগসাজশে কীভাবে জুলফিকার আলী ভুট্টো পূর্ব-পাকিস্তানে গণহত্যা চালান তা বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। তিনি বলেন, কিছু সমাজসংস্কারক সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ধর্মের নানাবিধ ক্রিয়াচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি মৌলানা আকরম খাঁর মতো প্রগতিপন্থি সমাজ সংস্কারকও মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।

সামাজিক প্রবন্ধ গ্রন্থের লেখক ভূদেব মুখোপাধ্যায় স্বদেশি সমাজে জাতীয় ভাব পরিবর্তনের কারণসমূহ বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রয়াসে ইংরেজরা কতটা হঠকারী নীতি অবলম্বন করে সে বিষয়গুলো তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সেতুবন্ধনের কারণসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই প্রবন্ধে। এছাড়া ভারতবর্ষে জাতীয় ভাবধারার সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রবণতা ও বিচ্ছেদ প্রবণতার পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রভাবকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হিন্দু সমাজব্যবস্থার কাঠামো আলোচনা করতে যেয়ে লেখক বলেন, হিন্দুরা নীতিবোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত, পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল এবং অনাসক্ত চিত্তের অধিকারী। পাশাপাশি বৌদ্ধরাও শান্ত, ধৈর্যশীল ও সাধনশীল। অন্যদিকে খ্রিষ্টানরা অপেক্ষাকৃত অশান্ত, স্বৈরাচারী, উদ্যমশীল ও ভোগলিপ্সু। তবে পরকালে বিশ্বাসী মুসলমানরা অপেক্ষাকৃত অশান্ত, স্বৈরাচারী কিন্তু সাম্যবাদী।

আবদুল হক ‘যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতা’ এবং ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ পুনর্নিরীক্ষা’ প্রবন্ধদ্বয়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে ব্যাখ্যা করেন। লেখক বলেন, বাঙালি মুসলমানরা দীর্ঘদিন নিজেদেরকে বাঙালি হিসেবে বিবেচনা না করে পশ্চিমা মুসলমানের ধ্যানধারণা ও সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করে। যে কারণে ব্রিটিশ আগমনের পূর্বপর্যন্ত তারা সাহিত্য, ললিতকলা, দর্শন এবং বিজ্ঞানে বিশেষ কোনও অবদান রাখতে সক্ষম হয়নি। লেখক পাকিস্তান সৃষ্টির আলোকে মুসলিম জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামি রাষ্ট্রের তাৎপর্য অনুধাবন ও বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন। গোড়াতে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ সম্মিলিতভাবে একক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথমবারের মতো হিন্দু ও মুসলমানদেরকে পৃথক ঐতিহ্য, জীবনদৃষ্টি এবং ইতিহাস-চেতনার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে লেখকের বিশ্লেষণে জিন্নাহ তাঁর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রান্ত ধারণা শেষ জীবনে উপলব্ধি করেছিলেন। লেখক আন্তর্জাতিক মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বলেন, জাতীয়তাবাদের রোমান্টিকতায় যাঁরা একসময়ে ইসলামের স্বপ্ন দেখেছেন তাঁরা যদি তা বাস্তবে রূপ দিতে পারতেন তাহলে হয়তো দেশে দেশে খেলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হত না।

মুসলিম জাতীয়তাবাদের বাস্তবতা নিরীক্ষার মাধ্যমে লেখক বলেন, ভাষাগতভাবে পূর্ব-পাকিস্তান ও পশ্চিম-পাকিস্তানের মুসলমানরা এক নয়। কারণ তাদের সামাজিক কাঠামো, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, ইতিহাস-চেতনা এবং ইতিহাস ভিন্ন ধারার এবং বহুলাংশে পৃথক। ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ, বিশেষ করে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধকে বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িকতা নতুন করে সরব হয়ে না উঠলেও একে মুসলিম জাতি রক্ষার সংগ্রাম বলে অনেকে জেহাদের ডাক দেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ রাষ্ট্রীয় সংহতি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় যুদ্ধ দরকার হয়, ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধ করা বোকামি।

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ‘আমার দেশ’ প্রবন্ধে বাংলাদেশের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন দ্রাবিড়, মঙ্গোল, তাতার ও পারসিকদের নিয়ে এক সংমিশ্রিত বা সংকর জাতি সৃষ্টি হয়েছে ভারতবর্ষে। পাশাপাশি ভাষার বিবর্তন হয়েছে প্রথমে লৌকিক থেকে প্রাকৃত, তারপর মাগধী প্রাকৃত এবং পরিশেষে বাংলা। আবু জাফর শামসুদ্দীন ‘জাতীয় ইমেজ’ বিশ্লেষণ করে বলেন, এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন। অজয় রায় তাঁর ‘জাতীয়তাবাদ : পাকিস্তান ও বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে বাঙালি জাতির বিকাশের প্রতিবন্ধকতাসমূহ বিশ্লেষণ করেছেন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উপাদানসমূহ যথা ভাষা আন্দোলন, রাজনীতিক দলের ভূমিকা, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতা-উত্তর স্বৈরাচারী আন্দোলনসমূহকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। খোন্দকার আবদুল হামিদ এবং এনায়েতুল্লাহ খান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে বিশ্লেষণ করেছেন জাতি ও জাতীয়তার প্রেক্ষাপট, ভৌগোলিক অবস্থান, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক উন্মেষ ইত্যাদির ভিত্তিতে।

স্বামী বিবেকানন্দ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখান যে, ইউরোপীয়দের দৃষ্টিতে ভারতের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী হচ্ছে হতদরিদ্র, দুর্ভিক্ষপীড়িত, দাসসুলভ সহিষ্ণু, ধর্মপরায়ণ--সর্বোপরি বহিঃশত্রুর হাতে নিষ্পেষিত। অন্যদিকে ইউরোপীয়রা হিংস্র, ভয়ানক, সুরাসক্ত, জড়বাদী, আচারহীন, পরলোকে অবিশ্বাসী, এবং দেহাত্মবাদী। লেখকের মতে, এই পার্থক্যের অন্যতম কারণ হচ্ছে ভাবের পার্থক্য। একইভাবে লেখক দুটি সভ্যতার বেশভূষা, আহার-রীতি, ধর্ম, শরীরিক ও জাতিগত, রীতিনীতি, শক্তিপূজা ইত্যাদি বিষয়ে পার্থক্যগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি সমাজের ক্রমবিকাশের পার্থক্যগুলো আলোচনা করেছেন লেখক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতির আত্মশক্তি বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে বলেন, জাতি হচ্ছে একটি সজীবসত্তা, একটি মানস পদার্থ যা সর্বসাধারণের ঐতিহ্য এবং অধিকারের প্রতিফলন। ভারতীয় জাতিগোষ্ঠীর উদাহরণ টেনে লেখক বলেন, এই সমাজ হাজার বছরের বিপ্লবে, উৎপীড়নে ও পরাধীনতার শেষ সীমায় তলিয়ে যায়নি যার কারণ হচ্ছে স্বজাতিবোধ। লেখক হিন্দুসমাজের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সমাজের শিক্ষাদান, স্বাস্থ্যদান, অনুদান, ধনসম্পদ দান ইত্যাদিকে সমাজের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু ইংরেজরা এদেশের জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের হীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করে। তাই লেখক ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের সব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য টিকিয়ে রেখে নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হওয়ার জন্য আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, ভারতের সহজ-সরল সাধারণ জনগোষ্ঠী সংযমের দ্বারা, বিশ্বাসের দ্বারা, ধ্যানের দ্বারা এবং বৈরাগ্যের উদার গাম্ভীর্য দ্বারা সমগ্র জাতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করত। কিন্তু বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসকদের বিলাসবহুল জীবন দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজেদের এই সহজ-সরল জীবন-সংস্কৃতিকে হারিয়ে ফেলে। পশ্চিমা সভ্যতার যান্ত্রিক ও ভোগবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের মননশীলতাকে নষ্ট করে ফেলছে। লেখক বলেন, এশিয়া ও ইউরোপের সভ্যতা অনেকটা একমুখী বৈশিষ্ট্য দ্বারা পরিচালিত। তবে গ্রিসের সভ্যতা যেমন দ্রুত বিকাশ লাভ করে, ভারত ও মিশরীয় সভ্যতা সে তুলনায় অনেকটা অচল ও স্থবির অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। সেই সঙ্গে ভারতবর্ষের বর্ণাশ্রম ও ধর্মের সংকীর্ণতা দেশের উন্নয়নের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ভূদেব মুখোপাধ্যায় ভারতবর্ষে ইংরেজশাসনের প্রভাবকে বিশ্লেষণ করে বলেন, ইংরেজদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদ এই দেশের প্রচণ্ড ক্ষতি করেছে, কারণ ইংরেজ রাজশক্তি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে খর্ব করেছে। এমনকি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নামে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে। আপাতদৃষ্টিতে নানা ধরনের সংস্কারমূলক কর্মসূচি কল্যাণমূলক হলেও ইংরেজরা এদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির লক্ষ্যে এসব সংস্কারমূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। কাজেই ইংরেজশাসন ভারতের জন্য বাস্তবে কল্যাণ বয়ে আনেনি।

মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বলেন, বর্তমান সভ্যতা যদিও মানবজাতির কল্যাণে পৃষ্ঠপোষকের দাবিদার; কিন্তু ইউরোপীয় সভ্যতা বিশ্বব্যাপী শোষণ ও শাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নানা জাতি, গোষ্ঠী ও ধর্মাবলম্বীদেরকে নাজুক অবস্থায় ফেলেছে। তিনি বলেন, ইউরোপীয়রা একদিকে যেমন বিশ্বের মুসলিম সভ্যতা ধ্বংস করেছে, পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ও জাতিগোষ্ঠীকে শোষণ করে নিজেদের ধনসম্পদ বৃদ্ধি করেছে। লেখক বলেন, দীর্ঘদিনের ইংরেজশাসন যদিও তথাকথিত গণতন্ত্রের ধারা সূচনা করেছে; কিন্তু তা সাধারণ মানুষের কল্যাণ বয়ে আনেনি বরং মহা সর্বনাশ করেছে। একইভাবে এদেশের সমাজে গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমতা প্রতিষ্ঠা না হলে ইসলামি-অ-ইসলামি কোনও ধরনের গণতন্ত্রই সফল হবে না। লেখক ইউরোপ ও আমেরিকার সভ্যতার তুলনা করে বলেন, ওই দেশগুলোর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একধরনের শোষণ ও শাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার মধ্যে তুলনা করে লেখক বলেন, বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপকে দুর্বল করলেও আমেরিকা, যুক্তরাজ্য যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ায় তারা বিশ্বব্যাপী শিল্পশক্তি ও অর্থশক্তির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে এশিয়ার দেশগুলো কাঁচামালের জোগানদাতা হিসেবে এবং শিল্পপণ্যের বাজার হিসেবে রূপান্তরিত হওয়ায় দারিদ্র্যতার চরম সীমায় নেমে যায়। তবে রাজনৈতিক শক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের আধিপত্যবাদ ও নিয়ন্ত্রণবাদ নীতির মাধ্যমে অন্যান্য দেশ যথা চীন, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লিবিয়া, মরক্কো, মিশর ও ইরানকে চাপের মধ্যে রাখে। লেখক ভারতবর্ষে পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে বলেন, হিন্দুদের ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জন্ম হলেও শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে এই রাষ্ট্র অনেকটা পশ্চাৎপদ হয়ে পড়ে।

অন্নদাশঙ্কর রায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বলেন, দেশরক্ষার ক্ষেত্রে ভারতীয় রাজন্যবর্গ খুব বেশি সতর্ক ছিলেন না; এমনকি সমুদ্রপথে যে শত্রুরা প্রবেশ করতে পারে সেই বিষয়টি রাজাদের জানা ছিল না। যে কারণে মুসলমান, শক, হুন, কুশানরা সহজেই এদেশে ঢুকে রাজ্য জয় করতে সক্ষম হয় এবং এর মাধ্যমে নানা ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠীর মিলন ঘটে। কাজেই সব জাতি-গোষ্ঠী, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে আমাদের উচিত স্বজাতির পরিচয়ে নিজেদের পরিচিত করা এবং সবাই মিলে দেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে সংরক্ষণ করা।

লেখক আরও বলেন, ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পরও নানাধরনের জড়তার কারণে আমাদেরকে পরাধীনতার শেকলে আবারও আবদ্ধ হতে হয়েছে। অর্থাৎ ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক নাগপাশ থেকে পরিত্রাণ পেলেও আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের খপ্পরে পড়তে হয়েছে। লেখক বলেন, ব্রিটিশদের শক্তির মূল হল শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি স্বাধীনতা, আর রাশিয়ার শক্তি জারের নাগপাশ থেকে নিজেদের মুক্তি। তবে ভারতের বিপ্লব হতে পারত গান্ধীর দর্শনকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এমনকি তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন মডেল হতে পারত গরিবদের বেঁচে থাকার হাতিয়ার এবং টেকসই উন্নয়ন কৌশল।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র একাদশ খণ্ডে যাঁদের রচনা সংকলন করা হয়েছে তাঁরা হলেন সুকোমল সেন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ, অসিত রায়, আবুল ফজল, অন্নদাশঙ্কর রায়, আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বদরুদ্দীন উমর ও জয়ন্তানুজ বন্দোপাধ্যায়।

ড. সুকোমল সেন আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ও সমাজজীবনে ধর্ম, জাতিভেদ ও শ্রেণিদ্বন্দ্বের বিশ্লেষণ করে বলেন, ভারতবর্ষে রামমোহন, বিদ্যাসাগরের মতো সমাজ-সংস্কারক পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোকে ভারতীয় সমাজের কুসংস্কার ও স্থবিরতাকে কাটানোর চেষ্টা করলেও এসব প্রতিবন্ধকতার অন্তর্নিহিত কারণসমূহ বর্জন করার ব্যাপারে ভারতবাসীর যৌক্তিক ও উদার মনোভাব খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন। ব্রিটিশরা নিজেদের স্বার্থ-চরিতার্থ করার লক্ষ্যে একদিকে যেমন ব্রাহ্মণ ও অব্রাহ্মণ বিভেদটাকে খুঁচিয়ে তোলে, পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে শাসন ও শোষণ প্রক্রিয়া পাকাপোক্ত করে। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে প্রগতিশীল সমাজ-সংস্কারক পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানকে স্বাগত জানিয়ে ভারতে নবজাগরণ সৃষ্টির চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্রিটিশদের ক্ষমতা দখল ভারতীয় এক অংশে যেমন প্রগতিশীল করে, অন্যদিকে রক্ষণশীল হিন্দু পুনরুত্থানবাদী ধারাও সৃষ্টি হয়।

ভারতের রাজনৈতিক ও সমাজ বিকাশের ইতিহাস মূলত নানাবিধ সংঘাতের ইতিহাস। ব্রিটিশরা নিজেদের স্বার্থে ভারতকে বিভক্ত করে; কিন্তু এর ফলে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের পরাজয় ঘটে। স্বাধীনতা (১৯৪৭) পরবর্তী ব্যাপক দাঙ্গা প্রমাণ করে যে, ব্রিটিশদের ক্ষমতা হস্তান্তরও সাম্প্রদায়িকতাকে টিকিয়ে রাখার একটি নীলনকশার অংশ ছিল। লেখকের বিশ্লেষণে, ভারতের রাজনীতিতে শ্রেণিস্বার্থ, সাম্প্রদায়িক স্বার্থের দ্বন্দ্বের সমাধান হতে পারত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে; কিন্তু ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে তা ব্যর্থ হয়। গান্ধীর নেতৃত্বে ১৯২০ সালের ১ আগস্ট থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় এবং তা খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে মিলে ১৯২২ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এর মাঝে খেলাফত উচ্ছেদের পর মুসলমানদের আন্দোলনের ভিত ভেঙে যায় এবং ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার এ সুযোগটি গ্রহণ করে।

১৯৩০-এর দশকে ভারতব্যাপী ব্যাপক শ্রমিক ধর্মঘট পালিত হয়। তবে ১৯৩৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণার পর শ্রমিক অসন্তোষ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এর ফলশ্রুতিতে অত্যাচারিত জমিদার, মহাজন ও জোতদারবিরোধী আন্দোলন ত্বরান্বিত হয়। ১৯৩৪-১৯৩৬ সালের মধ্যে ভারতবর্ষের সর্বত্র কৃষক আন্দোলন তীব্রতর হয় এবং ১৯৩৮ সালে কমিউনিস্টরা কিষাণ কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। ১৯৪৬ সালের শ্রমিক ধর্মঘট, নৌবাহিনীর বিদ্রোহ এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাত ইত্যাদি ব্রিটিশদের ভারত ছাড়তে বাধ্য করে। তবে লেখকের বিশ্লেষণে ভারতীয় রাজনীতিতে ব্রিটিশ-শাসনের অবসান ঘটলেও শ্রেণি-স্বার্থ, সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং শোষণপ্রক্রিয়া রয়েই যায়, যার পরিবর্তন ঘটতে পারত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে।

মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ‘সাম্প্রদায়িক মিলন’ প্রবন্ধে দেখান মূলত ধর্মকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সংঘাত ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়; যার কারণ হচ্ছে ধর্মান্ধতা ও অনুদারতা। তবে ব্রিটিশরা হিন্দু-মুসলমান সংঘাতকে অতি কৌশলে বিভেদের মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। লেখক প্রাচীন ভারতের স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ কাঠামোর অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণ করে বলেন, ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ নিয়ন্ত্রণের পূর্বপর্যন্ত ভারতবর্ষের গ্রামীণ সমাজ ছিল স্বাধীন এবং এক-একটি প্রজাতন্ত্রের মতো; কিন্তু ব্রিটিশ-শাসন ভারতের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে হাজার বছর ধরে চলমান স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে শোষণ ও নির্ভরশীলমূলক সমাজ-কাঠামো সৃষ্টি করে--যা ভারতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ছিল সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। লেখকের বিশ্লেষণে ভারতবর্ষের মুসলমানরা যেমন ব্রিটিশ-শাসনকে মেনে নেয়নি, অনুরূপ হিন্দুরা প্রায় ৮০০ বছরের মুসলিম-শাসনকেও মেনে নেয়নি। পাশাপাশি মারাঠি, রাজপুতরাও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। লেখক পূর্ববঙ্গের জাতিভেদ-বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বলেন, ইসলামের মাধ্যমে সাম্যধর্মের প্রসার ঘটলেও হিন্দুদের জাতপাত ও বর্ণবিভেদের প্রচণ্ডতার অবসান ঘটেনি।

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ‘আদর্শবাদীর দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িক সমস্যা’ প্রবন্ধে বলেন, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানের কারণে সমাজব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে অসমতা। তিনি সাম্প্রদায়িক সংঘাত বিষয়ে বলেন, তা হল নৃশংসতার নামান্তর। সালাহ্উদ্দীন আহ্‌মদ ‘আত্মপরিচয়ের সন্ধানে : একটি ঐতিহাসিক সমীক্ষা’ প্রবন্ধে বলেন, সামগ্রিকভাবে ভারতের মুসলমানরা বিভিন্ন অঞ্চলজুড়ে বসবাস করলেও তাদের মধ্যে এক ধর্মভিত্তিক চেতনার সৃষ্টি হয়--যা প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। লেখক বলেন, জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির পেছনে যে উপাদানটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে সম্মিলিত ঐক্যবোধ। অসিত রায় ‘পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধে বলেন, বাংলা বিভক্তির দায়ভার শুধু জিন্নাহ্র ওপর চাপানো অন্যায়। তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বকারী সাংসদদের অধিকাংশ ছিল দেশীয় নৃপতি, সামন্ত, জোতদার, মুতসুদ্দি, বুর্জোয়া অথবা তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি--যারা রাজ্যের অন্য জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের বিপক্ষে; এমনকি রাজ্যের হাতে বেশি ক্ষমতা দেওয়ার বিপক্ষে। এরা ছিল মূলত বুর্জোয়া রাজনীতিতে বিশ্বাসী। ১৯৪৭-পরবর্তী বাংলায় কায়েম হয় পশ্চিম-পাকিস্তানিদের নেতৃত্বে একধরনের বুর্জোয়াশ্রেণির শাসন-শোষণ, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

আবুল ফজল তাঁর লেখা ‘ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র : এক অবাস্তব কল্পনা’য় বলেন, বিশ্বসভ্যতায় ধর্মীয় প্রভাব রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনস্বীকার্য হলেও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রীয় শাসন ও শোষণ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; যার উদাহরণ বাংলাদেশ। এর পাশাপাশি লেখক ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিপদ, ‘বিদেশি ইজম’, রাজনীতি ও আলেমসমাজ এবং পাকিস্তান জাতীয়তাবাদের বুনিয়াদ সম্পর্কে নানা ধরনের বিশ্লেষণ করেন।

অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর লেখা ‘পুরোনো কাসুন্দী’তে বলেন, হিন্দু, মুসলমান ও শিখদের ‘সম্মিলিত ভারতবর্ষ’--এ ধারণা ও প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তবে লেখকের দৃষ্টিতে সাত শত বছরের পুরোনো ইতিহাসে হিন্দু-মুসলমানদের সমস্যা অনেকটা জটিল। তবে প্রাচীন সমাজের নানক, কবির, চৈতন্য এবং মধ্যযুগে আকবর ও জাহাঙ্গীর এই সমস্যা সমাধানে প্রচেষ্টা চালান; কিন্তু পরবর্তী শাসকরা অনেকটা ধর্মান্ধতার মাধ্যমে এই সম্পর্ক সংঘাতময় করে তোলেন। আহমদ শরীফ ‘সাম্প্রদায়িকতার শেকড় ও শাখা পল্লব’ প্রবন্ধে বলেন, সাম্প্রদায়িকতার শেকড় ছিল মূলত ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণপ্রক্রিয়ার মধ্যে। ইতিহাস বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি দেখান তুর্কি-মোগল শাসনামলে কোনও সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছিল না, বরং পারস্পরিক সম্প্রীতি ছিল অত্যন্ত গাঢ়। কিন্তু ব্রিটিশরা সৃষ্টি করে সংঘাত, বিচ্ছিন্নতা ও শত্রুভাব। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রবন্ধে বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখান জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের উত্থানের পেছনে রয়েছে মূলত ইহজাগতিক চিন্তা ও চেতনা। বুর্জোয়ারা রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করেছে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে।

বদরুদ্দীন উমর ‘ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে’ প্রবন্ধে বলেন, আমাদের দেশের রাজনীতিতে ধর্মের যে ব্যবহার তা অনেকটা সাম্প্রদায়িকতার বহিঃপ্রকাশ। তবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটলেও কিছু রাজ্যে তারা দুর্বল হওয়ায় বামপন্থিরা সরকার পরিচালনায় সক্ষম হয়। এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কোনও জয় হয়নি; যার অন্যতম কারণ হল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রগতিশীল শক্তির অনুপস্থিতি। সম্প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশে ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের চর্চা শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে দরিদ্রতা এবং বেকারত্বের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। জামায়াত ও বিজেপির মতো ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার নামে জনগণকে করেছে বিভক্ত। সেই সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে যোগাচ্ছে ইন্ধন ও সমর্থন, যা রোধ করার কোনও চিন্তা সরকারের নেই। অন্যদিকে জয়ন্তানুজ বন্দোপাধ্যায় ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার উৎস তথা কারণ ও ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, এটি মূলত ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক শাসন ও শোষণের প্রতিফল।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র দ্বাদশ খণ্ডে যাঁদের লেখা সংকলিত হয়েছে তাঁরা হলেন স্বপন বসু, ড. অতুল সুর, মমতাজুর রহমান, আসহাবুর রহমান, আনিসুজ্জামান, ইবনে আজাদ, বদরুদ্দীন উমর, এমাজউদ্দীন আহমদ, শওকত ওসমান ও আবদুল মওদুদ।

স্বপন বসুর গণ-অসন্তোষ ও উনিশ শতকের বাঙালীসমাজ বইটির সব রচনা এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। তাঁর বইয়ে তিনি মূলত বাঙালিদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছেন। এই গণ-বিদ্রোহ ও গণ-আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রোহ, হাজি শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিয়ার ফরায়েজি আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ, সিপাহি বিদ্রোহ, নীলবিদ্রোহ ও প্রজাবিদ্রোহ। অন্যদিকে ড. অতুল সুর তাঁর রচনায় সেই সময়ে ব্রিটিশ-পূর্ববাংলার জনজীবনে যে শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য ছিল তা বিশ্লেষণ করেছেন সেই সঙ্গে তিনি মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণসমূহ পর্যালোচনা করেছেন। পাশাপাশি মুরশিদ কুলি খানের শাসনামলে ঢাকার রাজস্ব আদায়ে অনিয়ম এবং সেইসব অনিয়ম দূরীকরণে তাঁর দূরদর্শিতা বিশ্লেষণ করেছেন। একই সঙ্গে বাংলার প্রশাসনিক সংস্কারে তাঁর অবদান সম্পর্কে আলোচনা করেন। এর সঙ্গে আলিবর্দি খাঁর শাসনামলের চিত্র তুলে ধরে লেখক বলেন, এই সময় দিল্লির বাদশাহর বিরাগভাজন হওয়াসহ মারাঠির দলপতি রঘুজির বাংলা আক্রমণে (প্রায় নয় বছর বাংলায় বর্গিদের লুণ্ঠন) সাধারণ মানুষ যথা-সর্বস্ব হারায়। ড. অতুল সুর তাঁর প্রবন্ধগুলোতে ইংরেজের প্রভুত্ব, ওয়ারেন হেস্টিংস-এর মাধ্যমে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের শক্তি সুসংহতকরণ, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব ও ফলাফল, সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কারণ, নেতৃত্ব ও ফলাফল ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেন। অন্যদিকে মমতাজুর রহমান ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভূমিকা’ শীর্ষক রচনায় ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে বিশ্লেষণ করেন। যেখানে তিনি দেখান যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের মধ্যে একধরনের সংঘাত ও ভিন্নতা বিদ্যমান থাকায় এবং এ দুয়ের মধ্যে সমন্বয় না-হওয়ায় ভারতে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে দুটি ভিন্নধারার মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ হয়েছে।

আসহাবুর রহমান ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদের সমস্যা’ শীর্ষক লেখায় ভারতীয় উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদ বিকাশের সূত্রপাত এবং উপাদানসমূহ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, সেচভিত্তিক কৃষিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রশক্তি মূলত নির্ভর করত সামরিক শক্তির ওপর; যে কারণে এই উপমহাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রশক্তি অনেকটা স্বৈরশাসকের ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি হিন্দুদের বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার কারণে জাতি-বর্ণে প্রচণ্ড বৈষম্য ও শোষণপ্রক্রিয়া চলতে থাকে। অন্যদিকে তুর্কি, আফগান ও মোঘলদের কারণে ধর্মান্তরব্যবস্থার মাধ্যমে জাতি-বর্ণ ব্যবস্থায় প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি রাষ্ট্রকাঠামো সনাতনী কৃষি উৎপাদনব্যবস্থাকে পুঁজি করে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে নিরুৎসাহিত করে।

আনিসুজ্জামান ‘জাতীয়তাবাদ-বিষয়ক ভাবনা’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে গুপ্ত-শাসন ও মোঘল-শাসনের কারণে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে পাল, সেন ও সুলতানি আমলে বাংলার শিল্পকলা, ভাষা, সাহিত্য ও সংগীতের উৎকর্ষের মূল কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা। ইবনে আজাদ ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ’ প্রবন্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বলেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়েছে মূলত তুর্কি-পারসিক মুসলমানদের মাধ্যমে সৃষ্ট মুসলমান জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে। বদরুদ্দীন উমর ‘বাঙলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি’ প্রবন্ধে বলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে পূর্ববাংলার সমাজের উচ্চস্তরে শাসন, শোষণ ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে সম্প্রদায়গতভাবে হিন্দুদের প্রাধান্যের পরিবর্তে মুসলমানদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এমাজউদ্দীন আহমদ ‘বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের প্রকৃতি : ক’টি প্রশ্ন’ প্রবন্ধে বলেন, ‘জাতীয়তাবাদ’ ধারণাটি মূলত বাঙালি, বাংলাদেশি বা মুসলিম জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে এবং এটি হচ্ছে জনসমষ্টির সামগ্রিক চেতনাবোধ। শওকত ওসমান ‘মুসলমানের পক্ষে জাতীয়তাবাদের সমস্যা’ প্রবন্ধে বলেন, ইসলাম ধর্মে ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের কোনও স্থান নেই।

অন্যদিকে আবদুল মওদুদ ‘মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ : সংস্কৃতির রূপান্তর’ বিষয়ে বিশদ আলোচনা ও বিশ্লেষণ করেছেন। লেখক বলেন, ইউরোপে মধ্যবিত্তশ্রেণি বিকাশের মূলশক্তি ছিল শিল্পবিপ্লব। কারণ এর মাধ্যমে একদিকে যেমন শিল্প, ব্যবসা ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল পাশাপাশি সমাজব্যবস্থায় তেমনি একটি নতুন শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল। অর্থাৎ শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার দেশের নাগরিক রূপায়ণ ও নাগরিক সচেতনতা সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিল। তবে পাশ্চাত্যের মধ্যবিত্তশ্রেণির দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয় : প্রথমত এই শ্রেণি নিজেদের পেশাগত স্বার্থের তাগিদে একতাবদ্ধ হয়, দ্বিতীয়ত কতগুলো উদারনৈতিক ও গণতান্ত্রিক জীবনধারার কারণে সামাজিক ও রাষ্ট্রিক কর্মকাণ্ডে নিজেরা সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়--যা পরবর্তীকালে শিক্ষা, অর্থ ও শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একটি নতুন শ্রেণির গোড়াপত্তন করে। অন্যদিকে ভারত উপমহাদেশে পাশ্চাত্যের ন্যায় মধ্যবিত্তশ্রেণি গড়ে উঠতে পারেনি। তার কারণ হচ্ছে এখানে মধ্যবিত্তশ্রেণি সুসংগঠিত হওয়ার উপাদানসমূহের মধ্যে ভিন্নতা ছিল। বিশেষ করে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্ম ও মূল্যবোধভিত্তিক পার্থক্য এবং হিন্দু বর্ণবাদের কারণে ভিন্ন ভিন্নভাবে মধ্যবিত্তশ্রেণির বিকাশ ঘটে। আবার ব্রিটিশদের সমর্থন দেওয়ায় এদেশীয় অভিজাত বর্ণ-হিন্দুদের নিয়ে গড়ে ওঠে নতুন জমিদারশ্রেণি, জোতদারশ্রেণি, বণিকশ্রেণি ও বুদ্ধিজীবীশ্রেণি। অন্যদিকে মুসলমানরা গোড়ার দিকে ব্রিটিশ প্রশাসনকে সহায়তা না করার কারণে তারা শুরুতে এই শ্রেণীভুক্ত হতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তী সময়ে কিছু উদারপন্থি মুসলমান নেতৃত্ব ইংরেজি-শিক্ষার দিকে মুসলমানদের আগ্রহী করে তোলে এবং হিন্দুদের মতো উকিল, ডাক্তার, শিক্ষক ও সরকারি আমলা হিসেবে নিজেদেরকে অধিষ্ঠিত করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে মধ্যবিত্তশ্রেণিতে উন্নীত হতে থাকে। কিন্তু তারা হিন্দুদের সমকক্ষ হতে ব্যর্থ হয়। তবে হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই পাশ্চাত্যের মতো জীবনের সার্বিক মূল্যবোধ নতুনভাবে নির্মাণে সক্ষম হয়নি; কারণ এদেশীয় মধ্যবিত্তশ্রেণির সন্তানরা বাণিজ্য-শিল্পের চেয়ে শিক্ষালাভের দিকে ঝুঁকেছে বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতির রূপান্তর সম্পর্কে লেখক বলেন, ভারত উপমহাদেশে ‘এক ভারতীয় সংস্কৃতি’ বা ‘এক বাঙালি সংস্কৃতি’র অস্তিত্ব গড়ে ওঠেনি। এর কারণ হচ্ছে বহির্বিশ্ব থেকে বৈদিক হিন্দু সম্প্রদায়, মুসলিম সম্প্রদায় ও পরে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশে এদেশের সংস্কৃতির শুধু পরিবর্তন হয়নি বরং শ্রীবৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন আঙ্গিকে বিকশিত হয়েছে। নানা জাতি, গোষ্ঠী, বর্ণ, গোত্র ও নরগোষ্ঠীর ধারা ভারত উপমহাদেশের জীবনস্রোতে মিশেছে--তাদের সকল বৈশিষ্ট্যই এদেশীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে বহু গুণে এবং বহু মাত্রায়।

কাজেই আর্য, অনার্য, কোল, ভীল, মুণ্ডা, সাঁওতাল, মঙ্গোলীয়, গুর্খা, খাসিয়া, ভুটিয়া, অসমিয়া, আরব, তুর্কি, ইরানি, আফগানি, পাঠানি, বর্ণহিন্দু, মুসলমান, পর্তুগিজ, ফরাসি, ব্রিটিশ, দিনেমার ও অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা বহিরাগত হয়েও এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে এদেশের কৃষ্টি তথা জীবনধারাকে করেছে উন্নত। তবে ব্রিটিশরা এদেশীয় আচারব্যবস্থা গ্রহণ করলেও রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে এদেশের লোকদের করেছে শোষণ এবং বঞ্চিত। উচ্চপদসমূহ থেকে ভারতীয়দের বিতাড়িত করার মাধ্যমে তারা এদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্যও নষ্ট করে ফেলে। তবে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে বিশেষ করে ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অজ্ঞতা, ধর্মান্ধতার বিষয়গুলো সহসা পরিত্যাগ করতে পারেনি। এই না-পারার পেছনে যে উপাদানগুলো কাজ করেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্ণভেদব্যবস্থা, শ্রেণিবৈষম্য, শিক্ষা, পেশাগত ভিন্নতা ও মানসিকতা--সেই সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্ম ও সম্প্রদায়ভিত্তিক জটিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। যেমন হিন্দু ধর্মীয় সংস্কারের পরেও সম্ভব হয়নি হিন্দু সমাজকে একটি পরিচ্ছন্ন ও ক্লেদমুক্ত উদার সমাজ ও সংস্কৃতিতে রূপান্তর করা। পাশাপাশি মুসলমান সমাজেও রয়ে যায় বংশমর্যাদার প্রভাব, অভিজাত তথা সম্ভ্রান্তশ্রেণি এবং নিম্নশ্রেণির মধ্যে বৈষম্য ইত্যাদি। পাশাপাশি উদীয়মান মধ্যবিত্তশ্রেণিতে চালু হয় ‘বাবু কালচার’। এ কালচার যেমন নব্য বাবু শ্রেণী তৈরি করতে সাহায্য করেছিল, তেমনি তার গণ্ডি সীমাবদ্ধ ছিল শুধু শহর অঞ্চলে। বস্তুত এ সংস্কৃতি ছিল ইংরেজ-মিশ্রিত অর্থাৎ বেনিয়া, দালাল ও মুতসুদ্দিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি নব্য সংস্কৃতি। পরবর্তীকালে অবশ্য জাতীয় সাংস্কৃতিক চেতনার মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান মিশ্রিত বাংলাসাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। তবে আধুনিক যুগে রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, শিল্পনীতি ও সংস্কৃতিনীতি বিশ্ববলয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিশ্বের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে মিশে গেছে আমাদের সামাজিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহ্যসমূহ। তবে নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছেন আমাদের সৃজনশীল সংস্কৃতি-কর্মীরা।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র ত্রয়োদশ খণ্ডে যাঁদের লেখা সংকলিত হয়েছে তাঁরা হলেন খান সারওয়ার মুর্শিদ, অশোক মিত্র, সরদার ফজলুল করিম, সন্তোষ গুপ্ত, হাসান আজিজুল হক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আনু মুহাম্মদ, বদরুদ্দীন উমর, সুব্রত ব্যানার্জী ও ভূদেব মুখোপাধ্যায়।

খান সারওয়ার মুর্শিদ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, গণতন্ত্র এবং মানবতার সংগ্রামে যাঁরা নিজেদের জীবন দান করেছেন তাঁদের সেই ঋণ আমাদের পরিশোধ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভূমিকা অনন্য। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভোটাধিকার চর্চার যে নেতিবাচক সংস্কৃতি--তাতে বিদ্যমান সাধারণ নাগরিকদেরকে কার্যত ভোটারবিহীন করে জাতীয় সংসদ গঠিত হয় এবং রাষ্ট্রপতি তার শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। বিদ্যমান এই ব্যবস্থায় জনগণের নিজস্ব ইচ্ছা প্রকাশ এবং সেই ইচ্ছাকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে প্রতিফলনের সুযোগ নেই। বিশেষ করে, সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারাকে যেখানে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে, সেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের উচিত নির্ভীক পদক্ষেপের মাধ্যমে এসকল অন্যায় প্রতিহত করা।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, অকার্যকর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দেশজুড়ে সন্ত্রাস, প্রাকৃতিক-মানবিক ব্যর্থতা ইত্যাদির অজুহাতে মার্কিনি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এদেশে শুরু হয় ব্যাপক অনাহার ও মৃত্যু। এরই ধারাবাহিকতায় চলে নানা ধরনের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। এগুলোর প্রতিফলন হয় নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে। এসব অন্যায়কে প্রতিহত করার জন্য আমাদের দরকার রাজনৈতিক দলসহ প্রাসঙ্গিক সকল প্রতিষ্ঠানের যৌক্তিক ভূমিকা পালন করা। আর এজন্য প্রয়োজন নেতৃত্বের প্রজ্ঞা এবং ঔদার্য।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ‘স্বাধীনতার প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি’ প্রবন্ধে বলেন, সমগ্র জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য এদেশে দরকার সমতাভিত্তিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যার মাধ্যমে সম্ভব হবে শ্রেণিশোষণের অবসান এবং সৃদৃঢ় হবে মানুষের সাথে মানুষের বন্ধন। তবে শিক্ষা-শিল্পক্ষেত্রে অপরিকল্পিত জাতীয়করণ, সরকারি প্রশাসনকে মাথাভারী করা, সার্বিক জবাবদিহিহীনতা এবং বিরতিহীন স্বৈরশাসন দেশকে নাজুকতার দোড়গোঁড়ায় ঠেলে দিয়েছে--যা থেকে বের হওয়ার লক্ষ্যে অন্তত পরবর্তী প্রজন্মকে হতে হবে সোচ্চার। লেখক বাংলাদেশের ‘জাতীয়তাবাদ’ বিতর্ক নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয়তাবাদ’-এর উত্থানের একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া রয়েছে--বিশেষ করে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে জাতিগত অস্তিত্ব বিলোপের আশঙ্কা থেকেই এই ‘জাতীয়তাবাদ’ বাঙালি জাতির মধ্যে জন্ম নেয়। পরবর্তীতে, ১৯৪৭-এর পটপরিবর্তনে অবশ্য ভিন্ন আঙ্গিক ও প্রেক্ষাপটে এর বিকাশ ঘটে। বিশেষ করে, ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে যে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে তার শুরু মূলত পাকিস্তানিদের শাসন ও শোষণ প্রক্রিয়ার নাগপাশ থেকে বাঙালিদের মুক্ত করার লক্ষ্যে।

এ খণ্ডে অশোক মিত্রর তিনটি রচনা বিন্যস্ত করা হয়েছে ‘প্রবন্ধসমূহ’ পোশাকি নামে। লেখক ‘বিলীনতর প্রজাতন্ত্র’ রচনায় বলেন, ভারতের ‘প্রজাতন্ত্র’ নিরীহ নাগরিকদেরকে কতটা নিরাপদ করেছে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ প্রজাতন্ত্রের নিরীহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী যেভাবে হাজার হাজার উন্মত্ত দুর্বৃত্তের হাতে অমানবিক প্রক্রিয়ায় নির্যাতন এবং নিবর্তনের স্বীকার হচ্ছে তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে, বোম্বাই, আহমেদাবাদ এবং সুরাটে যেভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, বিভৎস হত্যাকাণ্ড, নারী নির্যাতন হল তা কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক মূল্যবোধকে তাড়িত করল না বরং রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার একটি মুখ্য সুযোগ তৈরি হল।

লেখক ‘লড়াই করে বাঁচতে চাই’ প্রবন্ধে ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংঘাতকে বিশ্লেষণ করে বলেন, ১৯৪৭-এর পর কাশ্মীর রাজ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভারত দখল করে নিয়েছে যা কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছে তীব্র আক্রোশ এবং ক্ষোভ। কাজেই পাকিস্তানের সাথে রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে যে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বও বহুলাংশে দায়ী। ‘বাঙালি কেন স্বভাববামপন্থী’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, পশ্চিমবঙ্গের বাম-ঐতিহ্য হচ্ছে দেশপ্রেমের ঐতিহ্য, স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্য। ১৯৩০, ১৯৪০ এবং ১৯৫০-এর দশকে বাবা কিংবা জ্যেষ্ঠভ্রাতা হয়তো কংগ্রেসে ছিলেন, অথচ তার পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানেরা কোনও না কোনও কারণে বামপন্থি দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন--যা সাবেক কংগ্রেস সদস্যদের ঐতিহ্যগত প্রবণতা।

সরদার ফজলুল করিমের প্রবন্ধ ‘গণতন্ত্র এবং সহনশীলতা’ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের সেই প্রাচীন নগর-রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা হলেও সেই গণতন্ত্রকে শেখ মুজিবসহ পরবর্তী সকল সামরিক বেসামরিক শক্তিমানরা ওই রাষ্ট্রপতি-পদ্ধতি বহাল রাখলেন--যার উদ্দেশ্য গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং গণতন্ত্রের নামে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা। তবু লেখকের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হওয়া দরকার গণতন্ত্র যা জনগণের অবাধ স্বাধীনতা এবং অধিকারের প্রতীক।

গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে লেখক বলেন, গণতন্ত্র হচ্ছে নিরন্তর সচেতনভাবে উত্তম থেকে অধিকতর উত্তমরূপে, অসঙ্গতিপূর্ণ সমাজ থেকে অধিকতর সঙ্গতিপূর্ণ সমাজে মানুষের উত্তরিত হওয়ার সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলন ও একুশের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, একুশ হচ্ছে পূর্ববাংলার গণমানুষের, বিশেষ করে বাঙালি জনগোষ্ঠীর আবেগের এক মূর্তিমান স্বাক্ষর। একুশ হচ্ছে শিক্ষাদাতা, যিনি শিখিয়েছেন আমাদের মাথা নত না করতে। তাই একুশ ‘অমর এবং অনন্য’। ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ প্রবন্ধে সরদার ফজলুল করিম বলেন, শেখ মুজিবের এই স্বাধীনতার ডাক একটি যুগান্তকারী এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সেদিনের লাখো মানুষের জমায়েতে আকাশে জঙ্গি বিমানের হুংকার উপেক্ষা করে শেখ মুজিব গর্জে উঠেছিলেন এবং তাঁর সেই গর্জনে সাড়া দিয়েছিল উদ্বেল লাখো মানুষের সংগ্রামী কণ্ঠ।

লেখক আরও বলেন, স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ যখন গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হল তখন থেকে গণতন্ত্রের কথা উচ্চারিত হতে লাগল, গণতন্ত্রের মূল শক্তি সেই ভোটাধিকারের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হল; কিন্তু ভোটের এই অধিকার মানুষ সত্যিকারভাবে পেয়েছে কি না তা লেখকের জিজ্ঞাসা।

সন্তোষ গুপ্ত ‘ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধে বলেন, ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমানের সহ-অবস্থান এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে দ্বিধা-বিভক্ত করে ব্রিটিশ-শাসকরা। কারণ তাদের দরকার ছিল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শোষণ। তাই ‘বিভেদ কর এবং শাসন কর’ নীতি অনুসরণের মাধ্যমে ব্রিটিশরা এদেশে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের বিষবাষ্প ছড়ায় ধর্মকে সূক্ষ্মভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে।

হাসান আজিজুল হক ‘বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত’ প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশে স্বাধীন বুর্জোয়াশ্রেণির অস্তিত্ব না থাকলেও দালাল ও সহযোগী মুতসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণিকে বিবেচনা করতে হয়। এখানে সাম্রাজ্যবাদ সমর্থিত পুঁজি আর সেই সঙ্গে এদের সহযোগী পেটোয়া মুতসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণির উত্থানে লোপ পায় আমাদের মধ্যবিত্ত স্তরগুলো। একচেটিয়া পুঁজির প্রচণ্ড শোষণের ফলে সমাজের শ্রেণিবিন্যাস দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং সমাজ ধনী ও দরিদ্র দুটি মূল শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই অবিশ্বাস্য গতিতে ভূমিহীনদের সংখ্যা বাড়ছে; কারণ বুর্জোয়া কৃষকের দাপটে গরিব ও মাঝারি কৃষক জমি ধরে রাখতে পারছে না। অন্যদিকে বিশ্বায়নের প্রভাবে ছোট ব্যবসায়ী হচ্ছে ব্যবসাচ্যুত। সেই সঙ্গে নিম্নমধ্যবিত্তের চাকুরে, স্কুল এবং কলেজের শিক্ষকও ঢুকে পড়ছে দরিদ্রশ্রেণির মধ্যে। দেশের ধনী কৃষক, জোতদার, ব্যবসায়ী, কলকারখানার মালিক, বড় আমলা ইত্যাদি নিয়ে গড়ে উঠেছে ছোট মুতসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণি। এর বাইরে আছে অগণিত মানুষ যারা মধ্যবিত্ত--শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী এবং চাকুরে--যারা এখন দরিদ্রশ্রেণিভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

আনু মুহাম্মদ ‘বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের উত্থান ও পতন’ প্রসঙ্গে বলেন, শাসক হিসেবে টিকে থাকার প্রয়োজনে ইংরেজরা ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে সৃষ্টি করে নতুন বিত্তবান আর মধ্যবিত্ত। অন্যদিকে ইংল্যান্ডে শিল্প-বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন মধ্যবিত্ত ও পুঁজিপতিশ্রেণি গড়ে উঠেছে; কিন্তু রাশিয়ায় সেভাবে মধ্যবিত্তশ্রেণি গড়ে ওঠেনি। ১৯৪৭-পূর্ব বাংলায় প্রশাসক, জমিদার, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উকিল, ব্যবসায়ী-পেশায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল হিন্দু--যারা ব্রিটিশদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষিত হয়ে মধ্যবিত্তে রূপান্তর হয়ে যায়; কিন্তু মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষায় আগ্রহ না দেখানোর কারণে মধ্যবিত্তের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে অর্থাৎ ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলে পূর্ববাংলার প্রশাসক, ব্যবসায়ী, জোতদার, আইন ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সামরিক ও অসামরিক আমলা দ্রুত নিজেদের পদোন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয় যা শূন্য জায়গা পূরণ করে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে মাঝারি ব্যবসায়ী, পসারহীন উকিল হয়ে ওঠে মধ্যবিত্তের অংশীদার। আর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর মধ্যবিত্তদের সংজ্ঞা দ্রুত পাল্টাতে থাকে, কারণ যারাই অনৈতিকভাবে অর্থ-বিত্তের মালিক হন তারাই মধ্যবিত্তে রূপান্তরিত হয়ে যান।

এ খণ্ডে বদরুদ্দীন উমরের বাঙলাদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির চালচিত্র বইয়ের ভূমিকাসহ ১৪টি রচনা এবং অন্য বই থেকে ১টি রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘বাঙলাদেশে মার্কিন শান্তি বাহিনীর প্রত্যাবর্তন’ বিষয়ে বদরুদ্দীন উমর বলেন, ১৯৬১ সালে মার্কিন শান্তিবাহিনী তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানসহ সমগ্র পাকিস্তানে কাজ শুরু করে। তবে উন্নয়নের নামে যে কাজটি তারা শুরু করে সেটি হচ্ছে গোয়েন্দাগিরি। এর কারণ হচ্ছে বাংলাদেশ একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এখানে ভারত ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ কায়েমের বিরুদ্ধে কীভাবে মার্কিনিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায় তা সর্বতোভাবে চেষ্টা করা হয়।

‘বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি’ বিষয়ক রচনায় বদরুদ্দীন উমর বলেন, দেশের তরুণদের বিভিন্ন ধরনের কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন। ‘গ্যাস রপ্তানীর রাজনীতি’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, জামায়াতে ইসলামীর মতো ডানপন্থি দলের ভারতে গ্যাস রপ্তানির প্রশ্ন নিয়ে মিটিং-মিছিল করার উদ্দেশ্য দেশপ্রেমের নামে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং সাম্প্রদায়িক শক্তি বৃদ্ধি করা--যা প্রতিরোধের জন্য প্রগতিশীল শক্তিকে সোচ্চার থাকা দরকার। পাশাপাশি ভারতীয় সরকার বা অপর কোনও সরকারের চাপে গ্যাস রপ্তানি করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে কারণ সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্য হল এ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে লুট করা। এছাড়া গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রে যে চুক্তি হয়েছে তা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থি। কাজেই গ্যাস রপ্তানির সকল চেষ্টা প্রতিহত করা দরকার।

‘বুর্জোয়া রাজনীতিক্ষেত্রে ক্ষমতার লড়াই’ প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর বলেন, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব সরকারের পতনের পর থেকে এদেশে বুর্জোয়া-শাসন ব্যবস্থা মূলত সামরিক শাসনের মাধ্যমেই টিকে রয়েছে। যতদিন এই অবস্থা থাকবে ততদিন সামরিক শাসকদের আধিপত্যবাদ টিকে থাকবে এবং রাজনীতি ক্ষেত্রে নোংরা লড়াই চলবে। বিপ্লবীদের তথাকথিত জাতীয় কনভেনশন প্রসঙ্গে লেখক বলেন, চারটি বাম রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ একক পার্টি গঠন করার লক্ষ্যে ১৯৮২ সালের ৭ ও ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় একটি জাতীয় কনভেনশনের আয়োজন করা হয়। লেখকের প্রশ্ন, এই জাতীয় কনভেনশনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য মহৎ হলেও এ পর্যন্ত এই ধরনের বিপ্লবী বুলি এবং কাগুজে কর্মসূচি কতটুকু সফল বাস্তবায়ন হয়েছে? লেখক বলেন, এদেশের প্রগতিশীল ও বিপ্লবীরা বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করে। কাজেই যতদিন তারা এই লেজুড়বৃত্তি করবে ততদিন বাম সংগঠনগুলো এদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে কোনও পরিবর্তন আনতে পারবে না। অপর এক প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর বলেন, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি-শাসিত শাসন-ব্যবস্থা চালু করে জিয়াউর রহমান এবং অন্যরা জাতীয় সংসদের কর্মকাণ্ডকে প্রচণ্ডরকম বাধাগ্রস্ত করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার সম্ভাবনা এবং উপযোগিতা ধ্বংস করেছেন। বাংলাদেশের বামপন্থিদের সম্পর্কে লেখক বলেন, কমিউনিস্ট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তিকে সাধারণত প্রগতিশীল বুর্জোয়াদের বোঝানো হয়ে থাকে। কারণ বাংলাদেশে কমিউনিস্টদের সাথে বুর্জোয়া বামপন্থিদের মৌলিক কোনও পার্থক্য নেই। বাংলাদেশে বুর্জোয়া-শ্রেণি-চরিত্রের যে অবস্থা তা সাম্রাজ্যবাদের ও প্রতিবিপ্লবী আওয়ামী লীগের সাথে একাত্ম হয়ে বাকশালের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব লোপ করে। অন্যদিকে পিকিংপন্থিরা যাঁরা প্রাক্তন কমিউনিস্ট সমাজতন্ত্র ও বুর্জোয়া প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত তাঁরা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করে নিজেদের অস্তিত্ব বিলোপ করে।

‘জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশের রাজনীতি’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ দেশাত্মবোধ ও দেশীয় স্বার্থরক্ষার নামে অন্য দেশীয় পুঁজির অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে অথবা দেশীয় পুঁজির অনুপ্রবেশের উদ্দেশ্যে কাজ করলেও বাস্তবে দেশীয় বুর্জোয়াশ্রেণির স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করে। এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশীয় শিল্প-বুর্জোয়াশ্রেণি তাদের স্বার্থ উদ্ধারে দেশের শিল্প ও শ্রমিকশ্রেণির বিস্তার ঘটায়। জিয়াউর রহমানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, সামরিক শাসনকে টিকিয়ে রাখা এবং এটিকে গণতান্ত্রিক চরিত্র প্রদান করার উদ্দেশ্যে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দল নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল একদিকে সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব ও অন্যদিকে ভোটে জয় লাভ করে ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে নিজে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া। তিনি তা-ই হয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর যে তৎপরতা চলছে তা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

 ‘বাঙলাদেশে বুর্জোয়া রাজনৈতিক সংকট ও সাম্রাজ্যবাদ’ প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর বলেন, বাংলাদেশের বুর্জোয়াশ্রেণি সাম্রাজ্যবাদের ক্রমাগত সাহায্য-সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে টিকিয়ে রাখছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই দেশকে পুঁজিবাদীদের বাজার-ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে গড়ে তোলা এবং বৈদেশিক পুঁজির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে দেশীয় আর্থিক ও সামাজিক কাঠামো ধ্বংস করা। এখানকার মুতসুদ্দি, পুঁজিপতি বিশেষত ব্যবসায়ী-বুর্জোয়াদের সহায়তায় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো বাণিজ্যের মাধ্যমে এদেশের সম্পদ লুণ্ঠনের অবাধ ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং উৎপাদন-নীতি এমন করেছে যে উৎপাদন প্রক্রিয়া সবসময় বুর্জোয়া-উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়। কাজেই সাম্রাজ্যবাদের ওপর নির্ভরশীলতা যত বাড়ছে ততই স্বনির্ভরশীলতার কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

বদরুদ্দীন উমর ‘সরকারী মহলে গৃহযুদ্ধ’ প্রবন্ধে বলেন, জাতীয়তাবাদীপন্থি গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) এবং অন্য কয়েকটি দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের প্রেসিডেন্ট হন তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। তিনি এই ফ্রন্টের সভাপতি হন এবং ফ্রন্টের একজন হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেন। জাগদল থেকে পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান বের হয়ে এসে সুকৌশলে ফ্রন্ট গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু করেন তা নির্বাচনে জয় লাভের জন্য একটি কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এর সাথে যুক্ত হয় বুর্জোয়া দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিরা যারা দেশকে একটি তাঁবেদার বুর্জোয়া রাষ্ট্রে পরিণত করার নীলনকশা বাস্তবায়নে সহায়তা করে। ‘ঐক্যফ্রন্টের সংকট’ প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর বলেন, ১৯৭৬ সালে সংগঠিত ‘জাতীয় প্রতিরোধ কমিটি’ থেকে শুরু করে যে কয়টি বুর্জোয়া ও জাতীয় ‘ঐক্যফ্রন্ট’ গঠিত হয়েছে তার সবকটির লক্ষ্য হল ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ছত্রছায়ায় নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা। ‘বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানি করছে কেন?’--এ প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর বলেন, এটা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর একটি বাণিজ্যিক স্বার্থ যা চরিতার্থ করার জন্য আমাদের সরকারগুলো প্রতিনিয়ত জনশক্তি রপ্তানির চেষ্টা করছে; কিন্তু তার বিনিময়ে আমদানি করা হচ্ছে বৈদেশিক বিশেষজ্ঞ, দক্ষ জনশক্তি--যাদের পেছনে ব্যয় হচ্ছে বিদেশি ডলার যা মূলত দেশকে পরনির্ভরশীল করছে।

‘বিদেশী মতবাদের বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমানের জেহাদ’ প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে কোনও ‘বিদেশী’ মতবাদ আদর্শ কিছুতেই সহ্য করা হবে না। এর উদ্দেশ্য আর কিছু নয় বরং জাতীয়তাবাদী আদর্শের ধোঁয়া তুলে দেশের মানুষকে একতাবদ্ধ করে তাদের থেকে রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নেওয়া, যার অন্যতম লক্ষ্য হলো পুঁজিবাদী বুর্জোয়া কাঠামো টিকিয়ে রাখা।

‘গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের পরলোক যাত্রা’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, গণফ্রন্ট ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট উভয়ের মধ্যে কয়েকটি দল রয়েছে; কিন্তু যে নামই থাকুক না কেন এইসব দল আসলে বুর্জোয়াশ্রেণিরই একটি অংশ। এর উদাহরণ হলো সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে ঐক্যফ্রন্ট গঠন। ‘ইসলামী ছাত্র শিবিরের শুদ্ধি অভিযান’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রফ্রন্ট হিসেবে তৎপর ইসলামী ছাত্রশিবির নামে এই সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য ধর্ম প্রচার নয় বরং ধর্মীয় অনুভূতিগুলোকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলে নিজেদের স্বার্থকে চরিতার্থ করা।

‘বাঙলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাত্রদের কর্তব্য’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, ছাত্র রাজনীতিতে যে নোংরা রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে সে ক্ষেত্রে ছাত্ররা রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তির কারণে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নিজেদের আদর্শ ও মূল্যবোধকে বিসর্জন দিতে বাধ্য হচ্ছে। কাজেই ছাত্রদের উচিত নেতিবাচক রাজনীতি থেকে বের হয়ে প্রগতিশীল রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া এবং সমাজে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে মৌলিক ভূমিকা পালন করা। ‘বাঙলাদেশের জাতীয় সংসদ ও সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবী’ প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ রাষ্ট্রপতি-শাসিত ব্যবস্থায় সামরিক কর্তাব্যক্তিদের খেলার স্থান ছাড়া কিছুই নয়। কারণ এ দেশের সংসদীয় রাজনীতির অবক্ষয়ের পাশাপাশি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির ঐতিহাসিক ভূমিকা বিলুপ্ত প্রায়। সংসদীয় রাজনীতিতে সাংসদদের প্রকৃত কোনও ক্ষমতা নেই। কারণ রাষ্ট্রপতি-শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিই সর্বেসর্বা, সবকিছু, একমাত্র। ফলে রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন করেন। কাজেই দরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন।

‘বাঙলাদেশের বামপন্থীরা’ প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর বামপন্থিদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে বলেছেন, সাধারণত যারা সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদবিরোধী তারা প্রগতিশীল বামপন্থি, কিন্তু বাস্তবে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই এখন বাংলাদেশের একশ্রেণির কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের রাজনীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য। যদিও এরা নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক দাবি করে এবং অন্যদের সাম্রাজ্যবাদের দালাল হিসেবে আখ্যায়িত করে--বাস্তবে এই বামপন্থিরা বিভিন্ন ইস্যুতে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই গড়ে তোলে নতুন নতুন ঐক্যফ্রন্ট বা মোর্চা। ‘জাতীয়তাবাদ ও বাঙলাদেশের রাজনীতি’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, পুঁজিবাদকে সাম্রাজ্যবাদে রূপান্তরের প্রক্রিয়া উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে আদর্শগতভাবে জাতীয়তাবাদের অবক্ষয় ঘটিয়েছে। কারণ সাম্রাজ্যবাদ আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় বুর্জোয়া তথা মালিকশ্রেণি তৈরি করে। সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ও প্রসারের মাধ্যমে পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণের পেছনে জাতীয়তাবাদী শক্তির একধরনের যোগসূত্র রয়েছে।

‘বাঙলাদেশের বুদ্ধিজীবী : ইতিহাসের প্রেক্ষপটে’ প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর বলেন, মূলত পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণি ভারতবর্ষে বুদ্ধিজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সমকালীন ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে হিন্দু শিক্ষিতসমাজের মিথষ্ক্রিয়া ঘটে। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে তারা যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে এক নতুন শ্রেণিবিন্যাস রচিত হয়। পরবর্তীতে মুসলমানদের পক্ষ থেকে মুসলিম অভিজাত শ্রেণির নেতারা ইংরেজ বড়লাট লর্ড মিন্টোর মাধ্যমে স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবি করে। কাজেই হিন্দু-মুসলমান উভয়ের শিক্ষিত শ্রেণি প্রাচীন ধ্যান-ধারণা, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে আধুনিকতার মাধ্যমে সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

এ খণ্ডে সুব্রত ব্যনার্জীর বাংলাদেশ বইয়ের সব রচনা গৃহীত হয়েছে। তাঁর বিভিন্ন রচনা যথা : বাংলার মুখ, বাংলার উপকূলে, অগণিত রাজত্ব, গভীর শিকড়ে, দেশ-ভাগ ও ইংরেজের বিদায়, মোহভঙ্গ, আত্মপরিচয়ের সন্ধানে, স্বাধীনতার যুদ্ধে, স্বপ্ন ও বাস্তব এবং এত কণ্ঠস্বর-এ ভারতবর্ষ তথা অবিভক্ত বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়সমূহ উঠে এসেছে। লেখক এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি শুরুতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখা, জাতি-বর্ণের সংমিশ্রণ, ভারতবর্ষের শাসকবৃন্দ এবং শাসনকালের প্রকৃতি ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ করেছেন। লেখকের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মূল জাতিগোষ্ঠী তথা বাঙালি ছাড়াও এখানে রয়েছে অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো--চাকমা, মগ, মুরাং, শেনডু, তিপরা, কুকী, লুসাই, বনযোগী, গারো, হাজং, দুলুই, হোড়ি, বনা, খাসি, মনিপুরী, ওরাঁও, সাঁওতাল, রাজবংশী, হো ও মুণ্ডা। লেখক বলেন, খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে ঐতরেয় ব্রাহ্মণগণ পুণ্ড্রদের সমাজবহির্ভূত আদিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

অন্যদিকে ভূদেব মুখোপাধ্যায় ভারতীয় হিন্দু ও মুসলমান নেতাদের নেতৃত্বের ভূমিকা ও নেতৃত্বের যোগ্যতার মাপকাঠি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র চতুর্দশ খণ্ডে আবুল মনসুর আহমদের আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর গ্রন্থের লেখাসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লেখক এ গ্রন্থে ভারতবর্ষের অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাসকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তবে শুরুতে তিনি পারিবারিক-রাজনৈতিক ঐতিহ্যের বিশ্লেষণ করেন। তাঁর পরিবার ওয়াহাবি আন্দোলনে প্রভাবিত হওয়ায় এবং জেহাদি লোকজনের সান্নিধ্যে আসায় হিন্দু ও শিখদের মাধ্যমে কীভাবে মুসলমান জনগোষ্ঠী শোষিত ও নির্যাতিত হয়েছে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।

