সম্পাদক পরিচিতি
ধর্মচিন্তার খন্ড সমূহ
‘মানুষের ইতিহাস হলো প্রকৃতপক্ষে ধর্মের ইতিহাস’\মানবসভ্যতার মূলের দিক থেকে বিচার করলে ম্যাক্সমুলারের (ুটসবলফফণর) এই উক্তি খুব-একটা অতিশয়োক্তিপূর্ণ নয়।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র প্রথম খন্ডে আঠারোজন লেখকের বাইশটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হলো।
চর্যাপদের আবিষ্কারক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রণীত ‘ভারতবর্ষের ধর্মের ইতিহাস’ প্রবন্ধে ভারতের ধর্মসম্প্রদায় ও ধর্মগ্রন্থগুলোর উৎপত্তি ও বিকাশ কবে কীভাবে ঘটে, কী তার ঐতিহাসিক ভিত্তি তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপস্থাপিত হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ ‘ধর্মের উদ্ভব’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন হিন্দুধর্মে দেবতা সৃষ্টির মূলে মানুষের ভয়, বিস্ময় ও কৌত‚হল কাজ করেছে। মানুষের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে দেবতার ধারণারও উন্নয়ন ঘটেছে। নীহাররঞ্জন রায় ‘ধর্মকর্ম: ধ্যান-ধারণা’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, ‘আজ আমরা যাকে হিন্দু ধর্মকর্মসাধনা বলিয়া দেখি, বা যাহাকে আর্য-ব্রাহ্মণ্য সাধনা বলিয়া জানি তাহা একদিকে আর্য ও অন্যদিকে প্রাক্-আর্য বা অনার্য ধর্মকর্মসাধনার সমন্বিত রূপ মাত্র।’ দীনেশচন্দ্র সেন ‘মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে’ প্রবন্ধে খ্রিস্টীয় দশম ও একাদশ শতাব্দীতে বাংলার ইতিহাসে গোরক্ষনাথের ঐতিহাসিক ভ‚মিকা ও তাঁর গোরক্ষ-বিজয় গ্রন্থের আলোকে সমকালীন বাংলার ধর্মীয় জীবনচিত্রের আলেখ্য উপস্থাপন করেছেন।
মুহম্মদ এনামুল হক ‘বঙ্গে ইসলাম-বিস্তৃতির কাল-নির্ণয়’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, ইসলামের সঙ্গে হিন্দুধর্মের সংঘর্ষ ও সমন্বয়ের ফলেই বাংলায় গৌড়ীয়-বৈষ্ণব মতের উদ্ভব। গৌড়ের সুলতান হুসেইন শাহের রাজত্বকালে এইমত প্রতিষ্ঠিত হয়। পরধর্মের প্রতি তাঁর উদারতাই এর কারণ। গোপাল হালদার ‘বাংলায় মুসলমান বিজয়’ প্রবন্ধে মধ্যযুগে ভারতীয় সংস্কৃতিতে মুসলিম প্রভাব আলোচনা করে দেখিয়েছেন, এ-সময়ে জাতিভেদ প্রথা তথা হিন্দু শ্রেণিভেদের বিলুপ্তি ঘটে এবং ভারতীয় জনজীবনে সামাজিক উত্তরণে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। ড. তারা চাঁদ ‘ভারতে মুসলিম আগমন’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, কীভাবে সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আবির্ভাব এবং একটি রাষ্ট্রশক্তির অধীনে তাদের ঐক্য ইসলাম- পূর্বকাল থেকে সূচিত সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ায় তীব্র গতি সঞ্চার করে। সৈয়দ মুজতবা আলী ‘বাঙলাদেশ\মুসলিম বিজয়ের পূর্বকথা’ প্রবন্ধে ভারতীয় জনপদের পূর্বাঞ্চলে মুসলিম আধিক্যের ঐতিহাসিক অনুসন্ধান উপস্থাপনপূর্বক তার যৌক্তিক বিশ্লেষণ করেছেন। ঐতিহাসিক আবদুল করিম ‘বাংলায় মুসলমানদের প্রাথমিক যোগাযোগ’ প্রবন্ধে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান শাসন বিস্তারের তিনটি পর্যায় বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘বাংলাদেশে মুসলমান আগমনের প্রাথমিক যুগ’-এ তিনি প্রতœতাত্তি¡ক সূত্র, আরব ভৌগোলিকদের বিবরণ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাপ্ত কিংবদন্তি ও জনশ্রæতির সাহায্যে প্রাথমিক যুগে বাংলাদেশে মুসলমান আগমনের স্বরূপ নির্ণয় করেছেন। সমাজবিজ্ঞানী এ. কে. নাজমুল করিম ‘ভ‚গোল ও ভগবান’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, আদিম সমাজে পরিবেশ ও আর্থিক প্রয়োজনবুদ্ধিই ছিল ধর্মের মূলে। আজকাল যে উন্নত ধরনের ধর্মজ্ঞান দেখতে পাই তা অনেক পরের কথা। বস্তু বা পরিবেশ যেমন ধর্মকে রূপ দেয়, সেরূপ মানুষের দার্শনিকচিন্তাও ধর্মকে রূপ দিয়েছে। তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘ধর্ম্মের বিবর্ত্তন ও মার্ক্সবাদ’-এ ধর্মের বিবর্তনীয় উৎস নিয়ে আলোচনা করে দেখিয়েছেন, ধর্মের উৎস কেবল সৃষ্টিরহস্যকে জানবার আগ্রহ নয়, ‘প্রকৃতির পীড়ন থেকে অব্যাহতি পাওয়ার তাগিদেও’ ধর্মের জন্ম হয়েছে। মার্ক্সবাদীরা ধর্ম-উৎপত্তির কথা বলতে গিয়ে দ্বিতীয় কারণটির ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন।
ইতিহাসবিদ এম. এ. রহিম ‘বাঙালি মুসলিমের বংশধারার শিকড়’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বাঙালি মুসলমানদের বংশধারার প্রবহমানতায় রয়েছে একটি ঐতিহ্যিক শিকড়। এই শিকড়ের ডালপালা বিস্তৃত হয় বহিরাগত মুসলিম বনাম স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলমানদের পূর্বাপর সামাজিক মিশ্রণে। ভবানীপ্রসাদ সাহু ‘ধর্মের উৎস সন্ধানে’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, আদিমকালে প্রকৃতির কাছে অতি অসহায় ও পরবর্তী সময়ের শোষণভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় মানুষের বেঁচে থাকার প্রক্রিয়ায় ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। আবদুল মমিন চৌধুরী ‘বাংলায় ইসলাম-বিস্তারের পটভ‚মি’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, বাংলায় বহিরাগতদের সংখ্যা কোনও সময়েই এত বেশি ছিল না যে, তাদের মাধ্যমেই এই অঞ্চল মুসলিম-অধ্যুষিত হয়েছে, বরঞ্চ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ধর্মান্তরই এর প্রধান কারণ এবং এই ধর্মান্তর প্রক্রিয়ায় সুলতান, মুসলমান বুদ্ধিজীবী ও সুফিসাধকদের বিশেষ ভ‚মিকা ছিল। ওয়াকিল আহমদ ‘বাংলায় মুসলমান সমাজের পত্তন ও বিকাশ’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, তেরো শতকের গোড়ায় তুর্কি বিজয়ের ফলে বাংলায় মুসলিম গোড়াপত্তন হয়। বিভিন্ন দেশের বহিরাগত এবং স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলমান দ্বারা এ সমাজ গঠিত হয়। কিন্তু বহিরাগত ও ধর্মান্তরিত মানুষের সংখ্যা ও অনুপাত কী, বৃদ্ধি কীরূপ হয়, সামাজিক শক্তি হিসেবে কখন তা আত্মপ্রকাশ করে তার অনুসন্ধান এই প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয়। ‘বাঙালি মুসলমান’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, ইসলামে ধর্মনীতি ও মুসলমান সমাজব্যবস্থায় এমন কতকগুলো গুণ ছিল, যা সে-যুগের মানুষকে চমকিত করেছিল। বিশেষ বর্ণভেদ প্রথা, অস্পৃশ্য প্রথার কারণে নিম্নশ্রেণির মানুষের সামাজিক মর্যাদা ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নে ইসলামের সাম্যনীতি মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে বিশেষ ভ‚মিকা রাখে।
মুহাম্মদ আবদুর রহমান আনওয়ারী ‘বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ও বিস্তার’ প্রবন্ধে ভারতীয় জনপদে ইসলামের আগমন ও বিস্তারে আরব বণিকদের নৌবাণিজ্যের ঐতিহাসিক পটভ‚মি তুলে ধরে এই উপমহাদেশে আচরিত প্রায় সকল ধর্মের উৎস ও বিকাশধারার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত উপস্থাপনের প্রয়াস পেয়েছেন। পল্লব সেনগুপ্তের ‘ধর্মভাবনা ও ভারতবর্ষ: প্রাক্ এবং প্রতœ-ইতিহাসের পর্বে’ প্রবন্ধে ভারতবর্ষে ধর্মের উৎসারণ এবং প্রাক্-ইতিহাস ও প্রতœ-ইতিহাসের পর্বে তার ক্রম-উত্তরণ কীভাবে ঘটেছে সেই অনুসন্ধানের প্রয়াস আছে। সুকোমল সেন ‘মানব ইতিহাসে ধর্ম বিশ্বাসের উদ্ভব ও বিকাশ’ প্রবন্ধে ধর্মবিশ্বাসের উদ্ভব সম্পর্কে মনীষীদের যে নানা অভিমত আছে তার বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে পরিশেষে মার্কস-এঙ্গেলস-এর বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, মানুষের ধর্মভাবনার মূলে রয়েছে ওই কালের উৎপাদনশক্তি বিকাশের এবং মানুষের জীবনধারণের প্রকৃতি। তাঁর দ্বিতীয় রচনা ‘প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় ধর্মচিন্তার সূত্রপাত হিন্দু ধর্মাচরণের ক্রমবিকাশ’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, মহেঞ্জোদারো-হরপ্পা সভ্যতার ধর্মচিন্তা বৈদিকযুগে হিন্দুধর্মের বিকাশের উৎস চিহ্নিত করে এই সভ্যতার অন্তর্গত জীবনপ্রবাহের প্রতিফলন যেভাবে তখনকার ধর্মচিন্তায় লক্ষ করা যায়, তা বৈদিক আর্যদের যুগে ধর্মবোধ তথা পৃথিবী ও পার্থিব জীবনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। এরই ক্রমবিকাশের ধারায় হিন্দুধর্ম এক কঠিন আচার-অনুষ্ঠান, জাতিভেদভিত্তিক ধর্মে পরিণত হয়। এ খÐের সর্বশেষ রচনা ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল হাইয়ের ‘ইসলাম প্রচারের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত’। এই প্রবন্ধে তিনি এই জনপদে ইসলাম প্রচারের ইতিবৃত্ত উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে পূর্বাপর গবেষকদের অভিমতের নতুন মূল্যায়ন করেছেন। তাছাড়া সমকালীন পাঠকদের জিজ্ঞাসার সমন্বিত কালানুক্রমিক তথ্যের মাধ্যমে এর প্রকৃত সত্যের প্রামাণ্যরূপ উন্মোচন করার প্রয়াস পেয়েছেন।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র দ্বিতীয় খন্ডে ষোলজন লেখকের রচনা উপস্থাপিত হলো। প্রথম রচনাটি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত আত্মজীবনী থেকে নির্বাচিত অংশে আমরা দেখি একাত্মবাদভিত্তিক পৌত্তলিকতা পরিত্যাগপূর্বক ঈশ্বর উপাসনায় নতুন চেতনামুখী সমাজ। এই সমাজের নাম ব্রাহ্মসমাজ। যতীন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গে ইসলাম: তুর্কীর আগে ও পরে’ প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, বঙ্গদেশে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও প্রসার হয় তুর্কি অধিকারের পর থেকে। এর পূর্বে সুফিসাধক ও পির-দরবেশদের প্রচেষ্টায় বঙ্গের বিভিন্ন জনপদে মুসলিম সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। তবে এর বিকাশপর্বে মুসলিম শাসকদের সহায়তাও সক্রিয় ছিল। তুর্কি বীর বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই বিজয়ের সূত্রপাত ঘটে। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ ‘বাঙালী মুসলমানের ইতিহাস’ প্রবন্ধে বাঙালি মুসলমানদের আত্ম-পরিচয়ের এবং আত্ম-উন্মোচনের জন্য ইতিহাসচর্চার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলাদেশ রচনায় সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে ভারত-পাকিস্তানের যে ভৌগোলিক বিন্যাস ঘটেছে তাতে স্বদেশি-বিদেশি শাসককুলের ক‚টকৌশলের এক কুৎসিত বেদনাবিদ্ধ চিত্র উপস্থাপন করেছেন। সেই সাথে এই জনপদের মানুষের ধর্মীয় অভিঘাতের নানা করুণ বিপর্যয় বিশ্লেষণ করেছেন। ধর্মচিন্তার নির্মোহ বিশ্লেষক জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘সৃষ্টি ও স্রষ্টা: ধর্মে ও বিজ্ঞানে’ প্রবন্ধে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, ধর্মগ্রন্থগুলোর বাণীর মাধ্যমে মহাবিশ্বের আদি-অন্ত জানা অসম্ভব। কারণ ধর্মগ্রন্থগুলো মানুষের কল্পনার দ্বারা সৃষ্ট ও পল্লবিত, এমনকি মৃত্যু-পরবর্তী যে স্বর্গ-নরকের ধারণা ধর্মগ্রন্থগুলোতে আছে, তা আসলে মানুষের আনন্দ-যন্ত্রণারই সম্প্রসারণ। তাঁর মতে, বিশ্বচরাচর সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান অর্জন সম্ভব কেবল বিজ্ঞানের মাধ্যমেই। ইতিহাসবিদ কালিদাস নাগ ‘ব্রহ্মদেশ, বাংলা ও বৌদ্ধধর্ম’ প্রবন্ধে বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধদর্শন যে-সকল জনপদ তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের সাংস্কৃতিক জীবনযাত্রা ও জনজীবনে প্রভাব ফেলেছিল তার সন্ধিৎসু একটি ভ্রমণবিবরণী উপস্থাপন করেছেন।
বৈষ্ণবধর্ম বিশেষজ্ঞ রমাকান্ত চক্রবর্তীর বঙ্গে বৈষ্ণ ধর্ম গ্রন্থের সাতটি প্রবন্ধ এখানে সন্নিবেশিত হয়েছে। তিনি এসব প্রবন্ধে প্রতœতাত্তি¡ক গবেষণায় দেখিয়েছেন, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত কালসীমায় রাঢ়বঙ্গে বৈষ্ণবধর্ম ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মের বৃহৎ ঐতিহ্যের একটি বিশিষ্ট মাত্রারূপে প্রচলিত ছিল। গুপ্তবংশের সম্রাটরা বঙ্গে ব্রাহ্মণদের উপনিবেশ গঠনের সূত্রপাত করেন। এ-সময়ে শৈব-শাক্ত-সৌর-গাণপত্য, বৈষ্ণবধর্ম এবং বৌদ্ধধর্ম জনপ্রিয় ছিল। এসব ধর্মের সহাবস্থানও ছিল। বৈষ্ণবরা বুদ্ধদেবকেও বৈষ্ণব-অবতাররূপে শ্রদ্ধা করতেন। সর্বোপরি বঙ্গে ধর্মীয় সমন্বয়ের আদর্শ জনপ্রিয় ছিল। ব্রাহ্মধর্ম বিশেষজ্ঞ রামানুজ মুখোপাধ্যায় ‘উনিশ শতকে ব্রাহ্মসমাজের যাত্রাপথ’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, অষ্টাদশ শতকের অবিভক্ত বাংলার সমাজজীবনে ব্রাহ্মসমাজের ভ‚মিকা সনাতন হিন্দুজীবনবোধে নতুন ধর্মোপলব্ধির সঞ্চার করে। প্রচলিত পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসে নিমজ্জিত সনাতন সম্প্রদায়কে নতুন এক আলোকবর্তিকায় উজ্জীবিত করে ব্রাহ্মসমাজ, যার প্রথম উদ্যোক্তা ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। সমকালীন প্রায় সকল সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বই রামমোহনের একেশ্বরমুখী ধর্মদর্শনের আলোকশিখায় আলোকিত হয়েছিলেন। ধর্মবিশেষজ্ঞ নওমুসলিম আবুল হোসেন ভট্টাচার্য ‘মূর্তিপূজার গোড়ার কথা’ প্রবন্ধে সুদূর অতীতে পুতুলপূজা প্রবর্তিত হওয়ার কারণ ও তথ্য-প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, সে-সময়েও অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমান একটি শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে কম বুদ্ধিমান ও সহজসরল শিশু-মানবদের অন্যমনস্ক করা বা ভুলিয়ে রাখার অভিপ্রায়েই এই পুতুলপূজা বা মূর্তিপূজার উদ্ভব ঘটিয়েছিল। একমাত্র ভারতীয় হিন্দুসমাজ ছাড়া পৃথিবীর আধুনিক সভ্য শিক্ষিত দেশসমূহের কোথাও আজ আর এই ধরনের মূর্তিপূজা বিদ্যমান নেই। সাতকড়ি মুখোপাধ্যায় ‘বৌদ্ধধর্মের বিস্তারের রহস্য’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, মহামানব বুদ্ধ যখন অহিংস ধর্মের উপাদেয়তা কীর্তন করেছেন তখন তিনি অষ্টাঙ্গিকমার্গের সর্বধর্মসাধারণ তত্তে¡রই প্রচার করেছেন। অহিংসার নিষেধাত্মক অর্থে গ্রহণ ও ব্যাখ্যাদানের নিমিত্ত প্রচারিত হওয়ায় বৌদ্ধধর্মের বিস্তারলাভ হয়েছিল। অধ্যাপক দিব্যদ্যুতি সরকার ‘হিন্দু ধর্মে বাঙালি মনীষা’ প্রবন্ধে হিন্দুধর্মে বাঙালিদের অবদান যে বিশাল ও বহুমুখী তা প্রমাণের প্রয়াস পেয়েছেন। প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে এই জনপদের মানুষ মানবীয় চেতনায় নানাভাবে বিকশিত হয়েছিল যার অজস্র প্রমাণ রয়েছে ধর্মীয় পুরাণ সাহিত্যে। হিন্দুধর্মের মনীষীরাই প্রথম সত্যজিজ্ঞাসার উত্থাপক। গবেষক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ‘বৌদ্ধধর্ম: উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’ প্রবন্ধে ভারতে উদ্ভূত বৌদ্ধধর্মের বিস্তার বিষয়ে পÐিতবর্গের বিবিধ বিতর্কের সমাধান প্রদানে প্রয়াসী নানা বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম ও মধ্য\এই পাঁচটি ভৌগোলিক বিভাগের ব্যাখ্যা প্রদান সাপেক্ষে ভারতে যে ষোলোটি মহাজনপদ ছিল তার শ্রীবৃদ্ধিতে বৌদ্ধধর্মের অবদান অপরিসীম। বুদ্ধ যে ধর্মচক্র প্রবর্তন করেছিলেন, ‘বহুজনের হিত, বহুজনের সুখ’\এই দর্শনে প্রবর্তিত ‘মধ্যপন্থা’ই ছিল বুদ্ধের সর্বমানবিকবোধের নৈতিকবোধের আচরণ। বুদ্ধের বিশিষ্ট জীবনীকার মহেশচন্দ্র ঘোষ ‘গৌতম বুদ্ধের আত্মচরিত’ প্রবন্ধে অশ্বঘোষ প্রণীত বুদ্ধচরিত্র, ললিত-বিস্তর এবং জাতকের উপক্রমণিকা\এই তিনটি গ্রন্থকে বুদ্ধজীবনচরিতের প্রামাণ্য আকরগ্রন্থ হিসেবে এর মৌলিকতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছেন। অধ্যাপক সুধা সেনগুপ্ত ‘বৌদ্ধস্তূপ\উদ্ভব ও বিকাশ’ প্রবন্ধে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের কিছু পূর্বে তাঁর পার্থিব দেহের সমাধি নিয়ে শিষ্যদের মধ্যে যে বিতর্ক হয় এবং পরিশেষে বুদ্ধের নামে দশটি স্তূপ নির্মাণের মধ্য দিয়ে এই বিতর্কের যে অবসান ঘটে তার পূর্বাপর ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন। অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া ‘বঙ্গে বৌদ্ধধর্ম ও ক্রমবিবর্তন’ প্রবন্ধের শিরোনামের স্বপক্ষে নানা তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে একটি প্রামাণ্য ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে বুদ্ধযুগ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে পালযুগ খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই প্রবন্ধের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। অধ্যাপক অমল বড়ুয়া ‘বাংলায় বুদ্ধধর্ম’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে তৃতীয় শতকের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম বাংলাদেশে প্রচারলাভ করেছিল এবং মৌর্যসম্রাট অশোকের সময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। নানা ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে প্রবন্ধকার প্রমাণ করার প্রয়াস পেয়েছেন যে, বাংলার জনপদে বৌদ্ধধর্মের প্রচার বুদ্ধের সময়কালেই বিস্তারলাভ করে।
সৈয়দ আমীর আলীর (১৮৪৯-১৯২৯) দ্য স্পিরিট অব্ ইসলাম একটি সুবিখ্যাত গ্রন্থ। এ গ্রন্থ সম্বন্ধে লেখক স্বয়ং বলেন, ‘এই গ্রন্থে আমি বিশ্বধর্ম হিসেবে ইসলামের বিবর্তনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। স্বল্পকালের মধ্যে ইসলামের দ্রæত প্রসার আর কোটি কোটি মানুষের বিবেক ও মনের ওপর অসাধারণ প্রভাব বিস্তারের কাহিনিও এর অন্তর্ভুক্ত।’ আমীর আলীর যে দুটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ তাঁকে অমর করে রেখেছে তা হচ্ছে কদণ ওযধরর্ধ মত অ্রফটব (১৮৮৫) এবং কদণ ঔর্ধ্রমরহ মতর্ দণ ওটরটডণভ্র (১৮৮৯)। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং আইনশাস্ত্র সম্বন্ধে তাঁর ছিল অগাধ পাÐিত্য। মুসলিম আইনেরও তিনি ছিলেন অসাধারণ ব্যুৎপত্তির অধিকারী। ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ও প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য। লন্ডন ইনার টেম্পল থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন ১৮৭৩ সালে। কিছুকাল প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের আইনের অধ্যাপকও ছিলেন। সর্বোপরি আইন বিষয়ক বহু গ্রন্থের প্রণেতা। নিজে উদার, অসাম্প্রদায়িক ও আধুনিক চিন্তাচেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং সে আলোকে ভারতীয় মুসলমানদের মানস গঠনের জন্য লেখালেখি করা ও বক্তৃতা-বিবৃতি প্রদানে ন্যস্ত থাকতেন। ‘অন্ধ বিশ্বাস ইসলাম নহে, মুক্ত বিচার-বুদ্ধির সঙ্গে ইসলামের বিরোধ নাই’ এ মতবাদ প্রচারের জন্য খ্যাত ছিলেন। অন্ধ অনুবর্তিতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি পরিহার করে আধুনিক যুগের ভাবধারা ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের জন্য মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করতেন। জন্মেছিলেন হুগলির চুঁচুড়ায়। তবে তিনি ছিলেন সরাসরি রাসুলুল্লাহর বংশধর। দ্য স্পিরিট অব্ ইসলাম-এর তথ্য উপাত্তের উৎস হিসেবে ইবনুল আসী, আত তাবারি, আল হাবিবি ও ইবনে হিশাম লিখিত সিরাত গ্রন্থের সাহায্য নিলেও আমীর আলী স্বধর্মীয় ভাবাবেগ বর্জন করে প্রকৃত ইতিহাস উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। বাঙালি ধর্মচিন্তকদের মধ্যে আবুল হাশিম (১৯০৫-১৯৭৪) একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। ভারত-উপমহাদেশের মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ আবুল হাশিমের চিন্তার মূলে ছিল ইসলাম ও মুসলিম ধর্ম। ইংরেজি ভাষায় রচিত কদণ উরণণঢ মত অ্রফটব (১৯৫০) তাঁর ধর্মতাত্তি¡ক চিন্তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। আবুল হাশিম জীবন ও জগৎকে ব্যাখ্যা করেছেন ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁর মতে জগৎ ও জীবন পরিচালিত হয় কোরানে বর্ণিত ‘রুবুবিয়ত’ বা ঐশী নীতি অনুযায়ী। মানুষ চেষ্টা দ্বারা আল্লাহর গুণাবলি অর্জন ও রূপায়ণ করতে সক্ষম। পরম করুণাময় আল্লাহ মানুষকে স্বেচ্ছায় এ শক্তি প্রদান করেছেন। স্রষ্টা নিজেকে সৃষ্টিতে অভিব্যক্ত করেন তাঁর গুণাবলি প্রকাশের মাধ্যমে। মানুষ ওইসব ঐশীগুণ অধিকমাত্রায় অনুশীলন করতে সক্ষম। ঐশী গুণাবলির মাধ্যমেই আল্লাহ, জগৎ ও মানুষের স্বরূপ ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষ ঐশী গুণ অনুশীলনের মাধ্যমে পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হতে পারে। আল্লাহকে মানুষ তার নিজের মধ্যে আবিষ্কার করতে পারে। কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের (১৯২৬) অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন মননে ও মানসে মুক্তবুদ্ধি চর্চার মানুষ। ব্যক্তিগত, সম্প্রদায়গত, দেশ ও জাতিগত সব রকমের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর রচনায়। ধর্মকে গোঁড়ামিমুক্ত করার আন্দোলনেরও পথিকৃৎ তিনি । ইসলাম ধর্ম ও তার প্রবর্তক হজরত মহম্মদ (স.)-এর প্রতি গভীর আস্থা ও শ্রদ্ধা রেখেছেন আমৃত্যু। তাঁর লেখনী ছিল হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির সপক্ষে। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ শাশ্বত বঙ্গ (১৯৫১), বাঙলার জাগরণ (১৯৫৬), হযরত মোহাম্মদ ও ইসলাম (১৩৭৩)। পবিত্র কোরানের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদের জন্যও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন।
এস. ওয়াজেদ আলি (১৮৯০-১৯৫১) একজন আলোকিত বাঙালি মুসলিম। তাঁর ধর্মীয় মানস সত্য ও সুন্দরের সাধনায় নিবিষ্ট। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা ভবিষ্যতের বাঙালি (১৯৪৩), আকবরের রাষ্ট্রসাধনা (১৯৪৯), মুসলিম সংস্কৃতির আদর্শ (১৯৫১) প্রভৃতি গ্রন্থে ধর্মবোধের সুস্পষ্ট পরিচয় মেলে। হিন্দু ও মুসলমান মিলে-মিশে এক জাতি গঠন করা যায় কি না সে অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছে তাঁর রচনায়। ধর্মকে তিনি দেখেছেন মানব মিলনের সেতুবন্ধন হিসেবে। ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র তৃতীয় খÐে চারজন লেখকের একুশটি রচনা সন্নিবেশিত হলো। প্রথম এগারটি প্রবন্ধ সৈয়দ আমীর আলীর দ্য স্পিরিট অব্ ইসলাম গ্রন্থের দ্বিতীয় খÐ (সব রচনা) থেকে সংকলিত। এই গ্রন্থে তিনি বিশ্ব-ধর্ম হিসেবে ইসলামের ক্রমবিকাশ ও আদর্শের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ইসলামের অন্তর্নিহিত শক্তির উৎস অনুসন্ধান করেছেন। স্বল্পকালের মধ্যে ইসলামের দ্রæত প্রসার আর কোটি কোটি মানুষের বিবেক ও মনের ওপর অসাধারণ প্রভাববিস্তারের কাহিনিও এর বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। বিশিষ্ট রাজনীতিক ও ইসলামি চিন্তাবিদ আবুল হাশিম তাঁর ইসলামের মর্মকথা রচনায় মুসলমানদের ইসলামের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুতির দিকগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে পরিত্রাণপ্রাপ্তির উপায়ের সন্ধান দিয়েছেন। কাজী আবদুল ওদুদ ‘মুসলমানের পরিচয়’ প্রবন্ধে হিন্দু ও মুসলমানের বিরোধের কারণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, মানুষের আশা-আকাঙক্ষার সাথে পরিচিত হয়ে তার সপক্ষে সর্বমানবিকবোধ বিকশিত করতে পারলে এই বিরোধের একটি সহনীয় পর্যায় সৃষ্টি করা সম্ভব। এস. ওয়াজেদ আলি ‘ইসলামের দান’- প্রবন্ধে ইসলামে ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের গুরুত্ব অনুধাবনের উল্লেখ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ইসলামের শিক্ষায় মানুষ বুঝেছে, তার মানবিক বোধ বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনাগুলি কাজে লাগিয়ে বিশ্বমানবতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র চতুর্থ খন্ডে নয়জন লেখকের চৌত্রিশটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রথমে বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ; বাংলা গদ্যসাহিত্যের বিশিষ্ট শিল্পী মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ প্রণীত মোস্তফা-চরিত (১৯২৩) থেকে ইতিহাস ভাগ-এর চৌদ্দটি রচনা সংকলিত হলো। এসব প্রবন্ধে হজরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনী রচনার মধ্যে তাঁর নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষণীয়। পূর্ববর্তী জীবনীকারদের ভক্তির ও আনুগত্যের তীব্রতায় প্রকৃত তথ্যের বিকৃতি অপসারণ করে তিনি একজন উজ্জ্বল ও সচেষ্ট সফল মানুষের অবয়ব আবিষ্কার করেছেন। সেইসাথে লেখক নতুন তথ্যেরও সন্ধান দিয়েছেন। আত্মস্বভাবে স্বতন্ত্র কবি গোলাম মোস্তফা ইসলামি সংগীত, দেশাত্মবোধক গান, হামদ ও না’ত-এ রসুল-চর্চায় সিদ্ধহস্ত একজন জনপ্রিয় কবি। গদ্য রচনার মধ্যে রসুলুল্লাহর জীবনীমূলক বিশ্বনবী তাঁর অবিস্মরণীয় গ্রন্থ। বিশ্বনবীর দ্বিতীয় খÐ থেকে সাতটি রচনা এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ‘ইসলাম ও পৌত্তলিকতা’ প্রবন্ধে তিনি সমকালীন প্রামাণ্য সিরাতগ্রন্থের আলোকে হজরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনে আরোপিত বহু আনুমানিক তথা লৌকিক-অলৌকিক উপাদান অপসারণ করে বিশ্বনবীর চিন্তা, কর্ম ও আদর্শের একটি সত্যনিষ্ঠ তথ্যভিত্তিক জীবনী রচনার প্রয়াস পেয়েছেন। অপর প্রবন্ধে মিরাজ নিয়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহর সঙ্গে আল্লাহর দিদার লাভ সম্পর্কিত ঘটনা যে অশরীরী নয়, শারীরিক\তার সপক্ষে তিনি প্রামাণ্য তথ্য হাজির করেছেন। বহুভাষাবিদ পÐিত ও প্রাচ্যের অন্যতম ভাষাবিজ্ঞানী ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ইস্লাম প্রসঙ্গ গ্রন্থ থেকে পাঁচটি প্রবন্ধ বর্তমান খÐে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ‘ইস্লামে নারীর ধর্ম সম্বন্ধীয় অধিকার’ প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন, ইসলামি জীবনাদর্শে তথা নির্দেশনায় নারী-পুরুষে কোনও বৈষম্য সৃষ্টি হয়নি, যদিও সমাজ-বিবর্তনের নানা সময়ে নানা স্থানে ও বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে নারীর এই সমঅধিকারের বিধান সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। নারীর জীবনযাপনে ও মানবিক মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণে কোরআনে যে নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছে তার আলোকেই বিশ্লেষিত হয়েছে এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য। ‘মুসলিম পারিবারিক আইন ও নারীর কল্যাণ’ প্রবন্ধে মুসলিম পারিবারিক আইনে নারীর মানবিক অধিকার এবং নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে যে নীতিমালা ঘোষিত হয়েছে তার সম্পূরক আলোচনা রয়েছে। ‘ইস্লামে রাষ্ট্রের স্বরূপ’ প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন, ইসলাম পরকালের প্রলোভনমুখী ধর্ম নয়। ইসলাম মানুষের সর্বাধিক পার্থিব উন্নতির পথকে সুগম করেছে। ইসলামে রাষ্ট্রের শাসকের হাতে ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে যে বিধিবিধান রয়েছে তা কীরূপে বাস্তবায়িত হবে তার বিশ্লেষণই এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ‘ইস্লামী সমাজের রূপ’ প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন, হজরত মুহম্মদ (স.) জাতীয়তা প্রতিষ্ঠা করেননি, তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ভ্রাতৃত্ব। সর্বোপরি মানব-ঐক্য। ‘ইস্লাম: মানবতার মুক্তিদূত’ প্রবন্ধে ইসলামপূর্ব বৈশ্বিক সমাজের পূর্বাপর অবস্থা এবং ইসলাম আগমনে পরিবর্তিত রূপ আলোচিত হয়েছে।
মানবতাবাদী লেখক এম এন রায় ‘ইসলামের সামাজিক ও ঐতিহাসিক পটভ‚মি’ প্রবন্ধে ইসলামের বৈশ্বিক বিকাশের সামাজিক মানবিক চিন্তায়, সর্বোপরি ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সমকালীন শাসকবৃন্দের দূরদর্শিতা, তাঁদের অনাড়ম্বর নির্মোহ জীবনাদর্শের প্রশংসা করেছেন। লেখক তাঁর ‘ইসলাম ও ভারতবর্ষ’ প্রবন্ধে এই উপমহাদেশের জনজীবনে ধর্মদেশনা ও তা অনুধাবনে সুচিন্তার বৈকল্য তথা মানবিক বিপর্যয়ের উৎস অনুসন্ধান করেছেন। বিশিষ্ট সুফিবাদী চিন্তক সদরউদ্দিন আহ্মদ চিশতী ‘অখÐ কোরানদর্শনের পটভ‚মি’ প্রবন্ধে বলেন, কোরান জীবনবিধান নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। কেননা বিধান পরিবর্তনশীল, কিন্তু দর্শন অপরিবর্তনীয়। মুক্তচিন্তক ড. আহমদ শরীফ ‘বাঙলার সূফীসাধনা’ প্রবন্ধে এর স্থানীয় রূপ ও তার বিবর্তনের বহুবিধ পরম্পরা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, সুফিমত একটি মিশ্র দর্শনের সন্তান। তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘চৈতন্য মতবাদ ও ইসলাম’-এ নানা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তিনি এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, সৃষ্টি ও স্রষ্টার দ্বৈততত্ত¡ই ইসলামের ভিত্তি। আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হচ্ছে দাস (আবদ) ও প্রভুর (রব)। সুরজিৎ দাশগুপ্ত ‘ভারতবর্ষ ও ইসলাম’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, ইসলামধর্ম দু’বাহু প্রসারিত করে ভারতীয়দের আপন বক্ষে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল\ফলে হিন্দুসমাজের সংকীর্ণ ও কঠোর আইনকানুনে জর্জরিত নিম্নবর্ণের অস্পৃশ্য জাতিগুলো একই সাথে মানবিক ব্যবহারলাভের ও শাসকশ্রেণিতে উন্নয়নের প্রত্যাশায় ইসলাম বরণ করে নিতে অগ্রসর হয়েছিল। বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ‘ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন’ প্রবন্ধে বলেন, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এই বিধান সর্বমানবিক এবং সর্বকালে প্রয়োগ-উপযোগী। তবে ইসলামের উদ্ভব ও বিকাশে এই প্রয়োগপদ্ধতি এক নিয়মে নিবদ্ধ থাকেনি। কালের ধারায় বিভিন্ন শাসকের শাসনামলে নানা বিষয়ে সমকালীন জীবনধারার সাথে সুসামঞ্জস্য রক্ষার প্রয়োজনে বহু চিন্তাবিদের অবদানে ইসলামের আধুনিক অবয়ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান খÐের সর্বশেষ রচনা ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল হাই-এর ‘সুফিবাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’। প্রবন্ধে সুফিবাদের উৎপত্তি নিয়ে পাশ্চাত্য পÐিতদের নানা মতবাদের যৌক্তিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সুফি মতবাদের পূর্বাপর ইতিহাস উপস্থাপনের মাধ্যমে এর স্থানিক ও বৈশ্বিক রূপভেদ নিয়ে এক মানব-ঐক্যের সমন্বিত ধারার বিশ্লেষণও করা হয়েছে।
‘হিন্দুধর্ম’ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম ধর্ম।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র পঞ্চম খন্ডে নয়জন লেখকের রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘বেদ সংহিতা’ প্রবন্ধের লেখক সত্যব্রত সামশ্রমী বিখ্যাত বৈদিক পÐিত, বেদ প্রচারক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের ভ‚তপূর্ব অধ্যাপক। এই প্রবন্ধে ঋগে¦দ ভাষ্যগুলোর বিশ্লেষণ আছে। বৈদিক জ্ঞানরাশির প্রকাশ বেদ শুধু পুস্তকের সমাহার নয়, এগুলো জ্ঞানের সমাহার\যা জানলে মানুষ সত্য বিদ্যা জানতে পারে, সত্য ও অসত্যের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে, প্রকৃত বিদ্বান হতে পারে এবং জ্ঞান অর্জনের ফলে আনন্দ ও শান্তি লাভ করতে পারে। এখানে সকল ঋষির রচিত বেদের সূক্তগুলোর সারসংক্ষেপ উপস্থাপিত হয়েছে। সাহিত্যসম্রাট তথা ধর্মতত্তে¡র অন্যতম প্রধান ভাষ্যকার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উনত্রিশটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে এ খÐে। এই প্রবন্ধগুলো নেয়া হয়েছে তার দেবতত্ত¡ ও হিন্দুধর্ম্ম, কৃষ্ণচরিত্র ও ধর্ম্মতত্ত¡ (অনুশীলন) বই থেকে। বেদ ভাষা অনেক প্রাচীন, তাই এর সঠিক তাৎপর্য অনুধাবন সাধারণ্যে সহজ নয়। ফলে বেদ নিয়ে দেশি-বিদেশি পÐিতদের যেসব অভিমত ও ভাষ্য পাওয়া যায়, বঙ্কিম নিজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেসবের যথার্থতা যাচাই করেছেন। বেদের প্রকৃতিবাদী ব্যাখ্যা, যাজ্ঞিকগণ প্রদত্ত ভাষ্য, সর্বোপরি অধ্যাত্মবাদী ব্যাখ্যার বিশ্লেষণ আছে বঙ্কিমভাষ্যে। আছে কৃষ্ণ চরিত্রের বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ। সেইসঙ্গে দ্বাপর যুগের এই অবতারকে নিয়ে প্রচলিত মতবাদ ও নানা বিশ্বাসের প্রকৃত সত্যাসত্যের বিশ্লেষণও রয়েছে। তাছাড়া আছে সনাতনধর্মের সর্বশাস্ত্রের সারস্বতরূপ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অন্যতম অংশ কামগীতার মানবীয় ও দার্শনিক বিশ্লেষণ। মানবজীবনের অধোগতির অন্যতম কারণ কামবাসনা তথা সমুদয় প্রবৃত্তির দমন ও নিয়ন্ত্রণে কামগীতার ভাষ্যও উপস্থাপিত হয়েছে এখানে। ‘হিন্দুধর্মের অভিব্যক্তি’ প্রবন্ধে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর উপনিষদের অমৃত উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মানুষের ঐশীশক্তির ঐশ্বর্য বিশ্লেষণ করেছেন। প্রথম ভারতীয় সিভিল সার্ভেন্ট এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভগবদ্গীতারও অন্যতম ভাষ্যকার। বিশিষ্ট বাগ্মী, হিন্দুধর্মের বৈশ্বিক ভাষ্যকার স্বামী বিবেকানন্দের সাতটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়েছে এখানে। এসব প্রবন্ধ তাঁর দেশে-বিদেশে প্রদত্ত বিভিন্ন বক্তৃতার লেখ্যরূপ। শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ‘ঈশ্বর সব মানুষে আছেন কিন্তু সব মানুষ ঈশ্বরে নেই’\মানুষের এই বিপন্নবোধের মানবীয় উদ্বোধক বিবেকানন্দ হিন্দুধর্মের নবজাগরণে অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে উদ্ভাসিত মানবাত্মার অনন্ত সত্তার অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়েছে এসব প্রবন্ধে। স্বদেশি আন্দোলনের প্রবক্তা বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী বরিশালের কৃতী সন্তান অশ্বিনীকুমার দত্ত ‘দুর্গোৎসবতত্ত¡’ প্রবন্ধে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন ও তার ইতিহাস পরম্পরা আলোচনায় দুর্গাপূজায় প্রকৃত মানবীয় ঐক্যের অনুষঙ্গ নিয়ে এর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। বাঙালি হিন্দুসমাজে গীতার বঙ্গানুবাদে পথিকৃতের মর্যাদায় অভিষিক্ত জগদীশচন্দ্র ঘোষ শ্রীগীতা রচনায় পূর্ণাঙ্গ গীতাশাস্ত্রের সারাৎসার বিশ্লেষণ করেছেন। সেইসঙ্গে লেখক দেশে-বিদেশে অপরাপর পÐিত ও ভাষ্যকারদের গীতার দার্শনিক ব্যাখ্যার ব্যাপারে স্বীয় অভিমত সংযোজন করেছেন। বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘হিন্দুধর্মের স্বরূপ’ প্রবন্ধে হিন্দুধর্মের অধ্যাত্মদর্শনে অন্যান্য ধর্মমতের অনুক‚লে সর্বমানবীয় বোধের বিশ্লেষণ করেছেন। অন্যান্য ধর্মের একক মহাপুরুষদের অভিজ্ঞান অনুসারে বিকশিত ধর্মগুলোর সঙ্গে হিন্দুধর্মের সম্মিলিত জ্ঞানের স্বাতন্ত্র্য বিশ্লেষণ করে এই ধর্মের সর্বজনীনতা তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ‘হিন্দুধর্মের স্বরূপ’ এই একই শিরোনামে অপর প্রবন্ধে অতুল সুর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, হিন্দুধর্ম কোনও একক ব্যক্তির স্বপ্নাদিষ্ট আজ্ঞার বাস্তবায়ন নয়। সত্যসন্ধান ও সত্যগ্রহণের অভিযাত্রায় যুক্ত অসংখ্য মনীষার বিচিত্র অভিজ্ঞানে পূর্ণ এই ধর্ম। দীনেশচন্দ্র সরকার ‘হিন্দুধর্মে সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, এই ধর্মে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক উপাদানের তুলনায় সাংস্কৃতিক উপাদানই বেশি। সংশ্লিষ্ট এসব উপাদানে আছে প্রাচীন কিংবদন্তি, পৌরাণিক কাহিনিসহ অসংখ্য আচার-উপাচারের বিবরণ\যা সাধারণ মানুষের মনে ভক্তি ও বিশ্বাসকে প্রভাবান্বিত করেছে এবং উপাসনাপদ্ধতিও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