কীভাবে জমিদার, নায়েব এবং আমলাদের অত্যাচারের প্রতিবাদে স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রজা-আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন লেখক তা আলোচনা করেন। এর পাশাপাশি লেখক খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন, বেঙ্গল প্যাক্ট, প্রজা-সমিতি প্রতিষ্ঠা, কংগ্রেসের প্রজা-আন্দোলন বিরোধিতার কারণসমূহ, প্রজা-আন্দোলনের শক্তি ও তাৎপর্য, প্রজা-পার্টির ভূমিকা, ১৯৩৭ সালের আইনসভার নির্বাচনে কৃষক-প্রজা পার্টির কাছে মুসলিম লীগের অনেক অভিজ্ঞ নেতার পরাজয় বরণের বৃত্তান্ত, হক মন্ত্রিসভা গঠনের সমস্যা, কৃষক-প্রজা পার্টির ভূমিকা, পাকিস্তান আন্দোলনের আদ্যোপান্ত, কলকাতার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার কারণ ও ফলাফলসমূহ, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার নেপথ্য ইতিহাস, আওয়ামী লীগ ও কৃষক-শ্রমিক পার্টির সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্টের রাজনৈতিক ভূমিকা ও সাফল্য, ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে গণপরিষদ ভেঙে দেওয়ার নেপথ্য কাহিনি, কৃষক-শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘাতের কারণসমূহ, ঐতিহাসিক মারি প্যাক্ট, আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসন দাবি, লেখকের মন্ত্রিত্ব প্রাপ্তি ও পরবর্তী করণীয়, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে সংঘাত ও দূরত্ব পর্যালোচনা, সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর নেপথ্য কাহিনি, চুন্দ্রীগড় মন্ত্রিসভার হঠকারী সিদ্ধান্ত ও পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন হারানোর কারণসমূহ বিশ্লেষণ করেন।

এছাড়া লেখক আইয়ুব খানের আগমন, স্বৈরশাসন এবং ইয়াহিয়া খানের সময়কালের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জনমত উপেক্ষা, রাষ্ট্রীয় তহবিল তছরুপের ইতিহাস, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জেল, নির্যাতন-নিবর্তন ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৮ এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্য কারণসমূহ,  ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক, মুক্তিযুদ্ধ এবং জনযুদ্ধের কারণ ও ফলাফল, শেখ মুজিবের গ্রেফতারের ঘটনা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট, ১৯৭২-৭৩ সালে সংবিধান রচনা ও সংবিধানের মূলনীতিসমূহ পর্যালোচনা, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এর প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা--সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের কারণসমূহ বিশ্লেষণ করেন।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র পঞ্চদশ খণ্ডে আবদুল হক, সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল হুসেন, মোহাম্মদ আবদুল হাই, সরদার ফজলুল করিম, আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর ও আবদুর রাজ্জাকের প্রবন্ধ সংকলন করা হয়েছে।

আবদুল হক তাঁর লেখায় বলেন, বাংলাদেশ উদ্ভবের গোড়ার দিকে আদিম এবং গোষ্ঠীভিত্তিক আদিবাসী সমাজগুলো ছোট ছোট রাজত্বে বিভক্ত ছিল। তৃতীয় খ্রিষ্টাব্দের পর বঙ্গদেশ মৌর্য শাসনের আওতাভুক্ত হয় এবং এই সময় থেকে বাংলাদেশে একটি সর্বভারতীয় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। তবে বাংলাভাষার জন্ম হয় মূলত স্বৈরাচারী ব্রাহ্মণ শাসকের বিরুদ্ধে বাঙলাবাসীর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যার বর্ণনা রয়েছে চর্যাপদ-এ। কালক্রমে সর্বভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে বাঙালি রাষ্ট্রচেতনার সাধারণ উপাদানগুলো প্রবল হয়ে ওঠে। লেখক বলেন, মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর ইংরেজ রাজত্বকালে কৃষকদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে নানাধরনের বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়, যার মধ্যে সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ অন্যতম। এরই ধারাবাহিকতায় দেখা দেয় সিপাহি বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ এবং কৃষক বিদ্রোহ। লেখক বলেন, ভারতবর্ষে মোগল আমল পর্যন্ত টিকে থাকা স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি ধ্বংস হয় ব্রিটিশদের শাসন ও শোষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

অন্যদিকে দেশভাগের মাধ্যমে পূর্ববাংলা শিল্প-কলকারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়। একই সময় সামরিক শাসনের বেড়াজালে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য মারাত্মক ঘাটতির সম্মুখীন হয়। যদিও বাংলার মানুষ হিন্দু আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত হয়; কিন্তু সরকারি ও অসামরিক আমলারা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। লেখকের মতে, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক বৈষম্যের কারণে বাংলাদেশে দ্রুত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ছয়-দফা কর্মসূচি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ধর্মনিরপেক্ষতার মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির শক্তিতে পরিণত করে।

আবদুল হক তাঁর রচনায় বলেন, ১৯৬৮-৬৯ সালের গণবিস্ফোরণ এবং ১৯৭০-এর জাতীয় সাংসদ নির্বাচনের ফলাফলের ধারাবাহিকতায় শেষপর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। তবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তেমন কোনও গুণগত এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি, যদিও সংমিশ্রিত সংস্কৃতিতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক উপাদান একীভূত হয়েছে। পরিশেষে লেখক শেখ মুজিবের ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজবাদী সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় অবদানের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

অন্যদিকে সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ তাঁর রচনায় বাংলাদেশে জাতীয় চেতনার উন্মেষ, ঊনবিংশ শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, গণতন্ত্রের সংকট, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উৎস ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ‘জিন্নাহ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য’, ‘আমাদের সমাজব্যবস্থা’ এবং ‘পাকিস্তানে ইসলামী নীতি’ প্রবন্ধে বলেন, কায়েদে আজম ছিলেন ধর্মভিত্তিক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একজন একনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ। পাশাপাশি তিনি বলেন, মুসলিমসমাজ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও দেশে নানা ধরনের বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। সেইসঙ্গে তিনি বলেন, পাকিস্তানে ইসলামিক রাজনীতির মাধ্যমে সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়া দরকার। অন্যদিকে আবুল হুসেন ‘আমাদের রাজনীতি’ প্রবন্ধে বলেন, স্বাধীনভাবে নিজেকে নিজের ইচ্ছামত ফুটিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত করবার অধিকারকে আমি বলি রাষ্ট্রীয় অধিকার। সে অধিকার অনেক বড়। মানুষ সে অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে পঙ্গু হয়ে থাকতে বাধ্য। তিনি ‘ব্রিটিশ-ভারতে মুসলমান-আইন’ প্রবন্ধে বলেন, যুগে যুগে মানুষ তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার তাড়নায় আপনার সত্তার প্রয়োজনে আইন গড়েছে। সেই অবস্থাবিশেষই আইনের জন্ম দিয়েছে। কাজেই অবস্থার পরিবর্তন হলে আইনের পরিবর্তনও অবশ্যম্ভাবী।

মুহম্মদ আবদুল হাই ‘তোষামোদ ও রাজনীতির ভাষা’ রচনায় ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের ভিন্নতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, হিন্দু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে বর্ণবিভেদ থাকা সত্ত্বেও একধরনের সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যা মুসলমান সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনুপস্থিত। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, আচার-অনুভূতি, রাজনীতি ইত্যাদির ক্ষেত্রে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট।

আবদুল হক ‘দোদুল্যমান জাতীয়তা’ প্রবন্ধে বলেন, এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠী কখনও বাঙালি, কখনও মুসলমান বা হিন্দু হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করে--যা সাম্প্রদায়িকতার পরিচয়, জাতীয়তার নয়। সরদার ফজলুল করিম ‘স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক তাৎপর্য’ প্রবন্ধে বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রে স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে স্বাধীন রাষ্ট্রভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির স্ব-স্বাধীনতা। আর আধুনিক রাষ্ট্রের শাসক হচ্ছেন একজন ব্যবস্থাপক মাত্র; শাসক নয়। আহমদ শরীফ ‘নেতৃত্ব সংকট’ প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সৎ, জনদরদি ও কল্যাণমূলক নেতৃত্বের অনুপস্থিতি। এদেশে জোরজুলুম ও লুটতরাজের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থকে চরিতার্থ করাই হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ‘ভারতে-বাংলাদেশে মৌলবাদ ও এর রূপ-স্বরূপ’ প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতে অর্থডক্স ও মৌলবাদী হিন্দুর সংখ্যা অনেক। পাশাপাশি বাংলাদেশে একশ্রেণির মুসলিম মৌলবাদী ইসলামের নামে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে অধিক আগ্রহী।

এ খণ্ডে বদরুদ্দীন উমরের বাংলাদেশে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বইয়ের সব প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বদরুদ্দীন উমর তাঁর এ বইয়ে যে বিষয়গুলো আলোচনা ও বিশ্লেষণ করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘ভারত বিরোধিতা ও সাম্প্রদায়িকতা’, ‘বাঙলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি’, ‘দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি প্রসঙ্গে’, ‘জামাতে ইসলামীর নোতুন তৎপরতা’, ‘বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা’, ‘বাঙলাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও মেহনতি জনগণের সংগ্রাম’, ‘বর্তমান বাঙলাদেশ সরকারের ধর্মীয় জিগীর ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণা’, ‘ভারত এবং বাঙলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রভাব’, ‘বাঙলাদেশে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা’, ‘বাঙলাদেশে মৌলবাদ ও শ্রেণী সংগ্রামের নোতুন পর্যায়’ ইত্যাদি।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ : জাতির অবস্থা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি ইংরেজি বক্তৃতা থেকে অনূদিত। এর অনুবাদ করেছেন তানভীর মোকাম্মেল। আবদুর রাজ্জাক তাঁর প্রবন্ধে বলেন, বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অনন্য। তবে দুর্ভাগ্য হচ্ছে তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ড, পরবর্তী সময়ে সামরিকবাহিনী ও আমলা কর্তৃক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং তথাকথিত সামরিক-রাজনৈতিক প্লাটফরম গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা। অধ্যাপক রাজ্জাক বাংলাদেশের সমগ্র জাতির সার্বিক নাজুক অবস্থাসমূহ পর্যালোচনা করে সেগুলো থেকে উত্তরণের উপায় সংক্রান্ত দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র ষোড়শ খণ্ডে যাঁদের লেখা সংকলিত হয়েছে তাঁরা হলেন আবুল মনসুর আহমদ, আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ, বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ও ড. বদিউজ্জামান।

আবুল মনসুর আহমদ তাঁর প্রবন্ধ ‘বাংলাদেশের জাতীয় আত্মা’য় ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন আমলে স্বাধীন বাংলাদেশের ২৫০ বছরের রাজত্বকালে হিন্দু, মুসলিম ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। সেইসঙ্গে লেখক ঐ সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে শিল্প, সাহিত্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অবদান বিশ্লেষণ করেন।

আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ ‘মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ : নগর ও রাষ্ট্র’, ‘ভারতের মুসলমান’, ‘ভারতে ওহাবী আন্দোলন’, ‘বাংলার মুসলমান’--এ-সকল প্রবন্ধে ভারতে মুসলিম সভ্যতার প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। লেখকের মতে, ধর্ম, সমাজ এবং সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম ধর্ম সংস্কৃতিধর্মী, আভিজাত্যের প্রতীকও নগরকেন্দ্রিক। মুসলিম সমাজ ও সভ্যতায় যুগে যুগে জ্ঞান ও ভাবনায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন সুফি, জ্ঞানসাধক, শাস্ত্রবিদ, কবি, সাহিত্যিক ও লিপিকার, কোনও রাজশাসক নন। মুসলিম সভ্যতার এই ঐতিহ্য মধ্যযুগীয় ভারতেও অনুসরণ করা হত। লেখকের মতে, ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে নানা সংঘাত ও মতাদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পঞ্চদশ শতাব্দীতে এ দুই ধর্মের দার্শনিক পর্যায়ে একধরনের সমঝোতা ছিল। বিশেষ করে মোগল আমলে এ সমঝোতা যথেষ্ট ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। ওহাবি আন্দোলন ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের একধরনের প্রতিরোধ ও যুদ্ধপ্রচেষ্টা। লেখক আরও বলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতে তুর্কি আদলে মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলা তথা বঙ্গদেশের দিল্লির রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক শক্তির সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপিত হয়।

আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ ভারতবর্ষের মুসলমান ও মুসলিম সভ্যতার বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন, এই সভ্যতা মূলত ভারতে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করে--বিশেষ করে রাষ্ট্রের জনগণের সার্বিক কল্যাণে মুসলমানগণ অসাধারণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। তিনি আরও বলেন, ভারতবর্ষ থেকে ঔপনিবেশিক পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুসলমানগণ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসকের তাঁবেদার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গোষ্ঠী যথা--জমিদার ও কিছু আমলার বিরুদ্ধে একধরনের আন্দোলন ও বিপ্লব সংঘটিত করার ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান তাৎপর্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ--ভারতের বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যার মধ্যে ওহাবি আন্দোলন অন্যতম।

বদরুদ্দীন উমর ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও  মুসলিম সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে বলেন, লাহোর প্রস্তাব ছিল সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্রবোধের একটি চিত্র। যে কারণে পরবর্তীকালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মাধ্যমে হিন্দু এবং মুসলমানদের বিভক্তিকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় এবং দুটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়। তবে পাকিস্তান সাংবিধানিকভাবে ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হলেও পূর্ব ও পশ্চিম-পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ভিন্নতা এবং জাতিগত পার্থক্যের কারণে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে, যার ফলাফল হলো--বিচ্ছিন্নতা। ‘ছাত্র রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর বলেন, ছাত্র-রাজনীতি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যাসমূহ সমাধানে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে, কিন্তু সমস্যা হল তারা দীর্ঘ সময় সংঘবদ্ধ থাকতে পারে না; আবার এ সংঘবদ্ধ সংহতির প্রকৃতি অস্থায়ী।

 ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ ও গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, এশিয়া ও আফ্রিকার জাতীয় আন্দোলন ছিল মূলত ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে। ‘সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, ইংরেজদের কারণেই ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে এবং ধর্মের ইন্ধনে একধরনের প্রতিক্রিয়াশীলতার মাধ্যমে ভারতের জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন শুরু হয়, যার ফলে দেখা দেয় দাঙ্গা, সংঘাত ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ। তবে এই বিদ্বেষ শেষপর্যন্ত রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রাখে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘বেকনের মৌমাছিরা’ প্রবন্ধে ভারতবর্ষের সুবিধাজনক এবং স্বার্থবাদী রাজনৈতিক চরিত্রকে বিশ্লেষণ করেছেন। অন্যদিকে ‘পথ কোন দিকে’ প্রবন্ধে ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শোষণমূলক ভূমিকাকে তীক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে লেখক হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় চেতনা ও সংহতির অভাবে জাতিগত সংঘাতের প্রেক্ষাপট বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি ব্রিটিশদের দ্বি-জাতিতত্ত্বের নেতিবাচক প্রভাবসমূহ তাঁর বিশ্লেষণে তুলে ধরেন। এ ছাড়া লেখক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারাকে বিশদভাবে পর্যালোচনা করেন। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ‘আমরা পৌঁছেছি’ প্রবন্ধে বলেন, কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের একাংশ এদেশের দক্ষিণপন্থিদের নেতিবাচক ভূমিকা ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং বাম রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভাবাদর্শের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।

 এ খণ্ডে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর বাঙালির অসমাপ্ত যুদ্ধ বইয়ের রচনাসমূহ গ্রথিত হয়েছে। যে বিষয়গুলোর ওপর লেখক আলোকপাত করেছেন সেগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশে একটি সেকুলার সাংস্কৃতিক যুদ্ধ, বাঙালির ভাষা-সাম্রাজ্য, সমাজ ও রাজনীতিতে হীনম্মন্যতা, পনেরো আগস্টের পায়ের আওয়াজ, বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ, ছাত্র-রাজনীতির ধারা, রাজনীতিতে এরশাদ ফ্যাক্টর, বিএনপির রাজনীতি, নিরপেক্ষ আলোচনা কতটা নিরপেক্ষ, পঁচাত্তরের তেসরা ও সাতই নভেম্বর, কৌশল বদলের রাজনীতি, ক্যান্টনমেন্ট কেন্দ্রিক রাজনীতি, ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব দিবস’, শহুরে বাম মধ্যবিত্তের ক্লাব কালচার, কঙ্গো ও বাংলাদেশের ক্লেপ্টোক্রেসি, সামরিক বাহিনী ও সিভিল সমাজ, ভয় সৃষ্টির রাজনীতি, রাজনীতিতে ‘কালেকটিভ্ ম্যাডনেস্’, পার্বত্য শান্তি চুক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের উপেক্ষিত নায়ক।

 আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বলেন, পাকিস্তানি আমলে ভাষা দিবস উদযাপন ছিল একটি সেকুলার জাতীয় উৎসব। বিদেশে, বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা এমনকি ভারতের বাঙালি ভাষাভাষীও একুশকে উদযাপন করেন। কিন্তু ১৯৭৫-এর পট পরিবর্তনের পর দেখা গেছে মধ্যরাতে শহীদ মিনারের বেদিতে মাস্তানদের দৌরাত্ম্য। এই অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য আমাদের প্রয়োজন গণ-সম্পৃক্ত, জ্ঞান-সম্পৃক্ত এবং মুক্ত সংস্কৃতিভিত্তিক প্রতিরোধ-যুদ্ধের সূচনা। ‘বাঙালির ভাষা-সাম্রাজ্য’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, এতদিন দুই বাংলা যথা বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে দুই মধ্যবিত্ত, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ছিল রেষারেষি ও সংঘাত; কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকার মধ্যবিত্তসমাজ অতিদ্রুত কলকাতার মধ্যবিত্তসমাজকে অতিক্রমের চেষ্টা করছে অর্থ ও বিত্তে--কিন্তু বিদ্যা-বুদ্ধিতে সমকক্ষ হতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়, সেই সাথে বিদেশের বাঙালিদের সাথেও একধরনের যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এমনকি খোদ লন্ডনেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার একাধিক স্বনামধন্য কেন্দ্র স্থাপিত হয়। লেখক বিশ্লেষণে বলেন, দুই বাংলার সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক এবং সামাজিক ঐতিহ্যের মধ্যে যথেষ্ট একাত্মতা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য ও ভিন্নতা সহসা বিলুপ্ত হওয়ার নয় এবং হওয়া উচিতও নয়। কারণ বিশ্বব্যবস্থায় এর উদাহরণ রয়েছে। উল্লেখ্য, দুই বাংলার ভাষা-সাম্রাজ্যের যে মিলনমেলার প্রবণতা শুরু হয়েছে তার মাঝেই বিশ্বের সকল বাঙালি তাদের হারানো সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয় ধরে রাখতে সক্ষম হবে বলে লেখক মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন। 

লেখক রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বলেন, এ দেশে বর্তমানে নেতৃত্ব নিয়ে একটি সংকট সৃষ্টি হয়েছে, কারণ নিম্নমধ্যবিত্তের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে একধরনের নিম্নমধ্যবিত্ত মানসিকতার আচ্ছন্নতা তৈরি হয়েছে। তবে ঢাকা-কেন্দ্রিক নিম্নমধ্যবিত্তের বিকাশ শুরু হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে যার গোড়াপত্তন হয় মূলত বহিরাগত মুসলিম সামন্ততান্ত্রিক আমলে, উল্লেখ্য, এই ঔপনিবেশিক শাসকদের হঠকারী রাজনৈতিক কৌশলের কারণে মূলত ভারত এবং সাবেক বঙ্গদেশের বিভক্তি ঘটে এবং ঢাকায় সামরিক ও অসামরিক এলিট-কুলের জন্ম হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধঃপতিত অবস্থা স্পষ্ট হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু জাতীয় নয় বরং আন্তর্জাতিক চক্রান্তও ছিল। বিশেষ করে তৎকালীন মার্কিন সরকারের ধৃষ্টতামূলক ষড়যন্ত্র, ব্রিটিশ-আমেরিকান মিডিয়াতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চরিত্র হনন ইত্যাদি সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন-রূপ তুলে ধরে। এমনকি বাকশাল গঠনের পর তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যার চক্রান্তে দেশি-বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী একধরনের হীন রাজনৈতিক স্বার্থের সাথে জড়িত হয় যার অংশীদার হল বেশকিছু দেশীয় নিম্নবিত্তের রাজনীতিবিদ। এরপর জেলহত্যার মাধ্যমে এই নিম্নবিত্তের রাজনীতিবিদদের খুনিচক্র ও সামরিক শাসক এদেশে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে।

‘বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ’ প্রবন্ধে গাফ্‌ফার চৌধুরী বিদেশে বাংলাদেশে ইমেজ সংকটের নানাবিধ কারণ উদ্ঘাটন করে দেখিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে বিচারবিভাগের নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় মিডিয়া বিশেষ করে রেডিও-টেলিভিশনের নিয়ন্ত্রণ, নারী-শিশু ও সংখ্যালঘুদের নির্যাতন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সীমাহীন ঘুষ ও দুর্নীতি ইত্যাদি। লেখক চীনের রাজনৈতিক সংস্কারের উদাহরণ টেনে বলেন, চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, বিদেশে বসবাসরত চীনাদের বিনিয়োগের কারণে এবং উদারীকরণ বাণিজ্যিক নীতি প্রবর্তনের ফলে আগামী এক বা দেড় দশকের মধ্যে চীন ইকনোমিক সুপার পাওয়ারে রূপান্তরিত হবে। কাজেই বাংলাদেশকেও একই নীতি অনুসরণ করে অর্থনীতিকে গতিশীল করা, অন্যদিকে রাজনৈতিক সততা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে সকল ধরনের অনিয়মকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে জনগণের সার্বিক কল্যাণ সাধন করা সম্ভব--আর এর জন্য প্রয়োজন যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব। লেখক ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বলেন, ভাষা আন্দোলনের পুরোধা ছিল ছাত্রসমাজ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ছাত্র আন্দোলনকে মুক্তির আন্দোলনে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়।

১৯৫৫ সালে ছাত্র ইউনিয়ন ও অসাম্প্রদায়িক ছাত্রলীগের মধ্যে ‘মোর্চা’ গঠনের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ ছাত্রসংগঠন গড়ে তোলা হয়। কিন্তু আইয়ুব-মোনায়েমের ছত্রচ্ছায়ায় প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন ধ্বংস করার লক্ষে এবং ছাত্র-রাজনীতির মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকর সরকার প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন সরকার তথাকথিত একটি ছাত্র সংগঠন (ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন, এনএসএফ)সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, এই ছাত্র সংগঠনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস ছড়িয়ে ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে নসাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। একই প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতার পর স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপক্ষের একটি গোষ্ঠী অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ছাত্রসমাজের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে ছাত্রদের একাংশকে নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্বক রাজনীতিতে ব্যবহার করে যার নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। বর্তমানে জাতির সামগ্রিক সংকট মোকাবিলায় প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে দরকার একধরনের সংহতি। তবে রাজনীতিতে এরশাদের আবির্ভাব হয় মূলত সামরিক শক্তির ছত্রচ্ছায়ায়--যে কারণে জিয়াউর রহমানের সৃষ্টি বিএনপি এবং এরশাদের সৃষ্টি জাতীয় পার্টির মধ্যে মৌলিক কোনও পার্থক্য নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ এরশাদকে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। সেইসঙ্গে তারা এরশাদকে নির্বাচিত সরকার উচ্ছেদ, সংবিধানে অবৈধভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শব্দ ও বাক্যসমূহের সংযোজন, নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা বাঁধানো ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, সীমাহীন দুর্নীতি, সামরিক গোয়েন্দাদের মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি ও অস্ত্র সরবরাহ, জালিয়াতির নির্বাচন ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।

লেখক তাঁর বিশ্লেষণে আরও বলেন, বিএনপির রাজনীতি মূলত জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পাকিস্তান প্রীতি, চায়নার সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন ও ভারতের সাথে তথাকথিত কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন। কিন্তু জিয়াউর রহমান নিজেও জানতেন না একদিন তাঁকে এই অপরাজনীতির ট্রাম্পকার্ডের বলি হতে হবে। জিয়াউর রহমানের পরে এরশাদের স্বৈরশাসনের সময়ে খালেদা জিয়ার এক দশকের নেতৃত্ব তথাকথিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে মিশে এবং মুক্তিযুদ্ধের পরের নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দিয়ে বিএনপির ভাবমূর্তি কিছুটা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়--যা পরবর্তীতে তাঁকে ক্ষমতায় যেতে সাহায্য করে। কিন্তু পরবর্তীতে খালেদা জিয়া সিভিল এবং মিলিটারি আমলাদের সহযোগিতায় সন্ত্রাসী ছাত্র-রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করে, কালো টাকার অবাধ প্রবাহ সৃষ্টি করে--বুদ্ধিজীবী ও সিভিল সমাজের একাংশকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থের কাজে লাগালেন। এতে চারদিকে তথাকথিত একটি নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, তাঁদের সাম্রাজ্যের পতন অসম্ভব।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিভক্তির ধারা বিশ্লেষণ করে গাফ্‌ফার চৌধুরী বলেন, মুজিবনগরে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগ মূলত দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায় : একদিকে মোশতাক, কর্নেল ওসমানী, মাহবুব আলম চাষী এবং অন্যদিকে তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে আরেকটি গ্রুপ। আর মোশতাক-ওসমানীর গভীর রাজনৈতিক সখ্যতার পরিণতি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড। লেখক বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাময়িক আঁতাতকে ইতিবাচক মনে করেননি। তিনি বাংলাদেশের ক্যান্টনমেন্ট কেন্দ্রিক রাজনীতির সমালোচনা করে বলেন, এই রাজনীতি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এই রাজনীতি গ্লোবাল ফ্রি মার্চেন্ট অর্থনীতি এবং সুপার পাওয়ার রাজনীতির সাথে জড়িত, যেখানে জেনারেল জিয়া এবং জেনারেল এরশাদকে ক্ষমতা দখল করায় ও টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে সাহায্য দেওয়া হয়। লেখক বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা কোনও নতুন কিছু নয় বরং এটি আরও দুটি ঘটনার ধারাবাহিকতার প্রতিফলন। এর একটি হচ্ছে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং অন্যটি হচ্ছে একই বছরের ৩ নভেম্বর জেলহত্যা। লেখক বাংলাদেশে বাম রাজনীতির চরিত্র বিশ্লেষণ করে বলেন, এই রাজনীতির উদ্ভব উদীয়মান শিক্ষিত শহুরে মধ্যবিত্তশ্রেণি থেকে। এই কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থিদের কোনও গণসম্পৃক্ততা গড়ে ওঠেনি। একই কারণে গ্রামবাংলার জনগোষ্ঠীকে সংযুক্ত করতে মওলানা ভাসানী বা হাজী দানেশের মতো নেতাদের সামনে দাঁড় করাতে হয়েছে।

লেখক কঙ্গো ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলেন, সত্তরের দশকে বাংলাদেশে ও বহির্বিশ্বে যেমন শেখ মুজিবের নাম তেমনি ষাটের দশকে কঙ্গোর লুমুম্বা নামটি সারা বিশ্বে উচ্চারিত হয়। কিন্তু দুটি দেশেই পশ্চিমা ও দেশীয় ষড়যন্ত্রের কারণে দুজন নেতার বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতাচ্যুতের নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়। লেখক বর্তমান সমাজ-ব্যবস্থায় সিভিল ও সামরিক সমাজের অবস্থান বিশ্লেষণ করে বলেন, রাষ্ট্রের পীড়ক শক্তির ভূমিকা থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য শক্তিকে গণসমাজের সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে সিভিল সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ‘ভয় সৃষ্টির রাজনীতি’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, গণবিরোধী অশুভ শক্তিকে মদদ যোগানোর কাজে এবং অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে একধরনের রাজনৈতিক গোষ্ঠী। এরা দেশের রাজনীতিতে বিভীষণের ভূমিকা পালন করে। ভারতের সাথে গঙ্গার পানি-চুক্তি প্রসঙ্গে লেখক বলেন, চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার পর বিএনপির নেতারা ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ না করে বরং নেতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করে। একই সঙ্গে পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করার কারণে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত হলেও বিএনপি এই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে সহিংসতাকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেছে, যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।

এ খণ্ডে ড. বদিউজ্জামানের সংস্কৃতির রাজনীতি বইটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘ বিশ্লেষণে লেখক বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির জন্মের পূর্বে সংস্কৃতির রাজনীতির দ্বার অবারিত হয়েছিল। লেখক বলেন, ১৯৪৭ সালে পূর্ব ও পশ্চিম-বাংলা পৃথক হওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল সাংস্কৃতিক ভিন্নতা। অবশ্য এর সূচনা হয়েছিল ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে, যার মূলে ছিল ধর্মীয় সংস্কৃতির ভিন্নতা, অর্থাৎ ব্রিটিশরা অতি কৌশলে ধর্মীয় সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক বিভাজন-নীতিতে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থকে চরিতার্থ করার চেষ্টা করে। তার বাস্তব প্রমাণ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ধর্মের ভিত্তিতে পূর্ব ও পশ্চিম-পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক বন্ধন ধরে না রাখতে পারা। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক উপলব্ধির পার্থক্যই এই বন্ধন ধরে রাখার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করেছে। সুতরাং পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পরও পূর্ব-পাকিস্তান পৃথক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হলো। কাজেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র সংস্কৃতির রাজনীতিতে ভিন্নতা থাকার কারণে এর ভৌগোলিক অখণ্ডতা টিকিয়ে রাখতে পারেনি। পশ্চিম-পাকিস্তানের শাসকবর্গ পূর্ব-পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে পারেনি, কারণ তারা পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে গ্রহণ করার মতো মানসিকতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। পাশাপাশি পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্র-রাজনীতি, রাজনৈতিক মূল্যবোধ ইত্যাদি মিলিয়ে পাকিস্তানি শাসকবর্গ পূর্ববাংলার সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

লেখক বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একইভাবে জাতীয়তাবাদের সংস্কৃতিকে রাজনীতিতে নিয়ে আসা হল। সেই সঙ্গে রবীন্দ্র-নজরুলের অবদানকে বিতর্কিত করা হলো, এমনকি বাংলাসাহিত্যের অবদান হিন্দু-মুসলমান পরিচয়ে বিভক্ত করার প্রয়াস চালানো হল। একই সঙ্গে বুর্জোয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি, পুঁজিবাদ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ, ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ইত্যাদি মিলিতভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নানাভাবে আচ্ছন্ন করে একধরনের সাংস্কৃতিক সংকটের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করা হলো।

পরিশেষে লেখক বলেন, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বুর্জোয়া রাজনীতির অচলায়তন সংস্কৃতির রাজনীতিকে শিকলে বেঁধে দিয়েছে, যা ভাঙার জন্য দরকার যোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র সপ্তদশ খণ্ডে যাঁদের প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে তাঁরা হলেন ভবানী সেন, হুমায়ুন কবির, অমলকুমার মুখোপাধ্যায়, আবুল হুসেন, আবুল ফজল ও আবু সয়ীদ আইয়ুব।

ভবানী সেন তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে যে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে মার্ক্সবাদ, চীন-ভারত সংঘর্ষের পটভূমি, বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন, কাশ্মীর সমস্যা, ভারত-সোভিয়েত সম্পর্ক, যুক্তফ্রন্ট ও কমিউনিস্ট পার্টি, নতুন পরিস্থিতির সংকেত, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, কোচিনের আহ্বান, কুম্ভকর্ণের ঘুম নয়, সিপিএম-এর স্বরূপ, ভারতে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের ভূমিকা ইত্যাদি। মার্ক্সবাদ সম্পর্কে লেখক বলেন, ১৮৪৪ সালে মার্ক্সবাদ ছিল কেবল শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পরবর্তী সময়ে তা শুধুমাত্র সমাজতান্ত্রিক কাঠামোতে রূপ নেয়নি বরং বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি জনগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট সমাজব্যবস্থার আওতাভুক্ত হয়েছে। চীন-ভারত সংঘর্ষের পটভূমি বিশ্লেষণ করে লেখক দেখান যে, ভারতের শাসকশ্রেণি আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী শাসকের সঙ্গে গাঁট বাঁধতে পারে যা চীনের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে।

জাতীয় আন্দোলনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা বিশ্লেষণের মাধ্যমে লেখক বলেন, ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে ভারতবর্ষে যে শ্রমিকবিপ্লবের ধারা সূচিত হয় সেখান থেকেই মূলত কমিউনিস্ট আন্দোলনের গোড়াপত্তন ঘটে। বিভিন্ন দেশের মধ্যকার কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে মতভেদের কারণসমূহ বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস যখন স্তালিনের ব্যক্তিতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে; তার পরপরই ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মতভেদ ও সংঘাত শুরু হয়। কমিউনিস্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রে মার্ক্সবাদী আদর্শ এমন একধরনের গোষ্ঠীর সৃষ্টি করে যারা শ্রমিকশ্রেণিকে শোষণের মাধ্যমে বণিকশ্রেণির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সুকৌশলে এড়িয়ে যায়। আবার শ্রমিকদেরকে তথাকথিত ন্যায়বিচার ও সমতামূলক সমাজব্যবস্থা তথা রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রয়াস চালায়। ভারতের কাশ্মীর সমস্যা সম্পর্কে ভবানী সেন বলেন, কাশ্মীরে পাকিস্তানের অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু পাকিস্তানের স্বার্থ না বরং ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির সমর্থন ছিল।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বিবর্তন ও ক্রমবিকাশ এবং সেইসঙ্গে ১৯২৯ সালের মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৩৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা, ১৯৩৯ সালে শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার এবং ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস সরকার কর্তৃক কমিউনিস্ট পার্টিকে দমন করার বিস্তারিত প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেন লেখক। সেইসঙ্গে ভবানী সেন ভারতের স্বাধীনতা লাভের পূর্বে ১৯৪৫ সালে সম্মিলিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধি ভারতের স্বাধীনতা সম্পর্কে যে দূরদর্শী বক্তব্য রেখেছিলেন তা বিশ্লেষণ করেন। লেখক বলেন, ১৯৬৭ সালের চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনে ভারতের দুটি ভিন্ন বামপন্থি ফ্রন্ট পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর এবং কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে পতন ঘটানোর চেষ্টা একটি প্রতিক্রিয়াশীল জাতির ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। লেখক ভারতের ইন্দিরা গান্ধী সরকারের করণীয় বিশ্লেষণ করে বলেন, এই সরকার পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সমস্ত প্রগতিশীল কর্মপরিকল্পনা বাদ দেয় যার উদ্দেশ্য হল আমেরিকার সাথে অধিকতর সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা।

ভবানী সেন অন্যান্য লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ভারতের নবম কংগ্রেসে যে রাজনৈতিক প্রস্তাব গৃহীত হয় তা বামপন্থি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে যায়নি। পাশাপাশি তিনি সিপিএম-এর স্বরূপ বিশ্লেষণ করে বলেন, এই পার্টির ভাঙনের পেছনে জাতীয় পরিষদের দ্বিধাবিভক্তি অনেকাংশে দায়ী। লেখকের বিশ্লেষণে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ভারতের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নির্ভরশীলতার নাগপাশ কাটাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন নানাভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা যোগায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের পক্ষ অবলম্বন করায় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর নানাধরনের চাপ সৃষ্টি করে। লেখক ভারতের জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণির সমালোচনা করে বলেন, তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকারের সঙ্গে আপস করে সাধারণ মানুষ থেকে নিজেদের আলাদা করে নিয়েছে, যে কারণে কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় কংগ্রেসের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখার কৌশল অবলম্বন করে।

হুমায়ুন কবির তাঁর লেখায় যে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে মার্ক্সবাদ, ঐতিহাসিক জড়বাদ, ধনতন্ত্র ও শ্রেণিসংগ্রাম, এবং শ্রমিকরাজ ও সাম্যবাদ। তিনি মার্ক্স ও তাঁর অনুসারীদের রাজনৈতিক দর্শন, পুঁজিবাদী শোষণব্যবস্থা এবং সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের স্বরূপ বিশ্লেষণ করেন।

অমলকুমার মুখোপাধ্যায় কংগ্রেসের রাজনীতিতে গান্ধীর সম্পৃক্ততা ও অবদানকে বিশ্লেষণ করেন। লেখকের মূল্যায়নে গান্ধীর যতটা-না ক্ষমতার প্রতি মোহ ছিল তার চেয়ে অনেকগুণে বেশি ছিল গণমানুষের কল্যাণের দর্শন এবং নৈতিক সততা--যার ফলে কংগ্রেস গণমানুষের ব্যাপক সমর্থন লাভে সক্ষম হয়। ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্র কতটা সাম্যবাদী এবং সমাজবাদী সমাজব্যবস্থার সহায়ক এ প্রসঙ্গে লেখক বলেন, পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতা দীর্ঘদিন সিপিআই (এম)-এর ধরে রাখার উদাহরণই প্রমাণ করে সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে বৈপ্লবিক সমাজ গড়া সম্ভব। ভারতের সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে অমলকুমার বলেন, প্রায় চার দশকের ভারতীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সন্ত্রাসবাদী তৎপরতায় গভীরভাবে আক্রান্ত ছিল, যা ভারতের জন্য এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তবে এই সন্ত্রাসবাদের কারণ বিশ্লেষণ করে লেখক আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র থেকে আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনসমূহ না মেটানোর কারণে গণমানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে যা অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদীকে উৎসাহিত করে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানাধরনের নাজুক অবস্থার পেছনে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে তা হচ্ছে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে সৃষ্ট বঞ্চনা ও শোষণপ্রক্রিয়া। লেখকের দৃষ্টিতে যদিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে কিন্তু অর্থনৈতিক শোষণের হাত থেকে জনগণের মুক্তি মেলেনি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে দেশি-বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিবাদী স্বার্থের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা, যা মূলত স্বার্থান্বেষীদের স্বার্থচরিতার্থের উপায় মাত্র। এই অবস্থা থেকে মুক্ত হতে গণমানুষের দরকার বড় ধরনের সচেতনতা। পাশাপাশি বাংলার রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। আবুল হুসেন ‘বাঙ্গলার রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ’ প্রবন্ধে বলেন, এদেশ সুফলা শস্য-শ্যামলা করেছিলেন আমাদেরই পূর্ব-পুরুষ--এখন এর শ্রী বাড়ানো ও রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই।

আবুল ফজল তাঁর লেখায় যে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন সেগুলো হলো--স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী বনাম স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাস্তব অবস্থাসমূহ, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বাভাস, শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে মানবিক ও যৌক্তিক বিষয়সমূহকে সংশ্লিষ্ট করা ইত্যাদি।

অন্যদিকে আবু সয়ীদ আইয়ুব ভারতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ তথা উদারবৃত্তিক রাজনৈতিক মনোভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জওহরলাল নেহরুর রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যসমূহকে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতের সাম্য ও স্বাধীনতা আনয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অবদানসমূহ আলোচনা করেন।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র অষ্টাদশ খণ্ডে যাঁদের প্রবন্ধ সংকলন করা হয়েছে তাঁরা হলেন আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বদরুদ্দীন উমর, আনু মুহাম্মদ, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আবু জাফর শামসুদ্দীন, শিবনারায়ণ রায় ও নারায়ণ দাশশর্মা।

আহমদ শরীফের বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণসমূহ হল : ঐতিহ্যবোধ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, জাতীয়তা, ইংরেজ আমলে মুসলিম-মানসের পরিচয়-সূত্র, জাতিবৈর ও বাঙলাসাহিত্য, ইতিহাসের ধারায় বাঙালি, ইতিহাসের আলোকে আত্ম-দর্শন, একটি প্রতারক প্রত্যয়, রাজনীতি ও গণমানব, মিলন-ময়দানের সন্ধানে, অপ্রেম ও ঐতিহাসিক নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস। তিনি বলেন, ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হলেও এখানে হিন্দু-ঐতিহ্য ও রীতিনীতির প্রভাবে অহিন্দুদের মধ্যে একধরনের নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে যা নিরাপত্তা ও স্বস্তি দুটোকে হুমকির মুখে ফেলেছে। জাতীয়তা প্রসঙ্গে তাঁর বিশ্লেষণ হল : এটি হচ্ছে ব্যষ্টি, যাদের নিয়ে গড়ে ওঠে সমষ্টি। কিন্তু ‘জাতীয়তা’ বোধকে ব্যবহার করা হচ্ছে ধর্মীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে। এজন্য দেখা যায় নানাধরনের জাতীয়তাবাদ যথা ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় বা গোত্রভিত্তিক--যা প্রকৃতপক্ষে নাগরিকদের মধ্যে বিভক্তি ও দ্বৈততা সৃষ্টি করে। লেখক আরও বলেন, ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচার হয়েছিল কেরামতি, সামাজিক সাম্য ও ভাববাদকে কেন্দ্র করে, কোনও যৌক্তিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে নয়। যে কারণে মুসলমানরা অনেক ক্ষেত্রেই দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে পারেনি।

তিনি তাঁর বিশ্লেষণে দেখান যে, বাংলাসাহিত্য বিশেষ করে মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লেখকরা সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, বিদ্রূপ, অবজ্ঞা ও কটাক্ষমূলক সমালোচনা করেছেন। ইতিহাসের ধারায় বাঙালিদের বিবর্তনবিষয়ক আলোচনায় তিনি যুক্তি দেখান যে, আমাদের পূর্বপুরুষ একসময় ছিল ঐরধবর্ধ্রটেথটভ, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং সবশেষে মুসলমান। তবে বাঙালিরা সবসময় ছিল বিদেশি শাসন ও শোষণের ঘোরবিরোধী যে কারণে তারা স্বাধীনতা আন্দোলনে কখনও পশ্চাৎপদ হয়নি। এ প্রসঙ্গে লেখক আরও বলেন, ধর্ম ও সম্প্রদায়ভিত্তিক জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় শুরু হয় মুঘল আমল থেকে যার ফলশ্রুতি হচ্ছে হিন্দু-মুসলিম উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিরোধিতা, সংঘাত ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা। লেখক ইসলামিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের দর্শনকে সমালোচনা করে বলেন, এই প্রত্যয়গুলো বৈষয়িক ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় কার্যকর নয়। লেখকের বিশ্লেষণে ভারতবর্ষে একের পর এক বিদেশি শাসকের আগমন ঘটেছে, শোষণপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে লুণ্ঠনকাজ সাধিত হয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রিক ঐক্যবোধের ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে ১৯৪৭-উত্তর আজাদ পাকিস্তানে শিক্ষিত মুসলমানশ্রেণি সাধারণ মানুষকে শোষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্যাতন করে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে লেখক আরও বলেন, ভারতবর্ষে নানা জাতি, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলন ও বিভেদ উভয়ই সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু প্রয়োজনে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে দেশের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মিলনমেলার মাধ্যমে একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে--যার প্রতিফলন হল সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য। লেখক দিল্লির সম্রাটদের শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, তাদের মাধ্যমে ইংরেজগণ দেওয়ানি পাওয়ার ফলে বাংলা এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজত্বের গোড়াপত্তন ঘটে।