ঋগে¦দে সর্বপ্রথম ‘বঙ্গ’ শব্দটি পাওয়া যায়। কাজেই বঙ্গ শব্দটি ভারতীয় সভ্যতার সমসাময়িক। ঋগে¦দের তথ্য থেকে জানা যায়, ঋষি দীর্ঘতমা কোনও কারণে নিজবাড়ি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে বালিরাজ্যে পৌঁছান। সেখানে তিনি শূদ্রানী পতœীর গর্ভে কাশ্যভট্টসহ ছয় পুত্র এবং রাজকুমারী সুদেষ্ণার গর্ভে পাঁচ পুত্রের জনক হন। পাঁচ পুত্র যথাক্রমে: অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র এবং সুহ্ম। এই পাঁচ পুত্র পাঁচটি দেশের রাজা হন এবং তাঁদের নামানুসারে রাজ্যের নামকরণ করা হয়। পশ্চিমা পÐিতগণ ঋষি দীর্ঘতমার ওপরে কোনও গুরুত্ব আরোপ করেননি। কিন্তু ভারতীয় ইতিবৃত্ত ঋষি দীর্ঘতমাকে ঋগে¦দের মন্ত্রদ্রষ্টাদের একজন বলে স্বীকার করেন। কারণ ঋষির পুত্রগণের নামের দেশগুলো বিদ্যমান আছে। কাজেই বঙ্গদেশ মহাভারত রচনার পূর্বকাল থেকেই ছিল। অর্থাৎ বঙ্গদেশ প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটি ভ‚খÐ। কোনও কোনও পÐিতের মতে, সমাজচ্যুত ঋষি দীর্ঘতমার কাহিনি প্রমাণ করে যে, প্রাচীন যুগে হিন্দুধর্ম একদেশ থেকে অন্যদেশে দাস, ¤েøচ্ছ, অসুর প্রভৃতি জাতির মধ্যে বিস্তারলাভ করে এবং ঋষি দীর্ঘতমাই হচ্ছেন এর পথিকৃৎ। মানবেতিহাসের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন হচ্ছে বৈদিক সংস্কৃতি, যার সংহত অনুশাসনিক রূপটির নাম মনুসংহিতা, ভারতীয় সংস্কৃতিতে যাকে সনাতন বা হিন্দু সমাজ ও ধর্মের বৈদিক সংবিধান বললেও অসংগত হয় না। প্রকৃতপক্ষে মনুসংহিতাকে হিন্দুধর্মের আচরণবিধির পবিত্র গ্রন্থরূপে গণ্য করা হয়। ঋগে¦দের মন্ত্রে মনুকে মনুষ্যজাতির আদি পুরুষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শতপথ ব্রাহ্মণেও মনু এবং মহাপ্লাবনের উল্লেখ আছে। (তাহলে এই মনু আর সেমেটিক ধর্মে উল্লিখিত নূহ নবী কি সমকালীন?)।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র ষষ্ঠ খÐে নয়জন লেখকের রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। ভারতীয় ধর্মদর্শনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তক অরবিন্দ ঘোষ তাঁর গীতা বইয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, গীতা মনুষ্যজীবের ধ্যানজ্ঞানের আধার। হতাশা দুরাশা ব্যর্থতা বেদনা উপশমে গীতার উপদেশ জীবের পুনরুদ্ধারের পথ প্রশস্ত করে। গীতার আসল উদ্দেশ্য মানুষকে মুক্তির পথ দেখানো। শুধু কর্মে প্রবৃত্ত করানো নয়, গীতা সৎকর্ম নির্বাচনেরও পথ দেখায়। গীতাকে বারবার উচ্চারণ করলে ত্যাগী শব্দের উদ্ভব ঘটে। গীতার শিক্ষা এই, সব ত্যাগ করে ভগবানকে লাভ করার চেষ্টা করা। উপনিষদ বিষয়ে তিনি বলেন, বেদ অপৌরুষেয়, এক ঐশীপ্রসূত ঋষিবাক্য দ্বারা সংকলিত। উপনিষদেও আছে জীবজগতের নিগূঢ় জ্ঞানের আধার। পুরাণ স্মৃতির মধ্যে প্রধান। স্মৃতি অপৌরুষেয় নয়, মানুষের সীমাবদ্ধ পরিবর্তনশীল মত ও বুদ্ধির সৃষ্টি। বেদ ও উপনিষদ থেকে পুরাণকে স্বতন্ত্র করে বৈদিকধর্ম ও পৌরাণিকধর্ম বলে যে স্বাতন্ত্র্য ভেদ করা হয় তা অজ্ঞানতাপ্রসূত। এ খÐে স্বামী বিবেকানন্দের গীতা-প্রসঙ্গ বইয়ের সব ও হিন্দুধর্ম বইয়ের তিনটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গীতা-প্রসঙ্গ বইয়ের প্রবন্ধগুলোতে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ও সূ² বিচার-বিশ্লেষণের নিষ্কাশনে তিনি গীতা আলোচনা করেছেন। গীতার অপূর্ব বাণীপুঞ্জ থেকে বিবেকানন্দ যে তত্ত¡লোক আবিষ্কার করেছেন তা সর্বযুগের সকল মানুষের জীবনসংগ্রামের দুর্গম পথে পরম আলোকস্তম্ভস্বরূপ বলে বিবেচিত। হিন্দুধর্ম স্বামী বিবেকানন্দের মৌলিক চিন্তার অন্যতম একটি সংকলন। বিভিন্ন সময়ে হিন্দুধর্ম সম্বন্ধে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতার সমন্বিত রূপ এটি। হিন্দুধর্ম সম্বন্ধে অনেকেরই সুস্পষ্ট ধারণা নেই, আবার অনেকেই এ বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন। যদিও হিন্দুধর্মের মূল ভিত্তি বেদ, তবুও বেদ-বেদান্ত, শ্রীমদ্ভগবগীতা, অষ্টাদশ পুরাণাদি শাস্ত্রে হিন্দুধর্মের কোনও উল্লেখ নেই। গ্রিক ও পারস্যবাসী সিন্ধুনদতীর-অধিবাসী আর্যজাতি বা বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের ‘হিন্দু’ বলতেন। বিবেকানন্দের মতে, মুসলমান শাসনকাল থেকে এই জনপদের মানুষ ওই শব্দ নিজেদের ওপর প্রয়োগ করতে আরম্ভ করে। কিন্তু বিবেকানন্দ এই হিন্দু শব্দের পরিবর্তে বৈদান্তিক শব্দ ব্যবহারের পক্ষে অভিমত দেন।
মধ্যযুগের ভারতীয় ধর্ম-দর্শনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তক ক্ষিতিমোহন সেন-এর হিন্দুধর্ম গ্রন্থ থেকে বর্তমান খÐে এগারোটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থের প্রবন্ধগুলো তিন ভাগে বিন্যস্ত। প্রথম ভাগে উপস্থাপিত হয়েছে হিন্দুধর্মের প্রকৃতি ও মূলতত্ত¡। এই তত্তে¡ আলোচিত হয়েছে: হিন্দুধর্মের প্রকৃতি ও বিকাশ, সামাজিক আদর্শ ও মূল্যবোধ, বর্ণভেদ বা জাতিভেদ প্রথা, লোকাচার ও উৎসব অনুষ্ঠান, সংহতি ও স্বাধীনতা। দ্বিতীয় ভাগে উপস্থাপিত হয়েছে হিন্দুধর্মের ঐতিহাসিক বিবর্তন। তৃতীয় ভাগে উপস্থাপিত হয়েছে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত অংশ। ‘হিন্দুধর্মের প্রকৃতি ও মূলতত্ত¡’ প্রবন্ধে হিন্দুধর্মের মূল তত্ত¡গুলোর বিবরণ রয়েছে। অতীতে এই তত্ত¡গুলোই বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করেছে, কিছু হিন্দুধর্মেরই মধ্যে দিয়ে, আবার কিছু এরই প্রশাখা জৈন বা বৌদ্ধধর্মের সহায়তায়। হিন্দুধর্ম একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গড়ে তোলা কোনও বড় স্থপতির বিরাট স্থাপত্যের মতো নয়, বরং অনেকটা মহিরুহের মতো বেড়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। ‘হিন্দুধর্মের প্রকৃতি ও বিকাশ’ প্রবন্ধে তাঁর অভিমত, সিন্ধু সভ্যতা সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান নিতান্তই অসম্পূর্ণ। কিন্তু মনে হয় এই মানুষেরা পুরুষ আর স্ত্রীদেবতা, দু’য়েরই উপাসক ছিল, যার সঙ্গে পরবর্তী হিন্দু পুরাণের যোগ রয়েছে। ধীরে ধীরে ভারতে যে একটা একীকরণের প্রক্রিয়া চলেছে তার গুরুত্বপূর্ণ এক প্রমাণ মেলে আর্য-অনার্য পুরাণের মিশে যাওয়া আর এক সাধারণ পুরাণের জন্ম নেওয়ার মধ্যে। ‘সামাজিক আদর্শ ও মূল্যবোধ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, বৈরাগ্য বা যাকে কখনও কখনও বলা হয় অন্যজগতের বা লোকাতীতের ধ্যান\তাই বলে যে একমাত্র হিন্দু শ্রেয়ো-নীতি এমন বলা যায় না। ‘বর্ণভেদ বা জাতিভেদ প্রথা’ প্রবন্ধে তাঁর অনুসন্ধান, ভারতীয় সমাজে বহু প্রজাতির বিমিশ্রতা থেকেই বর্ণ-বিভাগের উদ্ভব। দেশের সীমানার মধ্যেই বিশ্বের প্রায় সব জনগোষ্ঠীর আকৃতির দেখা মেলে, আর বেশির ভাগ মানুষই বস্তুত মিশ্রজাতের। বংশানুক্রমিক জাতিবিন্যাস বহু হিন্দুশাস্ত্রেই স্বীকৃত নয়। সেটাই বুঝিয়ে দেয় যে আচরণ দিয়েই বর্ণের নির্ণয় হওয়া উচিত, জন্ম দিয়ে নয়। ‘লোকাচার ও উৎসব-অনুষ্ঠান’ প্রবন্ধে ক্ষিতিমোহন সেন বলেন, নানা লোকাচার ও বৈচিত্র্যের সমাহারে বিকশিত হিন্দু সাংস্কৃতিক জীবন। হিন্দুর সামাজিক লোকাচার উৎসব-অনুষ্ঠানাদি বিচিত্র ধরনের। নানা লোকাচারে পরিপূর্ণ হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান। সাধারণ্যে হিন্দু আচার-অনুষ্ঠানের মানে ঠিক বুঝতে পারে না। ‘সংহতি ও স্বাধীনতা’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, ধর্ম আর রিলিজন এক জিনিস নয়। আর হিন্দুধর্মকে নির্দিষ্ট অর্থে রিলিজন বলা যাবে না। ধর্মের সম্পর্ক যত মানুষের স্বভাব আর আচরণের সঙ্গে, বিশ্বাসের সঙ্গে ততটা নয়। তাই এখানে কোনও মতবাদ বা তত্ত¡ মানার ব্যাপার জড়িয়ে থাকে, এমন বলা যাবে না। অবশ্য আচরণের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে আলাদা কথা। চিন্তার রাজ্যে এ আমাদের অবাধ স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু আচরণবিধিতে কঠোরতা আরোপ করে। আস্তিক, নাস্তিক, সংশয়বাদী, অজ্ঞেয়বাদী\সবাই হিন্দু হতে পারে হিন্দু সংস্কৃতি ও জীবনের সুসম্বন্ধ ব্যবস্থাটিকে স্বীকার করে নিলেই। ‘সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা’ প্রবন্ধে অনুসন্ধান করে তিনি দেখান, সিন্ধু উপত্যকাই হিন্দুধর্ম ও হিন্দু সভ্যতার বিকাশের উৎসধারা। সভ্যতাটি বহু শিল্পকলার নিদর্শন রেখে গেছে। এর লিপিগুলো সাংকেতিক, পাঠোদ্ধার হয়নি আজও। মনে হয় সে-সময় দক্ষ উৎপাদনশিল্প ছিল আর ছিল বেশ শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। কোন কোন প্রজাতি এর অন্তর্গত ছিল বলা কঠিন। ‘বৈদিক যুগ’ প্রবন্ধের বক্তব্য হলো, বৈদিক আর্যরা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল কিন্তু তাদের সঙ্ঘবদ্ধ করেছে এই দেবপূজা আর ধর্মীয় বিধি। তাদের মতে, মানুষের জীবনটাই দেবতাদের হাতে\জীবনের সমাপ্তি অথবা তাঁদেরই মতো সমৃদ্ধি। ‘বৈদিক সংস্কৃতি ও শিক্ষা’ প্রবন্ধে লেখকের অভিমত, তপোবনের বিদ্যায়তনগুলোর বিকাশ এই যজ্ঞভূমির মÐলী থেকেই। অনার্যদের শিক্ষাকেন্দ্র বা ভাব-বিনিময়ের কেন্দ্র ছিল তীর্থক্ষেত্র, বিশেষত পুণ্যস্নানের স্থান। ‘উপনিষদ ও গীতা’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, উপনিষদ ও গীতা হিন্দুর জীবনাচরণে নৈতিক শিক্ষার অন্যতম মৌলিকগ্রন্থ। ঔপনিষদিক শিক্ষা ব্রহ্ম এবং আত্মার তত্ত¡কে কেন্দ্র করে। ব্রহ্ম শব্দের তাৎপর্য উপলব্ধি করা খুব সহজ নয়। তাঁকে বর্ণনা করা হয়েছে এক ঐশীসত্তা-রূপে যিনি সর্বজীবের মধ্যে প্রচ্ছন্ন, যিনি সর্বব্যাপী, সর্বজীবের আত্মা, সর্বদর্শী, সর্বভূতে বিরাজমান; যিনি সাক্ষী, যিনি জ্ঞানস্বরূপ, এক ও অদ্বিতীয় এবং গুণাতীত। ‘সাংস্কৃতিক সমন্বয় এবং ভারতীয় জীবনে তার প্রভাব’ প্রবন্ধে লেখক দেখান, বেদে বহু দেবতার কথা আছে, কিন্তু সেখানে প্রতিমা বা মূর্তি নেই। সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতায় বহু মূর্তি দেখা যায়, তাই বোঝা যায় এই প্রতিমা-পূজা অবৈদিক সংস্কৃতির দান। ‘বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য’ প্রবন্ধে সুকুমারী ভট্টাচার্য বেদবিরোধী পÐিতবর্গের কথা বলেছেন। লেখক দেখিয়েছেন যাজ্ঞবল্ক্যের উক্তির মধ্যেই নাস্তিক্যবাদের ইশারা রয়েছে। ড. পরেশচন্দ্র মÐল ‘সহনশীলতার প্রয়োজনীয়তা ও অনুশীলন: হিন্দুধর্মের আলোকে’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, প্রাচীন ভারতে অবতার পুরুষ, ঋষি দার্শনিকদের উদার দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষাপটে সমাজজীবনে সহনশীলতা নিয়ে সাধারণ মানুষ সহাবস্থান করেছে। তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধের নাম ‘ঈশ্বর এক, না বহু?’। এ প্রবন্ধে তিনি শাস্ত্রপ্রামাণ্যে দেখিয়েছেন, বৈদিক যুগে ঋষিদের উপলব্ধিতে বলা হয়েছে: ‘একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি।’ অর্থাৎ সৎ বস্তু এক, পÐিতগণ তাঁকে ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করে থাকেন। তিনি ‘প্রসঙ্গ: ওঁ’ প্রবন্ধে বলেন, হিন্দু শাস্ত্রে ‘ওঁ’ ধ্বনিটি পরমব্রহ্মের প্রতীক শব্দ। এটি ব্রহ্ম, বিষ্ণু ও মহেশ্বর\সৃজনকর্তা, পালনকর্তা ও প্রলয়কর্তার এক সমন্বিতরূপে প্রকাশিত একক ধ্বনি। এ ধ্বনি প্রণব বা ‘ওঁ’ ব্রহ্ম শব্দ বা পরমাত্মার প্রতীক। এতদ্ভিন্ন এই ওঁ বা ওঁ-কার শব্দ ব্রহ্ম। পরেশচন্দ্র মÐল ‘বিশ্বশান্তি ও হিন্দুধর্ম’ প্রবন্ধে বলেন, হিন্দুধর্ম কোনও বিশেষ দেশ-কাল-পাত্রকে উদ্দেশ্য করে ধর্মাচরণের বিধান দেয়নি। সকল দেশের সকল কালে সকল মানবের পক্ষে যা হিতকর সে সকল গুণাবলির অনুশীলন হলো হিন্দুধর্মের মূল বিধান।
যুক্তিবাদী লেখক জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ভগবদ্গীতা ও আধুনিকতা’ প্রবন্ধে বলেন, বিশ্বব্রহ্মাÐের পেছনে বা অভ্যন্তরে যদি কোনও অদৃশ্য আদিশক্তি বর্তমান থাকে, তবে তা একদিন বিজ্ঞানের সাহায্যেই জানা সম্ভব হবে, চোখ বন্ধ করে অশিক্ষিত-কুশিক্ষিত মানুষের ধ্যান-জপের মাধ্যমে নয়। বিমল কুÐুর হিন্দুধর্মের উৎস সন্ধানে, বই থেকে ‘গণের উৎপত্তি: হিন্দুধর্মের অভ্যুদয়’, ‘হিন্দুধর্ম ও প্রাচীন বাংলা’, ‘বেদ ও বেদান্ত দর্শন’ ও ‘বেদে হোম ও পূজা’ শীর্ষক চারটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। এসব প্রবন্ধে লেখক কেবল সুনির্দিষ্টভাবে এর মধ্যকার কিছু কলঙ্কময় নারী-নিপীড়নমূলক বর্ণবাদী ঐতিহ্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেননি, একটি সুস্থ কল্যাণময় অখÐ মানবিক সমাজ গঠনের প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে চেপে থাকা আদিম অনুশাসনমূলক ধর্মীয়ব্যবস্থার অসারতাটুকু চিহ্নিত করে পাঠকমনে দ্বিধাহীন মুক্তচিন্তা জাগিয়ে তুলেছেন।
যুক্তিবাদী লেখক রণদীপম বসু ‘মনু ও মনুসংহিতা’ প্রবন্ধে বিশ্বজগৎ বা বিশ্বব্রহ্মাÐের যাবতীয় বস্তুনিচয়, গোটা প্রাণিকুল, উদ্ভিদ, গ্রহ-নক্ষত্র-পৃথিবী, আলো-জল-হাওয়া, দিন-রাত্রি-সময়-কাল-যুগ, জীব-জগতের উৎস, স্বর্গ-মর্ত্য-নরক, জীবলোক-মৃতলোক, সাক্ষী-বিচার-শাসন, আচার-অনুষ্ঠান, জন্মমৃত্যু-বিবাহ, খাবার-খাদ্য, ভক্ষ্য-অভক্ষ্য, শুচি-অশুচি ইত্যাদি যাবতীয় বস্তুগত ও ভাবগত বিষয়ের সৃষ্টিরহস্যের ব্যবহার-বিবেচনা বর্ণনা করেছেন নিজস্ব ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। মোটকথা, মনুসংহিতা হচ্ছে বিশ্বাসীদের কাছে একটি ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সমগ্র জীবনবিধান। ‘অস্পৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, মনুসংহিতা মতে, ব্রহ্মা হচ্ছেন সর্বলোকপিতামহ, আর মনু হচ্ছেন জীবজগতের আদিপিতা। মনুষ্যসমাজের অপরাপর বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, এজন্মের দুঃখকষ্ট যন্ত্রণাভোগ পূর্বজন্মের কোনও দুষ্কর্মের ফল হওয়ায় এর জন্য নিজেই দায়ী এবং তা ভোগ করতেই হবে, অন্য কাউকে দোষী করার উপায় নেই। অন্য কেউ এজন্যে দায়ীও নয়। তাঁর তৃতীয় প্রবন্ধ ‘মনুশাস্ত্রে নারী’ একটি সন্ধিৎসামূলক প্রবন্ধ। এ-প্রবন্ধে তাঁর অভিমত, মনুশাস্ত্রে কোথাও নারীকে শূদ্রের চেয়ে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়নি। শাস্ত্রীয় প্রবঞ্চনার মাধ্যমে খুব সচেতনভাবে নারীকে সমস্ত বৈদিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে পুরুষের অনুগামী অধীনস্থ হওয়াই নিয়তি-নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এ খÐের সব শেষ রচনা কুশল বরণ চক্রবর্ত্তীর। ‘সংক্ষেপে বেদবিদ্যার পরিচয়’ প্রবন্ধে তিনি বেদের রচনাকাল নিয়ে আলোচনা করেছেন।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র সপ্তম খÐটি দুটি পর্বে বিন্যস্ত। প্রথম পর্বে বৈষ্ণবধর্ম এবং দ্বিতীয় পর্বে আছে ব্রাহ্মধর্ম। বৈষ্ণব পর্বে পাঁচজন লেখকের ছয়টি প্রবন্ধ আর ব্রাহ্মধর্ম পর্বে আটজন লেখকের দশটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। বাঙালি-সমাজে উদার ও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির ভিত্তি রচনার পথিকৃৎ ও বাংলা সাহিত্যের প্রথম যথার্থ ইতিহাসগ্রন্থ প্রণেতা দীনেশচন্দ্র সেনের ‘চৈতন্যের তিরোধান ও বৈষ্ণব সমাজ’ এবং ‘হিন্দুসমাজ ও বৈষ্ণবধর্ম’ শীর্ষক দুটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রথম প্রবন্ধে তিনি চৈতন্যের তিরোধান সম্পর্কে জয়ানন্দ তাঁর চৈতন্যমঙ্গল-এ যে তথ্য দিয়েছেন তার পূর্বাপর ইতিহাস বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে এর সারসত্য উন্মোচন করেছেন। দ্বিতীয় প্রবন্ধে তিনি ভারতীয় ধর্মের উন্নতিসাধনে চৈতন্যদেবের অবিস্মরণীয় অবদান আলোচনা করেছেন। এ প্রবন্ধে তিনি দেখান যে, রথযাত্রার সময়ে কীর্তনানন্দে চৈতন্য হোঁচট খেয়ে পড়ে যান এবং তাতে পায়ে চোট লাগে। অনতিকাল-পরে গুÐিচা-গৃহে তাঁকে আনা হয়, এবং সেখানে তিনি প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হন। জয়ানন্দ বলেন, আষাঢ় মাসের রবিবার সপ্তমী তিথিতে ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে বেলা তিনটার সময়ে তিনি স্বর্গধামে গমন করেন, কিন্তু লোচনদাস বলেন রাত্রি আটটায় তাঁর বিয়োগ হয়। সেদিন অপরাপর দিনের মতো বেলা তিনটার পর গুÐিচা-বাটীর দরজা খুলে পান্ডারা বলেন\মহাপ্রভু স্বর্গে গমন করেছেন, তাঁর দেহের কোনও চিহ্ন নাই। এ প্রবন্ধে তিনি বলেন, বৌদ্ধধর্মের অবনতির সময় ভারতবর্ষ কতকগুলো বীভৎস তান্ত্রিক অনুষ্ঠানের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছিল। বৌদ্ধশাস্ত্রের সারকথা আত্মস্থ করে হিন্দুশাস্ত্র বৌদ্ধধর্মকে ভারতবর্ষ থেকে অপসারণ করেছিল।
বাংলা লোকসাহিত্য ও লোকধর্মের অন্যতম গবেষক সুধীর চক্রবর্তী ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম ও উপ-সম্প্রদায়’ প্রবন্ধে বৈষ্ণববাদ ও তার উপ-সম্প্রদায়ের অনুসন্ধানে দেখিয়েছেন, ষোড়শ শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই বৈষ্ণবধর্ম অবৈষ্ণব গুহ্য সাধকদের, অর্থাৎ যোগী-তান্ত্রিক-সুফিদের-আকর্ষণ করতে শুরু করেছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে এমন কোন কোন সাধন-সম্প্রদায় বাহ্যত বৈষ্ণব বৈরাগীর আচার ও আচরণ অবলম্বন করলেন। প্রধানত এঁদের মধ্য দিয়েই চৈতন্যের ক্রমবর্ধমান আচার-বিচার ও সেবাপূজা ইত্যাদি বিধিভুক্ত পদ্ধতির বহিরঙ্গতা এড়িয়ে দেশের অন্তভর্‚মিতে নেমে গিয়ে সর্বত্র প্লাবন ছড়িয়ে দিয়ে প্রচ্ছন্নভাবে বিস্তার লাভ করল। প্রধানত এই অনুরাগমার্গী সমাজবহিভর্‚ত সাধকদের মধ্যেই চৈতন্যের মনোধর্মের সজীব বীজটুকু প্রচ্ছন্নভাবে অন্তঃস্থিত ছিল।
বৈষ্ণবধর্মের অন্যতম বিশেষজ্ঞ গবেষক ইতিহাসবিদ রমাকান্ত চক্রবর্তী ‘পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায় বৈষ্ণব ধর্মের বিবরণ’ প্রবন্ধে পশ্চিমবঙ্গে বৈষ্ণবধর্মের প্রচারের ও প্রসারণের ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন। স্মৃতিকণা চক্রবর্তী ‘চৈতন্যধর্ম: মানবতাবাদের অন্য নাম’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, চৈতন্য ধনীদরিদ্র নির্বিশেষে সকলকে এক জাতপাতহীন সমাজবন্ধনীতে বাঁধতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশে প্রথম গণআন্দোলনের প্রবক্তা মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য। অন্যদিকে অধ্যাপক ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী ‘বেদে বৈষ্ণব বা ভাগবতীয় প্রভাব তত্ত¡’ প্রবন্ধে ঋগে¦দের ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ও শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার উদ্ধৃতি টেনে দেখিয়েছেন যে বিষ্ণুই সাক্ষাৎ যজ্ঞমূর্তি, যাজ্ঞিকেরাই বৈষ্ণব। বিশিষ্ট ধর্মবেত্তা, ধর্ম ও সমাজ-সংস্কারক দ্বারকানাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠপুত্র ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা, হিন্দুধর্মে পৌত্তলিকতাবিরোধী ধর্মমত ‘ব্রাহ্মধর্মের’ অগ্রণী উদ্যোক্তা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত আত্মজীবনীর অংশবিশেষ এ খÐে সংকলিত হয়েছে। সংকলিত রচনাংশ পাঠকের ব্রাহ্মধর্ম প্রতিষ্ঠার পটভ‚মি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য এক ঐতিহাসিক দলিল। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী বস্তুত তাঁর বিবর্তনশীল ধর্মবোধেরই বিবরণী। এর উপজীব্য ব্রহ্মবিষয়ক অন্বেষণ এবং ব্রহ্মলোক ভ্রমণ। ঘর আর বাহির, সংসার এবং ঈশ্বর, বিষয়কর্ম ও ব্রহ্মচিন্তা\এই দ্বৈত আকর্ষণে দেবেন্দ্রনাথ তাঁর মধ্যবয়স পর্যন্ত বিচিত্র দোলাচলে আন্দোলিত হয়েছেন। তবে তিনি লক্ষ করলেন যে, যখনই ঘরের আকর্ষণ থেকে অনেক দূরে প্রকৃতির গভীরে এসে স্তব্ধ, তখনই তিনি স্বস্থিত হয়েছেন ঈশ্বরের মুখোমুখি। তাঁর এই আত্মবিশ্লেষণের মধ্যেই অঙ্কুরিত হয়েছে ব্রাহ্মধর্মের বীজ।
ব্রাহ্মসমাজের শতবার্ষিক উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত বঙ্কবিহারী কর রচিত পূর্ব্ববাঙ্গালা ব্রাহ্মসমাজের ইতিবৃত্ত গ্রন্থের নির্বাচিত অংশের প্রবন্ধরূপ এখানে সন্নিবেশিত হয়েছে। রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজের পূর্ববাংলায় সম্প্রসারণের পূর্বাপর ইতিবৃত্ত উপস্থাপিত হয়েছে এ রচনায়। এতে ঢাকা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ এর পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি জনপদে এই সমাজের কার্যক্রমের প্রারম্ভকালের নানা চড়াই-উতরাইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সংশ্লিষ্টতা সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। এই বর্ণনায় উঠে এসেছে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জনপদে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্রাহ্মসমাজের অনুসারীদের সার্বিক সহযোগিতা, কীভাবে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই সমাজের ক্রমশ অনুরাগী হয়ে উঠলেন, কীভাবে এই একেশ্বরবাদী নতুন ধর্মান্দোলনে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়ে ব্রাহ্মসমাজের নানা কার্যক্রমে সংযুক্ত হন।
পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম নেতা শ্রীনাথ চন্দ-এর ‘ব্রাহ্মসমাজের চল্লিশ বছর’ একটি আত্মজৈবনিক রচনা। এ রচনায় উঠে এসেছে ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে লেখকের সংশ্লিষ্টতা ও নানা স্মৃতিচারণ। বিশেষত ময়মনসিংহ ব্রাহ্মসমাজের প্রাথমিক ইতিবৃত্ত এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য হলেও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পূর্বাঞ্চলে ব্রাহ্মসমাজের এক আনুপূর্বিক বিকাশধারা। ব্রাহ্মসমাজের নেতা কেশবচন্দ্র সেনের নির্দেশে লেখকের কর্মপরিধির আলোচনাও এই রচনার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। মনোরঞ্জিকা সভা, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মহাশয়ের প্রচার, সাধু অঘোরনাথের ময়মনসিংহে আগমন, ব্রাহ্মসমাজের অভ্যুত্থানে হিন্দুসমাজের আন্দোলন ও নিপীড়ন, ময়মনসিংহে ব্রাহ্মসমাজের শাখা স্থাপন এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নবদীক্ষিত ব্রাহ্মদের নিয়ে এই ধর্মের বিকাশের নানা উদ্যোগের কথা রয়েছে। ময়মনসিংহে ব্রাহ্ম মন্দির স্থাপন, নিয়মিত ব্রাহ্মসংগীতের আয়োজন, মাঘোৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন, সেইসঙ্গে শাখা সমাজের উৎসব ও দীক্ষাদানের নিয়মিত আনুষ্ঠানিক কর্মকাÐের উপাত্ত দিয়ে প্রণীত হয়েছে এই রচনার মূল বক্তব্য। বিশিষ্ট সমাজচিন্তক ও গবেষক নিখিলেশ গুহ ‘ব্রাহ্মসমাজ ও খ্রিস্টীয় একেশ্বরবাদ’ প্রবন্ধে খ্রিস্টধর্মের একেশ্বরবাদের সঙ্গে ব্রাহ্মমতের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাযুজ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেই সঙ্গে সংস্কারচিন্তক হিসেবে রামমোহনের ভ‚মিকাও এখানে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ ড. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ ‘রামমোহন রায় ও ব্রাহ্মসমাজ’ প্রবন্ধে বলেন, ধর্মচিন্তার ক্ষেত্রে হিন্দুধর্মকে বিশ্বধর্মে রূপান্তরিত করার উদ্দেশ্যে রামমোহন রায় ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন। যুক্তিহীন ভাবাবেগের প্রতি মানুষের দুর্বলতা যুক্তিভিত্তিক ব্রাহ্মধর্মের জনপ্রিয়তার প্রতিবন্ধক ছিল। জনপ্রিয় না-হলেও ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তন এ-কারণেই গুরুত্বপূর্ণ যে এর মধ্য দিয়ে রামমোহন রায় প্রাচ্যের ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের আধুনিক জ্ঞান ও মূল্যবোধের মিলন ঘটিয়েছিলেন। ইতিহাসসন্ধিৎসু ধর্মতত্তে¡র গবেষক অমিতাভ খাস্তগীর ‘বেদান্ত-ভাবনা: রামমোহন ও দেবেন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে বলেন, রামমোহনকে অদ্বৈতবাদী বলে, অন্ততপক্ষে বেদান্তবাদী বলে যারা স্বীকার করেন তারাও প্রায় সকলেই একমত যে রামমোহন শঙ্করের মায়াবাদ গ্রহণ করেননি। রবীন্দ্রনাথ রামমোহন-মহর্ষি উভয়েরই উত্তরাধিকারী ও উত্তরসূরি। অমিতাভ খাস্তগীর ‘ব্রাহ্মধর্মের দার্শনিক ভিত্তি’ প্রবন্ধ মন্তব্য করেন, ব্রাহ্মধর্মের তিন প্রধান\রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, কেশবচন্দ্র\একই পথের পথিক আদৌ নন। তাঁদের মধ্যে অবশ্যই মূলগত ঐক্য আছে, চিন্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাযুজ্যও আছে, তবু এঁরা সর্বাংশে এক নন। রামমোহনকে ধর্মপ্রবর্তক বলার চেয়ে ধর্মব্যাখ্যাতা ও ধর্মসংস্কারক বলা অধিকতর সংগত। রামমোহন কোনও অভিনব অশ্রæতপূর্ব সিদ্ধান্ত বা সাধনমার্গ প্রতিষ্ঠিত করেননি। সনাতন সিদ্ধান্ত ও সাধনমার্গকে আধুনিক দেশকালোপযোগীরূপে উপস্থাপিত করতে চেয়েছিলেন। এইজন্যেই রামমোহন ব্রাহ্মধর্মকে সনাতনধর্ম অর্থাৎ হিন্দুধর্মের প্রতিদ্ব›দ্বী নূতন ধর্মরূপে না-দেখে তার পরিপূরকরূপে দেখেছিলেন।
ধর্মদর্শন সম্পর্কিত লেখক ও গবেষক প্রসাদরঞ্জন রায় ‘রাজা রামমোহন রায়ের ধর্মমত’ প্রবন্ধে রামমোহনের জীবনের ইতিবৃত্ত ও তাঁর মানসগঠনে অপরাপর ধর্ম-দর্শনের প্রভাব সম্পর্কে দেখিয়েছেন, ছোটবেলায় রামমোহন গ্রামে টোল-চতুষ্পাঠী ও মক্তবে বাংলা-সংস্কৃত ও আরবি-ফারসি শেখার সুযোগ পান। প্রথাগতভাবে ইংরেজি তখন শেখেননি। দশ বছর বয়সে পিতার ইচ্ছায় তিনি পাটনা যান মৌলভিদের কাছে ভালো করে আরবি-ফারসি শিখতে\পাটনা তখন আরবি-ফারসি শিক্ষার এক বড় কেন্দ্র ছিল। এখানে ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি তিনি কোরআন পাঠ করেন এবং ইসলামধর্মের একেশ্বরবাদের ধারণা তাঁর মনে স্পষ্ট রেখাপাত করে। এক পর্যায়ে তিনি হিন্দুদের পৌত্তলিক ধর্মপ্রণালী নামে একটি পুস্তিকা রচনা করায় তা নিয়ে মনোমালিন্যের জেরে গৃহত্যাগ করেন। প্রায় চার বছর অজ্ঞাতবাসে ছিলেন রামমোহন। এই সময়ে তাঁর গতিবিধি সঠিক জানা যায় না, তবে সমগ্র উত্তর ভারতে তিনি পরিব্রাজকরূপে ভ্রমণ করেছেন ও তীর্থদর্শন করেছেন, এমনকি তিব্বত ভ্রমণ করেছেন। এই সময়ে শিখধর্ম, তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম এবং কবীর-দাদুর ‘সহজিয়া’ ভক্তিবাদ সম্পর্কে তিনি পরিচিত হন। তিনি ইসলামি যুক্তিবাদী মুতাজিলা সম্প্রদায়ের দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন।