অন্যদিকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর লেখায় স্বাধীনতা ও সাম্যের মধ্যে ভেদরেখা টেনে বলেন, স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে যখন শ্রেণিহীন আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সমাজকে দারিদ্র্য, শোষণ ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়। লেখক চীনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, যে চীন একসময় ড্রাগন ও আফিমের দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল সেই চীনকে মাদক আসক্তি থেকে মুক্ত করলেন মাও সেতুং একটি অভূতপূর্ব বিপ্লবের মাধ্যমে। বিপরীতে বাংলাদেশে যে পাকিস্তানি বুর্জোয়াদের শাসন ও শোষণ প্রক্রিয়া বিদ্যমান ছিল, স্বাধীনতার মাধ্যমে তার অবসান হলেও পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সরকারের ব্যর্থতার কারণে দেশটি বাস্তবক্ষেত্রে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে বিদেশি সাহায্যের মোটা অংশ শাসকগোষ্ঠী আত্মসাৎ করে জনগণের জন্য বয়ে আনে বড় ধরনের ভোগান্তি এবং যার চরম পরিণতি হচ্ছে দারিদ্র্য ও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হওয়া।

বদরুদ্দীন উমর যে বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করেছেন সেগুলো হচ্ছে বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব, ফরাসি বিপ্লবের তাৎপর্য ও করণীয়, ফরাসি বুর্জোয়া বিপ্লবের স্বরূপ এবং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার, বিপ্লব প্রতিবিপ্লবের দ্বিতীয় ধারা এবং মাও সেতুং-এর ঐতিহাসিক অবদান ও তাঁর শিক্ষার বর্তমান গুরুত্ব। সেইসঙ্গে লেখক সমসাময়িক রাশিয়া ও চীনে পুঁজিবাদের সংকটকে বিশ্লেষণ করেছেন গভীরভাবে। তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সমাজবাদ, পুঁজিবাদ এবং সাম্যবাদের সংকট বিশ্লেষণের পাশাপাশি ভারতবর্ষে বাম ধারার রাজনীতিতে বিভক্তিকরণের কারণসমূহ বিশ্লেষণ করেন। একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সংকট বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, এ সকল সমাজব্যবস্থায় নানাধরনের নেতিবাচক অর্থনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালিত হয় যা মূলত মুনাফাভিত্তিক এবং যার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে মাদকদ্রব্য ও চোরাচালানের প্রসার। এর পাশাপাশি লেখক সমাজবাদী সমাজ ও পুঁজিবাদী সমাজের বুর্জোয়াধারাকে তীব্র সমালোচনা করেন এবং দেখান যে, কীভাবে দুটি বিপরীত ধারার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাজব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যোগসাজশে সাধারণ মানুষকে শোষণ করে।

বাংলাদেশে মার্ক্সবাদ চর্চার কঠোর সমালোচনা করে লেখক ভণ্ড মার্ক্সবাদীদেরকে বুর্জোয়া হিসেবে অভিহিত করেন। পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদী সাহায্য সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনা করে এর স্বরূপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখান যে, এ সকল সংস্থাসমূহ উন্নয়নশীল বিশ্বে সাহায্যের নামে নির্ভরশীলতা তৈরি করছে তথাকথিত ‘শর্তসাপেক্ষ এইডস’-সরবরাহের মাধ্যমে। একই সঙ্গে লেখক বাংলাদেশে গণজাগরণের পূর্বশর্তসমূহ বিশ্লেষণ করেন এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যাগুলো মূল্যায়ন করেন। তিনি দেখান ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশে একটি পেটি বুর্জোয়াশ্রেণির বিকাশ হয়েছে। যাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো লুটপাটের মাধ্যমে একটি বিশেষ শ্রেণি তৈরি করে ভোগবিলাসবহুল জীবন নির্বাহ করার মাধ্যমে গণমানুষকে কল্যাণের পরিবর্তে শোষণ প্রক্রিয়ায় চরম দারিদ্র্যের আবর্তের মধ্যে নিয়ে যাওয়া। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের গণআন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা অতি নগণ্য--কারণ এই আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করার কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেই। একই সঙ্গে তিনি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন।

অন্যদিকে আনু মুহাম্মদ তাঁর বিশ্লেষণে চীনে সমাজতন্ত্র এবং শ্রেণিসংগ্রামের স্বরূপ বিশ্লেষণ করে বলেন, ১৯৪৯ সালে চূড়ান্তভাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধনের পূর্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যা শেষপর্যন্ত বিপ্লবকে সফল করে। তবে এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে চীনকে যথেষ্ট সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী তাঁর লেখায় গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের ধাপসমূহ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও ব্যবস্থাসমূহ গণমানুষের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকর নয় বললেই চলে, যার অন্যতম কারণ হচ্ছে দায়বদ্ধতার অভাব। তিনি ‘গণতন্ত্রের পথে এক ধাপ’ প্রবন্ধে পশ্চিম-পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব-পাকিস্তানে যে শোষণ, নির্যাতন ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে তা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে তৎকালীন পাকিস্তানে মুসলিম লীগ চক্র দেশকে প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকে ঠেলে দেয়।

আবু জাফর শামসুদ্দীন ‘মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও ইসলাম’ প্রবন্ধে বলেন, ইসলাম ধর্মে বিশেষ করে বাগদাদ-দামেস্ক সংস্কৃতিতে রোমান-পারসিক সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রভাব সুস্পষ্ট। তবে আরব-বিশ্বে গোত্রীয় সংহতি নির্বাহের ক্ষেত্রে ইসলাম সফলতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে ব্রিটিশ, জার্মান ও আমেরিকানরা তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মিত্রের সন্ধানে সকল কৌশল অবলম্বন করে। লেখক তাঁর বিশ্লেষণে বলেন, সৌদি বাদশাহ ইবনে সৌদ তিরিশের দশকে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে মার্কিন তেল কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড অয়েল সৌদির প্রতি তথাকথিত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। মার্কিন ওই তেল কোম্পানি সৌদিদের সঙ্গে চুক্তি করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদের নীলনকশা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়ে নেয় এবং নিজেদের সাম্রাজ্যবাদের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

‘জাতীয়বাদ, রাষ্ট্র এবং প্রশাসনিক কাঠামো’ প্রবন্ধে আবু জাফর শামসুদ্দীন বলেন, রাষ্ট্র, আইন এবং রাজা এক নয়। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, রাজ্য পালনে ‘শাসন-শোষণ’ কৌশল অবলম্বন করা অনেকটা বিধেয়। তবে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে লেখক বলেন, রোমান ও ইরানিদের মতো মুসলিম শাসকরাও বিলাস-ব্যসন ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র শাসন করেছেন, কিন্তু কখনও আধুনিক রাষ্ট্র তথা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পদক্ষেপ নেননি। অন্যদিকে প্রাচীন গ্রিক মনীষীগণ মানুষের কল্যাণে রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা করেন। ভারতবর্ষে দেশীয় রাজন্যবর্গ কখনও জনগণের কল্যাণে রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি বরং নিজস্ব সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাধারণ প্রজাদের নির্মমভাবে শোষণ ও নির্যাতন করেছেন।

শিবনারায়ণ রায় ‘জাতিবাদ, মনুষ্যত্ব ও সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ন্যাশনালিজম’ এবং রুডলফ রকারের ‘জাতীয়তাবাদ, মনুষ্যত্ব ও সংস্কৃতির স্বরূপ’ নিয়ে আলোচনা করেন। একই সঙ্গে লেখক মেকিয়াভেলির রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশলগত মডেলের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, জাতীয়তাবাদ হল একটি দেশের সংস্কৃতি উচ্ছেদের মূল হাতিয়ার যেখানে মনুষ্যত্বের কোনও স্থান নেই।

নারায়ণ দাশ শর্মা ‘প্রসঙ্গ কথা : বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতি’ প্রবন্ধে বলেন, বুদ্ধিজীবীদের দুটি ধারা সুস্পষ্ট। একদিকে তাঁরা ‘শিল্পী’ অন্যদিকে তাঁরা তথাকথিত ‘সমাজ বিশ্লেষক’, কিন্তু এই দুটি ধারা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এবং পারস্পরিক সাংঘর্ষিক।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র ঊনবিংশ খণ্ডে জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়, আবদুশ শাকুর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও বরুণ সেনগুপ্তর লেখা সংকলিত হয়েছে।

জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গণতন্ত্রধর্ম ও রাজনীতি গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধে বলেন, প্রাগ-ঐতিহাসিক যুগেও সামাজিক আন্দোলন তথা স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম লক্ষ করা গেছে। গ্রিক ও রোমান সাম্রাজ্যে দাসরা শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে যেমন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, মধ্যযুগে ধর্মীয় খোলসের অন্তরালে যে আর্থিক শোষণ, সামাজিক  বঞ্চনা-নির্যাতন চলে তার বিপরীতে শিল্পবিপ্লব ও রেঁনেসার মাধ্যমে চিন্তা ও সংস্কৃতির জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সমাজগুলো সাম্য, স্বাধীনতা ও মৈত্রীর আদর্শ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। এককথায় বলা যায়, আধুনিক যুগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তথা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ একদিকে যেমন নিজেদের সমাজে শোষণপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান প্রকটিত করে--পাশাপাশি আগ্রাসন, দমন, শোষণ ও নিপীড়নের মাধ্যমে বিশ্বের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে নাজুক অবস্থায় ফেলে। একইভাবে তথাকথিত ব্যক্তিস্বাধীনতার পাদপীঠ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গদের নির্মম শাসন, শোষণ ও দমন প্রক্রিয়া। অন্যদিকে ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়--এখানে বিভেদ ও বর্ণ-জাতিভেদ ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ রেখে সংখ্যালঘু আদিবাসীসহ নিম্নবর্ণের সকল জাতিগোষ্ঠীকে মূল সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে তাদের ওপর শোষণ ও নিষ্পেষণ চালায় শাসকবৃন্দ। এমনকি আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও শহরায়ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হলেও সমাজের নিম্নবর্গের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী বর্ণভিত্তিক শ্রমবিভাজনের শিকার--যার মাধ্যমে শোষণের মাত্রা এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অসমতার প্রতিফলন প্রচণ্ডভাবে লক্ষণীয়। সেইসঙ্গে অভিন্ন ভারতের সামাজিক কাঠামোতে নারীর স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে তাদের অধঃস্তন করা হয়েছে। নারীকে কখনও ভোগের বস্তু, কখনও সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম, আবার কখনও গৃহদাসী হিসেবে শোষণ ও বঞ্চনার মাধ্যমে অধীনন্ত করে রাখা হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকার পরও সাধারণ জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়।

জয়ন্তানুজ ধর্মনিরপেক্ষতা বিশ্লেষণ করে বলেন, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোতে এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও রাষ্ট্রকর্তৃক নাগরিকদের বিভাজনের নীতি অপরিবর্তনশীল--যে কারণে সম্পত্তির উত্তরাধিকার, নারীর অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের জন্য ভিন্ন নীতিমালার প্রচলন ও প্রয়োগ রয়েছে--যা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোতে মৌলিক অধিকার হরণ করার সামিল। লেখক প্রাচীন ভারতে শ্রেণিবিভাজনের প্রসঙ্গে বলেন, ঋগ্বেদ-এর পুরুষপ্রাধান্য-বাস্তবতা সামাজিক বিভাজনের মূলমন্ত্র। একইভাবে মনুসংহিতা এবং ভগবদ্গীতা ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্বের মাধ্যমে সমাজের সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ করার মন্ত্রণা দিয়েছে। এভাবে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের নামে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তৈরি করা হয়, যারা মূলত পরগাছা, অথচ তাদের মাধ্যমেই শোষিত হচ্ছে সমাজের অধিকাংশ সাধারণ জনগোষ্ঠী--বিশেষ করে কৃষকশ্রেণি যাদের অধিকাংশই আবার নিম্নবর্গের জনগোষ্ঠী। লেখকের দৃষ্টিতে ধর্মের বহিঃপ্রকাশ মূলত মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার প্রতীক--যা গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধকে নিষ্ঠুরভাবে কুঠারাঘাত করেছে, যা ধর্মান্ধতার নামান্তর। সেইসঙ্গে পুঁজিবাদ সম্পর্কে লেখকের বিশ্লেষণ হল, বিশেষ এই অর্থনৈতিক দর্শন মূলত রাজনৈতিক দর্শনের আদর্শ ও পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছে--যার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রে তথা সমাজের ওপর সার্বিকভাবে শোষণ ও আধিপত্যবাদ কায়েম করা।

আবদুশ শাকুর ‘সাম্প্রচারিক সাম্রাজ্যবাদ’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক পুঁজিবাদী প্রচারমাধ্যমের দ্বারা শিল্পপণ্যকে বাজারজাত করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা হয়েছে--যার ফলে তথাকথিত ‘ভোগবাদী’ সংস্কৃতি সমাজের অধিকাংশ মানুষকে আকর্ষণ করে। অন্যদিকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর রাষ্ট্রের মালিকানা গ্রন্থের বিভিন্ন রচনায় বলেন, স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত হত মূলত সামরিক ও অসামরিক আমলাদের মাধ্যমে। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পরও উভয় ধরনের আমলাদের প্রভাবে রাজনীতিবিদগণ তথা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি এই কাঠামোগত ব্যবস্থায় কোনও পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি--যা সাধারণ জনগণের জন্য কেবল দুর্ভাগ্যজনক নয় বরং সামাজিক সমতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের নাজুকতা সৃষ্টি করেছে। অধিকন্তু লেখক জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে বলেন, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কারণে সমাজ আজ দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, ১৯৭৫-এ প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করে যারা ক্ষমতাসীন হয়েছিল তারা মূলত পুঁজিভিত্তিক শ্রেণিব্যবস্থায় বিশ্বাসী, যে কারণে তারা সমাজবাদী মতাদর্শকে কঠোরভাবে দমনের মাধ্যমে দেশের মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা হরণ করেছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর গ্রন্থে যে বিষয়গুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের মালিকানার ধরন, জাতীয়তাবাদের মধ্যে ভিন্ন আদর্শিক সংঘাত, জাতি গঠনের উদ্যোগ ও নানাবিধ ষড়যন্ত্রের প্রয়াস, ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে জনগণের মুক্তির প্রয়াস নাকি স্বাধীনতার ডাক, রাষ্ট্রের মধ্যে ভাঙনের বাস্তবতা অথচ শ্রেণিশোষণের প্রক্রিয়া না ভাঙার কারণসমূহ, গণমানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার বিভীষিকা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের চাওয়া-পাওয়ার কারণে ঔপনিবেশিক বিরোধী নেতৃত্বের সমস্যা, ইতিহাসের বাস্তবতার আলোকে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় নানাধরনের শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর ভূমিকা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা ও বিজ্ঞানমনস্ক রাষ্ট্র গঠনের চ্যালেঞ্জসমূহ।

অন্যদিকে বরুণ সেনগুপ্ত তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে যে বিষয়গুলো আলোকপাত করেছেন তার মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি, নীতিগত গোঁড়ামি, রাজনৈতিক শরিকদের মধ্যে মতবিরোধ ও সংঘাত, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে রাজনীতিবিদদের করণীয়, রাজনৈতিক সংগঠনের স্বরূপ ও ভূমিকা, যুক্তফ্রন্ট সরকারের শাসনামলের মূল্যায়ন, ফ্রন্টে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতের নেপথ্য কারণসমূহ, ভাঙনের রাজনীতির নেপথ্য ইতিহাস, বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে রাজ্যের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নীতিহীন রাজনীতির ধারার সমালোচনা, খুনোখুনির রাজনীতির নেপথ্য কারণসমূহ, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ও তাঁদের কর্মকাণ্ড, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্য সরকারসমূহের ওপর শরণার্থীদের নানাবিধ চাপ এবং সংশ্লিষ্ট চাপসমূহ মোকাবিলায় নানাধরনের গৃহীত পদক্ষেপ, পশ্চিমবঙ্গের বেকার সমস্যার স্বরূপ, নব কংগ্রেসের নেতৃত্বে দ্বন্দ্বের নেপথ্য কারণ, ঘরে-বাইরে সিপিআইর রাজনৈতিক ও নেতৃত্বের সংকট, সংসদীয় কর্মকাণ্ডে শালীনতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের করণীয়, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে বন্ধ্যাত্ব ঘোচানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদদের করণীয় ইত্যাদি।

লেখক দুর্নীতির স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, প্রতিটি দেশেই কিছু কিছু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতা অপব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার প্রয়াস পায় এবং এ ক্ষেত্রে আমেরিকা থেকে শুরু করে ভারতবর্ষ এর ব্যতিক্রম নয়। তবে লেখকের দৃষ্টিতে এই ধরনের হীন প্রয়াস সংশ্লিষ্ট দেশ ও জাতিসমূহের জন্য চরম ক্ষতিকর। পশ্চিমবঙ্গের যুক্তফ্রন্ট সরকারের করণীয় সম্পর্কে লেখক বলেন, যদিও দেশের প্রচলিত সংবিধান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় রাজ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধক। তবু এই ধরনের প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও রাজ্য সরকারের থাকতে হবে দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বাস্তব আর্থসামাজিক উন্নয়নের পদক্ষেপ।

লেখকের বিশ্লেষণে সংবিধানের ১৬৪ ধারা প্রয়োগ করে রাজ্যপাল যে প্রক্রিয়ায় যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে তা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। লেখক আরও বলেন, যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সিপিএম-এর বিরোধী হয়ে ওঠায় প্রমাণ হয় যে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর ক্ষমতাকে দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করার কারণে সরকারের সার্বিক উন্নয়ন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। লেখক তাঁর বিশ্লেষণে আরও দেখান যে, পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের একধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও তৎপরতার ফলে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটে।

বরুণ সেনগুপ্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, পাকিস্তানের শক্তিশালী ও এলিট সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল, তথাপি এই মুক্তিযুদ্ধে বাংলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং গেরিলাযুদ্ধ থেকে শুরু করে রণাঙ্গনে তাঁরা জয়ী হন। পাশাপাশি লেখকের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর সরকার যে সমর্থন দিয়েছিল তা খুব যে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত তা নয়, বরং সেটি হয়েছিল ভারতীয় বামধারার রাজনৈতিক দল সিপিএম-এর চাপে। ভারত সরকারের দেওয়া প্রত্যক্ষ সহযোগিতার মধ্যে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ও অস্ত্র সরবরাহ, এক কোটির অধিক শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে অবস্থানের অনুমতি ইত্যাদি। তবে এই সকল সমর্থনের ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে সিপিএম-এর বিরোধিতা এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল ও চাপ ছিল--যা মূলত নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার উপায় মাত্র।

লেখকের বিশ্লেষণে এ-ও উঠে এসেছে--পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর হাজার হাজার তরুণ কংগ্রেসে যোগ দেয়, যাদের অনেকেই রাজনৈতিক মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নয় বরং তারা পেশীশক্তির অধিকারী গোষ্ঠী--যারা নিজেদেরকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার লক্ষ্যে দলে ভিড়ে, যা দলের জন্য ছিল মারাত্মক ক্ষতিকর। নেতৃত্বের গুণাবলি ও নেতাদের অতীত কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধাঁচে কংগ্রেস কল্যাণমুখী রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরের মাধ্যমেই কেবল জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যোগ্যতা অর্জন করতে পারে বলে লেখক মনে করেন। পাশাপাশি লেখক পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল জনগোষ্ঠীর নানাধরনের বঞ্চনা বিশ্লেষণ করে বলেন, একদিকে পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরা যেমন পাটের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত, পাশাপাশি গঙ্গার জলের ন্যায্য হিস্যা থেকেও তারা বঞ্চিত। লেখকের বিশ্লেষণে এই বঞ্চনা ও ক্ষোভ থেকে রাজ্যে নানাধরনের স্বাতন্ত্র্যবাদ কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদ আন্দোলনও শুরু হয় যার পরিণতি মারাত্মক ক্ষতিকর। লেখক তাঁর বিশ্লেষণে বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক ও বিরোধী দল উন্নয়নের পারস্পরিক পরিপূরক, কিন্তু কেন্দ্রে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর কংগ্রেসভিত্তিক রাজনীতিতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে নির্বিচারে কালো টাকা বিতরণ করে--যা সিপিএম-এর পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের সকল অঞ্চলে সমভাবে উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। যে কারণে লেখক তাঁর বিশ্লেষণে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি যথা পশুপালন, চাষাবাদ ও ছোট ছোট শিল্প স্থাপন প্রত্যেক অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার সুপারিশ করেন। পরিশেষে লেখক বলেন, সিপিএম-এর নেতৃবৃন্দের উচিত নিজেদের মধ্যে বিরোধ এবং কোন্দল মিটিয়ে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সব ধরনের সংকট শক্তভাবে মোকাবিলা করা।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র বিংশ খণ্ডে যাঁদের প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে তাঁরা হলেন আবু জাফর শামসুদ্দীন, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল মনসুর আহমদ, আহমেদ ছফা ও মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।