বাঙালি খ্রিস্টানসমাজের বিশিষ্ট চিন্তক ও গবেষক রেভারেÐ প্রাণেশ সমাদ্দার ‘ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্মধর্ম: বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে ব্রাহ্মসমাজে প্রচলিত কিছু সামাজিক বিধিবিধানের সংস্কার প্রস্তাব করেছেন। তিনি মনে করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ব্রাহ্মরা দায়াধিকার সম্বন্ধে হিন্দু আইনের অন্তর্ভুক্ত। লেখক মনে করেন, এজন্য বিবাহের পর ব্রাহ্মের এমন উইল করা উচিত, যাতে স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর আইনসংগত অধিকার বর্তায়। উল্লেখ্য যে, এই রীতির অভাবে অনেক স্থলে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে অন্যদের গলগ্রহ হয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করতে হয়। লেখকের অভিমত, ব্রাহ্মদের বিবাহ ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের বিশেষ বিবাহ আইনে রেজিস্ট্রি হওয়া বিধেয়। বিবাহের সময় রেজিস্ট্রার ও সাক্ষীরা এমন স্থানে বসবেন যেখান থেকে বর ও কন্যার উচ্চারিত উদ্বাহ-প্রতিজ্ঞা শুনতে পান।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র অষ্টম খÐটি বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম সমন্বিত যুক্তখন্ড। বৌদ্ধধর্ম পর্বে নয়জন লেখকের চব্বিশটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। আর জৈনধর্ম পর্বে ছয়জন লেখকের ছয়টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর-এর নয়টি লেখা সন্নিবেশিত হয়েছে। এসব লেখা বাংলা অনূদিত রূপ। অতীশ দীপঙ্করের অধিকাংশ লেখাই সংস্কৃত ও তিব্বতি ভাষায়, যদিও অতীশ জন্মেছিলেন এই বাংলায় বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনীতে। বঙ্গদেশের রাজা প্রথম মহীপালের সমকালে আবিভর্‚ত এই ‘গুহ্যজ্ঞানবজ্র’ অভিধায় অভিষিক্ত পÐিত অতীশের ‘বোধি-পথ-প্রদীপ’ রচনার প্রধান লক্ষ্য ছিল বজ্রযানী ধারার সঙ্গে অন্যান্য প্রাচীন বিশ্বাসগুলোর বিরোধ ঘুচিয়ে এমন একটা পথরেখা তৈরি করা, যা মহাযানী ধারার সাধকের জন্য উপযুক্ত। তিনি হীনযান, মহাযান ও বজ্রযানের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে তেমন একটা ধারাই সৃষ্টি করেন, যা ব্যক্তির আত্মিক উন্নয়নের পথে আলোকবর্তিকারূপে কাজ করবে। তিনি ‘চর্যা-সংগ্রহ-প্রদীপ’ লিখেছিলেন নেপালের পল্পতে অবস্থানকালে। সেখানে হলকা নামক স্থানে একজন স্থবিরের সঙ্গে তিনি পারমিতা নিয়ে আলোচনা করেন। বোধিলাভের জন্য অপরিহার্য দুটো চর্যা হলো তন্ত্র ও পারমিতা। কিন্তু সেই স্থবিরের মন্ত্রে আস্থা ছিল না। সে কারণে অতীশ কেবল পারমিতা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। এতে তিনি মন্ত্র নিয়ে কোনও আলোচনা করেননি, বরং পারমিতা মার্গ অনুসরণকারীদের আচরণীয় কী হবে, তা সংক্ষেপে বর্ণনা করেন।
শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর তাঁর ‘সত্যদ্বয়-অবতার’ লেখাটিতে দুই প্রকার সত্যের প্রকৃতি সম্পর্কে বলেছেন এবং কীভাবে এই সত্যদ্বয়কে জানা যাবে সেই যুক্তিপ্রক্রিয়াও তাঁর এই লেখার বিষয়। আমরা আকাশে চাঁদ দেখি, এটা একটা সংবৃতি সত্য আর জলে বিম্বিত চাঁদও সত্য, তবে তা ভ্রান্ত ব্যবহারিক সত্য। অতীশ তাঁর রচনায় বলছেন, সংবৃতি সত্যকে জানা যায় ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণ ও অনুমান দিয়ে। তবে অভ্রান্ত সত্য হচ্ছে তা-ই যার উদ্ভব ও বিলয় আছে, যেমন আমাদের চারপাশের বদলে যেতে থাকা বাস্তবতা। ‘গর্ভ-সংগ্রহ’-এ শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর মাধ্যমিকবাদের সারকথাগুলোকে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। এতে বাস্তবতার জ্ঞান এবং তার সঙ্গে যুক্ত নৈতিক অবস্থানকে বুদ্ধের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। মাধ্যমিকবাদের জ্ঞানতাত্তি¡ক অবস্থান হলো\বৈকল্পিক চিন্তার ভেতর দিয়ে দৃশ্যমান বাস্তবতার উদ্ভব ঘটে। বৈকল্পিক চিন্তা মানে ভেদজ্ঞান, যা বৌদ্ধিক প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান বাস্তবতার জন্ম দেয়। এই দ্বৈততাকে আঁকড়ে থাকার কারণেই জন্ম হয় ক্লেশের। আর ক্লেশের ফলে কর্মফলজনিত বাধ্যবাধকতা জীবকে সংসারের চক্রে আটকে রাখে। এই প্রক্রিয়া মানুষকে ভববন্ধনে জড়িয়ে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দেয়। এ থেকে মুক্তির উপায় হলো দৃশ্যমান বাস্তবতার জন্মকে রুদ্ধ করা। ‘হৃদয়-নিক্ষেপ’-এ অতীশ দীপঙ্কর তাঁর জ্ঞানতাত্তি¡ক ভাববাদী অবস্থানকে স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, জাগতিক সত্তারূপে যা-কিছুরই দৃশ্যমান আবির্ভাব ঘটুক, তার কারণ ‘আমি’ বা ‘আমিত্ব’। তবে তিনি যোগাচারীদের মতো চেতনার সহজাত অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। কেননা এই ‘আমি’ বা আমিত্ব’-এর উদ্ভবও ঘটে শর্তাধীন হয়ে। এই আমিত্বের বোধই বাস্তবতার জন্ম দেয় এবং এই ‘আমি’ই স্থায়িত্ব, অভিন্নতা ইত্যাদি প্রপঞ্চকে উপলব্ধি করে। একজন অগ্রসর ব্যক্তি এই আমির ধারণাকে প্রতিরোধ করার মাধ্যমে বাস্তবতার উপলব্ধিকে রোধ করেন। এ ক্ষেত্রে, ‘আমি’ ও ‘বাস্তবতা’ উভয় থেকে মুক্ত হতে যে করণ-কৌশলের প্রয়োজন, তা হলো প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত¡। অতীশ দীপঙ্করের ‘চর্যা-গীতি’ বৌদ্ধ মহাযান ধারার মাধ্যমিকবাদী দর্শন ও আচরণীয় বিষয়বস্তুর ভাষ্য। চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়-এর রচনাকালের যে ব্যাপ্তি তার মাঝামাঝি কোনও এক সময়ে অতীশ এটি রচনা করেন। বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মসাধনার অন্যতম জীবনদর্শন চর্যাগীতি। শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর তাঁর রচিত ‘চর্যা-গীতি’র একটা ব্যাখ্যা বা ভাষ্য রচনা করেন ‘চর্যা-গীতি-বৃত্তি’ নামে। এতে মূল রচনাটিকে তিনি বজ্রগীতি বলে উল্লেখ করেন, যার বিষয় নিরোধ সত্য। বুদ্ধের নীতিদর্শনের মূল বিষয় হলো দুঃখের নিরোধ। চার আর্য-সত্যের একটা হলো এই নিরোধ সত্য। এ বৌদ্ধ সাধন প্রণালির অন্যতম প্রধান অনুসৃত পথ হলো ‘মহাযান পথ’। শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর ‘মহাযান-পথ-সাধন-সংগ্রহ’-এ বলেন, বোধিলাভের সাধনাকে হতে হবে ভক্তিপূর্ণ ও সহৃদয়। এই লক্ষ্যে সাধককে ত্রিশরণ গ্রহণ, অকুশলকর্ম পরিহার, বোধিচিত্ত অর্জন ইত্যাদি কাজ ভক্তিপূর্ণ ঐকান্তিকতাসহ করে যেতে হবে। তাঁকে বোধিসত্তে¡র ব্রত পালন করতে হবে, যার শুরু ষড়-পারমিতা দিয়ে। অতীশ দীপঙ্করের ‘মহাযান-পথ-সাধন-বর্ণ-সংগ্রহ’-এর মূল ভাষ্য হলো বাসনা ও আসক্তি, সদ্গুণ অর্জনের জন্য করণীয়, বোধিচিত্ত অর্জন, গ্রন্থপাঠ ও সূত্র অধ্যয়ন, কল্যাণ মিত্র গ্রহণ, সম্পদ ও সদ্গুণের মোহ, জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, প্রজ্ঞা ও উপায়, যোগ ও নির্বিকল্প সমাধি ইত্যাদি। অতীশ দীপঙ্কর বলেন, পূর্ণ বোধিলাভ করতে হলে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে অন্তঃকরণ থেকে। এজন্য দরকার অষ্টাবক্ষণ বা অনুক‚ল পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া, কেননা পরবর্তীকালে পরিস্থিতি কঠিনতর হতে পারে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলনের প্রয়োজন যা মহাযান পথের দিকনির্দেশনায় প্রতিফলিত হয়েছে। বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবির সত্য-দর্শন বইয়ের প্রবন্ধগুলোতে বৌদ্ধধর্মের মৌলিক নীতিমালার একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন। বিশেষত বৌদ্ধ-দর্শনের অষ্টাঙ্গিক মার্গের অন্যতম তন্হা বা তৃষ্ণা নিবারণের বৌদ্ধিক পথনির্দেশনাই তাঁর ছয়টি প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
এ খন্ডে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় বা চর্যাপদ আবিষ্কারখ্যাত গবেষক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর একটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। ‘মহাযানের আগমন’ প্রবন্ধে বুদ্ধের মৃত্যুপরবর্তী তাঁর ধর্ম-দর্শন বিতর্কের নানা প্রসঙ্গ উত্থাপনপূর্বক এর সত্যাসত্য নির্ণয়ে যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত মীমাংসায় পৌঁছানোর প্রয়াস আছে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের একশো বছর পরে বুদ্ধের মতবাদ নিয়ে যে গোলযোগ দেখা দেয় তা বৈশালিতে এক মহাসভার মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা হলেও পরিণতিতে তা দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায়। এর একদল স্থবিরবাদ বা থেরবাদ ও মহাসাঙ্গিক নামে পরিচিতি পায়।
প্রাচীন বঙ্গ ও বাংলা ভাষা-সাহিত্যের অবিস্মরণীয় গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সেন ‘বৌদ্ধ ধর্ম্মের অবশেষ’ প্রবন্ধে দেখান, খ্রিস্টজন্মের তিনশো বছর পূর্ব থেকে বৌদ্ধধর্মে বিভাজন ও বিকৃতি ঘটতে শুরু করে। সঙ্গে নারীর অনুপ্রবেশ, একাভিপ্পায়ীর উদ্ভব, তান্ত্রিক ভৈরবীচক্র, বোধিধর্ম, নেড়ানেড়ি ইত্যাদির আবির্ভাব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই প্রভাব এতদূর বিস্তৃত হয় যে, বাংলায় বৌদ্ধধর্মের অনুসারীদের মধ্য থেকেই বিভিন্ন মতাবলম্বীর আবির্ভাব ঘটে। ‘বাঙ্গলার তন্ত্রশাস্ত্র’ প্রবন্ধে দীনেশচন্দ্র সেন বলেন, হিন্দুতন্ত্র আগে, না বৌদ্ধতন্ত্র আগে, এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ‘বস্তুত তন্ত্র হিন্দুর প্রাত্যহিক জীবনে ধর্মকার্যে এত নিগূঢ়ভাবে প্রবেশ করিয়াছে যে, তার আদি খুঁজিতে বৌদ্ধধর্ম সন্ধান করা যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হয় না।’ বাংলার শাক্ত ও বৈষ্ণবতন্ত্র একসময় প্রবল ছিল, ‘তন্মধ্যে বৈষ্ণবতন্ত্রে অনেক বৌদ্ধভাব ঢুকিয়াছে’ যা সহজিয়াদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু শৈব ও শাক্ততন্ত্রের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। উভয়েই পরমাত্মা ও জীবাত্মার একত্ব স্বীকার করে। কিন্তু পাশ্চাত্য পÐিতদের মতে, তন্ত্র বিদেশি জিনিস, হিন্দুরা তা গ্রহণ করে একে দেবসম্ভূত বলে প্রচার করে এসেছে। বৌদ্ধধর্মের গবেষক মহেশচন্দ্র ঘোষের ‘নির্বাণতত্ত¡’ বৌদ্ধ-দর্শনের একটি মৌলিক চিন্তাশীল প্রবন্ধ। বৌদ্ধধর্মের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সোপান এই নির্বাণতত্ত¡। নির্বাণই বৌদ্ধ-জীবনদর্শনের মূল লক্ষ্য। মহেশচন্দ্র ঘোষ তাঁর প্রবন্ধে বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যেই বৌদ্ধিক জীবনের পারত্রিক সকল কর্মকাÐ পরিচালিত হয়, যা বুদ্ধের আত্মতত্ত¡ উপলব্ধির মধ্য দিয়েই অর্জন করতে হয়।