আবু জাফর শামসুদ্দীন ‘অতীত নেতৃত্ব’ প্রবন্ধে অতীত নেতৃত্বের যোগ্যতা, একনিষ্ঠতা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং নেতৃত্বের দূরদর্শিতার দুর্বল ও বলিষ্ঠ দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেন। এ. কে. ফজলুল হকের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, তিনি জমিদারশ্রেণির লোক হয়েও সমাজের সাধারণ প্রজার ওপর যে সীমাহীন শোষণ, নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানো হয় সেগুলোর শুধু প্রতিবাদই করেননি বরং নিজে কৃষক-প্রজা পার্টি গঠনের মাধ্যমে সে-সবের প্রতিকার ও প্রতিরোধের অঙ্গীকার করেন। সুদখোর মহাজনদের শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে এবং জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আইনগত বাধ্যবাধকতার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি তিনি কৃষক-প্রজা পার্টির মাধ্যমে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুসলিম আসনসমূহে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী পাক-ভারতের পারস্পরিক বৈরী সম্পর্কের বিশ্লেষণ করে বলেন, যদিও নেতৃত্বের পর্যায়ে দুটি দেশের মধ্যে সংঘাত রয়েছে কিন্তু সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষ এ ধরনের তিক্ততা ও বৈরীতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ‘একটি রাজনৈতিক স্বপ্ন’ প্রবন্ধে অতিমাত্রার আবেগকে পরিহার করে বাস্তবতার আলোকে ব্রিটিশরাজকে ভারতের স্বাধীনতা প্রদানে চাপ সৃষ্টি এবং হিন্দু-মুসলিম নেতৃবৃন্দের সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে ভারতবর্ষকে একটি আদর্শ, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সেইসঙ্গে লেখক বলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে প্রথম যে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া দরকার; তা হল ইসলামি নীতির প্রবর্তন, তবে তা হতে হবে যৌক্তিক এবং সমতার ভিত্তিতে। সেইসঙ্গে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামোর রূপরেখা সম্পর্কে লেখক বলেন, সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বাধীনতার ভিত্তিতে গঠন করতে হবে গণপরিষদ, যেখানে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থাকতে হবে সকল অঞ্চল ও সকল শ্রেণি-পেশার জনগোষ্ঠীর।

আন্তর্জাতিক আজাদি প্রসঙ্গে লেখকের বিশ্লেষণ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো নিজেরা স্বাধীন জাতি ও রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোকে তারা নানাভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা।

আবুল মনসুর আহমদ তাঁর রচনায় যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন তা হচ্ছে দেশের সংবিধান প্রণয়ন করাই শেষ দায়িত্ব নয় বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার গঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। লেখক স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারকে বিপ্লবী সরকার আখ্যায়িত করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সরকার হচ্ছে একটি নিয়মতান্ত্রিক সরকার, কাজেই আওয়ামী লীগ সরকারের উচিত জনগণের মাধ্যমে সরকার পরিচালনার ধারা অব্যাহত রাখা--যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে ভারতের কংগ্রেস সরকার। লেখক স্বাধীন বাংলাদেশের নামকরণ অর্থাৎ ‘গণপ্রজাতান্ত্রিক’ কথাটি বাদ দিয়ে শুধু ‘প্রজাতান্ত্রিক’ রাখার ওপর জোর দেন কেননা প্রথমটির একাধিক অর্থ রয়েছে যার মধ্যে রয়েছে সমার্থক অর্থ। লেখক মুক্তিযুদ্ধে তরুণদের যে অবদান রয়েছে তা শাসনতান্ত্রিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন যা বাস্তবে গণতন্ত্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। তিনি বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক দলিল বিষয়ে বলেন, শুধু বাংলা ভাষাবিদদের মাধ্যমে এই সংবিধান প্রণয়ন না করে বরং সব পেশাজীবীকে সম্পৃক্ত করে সংবিধানকে সমৃদ্ধ করার বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেন। সংবিধানের কিছু মৌলিক অধিকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে লেখক বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ‘মূলনীতি’ ও ‘মৌলিক অধিকার’ এ দুটির মধ্যে ‘মৌলিক অধিকারের’ বিষয়টি সংবিধানের শুরুতেই উল্লেখ থাকতে হবে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের পুনর্গঠনে জনগণের প্রত্যক্ষ অবদান রাখার বিষয়টিরও জোর গুরুত্বারোপ করেন লেখক। পাশাপাশি তিনি আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ‘শিমলা চুক্তি’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিজয় দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে লেখক বলেন, এই জয় মূলত শোষণ, নিপীড়ন, অন্যায়, অত্যাচার ও পুঁজিবাদের কালো থাবা থেকে পরিত্রাণের উপায়-সূত্র। কাজেই সত্যিকারের এই বিজয় থেকে যাতে জনগণ বঞ্চিত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। ঐতিহাসিক ১১ দফার আলোকে লেখক শিক্ষার ক্ষেত্রে সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। একই সঙ্গে আইয়ুব ও হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের ১৬ এবং ১৭ নম্বর উপধারাদ্বয় বাতিলের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। দেশ ও জাতি গঠনের ওপর লেখক যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন সেইসঙ্গে পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের অবিলম্বে সম্মানের সঙ্গে তথা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী দেশে ফেরত নিয়ে আসার ওপর বিশেষ জোর দেন। লেখক সংবাদপত্রের সাংবিধানিক অধিকারকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাধীন সংবাদপত্র সরকারের উন্নয়ন, ভালোমন্দ, ভুল-ত্রুটি ইত্যাদি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের পাটশিল্পের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে লেখক বলেন, পাটশিল্প ধ্বংসের সাথে যে সকল দেশি-বিদেশি চক্র, লুটেরা এবং মুনাফাখোর জড়িত তাদের চিহ্নিত করে এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে কৃষকদের জীবন সুরক্ষা করতে হবে। ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনকে দেশের জন্য অত্যন্ত অর্থবহ হিসেবে চিহ্নিত করে লেখক বলেন, এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য শুধু রক্ষাকবচ নয় বরং সরকার ও বিরোধীদলের জন্য সেতুবন্ধনের প্রতীক। তিনি আরও বলেন, উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা একান্ত প্রয়োজন এবং এজন্য দরকার জরুরিভিত্তিতে কতগুলো আঞ্চলিক সমস্যা সমাধান করা--যার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবন্দি ইস্যু, পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের ফিরিয়ে নিয়ে আসা, পাকিস্তানের অবাঙালি জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ইত্যাদি। তিনি আরও বলেন, উপমহাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থেই পাকিস্তানের উচিত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া।

লেখক গণতন্ত্রী সমাজবাদী সমাজে তথা রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, ইংরেজ ও পাকিস্তান আমলে আমলারা যেভাবে দেশশাসন করেছেন সেই একই ধাঁচে দেশশাসন কাম্য নয় বরং দক্ষতা, সততা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে দেশপ্রেমবোধের মাধ্যমে শাসনের দায়িত্ব নেওয়া উচিত এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের প্রতিবাদী হওয়া উচিত। পাকিস্তান আমলে জারিকৃত ‘জরুরি আইনের ব্যবস্থা’ বাংলাদেশে সংবিধানে না রাখার জন্য আওয়ামী লীগকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখক বলেন, এই আইনটি মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের সামিল।

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি এবং আওয়ামী লীগ ঐক্যজোট গঠনের মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে সে সম্পর্কে লেখক সংশয় প্রকাশ করেন। লেখকের মতে, এতে দলীয় অধিকার ও স্বাতন্ত্র্যবোধ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে, অন্যদিকে এই ধরনের কর্মকাণ্ড সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে যা জাতির জন্য বিপজ্জনক। যদিও আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে ক্ষমতায় আরোহণ করেছে কিন্তু এই দলটির উচিত হবে বিরোধীদলের সঙ্গে আলোচনাপূর্বক দেশের সার্বিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা--না হয় স্বৈরব্যবস্থা প্রবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে বলে লেখক উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হল ইউনিয়ন ও ডাকসু নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে চারজনকে হত্যার ঘটনাকে জঘন্য, বর্বরোচিত এবং সামরিক স্বৈরাচারী শাসনের হত্যাযজ্ঞের সাথে তুলনা করেন লেখক। তিনি আরও বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য এ বিষয়টি কেবল কেলেঙ্কারি নয় বরং গোটা জাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আবুল মনসুর আহমদ তৎকালীন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব চেম্বার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতির বক্তব্যকে সমালোচনা করে বলেন, তাঁর উচিত ছিল অর্থনীতি এবং শিল্পকারখানার সমস্যাসমূহ সমাধানের লক্ষ্যে বাস্তবমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশ করা যাতে সার্বিকভাবে অর্থনীতি চাঙ্গা হয়।

আহমদ ছফা তাঁর রচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাথে যাঁরা সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাদের পরিচয় তুলে ধরেন এবং বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে যেমন নিজের দলের তথাকথিত বিশ্বস্ত লোকজন জড়িত ছিল, পাশাপাশি ছিল উন্নত বিশ্বের কূটনীতিকগণ, দেশীয় সামরিক এবং অসামরিক আমলাগণ। লেখক তাঁর লেখায় জাতির জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে যেমন স্মরণ করেছেন, পাশাপাশি বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর প্রতি যথাযথ দায়িত্বপালন না করার জন্য তাঁকে দায়ী করেছেন। শেখ মুজিবের দুর্বলতাগুলো বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, তিনি না পারলেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ধরে রাখতে, না পারলেন সমাজবাদী সমাজে উত্তরিত হতে। একই সঙ্গে তিনি ব্যর্থ হন একটি প্রগতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করতে। পাশাপাশি স্বাধীনতা-বিরোধীদের নিঃশর্ত ক্ষমা করাকেও তিনি বিরোধিতা করেন। লেখক আরও বলেন, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক বীরত্ব ছিল অসাধারণ কিন্তু ইতিহাসের বাস্তবতাকে তিনি উপলব্ধি করতে অনেকটাই ব্যর্থ হন। মওলানা ভাসানীর অবদান প্রসঙ্গে লেখক বলেন, শুরুতে যদিও তিনি ছিলেন কৃষকসমাজের নেতা কিন্তু সামগ্রিক অবদানের জন্য তাঁকে জাতীয় নেতা হিসেবে বিবেচনা করা যেত। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের জন্মের ইতিকথা বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, শেখ মুজিবের কারাবাসের সময় ভারত সরকারের পরোক্ষ সমর্থনে সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স হিসেবে এই সংগঠনের জন্ম। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে আওয়ামী লীগের বিপ্লবী অংশ নিজেদের জাসদ হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং এর পতাকাতলে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের একদল তরুণ একত্রিত হয়--যারা আওয়ামী লীগের রাষ্ট্র পরিচালনার দুর্বল দিকগুলোকে পুঁজি করে আকস্মিক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ফারাক্কা ষড়যন্ত্রের নানাদিক উন্মোচন করে লেখক বলেন, বাংলাদেশের এই জীবন-মরণ সমস্যায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয় তবে মওলানা ভাসানী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের আন্দোলনকে তীব্রতর করেন।

অন্যদিকে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান গণতান্ত্রিক সরকার পরিচালনায় বিরোধীদলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে বলেন, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, দারিদ্র্য বিমোচনে বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ, গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ইত্যাদি রুখতে বিরোধীদলের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর অনুপস্থিতিতে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্বহীনতার কিছু উদাহরণ লক্ষণীয়। লেখক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদীয় সরকার গঠনে সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, এই সংবিধান সাধারণ নাগরিকদের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভারসাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচারের নিশ্চয়তা প্রদান করে। কিন্তু সংবিধানের অযৌক্তিক সংশোধনী গণমানুষের এই মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে যার বিশেষ উদাহরণ চতুর্থ সংশোধনী। একই সঙ্গে লেখক জাতীয় সংসদের কার্যকর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, সংবিধানের যেকোনও পরিবর্তনে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতার যৌক্তিক ও সুচিন্তিত মতামতের প্রতিফলন হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ ক্ষেত্রে লেখক বৃটেনের নতুন অধিকার বিলকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। একই সঙ্গে লেখক ব্যক্তি-গোপনীয়তার অধিকার রক্ষায় সংবিধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকা দরকার বলে মনে করেন। পাশাপাশি লেখক জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, বাংলাদেশ যদিও এই সনদে স্বাক্ষর করেছে কিন্তু তা যথেষ্ট নয়, বরং শিশু অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এ দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকারের।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র একবিংশ খণ্ডে যাঁদের প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে তাঁরা হলেন আসহাবুর রহমান, ইবনে আজাদ, আবুল মাল আবদুল মুহিত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও বদরুদ্দীন উমর।

আসহাবুর রহমান তাঁর দুটি রচনায় বিশ্লেষণে বলেন, দেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী নিদারুণ সংকটে থাকা সত্ত্বেও শহরের মুষ্টিমেয় বণিকশ্রেণি দেশের সম্পদ লুটপাটে ব্যস্ত, যার সঙ্গে রয়েছে দেশীয় সামরিক, অসামরিক এবং আধাসামরিক আমলা ও রাজনৈতিক সরকারের জনপ্রতিনিধিগণ। জাতীয়তাবাদের সমস্যা সম্পর্কে লেখক বলেন, বিশ্বের স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশসমূহের ঐতিহ্য হল সংশ্লিষ্ট সমাজের মানুষের মধ্যে একধরনের ইতিহাস-সচেতনতা, যা রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদের ধারণা সৃষ্টি করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এদেশের সমাজব্যবস্থায় তা গড়ে ওঠেনি। বরং এই ধারণাটির সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত হয়েছে জাতিবর্ণ ব্যবস্থা, স্বৈরতন্ত্র, ইসলামি মূল্যবোধ, ইংরেজদের ভেদনীতি, মধ্যবিত্তের সাম্প্রদায়িক মনোভাব ইত্যাদি। তিনি আরও বলেন, মোগল ও নবাবি আমলে বাঙালির শ্রেণিবিন্যাসের নিয়ন্ত্রক ছিল শক্তিশালী হিন্দু জমিদার ও জোতদারশ্রেণি। অন্যদিকে অবাঙালি মুসলমানের ছিল কেবল রাজশক্তির সমর্থন। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাজনের পর মুসলমান মধ্যবিত্তশ্রেণির বিকাশ ঘটে, যারা হঠাৎ করে উচ্চ-সামাজিক মর্যাদা এবং ক্ষমতার মালিক বনে যান। তবে এই শ্রেণির লোকেরা সৃষ্টিশীল অবদান রাখতে ব্যর্থ হন যার অন্যতম কারণ হল আত্ম-অন্বেষায় অসম্পূর্ণতা।

ইবনে আজাদ তাঁর রচনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে বলেন, সকল বাঙালি জনগণের সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য প্রয়োজন অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শ তুলে ধরা এবং ওই আদর্শের পতাকায় পশ্চিমা ও ভারতীয় ধনতন্ত্রের চর, লুটেরা ও শোষক-শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করা।

এ খণ্ডে আবুল মাল আবদুল মুহিতের রাজনৈতিক ঐকমত্যের সন্ধানে গ্রন্থের রচনাসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। একই সঙ্গে লেখক স্বাধীন বাংলাদেশের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপায়ণের জন্য একটি স্থিতিশীল সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর জোর গুরুত্ব দেন--যাতে বারবার সংবিধান সংশোধন, পরিবর্তন এবং পরিবর্ধনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার যেন খর্ব না হয়। সেই সঙ্গে তিনি জাতির সামনের চ্যালেঞ্জসমূহ সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং রাজনৈতিক সরকারগুলোর স্বৈরাচারী ও বেআইনি কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়ার সমালোচনা করেন। পাশাপাশি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার, নারীর অধিকার সংরক্ষণ, প্রশাসনিক সংস্কার, দক্ষ সামরিক বাহিনী গঠন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য জোর দেন। এছাড়া অধিকার বাস্তবায়নে সংসদীয় কমিটি গঠন ও কার্যকর ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘বাঙালীর জয় পরাজয়’ প্রবন্ধে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক নিয়াজীর কঠোর সমালোচনা করে বলেন, নিয়াজী এবং টিক্কা খানসহ অন্যান্য উর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরীহ বাঙালিদের ওপর ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যা চালিয়েছে--যা ছিল বাঙালিদের ধ্বংস করার একটি নীলনকশার অংশবিশেষ। এই ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে যোগ দেয় দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী এবং স্বার্থবাদী কায়েমিগোষ্ঠী। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সামরিক শাসকদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার দায়ে দায়ী করেন। লেখক একই সঙ্গে মহান ভাষা আন্দোলনের সফলতাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই আন্দোলনের সফলতা প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ--যেখানে বাংলা ভাষা বাঙালির সংহতির প্রতীক।

এ খণ্ডে বদরুদ্দীন উমরের বাঙলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কয়েকটি দিক, বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং গণআদালত : অসমাপ্ত মুক্তিসংগ্রামের জের বই ৩টির সমুদয় রচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ-সব রচনায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে লেখক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদীয় রাজনীতি বুর্জোয়া এবং সামরিক ক্ষমতার মুখাপেক্ষী হওয়ায় এদেশে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে কোনও পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, বিপ্লবী সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজের মৌলিক পরিবর্তন আনা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পরিহার এবং অসমাপ্ত মুক্তিসংগ্রামকে সফল সমাপ্তির লক্ষ্যে শোষণহীন সমাজবাদী সমাজ গড়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সেইসঙ্গে বাংলাদেশে ধর্মের রাজনীতির মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভাজন সৃষ্টির জন্য জামায়াতে ইসলামীসহ মৌলবাদী সংগঠনগুলোকে দায়ী করেন।

তিনি জামায়াতে ইসলামীকে মৌলবাদের বাংলাদেশী সংস্করণ হিসেবে আখ্যায়িত করে এই মৌলবাদের ষড়যন্ত্র থেকে দেশ ও জাতিকে নিরাপদ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এর পাশাপাশি স্বৈরশাসকের রাজনৈতিক শাসন ও শোষণপ্রক্রিয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য প্রচণ্ড হুমকি বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশী কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কাঠামোর সমালোচনা করে বলেন, বিপ্লবী নেতৃত্ব দেওয়া এবং সংগ্রামকে তুঙ্গে নেওয়ার মতো যোগ্যতা না থাকায় এই দলগুলো ওই সময়ে পাকিস্তানি সরকার ও আওয়ামী লীগকে একই রাজনৈতিক লাইনে ফেলে বিচার করেছিল। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে জোতদারদের উচ্ছেদে হত্যা করার অপারেশনে শরিক হয়ে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেদেরকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। লেখক সামরিক শাসন ও উন্নয়নশীল বিশ্বে এর প্রভাব, বাংলাদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির প্রকৃতি, বাংলাদেশে সামরিক শাসন জারির প্রেক্ষাপট, মৌলবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের নতুন পর্যায় নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেন।

লেখকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্রাজ্যবাদ নয়া ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে লগ্নিপুঁজি, অস্ত্র ও প্রযুক্তিবিদ্যা রপ্তানির লক্ষ্যে সামরিক শাসকদের ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ লেখক বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেট এমনকি বাৎসরিক বাজেট পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদীদের আর্থিক সাহায্য ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি বিদেশি সাহায্য সংস্থাগুলোতে হাজার হাজার যুবক ছেলেমেয়ে চাকরি করার কারণে কোনওভাবেই তারা পুঁজিবাদী নিয়ম ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে না। বরং কিছুদিনের মধ্যেই এরা সাম্রাজ্যবাদী কর্মকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত হয়ে পড়ে। একইভাবে বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তির উত্থান হচ্ছে অতি দ্রুত। এই মৌলবাদীরা কৌশলে ধর্মের নামে বিভিন্ন মৌলবাদী সংগঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এবং এদের কার্যক্রমে সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার সুযোগ পায়।

‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র দ্বাবিংশ খণ্ডে যাঁদের রচনা সংকলিত হয়েছে তাঁরা হলেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবু জাফর, আবদুল হক, সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ, অনুপম সেন, আহমদ শরীফ ও আবদুল্লাহ আল-মুতী।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বাংলা ভাষার সংগ্রাম এখন অসমাপ্ত বইয়ের অধিকাংশ রচনা এ খণ্ডে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এই বইয়ের প্রথম রচনা ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়’-এ লেখক বলেন,  ১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ পর্যন্ত যে দু’শো বছর বাংলাদেশ সুলতানি আমলের অধীন ছিল, তখনও বাংলা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা বিদ্যমান ছিল। লেখক তাঁর অন্যান্য লেখায় আরও যেসব বিষয় তুলে ধরেন সেগুলো হলও ১৯৫১ সালে লিয়াকত আলীর মৃত্যুর পর ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ, ১৯৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে নাজিমউদ্দীনের অপসারণ, ১৯৫৪ সালে গণপরিষদ ভেঙে দেওয়া, ১৯৫৬ সালে সংবিধান বাতিল ঘোষণা, ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক মন্ত্রী ও আমলাদের নিয়ন্ত্রণ, ১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রসহ তথাকথিত সংবিধান প্রবর্তন, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও প্রভাব, ১৯৬৯ সালে স্বৈরাচারী সামরিক জান্তাদের শাসন, ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতকরণ ইত্যাদি। লেখক এসব ইস্যুকে পশ্চিম-পাকিস্তানিদের হীন ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেন এবং এর প্রেক্ষাপটসমূহ বিশ্লেষণ করেন। এর পাপাপাশি লেখক স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, বিভিন্ন দেশ কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান, জাতিসংঘের স্বীকৃতিপ্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ করেন। একই সঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ইতিবৃত্ত বিশ্লেষণ করেন। স্বাধীনতার ২৫ বছরের ইতিহাস মূল্যায়ন করে লেখক বলেন, এই দীর্ঘ সময় দেশে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি বরং দেশ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে স্বেচ্ছাচারী শাসক, আমলা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি দ্বারা।