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. নীরুকুমার চাকমা ‘বৌদ্ধধর্ম’ প্রবন্ধে বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের বিকাশ ও বিস্তার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সিদ্ধার্থ গৌতমের শিক্ষা ও উপদেশকে কেন্দ্র করে এই ধর্মের উদ্ভব। মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সে সিদ্ধার্থ জীবনে দুঃখের কারণ এবং তা থেকে মুক্তির উপায় অনুসন্ধানের জন্য যে জীবনবোধ প্রাপ্ত হয়েছেন তার অনুশীলন ও প্রায়োগিক পন্থাই বৌদ্ধধর্মের মূল ভিত্তি। বুদ্ধের এই জীবনবোধকে বলা হয় প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে বুদ্ধের মতবাদ ত্রিপিটক নামক পালি ভাষায় রচিত একটি সংকলনে গ্রন্থিত। তবে বুদ্ধের পরিনির্বাণ লাভের পর তাঁর উপদেশসমূহের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে যেসব বিতর্কের সৃষ্টি হয় তা এই ধর্মের অবক্ষয়ের পথকেও ক্রমশ প্রসারিত করে, যার প্রভাব থেকে বাংলাদেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও মুক্ত হতে পারেনি। শিক্ষাবিদ ও গবেষক জিতেন্দ্রলাল বড়ুয়া ‘ঈশ্বর ও বিশ্বতত্ত¡’ প্রবন্ধে দেখান, বৌদ্ধধর্মে ঈশ্বরের স্থান নেই। বৌদ্ধধর্মের মতে, প্রত্যেক কার্যেরই কারণ আছে, কিন্তু চূড়ান্ত কারণ বলে কিছু নেই; সুতরাং চূড়ান্ত কারণ রূপে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করবার কোনও প্রয়োজন হয় না। বৌদ্ধধর্মে কোনও অদৃশ্য অলৌকিক বা বাহ্য শক্তির ভূমিকা নেই। এ খÐে অন্তর্ভুক্ত জিতেন্দ্রলাল বড়ুয়ার দ্বিতীয় প্রবন্ধের নাম ‘নির্বাণ মতবাদ’। ‘নির্বাণ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘নিবে যাওয়া’, ‘প্রবাহের নিবৃত্তি ঘটা’ বা ‘তৃষ্ণার নিবৃত্তি’। কিন্তু কেবলমাত্র অর্থ বোধগম্য হলেই নির্বাণ বোধগম্য হয় না। নির্বাণ অবর্ণনীয় ও অতুলনীয়। এটা স্থান ও কালের দ্বারা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনও স্থূল বস্তু নয়। এই পরমতত্ত¡ অনুভূতিলব্ধ। নির্বাণগামী ব্যতীত নির্বাণের স্বরূপ কেউ উপলব্ধি করতে পারে না। কেউ কেউ নির্বাণ বলতে জীবনের নিঃশেষ বুঝে থাকেন। বাসনা বা তৃষ্ণার জন্যই মানুষ সংসারে আসা-যাওয়া করে। নির্বাণলাভে বাসনার বিলুপ্তি হয়; সুতরাং জীবনেরও অবসান ঘটে। তাঁরা প্রদীপ নিভে যাওয়ার সঙ্গে নির্বাণের তুলনা করে বলেন, তেলকে আশ্রয় করে প্রদীপ জ্বলতে থাকে এবং তেলহীন হলে প্রদীপ যেমন নিভে যায়\সেরূপ বাসনারূপ আশ্রয়ের অভাবে জীবনের বিলুপ্তি ঘটে। কিন্তু তা সত্য নয়; কারণ বুদ্ধ জীবিতাবস্থায় নির্বাণলাভ করেছিলেন; সুতরাং নির্বাণ জীবনের নিঃশেষে বিনাশ নয়\এটা তা থেকে অধিক অন্য কিছু। শিক্ষাবিদ ও গবেষক সুমিত বড়ুয়া ‘মানবসমাজে বৌদ্ধভাবনার প্রাসঙ্গিকতা’ প্রবন্ধে বলেন, বৌদ্ধভাবনায় জীবন ‘দুঃখ’ময় সত্য। জাগতিক সুখ-দুঃখ সবই ক্ষণস্থায়ী; সুতরাং ক্লেশদায়ক। জগতের সকলপ্রকার দুঃখকে বুদ্ধদেব আট শ্রেণিতে ভাগ করেছেন\জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, অপ্রিয়সংযোগ, প্রিয়বিচ্ছেদ, ঈঞ্ঝিতের অপ্রাপ্তি এবং পঞ্চোপাদান স্কন্ধময় এই দেহ ও মন দুঃখময়। এই আট প্রকার দুঃখ দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: (১) শারীরিক\জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু; (২) মানসিক\প্রিয়বিচ্ছেদ, অপ্রিয়সংযোগ, ঈঞ্ঝিতের অপ্রাপ্তি এবং পঞ্চ উপাদান স্কন্ধের বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান।
বাংলা ছন্দের শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার, শিক্ষাবিদ প্রবোধচন্দ্র সেন ‘বাঙ্লার আদি ধর্ম্ম’ প্রবন্ধে জৈনধর্মকে বাংলার আদিধর্ম বলার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে বলেছেন, জৈনধর্ম যে বহু প্রাচীন তার প্রামাণিক অনেক গ্রন্থ আছে। জৈনরা জৈনধর্মকে অনাদি বলে থাকেন। এর সমর্থনে তাঁরা বলেন, আর্যদের বেদের যে ছত্রিশ উপনিষদ তা জৈন গ্রন্থমধ্যেই আছে।
ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন ‘জৈন ধর্ম্ম’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, বুদ্ধের আগেই জৈনধর্মের প্রসার ঘটেছিল। জৈনধর্ম জীবহত্যা ও যজ্ঞানুষ্ঠানের বিরোধী ছিল। জৈনদের বিশ্বাস, প্রতিটি তরুলতারও আত্মা আছে। জীবের দুঃখকষ্টের প্রতি তারা এতই সদয় যে, গাছের পাতা ছিঁড়তেও তাদের কষ্ট হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, জৈনধর্ম হিন্দুধর্মের দেব-দেবতার ওপর বেশি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ভারতের সঙ্গে অধিকতর অন্তরঙ্গসূত্রে আবদ্ধ হয়ে আছে।
জৈনধর্মের গবেষক গোপালকৃষ্ণ দাস ‘জৈনধর্ম’ প্রবন্ধে বলেন, পার্শ্বনাথ ও মহাবীরের শিক্ষা ও জীবনদর্শনের মধ্য দিয়েই জৈনধর্মের উদ্ভব ঘটে। মহাবীরের জীবনকালেই বাংলায় জৈনধর্মের আবির্ভাব ঘটে। গোড়ার দিকে জৈনধর্ম বাংলায় প্রচলিত থাকলেও এটি কখনই এদেশে ততটা বিস্তারলাভ করেনি। মহাবীর আর বুদ্ধ ছিলেন প্রায় একই সময়ের। তাঁদের শিক্ষার মধ্যেও খানিকটা সাদৃশ্য রয়েছে। দুজনেই ছিলেন বেদবিরোধী। দুজনেই জাতিভেদ প্রথাকে স্বীকার করেননি। বৌদ্ধধর্মের মতো জৈনধর্মেরও উদ্দেশ্য জন্মচক্র থেকে অব্যাহতি। এই মোক্ষলাভের তিনটি পথ বা তিনটি প্রয়োজনীয় ‘রতœ’ আছে\শুদ্ধ বিশ্বাস, শুদ্ধ জ্ঞান এবং শুদ্ধ আচরণ। জৈন-আচরণবিধির মধ্যে পাঁচটি প্রতিজ্ঞা আছে\অহিংসা, সত্যনিষ্ঠা, অচৌর্য, ইন্দ্রিয়সংযম এবং বৈরাগ্যসাধন। এই ধর্ম হিন্দুচিন্তা ও আচরণে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। জৈন তাপসদের সর্বজনপরিচিত কঠোর সংযমে হিন্দু-ঐতিহ্য প্রভাবিত হয়েছিল। হিন্দুদের কোনও কোনও সম্প্রদায়ের নিরামিষ ভোজনের রীতি মনে হয় জৈনপ্রভাবের ফল। হিন্দুধর্মীয় চিন্তায় বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ছাড়াও বৌদ্ধধর্ম থেকে আর-একটি জিনিস হিন্দুরা পেয়েছে। সে হলো ধর্মশিক্ষায় বা ধর্ম-উপদেশে নীতিকথামূলক কাহিনি বা রূপকের ব্যবহার।
জৈনধর্মের আরেক গবেষক জগৎরাম ভট্টাচার্য ‘জৈনধর্ম-মানবধর্ম’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, জৈনধর্মে মানুষের মধ্যে জাতিভেদ প্রথা নেই। জৈন মান্যতায় তীর্থঙ্কর শব্দটি বিশিষ্ট অর্থের দ্যোতনা বহন করে। যিনি চারটি তীর্থের স্থাপনা করেন, তিনি তীর্থঙ্কর। এখানে চারটি তীর্থ হলো শ্রমণ, শ্রমণী, শ্রাবক ও শ্রাবিকা। এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই জৈন সম্প্রদায়ে পুরুষ ও স্ত্রীকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অমূল্যচরণ বিদ্যাভ‚ষণ ‘জৈনধর্ম’ প্রবন্ধে বলেন, প্রাচীন জৈন ধর্মপুস্তকসমূহের মধ্যে অধিকাংশ প্রাকৃত ভাষায় লিখিত, আধুনিক জৈনশাস্ত্রের অনেকগুলো সংস্কৃত ভাষায় রচিত। সাধারণের বোধের নিমিত্ত প্রসিদ্ধ জৈনগ্রন্থনিচয় প্রাকৃত ভাষায় রচিত হয়েছিল এবং পÐিতদের বোধের নিমিত্ত কতিপয় গ্রন্থের টীকাও সংস্কৃত ভাষায় দেওয়া হয়েছে। সুপ্রসিদ্ধ জৈন কোষকার হেমচন্দ্র প্রাকৃত ভাষায় গ্রন্থ রচনা করে সংস্কৃত ভাষায় যে টীকা সংযুক্ত করেছেন, তাতে শ্বেতাম্বর জৈনরা প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ-মত স্বীকার করেন; আর দিগম্বর জৈনরা আধুনিক জৈনগ্রন্থবিশেষ গ্রাহ্য করেন। পূরণচাঁদ সামসুখা ‘জৈন শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর সম্প্রদায়ের উৎপত্তি’ প্রবন্ধে দেখান, জৈনদের মধ্যে প্রধান বিভাগ দুটি\শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর। অন্যান্য যে সমস্ত বিভাগ আছে তা এই প্রধান বিভাগ দুটির যে-কোনওটির শাখা বিভাগ বলা যায়। এই উভয় সম্প্রদায়ই নিজেদেরকে সনাতন জৈনদের\যাঁরা প্রাচীন জৈন ও বৌদ্ধ গ্রন্থে ‘নির্গ্রন্থ’ নামে অভিহিত হয়েছেন\বংশধর বলে দাবি করেন ও অন্যদের অর্বাচনী বলেন।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র দশম খন্ডে দশজন লেখকের বারোটি রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ খন্ডের প্রথম রচনা স্বামী বিবেকানন্দের ‘ঈশদূত যীশুখ্রীস্ট’। লেখাটি ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলস্-এ প্রদত্ত একটি বক্তৃতা। এ বক্তৃতায় বিবেকানন্দ যিশুর আত্মত্যাগ ও মানবীয় গুণাবলি থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার আদর্শে মানুষকে উজ্জীবিত হওয়ার আহŸান জানান। পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘যিশুখ্রিস্ট’ প্রবন্ধে যিশুর জীবনদর্শন উপস্থাপনের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মের আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে। সেইসঙ্গে লেখক ‘কুমরানী পুঁথি এবং যিশু’ সম্পর্কিত যিশুর জীবনঘেরা পুঁথিরহস্য উন্মোচনের প্রয়াস পেয়েছেন। যিশুর জীবনদর্শনই খ্রিস্টধর্মের আদর্শ। প্রতিহিংসামুক্ত ক্ষমাপরায়ণ ও সহিষ্ণু জীবনই যিশুর জীবন। এই জীবনদর্শন মানব-ইতিহাসে বিরল।
খ্রিস্টধর্মের গবেষক তৃপ্তি চৌধুরী ‘খ্রিস্টান মিশনারি’ প্রবন্ধে বলেন, বাংলায় খ্রিস্টধর্ম প্রচারকেরা ইংল্যান্ডের গোড়ার দিকের প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের মানবতাবাদী ধ্যানধারণা অনুসরণ করেছিলেন এবং ধর্মপ্রচার কার্যক্রমে ‘সামাজিক দিকসমূহের’ প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। স্কটিশ ধর্মপ্রচারকেরা ও আইরিশদের গির্জার যাজকীয় শাসনতন্ত্রের সমর্থকবৃন্দও এ কার্যক্রম অনুসরণ করেছিলেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ঊনবিংশ শতাব্দীকে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের বিশিষ্টতম শতাব্দীতে রূপান্তরিত করে। ‘খ্রিষ্টধর্ম’ প্রবন্ধে তিনি বাংলায় খ্রিস্টধর্ম প্রচারে পর্তুগিজ মিশনারিদের ভ‚মিকা তুলে ধরেন। প্রবন্ধকার দেখান, বাংলায় খ্রিস্টধর্ম প্রথম প্রচারিত হয় ষোড়শ শতকে পর্তুগিজদের মাধ্যমে। বাংলায় খ্রিস্টধর্মীয় কর্মকাÐে প্রধান ভূমিকা পালন করে অগাস্টিয়ানরা। তারা ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে হুগলিতে একটি গির্জা স্থাপন করে, সেখান থেকে ঢাকাসহ বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করা হয়। আইনজ্ঞ ও লেখক কাজী এবাদুল হক ‘খ্রিষ্টান আইন’ রচনায় স্বল্প পরিসরে খ্রিস্টান সমাজের বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
ধর্মবিষয়ক গবেষক ড. মো. শাজাহান কবির ‘খ্রিস্টধর্ম’ প্রবন্ধে খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদিধর্মের শাস্ত্রীয় সম্পর্কসূত্র তুলে ধরে বলেন, খ্রিস্টধর্মের প্রথমদিকে খ্রিস্টানরা ছিল ইহুদি। তারা ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তোরাহ্ পাঠ ও অনুসরণ করত। অচিরেই খ্রিস্টধর্ম অ-ইহুদিদের মধ্যে একটি ধর্ম আন্দোলনের রূপ নিলেও খ্রিস্টানরা ইহুদি ধর্মগ্রন্থ অনুসরণ করতে থাকে তাদের ধর্মশিক্ষা ও ধর্মালোচনাকে যৌক্তিক ভিত্তি দেওয়ার লক্ষ্যে। এভাবেই ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তোরাহ্র নাম হয় ওল্ড টেস্টামেন্ট বা ‘ওল্ড কভন্যান্ট’, যাকে বাংলায় বলা হয় ‘প্রাক্তন সন্ধি’ বা ‘পুরাতন নিয়ম’। এই অংশে খ্রিস্ট-পূর্ববর্তী সময়কালে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যকার সংলাপই স্থান পেয়েছে। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সুরঞ্জন মিদ্দে ‘বঙ্গদেশে খ্রিস্টবাণী প্রচার’ প্রবন্ধে মিশনারি পাদ্রিদের সাংগঠনিক সক্রিয়তা ও বাইবেল বঙ্গানুবাদে তাঁদের সৃজনশীল ভ‚মিকার নানা তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন। ধর্মতত্তে¡র গবেষক ড. ডেনিস দিলীপ দত্ত ‘পাখির চোখে বাংলাদেশের চার্চ’ প্রবন্ধে বাংলায় খ্রিস্টধর্ম প্রচার এবং এদেশের বিভিন্ন জনপদে চার্চ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খ্রিস্টান মিশনারিদের সেবাদানের ইতিবৃত্ত উপস্থাপন করেছেন। তিনি বাংলায় মিশনারিদের আগমনের কালানুক্রমিক ইতিবৃত্ত উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এই জনপদে খ্রিস্টীয় চার্চ প্রতিষ্ঠার পটভ‚মি ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘খৃষ্ট’ রচনায় তিনি রবীন্দ্ররচনার আলোকে রবীন্দ্রচেতনায় খ্রিস্টমানস সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। ধর্মতত্তে¡র গবেষক সুবোধ চন্দ্র দাস (সুবোধ আচার্য) ‘খ্রিষ্টধর্মে একেশ্বরবাদ ও খ্রিষ্টীয় আইনের উৎস’ প্রবন্ধে খ্রিস্টধর্মে প্রচলিত ত্রিত্ববাদ নামে প্রচলিত ভ্রান্ত ব্যাখ্যা খÐনে বাইবেলের প্রামাণ্য তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন। লোকধর্মের গবেষক আলী আহাম্মদ খান আইয়োব ‘গারো সম্প্রদায়ের ধর্মে খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব’ প্রবন্ধে দেখান, গারো সম্প্রদায়ের প্রাচীন সংসারেক ধর্ম তার পাশের প্রভাবশালী ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। কিন্তু কোনও প্রভাবই তাদের মাঝে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল হাইয়ের ‘খ্রিস্টধর্ম, বাইবেল ও বাংলাসাহিত্য’ প্রবন্ধে বাংলাভাষায় বাইবেল অনুবাদ-পরবর্তী বাঙালি জনমানসে খ্রিস্টবাণীর মর্মার্থ অনুধাবনের ইতিবৃত্ত বিশ্লেষিত হয়েছে।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র দশম খন্ডে দশজন লেখকের রচনা সংকলিত হয়েছে। বাঙালির তথা বাংলাভাষায় তুলনামূলক ধর্মচিন্তার স্বরূপ ও বিকাশধারার সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপনের লক্ষ্যে প্রবন্ধগুলো নির্বাচিত হয়েছে। বাংলাভাষায় এ-বিষয়ে পথিকৃৎ গবেষক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রণীত প্রবন্ধটির নাম ‘হিন্দু বৌদ্ধে তফাৎ’। এই প্রবন্ধে তিনি বলেন, হিন্দু ও বৌদ্ধে নানা তফাত রয়েছে। বিশ্বাস, আচরণ, নিয়মনীতি, সম্পদ বণ্টন, আহার এমনকি শয্যাগ্রহণের ক্ষেত্রেও এই তফাত বিস্তৃত। তবে সবচেয়ে মৌলিক পার্থক্য হলো, হিন্দুরা দেবতার উপাসক, বৌদ্ধেরা গুরুর। গুরুকে বৌদ্ধরা দেবতার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। তারা সম্পূর্ণ গুরুর মতো হতে চায়। ‘গুরুই শূন্য, গুরুই পরমার্থ। শূন্য যেমন শূন্যে মিশাইয়া যায়, গুরুও তেমনি শূন্যে মিশাইয়া গিয়াছেন।’ হিন্দু ও বৌদ্ধে অনেক পার্থক্য থাকলেও কালক্রমে হিন্দুরাও এই শূন্যে মিশে যাওয়ার মতকে গ্রহণ করেছে। বৌদ্ধধর্মের অনেক কিছুই এরকম হিন্দুদের মধ্যে সংমিশ্রিত।