এ খণ্ডে বদরুদ্দীন উমরের পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি ১ বইয়ের পরিচ্ছেদসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বইটির ভূমিকাও এ খণ্ডে স্থান পেয়েছে। এছাড়া ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ বই থেকে কয়েকটি রচনা এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লেখক পূর্ববাংলায় প্রথম রাজনীতি সংগ্রামের প্রেক্ষাপট, পূর্ববাংলার প্রতি কায়েদে আজমের নেতিবাচক রাজনৈতিক মনোভাব, নাজিমউদ্দীন সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা, পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতির প্রেক্ষাপট সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনই পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ হওয়ার পথে সব ধরনের আন্দোলনের উৎস। তিনি আরও বলেন, যখন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি অগ্রাহ্য করা হয় ঠিক তখনই বাংলাদেশের ছাত্র-শিক্ষক, যুবফ্রন্ট, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেন যা ধীরে ধীরে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়। এই বাংলা ভাষার দাবিতেই গঠিত হয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ--যাদের ডাকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। ভাষা আন্দোলনের পর মার্চ মাস থেকেই শুরু হয় সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের ধর্মঘট এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট। ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি পূর্ববাংলায় একটি সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাঙালির চালিকাশক্তির অন্যতম বাহক হিসেবে বাংলাভাষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। ১৯৪৯ সালের ২৫ এপ্রিল সর্বপ্রথম ছাত্রদের সাথে বাংলার জনগণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং ছাত্র-জনতা সম্মিলিতভাবে স্বৈরাচার সরকারের নির্মম নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বাংলাভাষার আন্দোলন পূর্ববাংলার রাজনীতির ক্ষেত্রে মৌলিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গণবিরোধী চারিত্র সম্পর্কে শিক্ষিতসমাজ ও জনসাধারণকে সচেতন করে। পাশাপাশি পূর্ববাংলার জনগণের ওপর পাকিস্তান সরকারের নিষ্ঠুর নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলন পরবর্তীতে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। লেখক বলেন, মূলত ভাষা আন্দোলন থেকেই প্রতিরোধ সংগ্রামের সূচনা। ভাষা আন্দোলন মূলত মৌলিক অধিকারের আন্দোলন--যেখানে কোনও ব্যক্তিবিশেষ জড়িত নয়। এ আন্দোলনের প্রকৃত নায়ক তৎকালীন পূর্ববাংলার সংগ্রামী জনগণ। তবে লেখক ড. মযহারুল ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘এ আন্দোলনে শেখ মুজিবের প্রত্যক্ষ অবদান না থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করায় তাঁর অবদানকে ছোট করে দেখা সম্ভব নয়।’ বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি ছাত্র আন্দোলনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে লেখকের বিশ্লেষণ অতি তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে মূল্যায়ন করে লেখক বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক অংশকে রক্ষীবাহিনীতে যোগদান করিয়ে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করতে ব্যর্থ হয় আওয়ামী লীগ।

‘ভাষা, জনগণ ও রাজনীতি’ প্রবন্ধে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ভাষার অবস্থান, বাংলা-ভাষাভাষী মানুষ ও এদের ওপর রাজনীতির প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর মতে, স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে ব্যাপক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রত্যাশা করা হয়েছিল তা সম্ভব হয়নি, কারণ কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া এই ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাভাষা রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, কারণ এ দেশের শ্রেণিবিভাজন এতটা প্রকট যে রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা বুর্জোয়াশ্রেণির হাতে। এই বুর্জোয়াশ্রেণি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বিদেশি বুর্জোয়াদের কাছে জিম্মি। কাজেই বাংলাভাষার উপযোগিতা অনুধাবন করার ক্ষেত্রে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাই তিনি বাংলাভাষা প্রচলনের আন্দোলন বেগবান করার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের রূপরেখা বিশ্লেষণ করে বলেন, আন্দোলনে শিক্ষিত তরুণ থেকে শুরু করে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি--তাদের মাধ্যমেই সৃষ্টি হবে সমাজ-বিপ্লবী শক্তি, যা জনগণকে বিজয়ী হতে সাহায্য করবে।

আবু জাফর ১৭৮৩ সালে রংপুরে চাষিগণের বিদ্রোহ, ১৭৮৯ সালে বিষ্ণুপুরে নিপীড়িত জনসাধারণের বিদ্রোহ, ১৭৯৯ সালে চুয়ার আদিবাসী বিদ্রোহ, ফকির ও সন্ন্যাস বিদ্রোহ এবং ফরায়েজি আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বলেন, এইসব বিদ্রোহের দুটি দিক লক্ষণীয় : এর একটি রাজনৈতিক অন্যটি অর্থনৈতিক। পাশাপাশি ১৯৪২ সালে ব্রিটিশদের ভারত ছাড় আন্দোলন, আলীগড় আন্দোলন, সিপাহি বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণবিদ্রোহ ইত্যাদির কারণ ও প্রভাবসমূহ লেখক বিশ্লেষণ করেন। লেখক আরও বলেন, ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন, অতঃপর এই সরকারের ক্ষমতাচ্যুতি ইত্যাদি বিষয় শুধু ষড়যন্ত্র নয় বরং ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট সামরিক শাসনের মাধ্যমে একদিকে শোষণ এবং অন্যদিকে তথাকথিত পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার প্রয়াস মাত্রা।

আবদুল হক রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা ও দায়িত্ব বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখান যে, একজন সৎ এবং নিবেদিত নেতা তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বের মাধ্যমে জাতিকে ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেন। পাশাপাশি পশ্চিমের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার প্রতি বাঙালির ঝুঁকে পড়ার কারণ বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, ওই দেশগুলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দেশ থেকে নানাধরনের লুণ্ঠনের মাধ্যমে সম্পদকে কুক্ষিগত করে নিজেদের আধিপত্যবাদ ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে একদিকে যেমন সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটিয়ে সম্পদ লুট করেছে, পাশাপাশি ওই সাম্রাজ্যগুলোর পতনও লক্ষণীয়। তবে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস সম্পদের ওপর যেমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে, পাশাপাশি রোডেশিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকায় সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গের নির্মম শোষণ, শাসন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নব্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে নিজেরা আত্মপ্রকাশ করেছে। লেখক বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন এবং এক্ষেত্রে ভারতের সার্বিক সহযোগিতা ও ভূমিকার প্রশংসা করেন।

অন্যদিকে সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে বাংলাদেশে জাতীয় চেতনার উন্মেষ, ঊনবিংশ শতাব্দীতে জাতীয় আন্দোলনের সূচনা, গণতান্ত্রিক সংকট ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উৎসভূমি ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্বের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, ১৯৫৩ সালে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টি পুনর্গঠনের মাধ্যমে বামদলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। পরে নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটায় এবং সামরিক জান্তাদের মাধ্যমে স্বৈরশাসন প্রবর্তন করে। এরপর ১৯৬২ সালে তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রের নামে সামরিক নেতৃবৃন্দ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের মাধ্যমে ছয় দফা আন্দোলনের সূচনা করলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে ১৯৬৮ সালের শেষদিকে আইয়ুববিরোধী প্রচণ্ড গণবিক্ষোভ শুরু হয় এবং শেষপর্যন্ত ১৯৭০ সালে সরকার দেশে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। এই সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাধিক্যে জয়যুক্ত হওয়ার পর সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালিদের ওপর হামলে পড়ে। কিন্তু বাংলার স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠী ’৭১-এ মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে তা প্রতিহত করে এবং নয় মাসব্যাপী স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করে।

অনুপম সেন বাংলাদেশের সংগ্রামের সামাজিক পটভূমি বিশ্লেষণ করে বলেন, ১৭৯৩ সালে ভারতবর্ষে ভূমি-ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়। এর পাশাপাশি হিন্দুরা ইংরেজদেরকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়, অন্যদিকে মুসলমানগণ ইংরেজদের সহায়তা না করার কারণে নাজুক অবস্থায় পড়ে। অতঃপর এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার লক্ষ্যে মুসলমানগণ আলীগড় আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠনের মাধ্যমে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করা হয় এবং নবাব আবদুল লতিফ, স্যার সৈয়দ আহমদ, মুহম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম মধ্যবিত্তশ্রেণির বিকাশ ঘটে, পরে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়। এরপর বাঙালি জাতি দুর্ভাগ্যবশত পশ্চিম-পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের খপ্পরে পড়ে। তবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জনগোষ্ঠী যে আন্দোলনের সূচনা করে তা পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষপর্যন্ত বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে আত্মপ্রকাশ করে।

আহমদ শরীফ ‘ইতিহাসের দর্পণে দুই শতকের বাঙালি’ প্রবন্ধে বাঙালি সমাজের তুলনামূলক আলোচনা করে বলেন, আঠারো শতকের শেষের দিকে ইংরেজরা এদেশের শাসক হওয়ার পর বেনিয়া-ফড়িয়া-গোমস্তা-মুতসুদ্দি সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙালিদের একটি অংশকে ব্রিটিশরা তাঁবেদার গোষ্ঠীতে পরিণত করে। তবে বাঙালি সম্পদশালীদের মানসিকতায় কোনও পরিবর্তন ঘটেনি বরং মন-মেজাজে, রীতি-রেওয়াজে এবং নিয়ম-নীতিতে তারা নিজেদের তথাকথিত কীর্তিমান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। আবদুল্লাহ আল-মুতী তাঁর দুটি প্রবন্ধে বলেন, বাঙালি জাতির নিজস্ব ইতিহাস ও কৃষ্টি থাকার পরও পরদেশী অনুপ্রবেশকারী ও লুটেরাদের কারণে তাদের নিজস্ব কৃষ্টি, রাজনীতি ও স্বকীয়তা ভূলুণ্ঠিত হয়। তিনি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে দেশের জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘আমলাতন্ত্র ও গণতন্ত্র’ প্রবন্ধে বলেন, গণতন্ত্র হল মৈত্রীর প্রতীক আর আমলাতন্ত্র হঠকারী সংগঠন। পাকিস্তান রাষ্ট্র সামরিক আমলাতন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকার কারণে সেখানে বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম্য দেখা যায়। রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনশীল হলেও আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা চিরস্থায়ী। যদিও গোড়ার দিকে শেখ মুজিবুর রহমান আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সোচ্চার ছিলেন, কিন্তু স্বাধীনতার পর এরা সরকারের নানা দুর্বলতাকে পুঁজি করে অত্যন্ত শক্তিধর হয়ে ওঠে এবং তাদের সমর্থন নিয়েই বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপ্রশাসন পরিচালনা করতে বাধ্য হন। তবে পরবর্তীকালে ফিডেল ক্যাস্ট্রো শেখ মুজিবকে পরামর্শ দিয়েছিলেন আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনকে ভেঙে ফেলার জন্য, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি শেখ মুজিবের মৃত্যুর কারণে।


‘বাঙালির রাজনীতিচিন্তা’র ত্রয়োদশ খণ্ডে যাঁদের প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে তাঁরা হলেন আতিউর রহমান, আবু জাফর শামসুদ্দীন, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, অন্নদাশঙ্কর রায়, আহমদ শরীফ, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বদরুদ্দীন উমর, অনুপম সেন, অজয় রায় ও আবুল মোমেন।

আতিউর রহমান তাঁর রচনায় অসহযোগ আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ৭ মার্চ, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমাবেশে অসহযোগ আন্দোলনকে মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে উল্লেখ করেন। লেখক মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত বিশ্লেষণ করেন এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। লেখক তাজউদ্দীন এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। অন্যদিকে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের সংগ্রামী ভূমিকা, মজদুর পার্টির দেওয়ান সিরাজুল হক, শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা হায়দার আকবর খান রনো, শ্রমিক লীগের আবদুল মান্নান ও শ্রমিক ফেডারেশনের সিরাজুল হোসেনের অবদান স্মরণ করেন এবং সরকার গঠনে তাঁদের সৃষ্ট চাপ বাস্তবে স্বাধিকার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে বলে অভিহিত করেন। পাশাপাশি তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা ও সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে কৃষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, বঙ্গবন্ধুর জীবন ও জনকল্যাণ ভাবনা, বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিনের অসহযোগ আন্দোলন এবং সাধারণ মানুষের গণজাগরণের বিষয়গুলো বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন।

আবু জাফর শামসুদ্দীন ‘সমাজ, রাষ্ট্র ও ছাত্র-অসন্তোষ’ প্রবন্ধে বলেন, দেশের তথাকথিত রাজনৈতিক মহল নিজেদের কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ছাত্রদেরকে ব্যবহার করে প্রগতিশীল সমাজ গড়ার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। তিনি স্বৈরাচারী সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থে শিক্ষাঙ্গনগুলোকে ব্যবহারের মাধ্যমে ছাত্রদের নীতি ও নৈতিকতা ধ্বংসের জন্য রাজনৈতিক দলসমূহকে দায়ী করেন।

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ‘রাষ্ট্র ও ধর্ম’ প্রবন্ধে বলেন, সদ্য স্বাধীন হওয়া দুটি দেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে দরকার ঘনিষ্ঠ বন্ধন এবং সহযোগিতা। কিন্তু তা না হয়ে নানাধরনের সংঘাত ও দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। সেইসঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগানোর কারণে ধর্মের নামে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নানাধরনের বিশৃঙ্খলা। হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ‘হিন্দু ও মুসলিম’ প্রবন্ধে বলেন, ১৯২১ সালে গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে, যা শেষপর্যন্ত দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পরবর্তীতে হিন্দু-মুসলমানদের জাতিগত বিদ্বেষ থেমে থাকেনি বরং প্রচণ্ড বৈরী সম্পর্কের মাধ্যমে সংঘাত সৃষ্টি হয়।

মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ‘ভারতীয় সমস্যা ও জওহরলাল’ প্রবন্ধে বলেন, ভারতীয় সমাজে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে অধিকাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠী। নেহেরুর উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক বলেন, আমাদের দেশে শ্রমিক, কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে মধ্যযুগীয় কায়দায় শাসন ও শোষণের প্রক্রিয়া ব্রিটিশরা অনুসরণ করেছে, যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমাজতন্ত্রের গোড়াপত্তন। লেখক সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করতে যে সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কাজ করেছেন তারা কখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করেননি বরং নিজেদের শ্রেণিস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দেশে বিভক্তি সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন, যা রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। লেখক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সংকট বিশ্লেষণ করে বলেন, একধরনের দুর্নীতিপরায়ণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রসমূহে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। অন্নদাশঙ্কর রায় মহাত্মা গান্ধীর অসাধারণ অবদানের জন্য তাঁকে এ যুগের সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ রাজনৈতিক ত্রাণকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি গান্ধীকে লেনিনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, গান্ধীর দর্শন কেবল সামরিক এবং পুঁজিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন নয় বরং নিপীড়িত ও শোষিত গণমানুষের আত্মিক বলে বলীয়ান হয়ে দৈহিক শক্তির মাধ্যমে অন্যায় এবং অনিয়মকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অর্জন করা--যা লেনিনের রাজনৈতিক দর্শন থেকে অনেকটা ভিন্ন। তিনি আরও বলেন, গান্ধীজির যুদ্ধবিরোধী ভূমিকার কারণেই ভারতবর্ষে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। তবে দুর্ভাগ্য যে একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী গান্ধীর এই জনকল্যাণমূলক দর্শনের বিরুদ্ধে নিজেদের শ্রেণিস্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষে গান্ধীজিকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তাঁর প্রবন্ধে বলেন, নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিরোধীদলের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। লেখক তাঁর বিশ্লেষণে বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন এবং দুর্নীতি, মস্তান ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে লেখক বলেন, এদেশে সংবিধান রাজনৈতিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সরকার গঠনের মাধ্যমে জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের আইন পাস করেছে--তবে দরকার হলো এর সুষ্ঠু প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন। পাশাপাশি তিনি মানবাধিকারকে একটি সর্বজনীন ও জনকল্যাণমূলক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এ ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের অধিকারের বৈষম্যকে দূর করা দরকার। যা এ সমাজে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের--তবে তারা এ কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

এ খণ্ডে বদরুদ্দীন উমরের সামরিক শাসন ও বাঙলাদেশের রাজনীতি গ্রন্থের রচনাসমূহ গ্রথিত হয়েছে। তিনি ‘উন্নয়নশীল’ দেশে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা, বাঙলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ক্রমবিকাশ, বাঙলাদেশে সাম্রাজ্যবাদের অবস্থান ও তৎপরতা, বাঙলাদেশে মৌলবাদ ও শ্রেণীসংগ্রামের নতুন পর্যায়, বাঙলাদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির বিষাক্ত বৃত্ত ও আমাদের করণীয়, এরশাদ হটাও আন্দোলন ও সামরিক শাসনের উচ্ছেদ প্রসঙ্গে এবং বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বিষয়সমূহের সূক্ষ্মদর্শী বিশ্লেষণ করেছেন। অন্যদিকে অনুপম সেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালির রেনেসাঁস ও স্বাধীনতা-চিন্তা প্রসঙ্গে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন। অজয় রায় ‘আমাদের জাতীয়তার ভিত্তিভূমি’ প্রবন্ধে বলেন, বাঙালির সকল আন্দোলনের অন্যতম উপাদান হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, যার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করতে সক্ষম হন।

আবুল মোমেনের বেশকিছু প্রবন্ধ এ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। রচনাগুলো হল : সাম্প্রদায়িকতা ও রাষ্ট্রীয় বিধান, দেশ বনাম রাষ্ট্র, সিরাজদ্দৌলা : বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নতুন নায়ক?, বাংলাদেশে কি ইরানী কায়দায় বিপ্লব হবে, পঞ্চদশ শতাব্দীর কিছু ভাবনা, সমাজ প্রগতির অন্তরায় সাম্প্রদায়িকতা : উপমহাদেশের পটভূমিতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ, যুগ যুগ ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আপ্তবাক্য এখন অচল, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সংখ্যালঘু মনস্তত্ত্বের একটি দিক ও মঙ্গলপ্রদীপ কী সিকিউলার? লেখক এ-সব বিষয়সমূহের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিত আলোচনা করেন। লেখক বলেন,  রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক আইনকানুন এবং সংবিধানের বিভিন্ন বিধির কারণে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সাম্প্রদায়িকভাবে অবলেহিত এবং নির্যাতিত। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে কালাকানুন, প্রাপ্ত সম্পত্তি বা অর্পিত সম্পত্তি আইন ইত্যাদি। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের কোনও চূড়ান্ত রূপ নেই বরং তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে নানাবিধ বাহ্যিক কার্যকারণের ওপর--যার মৌল উপাদানসমূহ হচ্ছে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদি। তিনি তাঁর বিশ্লেষণে আরও বলেন, ১৯৯৩ সালে পলাশী দিবস পালনকালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সিরাজদ্দৌলাকে দেখানো হয় মুসলিম জাতীয়তাবাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এবং একইসাথে অনুষ্ঠানটিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি প্রচণ্ড বিরূপ ধারণা দেওয়া হয়--যা ইতিহাসের বাস্তবতাকে বিকৃত করার শামিল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণমাধ্যমে এ ধরনের প্রচারণা হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষকে আরও বাড়িয়ে দেবে। পাশাপাশি বাংলাদেশে মৌলবাদীদের তৎপরতার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে লেখক বলেন, জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য ইসলামিক দলগুলো রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের সংহতি ও জনসাধারণের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে তথাকথিত ইরানি কায়দায় বিপ্লবের জন্য যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তা মূলত এই ধর্মনিরপেক্ষ সমাজকে বিভক্তিকরণের শামিল। তবে লেখক বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সেই ধরনের কোনও শক্তি ও সাংগঠনিক সামর্থ্য নেই, কাজেই বাংলাদেশে ইরানি কায়দায় বিপ্লব হওয়া সম্ভব নয়। লেখক ‘পঞ্চদশ শতাব্দীর কিছু ভাবনা’ প্রবন্ধে পাল যুগের অবদানকে স্মরণ করে বলেন, যদিও তাঁরা বাঙালি ছিলেন না তথাপি সমাজ উন্নয়নে তাঁদের অবদান ছিল অপরিসীম। লেখক অন্য একটি প্রবন্ধে বলেন, সমাজ প্রগতির অন্তরায় হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। কাজেই আমাদের দরকার সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এদেরকে উচ্ছেদ করা। পাশাপাশি লেখক সংখ্যালঘুদের মানসিক নাজুক অবস্থা বিশ্লেষণ করে বলেন, জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের সময় সংবিধানকে ইসলামিকরণের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক নীতিমালাকে নস্যাৎ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংহতিকে বিনষ্ট করা হয়--যার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ফায়দা চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে ধর্মকে সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করা। তবে এই প্রক্রিয়া সংঘাতমূলক--বাস্তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একধরনের সহিংসতা ও সংঘাত সৃষ্টি করে, যা আজ পর্যন্ত চলমান।