স্বামী বিবেকানন্দ ‘বৌদ্ধধর্মের সহিত হিন্দুধর্মের সম্বন্ধ’ প্রবন্ধে দেখান, বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে হিন্দুধর্মের সম্পর্ক এরকম\‘বৌদ্ধধর্ম ছাড়া হিন্দুধর্ম বাঁচিতে পারে না, হিন্দুধর্ম ছাড়া বৌদ্ধধর্ম বাঁচিতে পারে না।’ ব্রাহ্মণের ধীশক্তি ও দর্শনশাস্ত্রের সাহায্য ছাড়া বৌদ্ধরা দাঁড়াতে পারে না। অন্যদিকে বৌদ্ধের হৃদয় ছাড়া ব্রাহ্মণরাও দাঁড়াতে পারে না। ভারতবাসীর দাসত্বের জন্য বিবেকানন্দ বৌদ্ধ ও হিন্দুর পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতাকে দায়ী করেছেন।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতীয় জনপদে উদ্ভূত ধর্মসমূহের বিশিষ্ট গবেষক ক্ষিতিমোহন সেন (১৮৮০-১৯৬০)। এ খÐে তাঁর হিন্দুধর্ম বই থেকে ‘জৈনধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম’সহ বেশকিছু প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হয়েছে। তিনি ‘বৌদ্ধধর্ম এবং অন্যান্য’ প্রবন্ধে অবৈদিক সংস্কৃতধারায় বিকশিত জৈনধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের মৌলিক ধর্মদর্শন বিশ্লেষণপূর্বক এ-দুটি ধর্মের ঐহিক ও পারত্রিক চিন্তার সাযুজ্য ও বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। এই ব্যাখ্যায় বৈদিকধারা ও অবৈদিকধারার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বৈদিক ভারতের রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, ষড়দর্শন প্রভৃতির সাথে জৈনধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। সেইসাথে বহির্ভারতে হিন্দুধর্মের বিস্তার ও বিকাশ নিয়েও আলোচনা করেছেন। এই আলোচনায় আরো যুক্ত হয়েছে ভক্তি আন্দোলন, উত্তর ভারতের মধ্যযুগীয় মরমিয়া সাধনায় বাউল মতবাদ ও বাঙালির ধর্মচিন্তায় আধুনিক ধারার উন্মেষে পূর্বাপর সম্পর্কসূত্র।
এ খন্ডে বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের বরণীয় গবেষক ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন-এর দুটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। ‘নব ব্রাহ্মণ্য, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম্ম’ প্রবন্ধে তিনি দেখান, মহাভারতের যুগে ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন হওয়ার পর থেকে যে-কোনও জাতির লোক যে ব্রাহ্মণ হয়েছে, তার প্রমাণ অজস্র। ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব প্রায় দু’হাজার বছর ভারতের জনসাধারণের মধ্যে ব্রাহ্মণভক্তির আতিশয্য সৃষ্টি করেছিল। যে-যজ্ঞ ব্রাহ্মণদের জন্য অবশ্যকরণীয় ছিল, বৌদ্ধধর্ম তার বিরুদ্ধে নতুন দীক্ষা নিয়ে এসেছিল। তারও দু’হাজার বছর পর চৈতন্য সাম্যের বাণী নিয়ে আবিভর্‚ত হন। বাঙালি জাতি কোনওকালেই নতুনকে, স্বাধীনতার আহŸানকে অগ্রাহ্য করেনি। ধর্মের বাড়াবাড়ি, কোনও ধর্মমতের অস্বাভাবিক অনুজ্ঞা বাঙালি বেশি দিন সহ্য করেনি।
দীনেশচন্দ্র সেন ‘বৌদ্ধ ও শৈব ভাবের বিভিন্নতা’ প্রবন্ধে বলেন, বৌদ্ধরা জীবজগতের প্রতি অশেষ করুণাবশত পশু ও মানুষের মধ্যে পীড়িতদের জন্য অনেক চিকিৎসালয় খুলেছিল। ত্যাগের উচ্চ-আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। শৈবধর্ম এসে মানুষের হৃদয়ের কোমলতায় গুরুত্ব দিয়েছে। রামায়ণ গার্হস্থ্য ধর্মের বীজ বপন করেছিল, শৈবধর্ম সেই বীজ অঙ্কুরিত ও অধ্যাত্মমÐিত করল। বৌদ্ধধর্ম সংসারকে অগ্রাহ্য করেছিল, শৈবধর্ম মানুষকে সংসারমুখী করে তুলল। বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে তুলনামূলক ধর্মচর্চার অগ্রণী ব্যক্তিত্ব মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ‘খ্রীষ্টান ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থসমূহের সহিত তুলনা’ প্রবন্ধে বলেন, ইসলামধর্মের গবেষণায় প্রাথমিক পর্যায়ে যে-সকল গবেষক অগ্রণী ভ‚মিকা রেখেছেন তাঁদের অধিকাংশই প্রাচ্যবিদ। ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়েও এঁদের গবেষণা অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। এতদ্সত্তে¡ও এঁরা যে সকলেই সততার সঙ্গে তাঁদের গবেষণা উপস্থাপন করেছেন সে দৃষ্টান্ত খুবই নগণ্য। ফলত দেখা যায়, ইসলামিক গবেষণায় উন্মোচিত হয় এক নতুন তত্ত¡, যা সাধারণত ‘প্রাচ্যতত্ত¡’ নামে পরিচিতি পায়। এই গবেষকদের অধিকাংশই ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। এঁদের মধ্যে যাঁরা ইসলামধর্মের কোরআন ও হাদিসের প্রামাণ্যতার সমালোচনা করেছেন তাঁদের সন্ধিৎসার ত্রæটি এবং সদিচ্ছার দুর্বলতার বিভিন্ন দিক নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে তাঁর প্রবন্ধে। সেইসঙ্গে অপরাপর ধর্মগ্রন্থের পূর্বাপর সম্পর্কযুক্ত তুলনামূলক আলোচনাও উঠে এসেছে এই প্রবন্ধে\যা অনেকটা প্রাচীনকাল থেকে সমকালীন ইতিহাস-পরম্পরায় বিশ্বমনীষীদের চিন্তার নির্যাসের আলোকে উপস্থাপিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. কাজী নূরুল ইসলাম ও তাঁর সহধর্মিণী অধ্যাপক ড. আজিজুন্নাহার ইসলাম প্রণীত তুলনামূলক ধর্ম: নৈতিকতা ও মানবকল্যাণ গ্রন্থের দশটি প্রবন্ধ এখানে উপস্থাপিত হয়েছে। ‘তুলনামূলক ধর্ম: স্বরূপ ও তাৎপর্য’ প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, তুলনামূলক ধর্ম বিভিন্ন ধর্মের ভেতরকার যে পার্থক্য তাকে উপেক্ষা করে না, ধর্মে ধর্মে যে পার্থক্য আছে তাকে এড়িয়ে চলে না। বরং দূর করতে চায় বিরোধকে। আর সে কারণেই এসব পার্থক্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে ও ব্যাখ্যা করে। পার্থক্য নিয়ে ঠাট্টা, ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ বা পরিহাস করে না। আসলে যেসব ক্ষেত্রে পার্থক্য বিদ্যমান সেগুলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে। বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা একই সৃষ্টিকর্তাকে বিভিন্ন নামে ডাকে। তুলনামূলক ধর্ম ক্রমান্বয়ে এই বিশ্বজনীনতাকে বোঝার এবং বোঝাবার চেষ্টা করে। তুলনামূলকভাবে ধর্ম মানুষের মনে শুধু সহনশীলতারই জন্ম দেয় না, সঙ্গে সঙ্গে অন্য ধর্মকে কীভাবে শ্রদ্ধা করতে হবে বা প্রশংসা করতে হবে সে শিক্ষাও দেয়; প্রত্যেক ধর্মের আসল যে উদ্দেশ্য বা রহস্য তা-ও খুঁজে বের করে তুলনামূলক ধর্ম। ‘ধর্ম, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণ’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, প্রতিটি ধর্মই মানুষকে ন্যায়পরায়ণ, উদার ও সংযমী হতে শিক্ষা দেয় এবং জীবনের চরম মূল্যগুলোকে অর্জন করে নিজের চারিত্রিক পূর্ণতালাভে উদ্বুদ্ধ করে। সত্যিকার মূল্যায়নে দেখা যায় যে, ধর্ম নয় বরং ধর্মান্ধতাই মানুষকে সংকীর্ণমনা, ক্ষুদ্রচেতা, স্বার্থপর ও নির্বিচার করে তোলে। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত যতগুলো ধর্মের উদ্ভব হয়েছে তার সবকটিই মানুষের দুঃখ নিয়ে আলোচনা করেছে এবং এই দুঃখের হাত থেকে মানুষকে কীভাবে বাঁচানো যায় তার পথ দেখানোর চেষ্টা করেছে। এই দুঃখের কারণ এবং দুঃখের হাত থেকে অব্যাহতিলাভের পর মানুষ কোথায় যাবে বা তার কী অবস্থা হবে তা নিয়ে অনেক মতবিরোধ আছে। কিন্তু মোক্ষ, মুক্তি, অপবর্গ, কৈবল্য, নির্বাণ, নাজাত, খালাস বা লিকাল্লাহ\যেটাই লাভ করতে চাই না কেন, তার জন্য প্রত্যেকটি ধর্মেই নৈতিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সব ধর্মের নৈতিক শিক্ষা মূলত এক।
‘বেদান্তে ভেদান্ত প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধে বিভিন্ন ধর্মের আলোকে বেদান্ত দর্শনকে ব্যাখ্যা করে দেখানো হয়েছে যে, সত্যিকার অর্থে এ দর্শন কোনও জাতি, সম্প্রদায় বা বর্ণে বিশ্বাস করে না; বরং মানুষে মানুষে সাম্য ও মৈত্রীর ভাবই শিক্ষা দেয়। ভেদাভেদ নিরসনকারী এ দর্শন মানুষকে তার বিকাশের উচ্চতম স্তরে নিয়ে যায় এবং এ স্তরে উপনীত হলে মতভেদ, বর্ণভেদ প্রভৃতি কোনও ভেদই তার নিকট প্রতিভাত হয় না। সে বিভিন্ন ধর্মের বহিঃপ্রকাশ নিয়ে আর বিবাদ করে না। কাজেই বেদান্ত দর্শনের সঠিক ও সুষ্ঠু অধ্যয়নই সকল ধর্মের মধ্যেকার বিরাজমান ভেদ ও বিদ্বেষ মীমাংসার ইঙ্গিত দেয়। সকল ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে কীভাবে দুঃখের হাত থেকে বাঁচানো যায় এবং কীরূপে সত্যিকারভাবে মুক্তিলাভ সম্ভব তারই পথনির্দেশ করা। বিভিন্ন ধর্মে ও দর্শনে এ মুক্তির অনেক নাম দেওয়া হয়েছে, যেমন\মোক্ষ, কৈবল্য, নির্বাণ, স্যালভেশন, নাজাত, খলুস, ফানা ইত্যাদি। এসব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ভিন্ন হলেও মর্মার্থের মধ্যে তেমন কোনও বিরোধ নেই। ‘ধর্মসমন্বয় ও শ্রীরামকৃষ্ণ’ প্রবন্ধে বর্তমান বিশ্বে যে কয়টি ধর্ম আছে সেগুলো খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করার পর কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও বলা হয়েছে, এদের মূল শিক্ষায় বড় কোনও পার্থক্য নেই, মূল শিক্ষায় যে পার্থক্য দেখানো হচ্ছে তা হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়তো অজ্ঞানতাপ্রসূত। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যকার এই ভাবটি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ এবং তাঁর যোগ্য শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ। শ্রীরামকৃষ্ণের অনুভূতি হতেই মনে হয়, এই চরম সত্যই, একমেবাদ্বিতীয়ম সর্বমালিন্যবর্জিত পরমব্রহ্মরূপ জ্ঞানাতীত ভূমিই হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মেরই শেষ লক্ষ্য; উভয় পথই সাধককে চরম লক্ষ্যে নিয়ে যায়। পৃথিবীতে পরস্পর বিবদমান ধর্মগুলোর চরমে কি এক ঈশ্বর? নাকি প্রত্যেক ধর্মের জন্য ভিন্ন উপাস্য আছে? সাকার-নিরাকার, সগুণ, নির্গুণ, দ্বৈত-অদ্বৈত এসব সাধন মতের মূলে কি কোনও ঐক্য বিদ্যমান? নাকি এরা পরস্পরবিরোধী? আবার হিন্দুধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায় যেমন বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, বেদান্তবাদী প্রভৃতি এবং অহিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান প্রভৃতি সকলে নিজ ধর্মকেই ঠিক বলে ভাবে আর অপরের ধর্মকে মনে করে ঠিক নয়, তা কি সংগত? নাকি বিভিন্ন মত ও পথের মধ্যে অর্থাৎ প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠানের নিয়মের পেছনে কোনও ঐক্য বা যোগসূত্র লুকিয়ে আছে? এসব প্রশ্নের কিছুটা উত্তর খোঁজার চেষ্টা হয়েছে এ প্রবন্ধে। ‘গৌতম বুদ্ধ, কিয়ের্কেগার্ড, শোপেনহাওয়ার ও নীট্শের দুঃখ-দর্শন’ প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, পৃথিবীতে যতগুলো ধর্ম আছে তার প্রত্যেকটিতেই দুঃখ সম্পর্কিত ব্যাখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। অনেক সমাজবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী এবং ধর্মতত্ত¡বিদের মতে, এই দুঃখই রয়েছে ধর্মের জন্মের বা উৎপত্তির মূলে। বৌদ্ধধর্মের শুরুই হয়েছে দুঃখ নিয়ে এবং দুঃখই হচ্ছে এই ধর্ম ও দর্শনের কেন্দ্রীয় বিষয়। দুঃখ মানবজীবনের শুধু ঘটনাই নয়, একটি রহস্যও বটে। যুগে যুগে অনেক দার্শনিক মানুষের জীবনের এ দিকটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে বৌদ্ধধর্মের মতো অন্য কোনও ধর্ম মানুষের জীবনের দুঃখদুর্দশাকে এত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেনি। সমকালীন পাশ্চাত্য দর্শনে যাঁরা মানুষের জীবনের এ দিকটি নিয়ে আলোচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে কিয়ের্কেগার্ড, শোপেনহাওয়ার ও নীটশের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। গৌতম বুদ্ধের দুঃখ-দর্শনের সঙ্গে এঁদের দুঃখ-দর্শনের একটি তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে এই প্রবন্ধে। ‘শংকরের দর্শন: কিছু ভ্রান্ত ধারণার নিরসন’ প্রবন্ধে লেখকদ্বয় দেখাতে চেয়েছেন যে, অদ্বৈত বেদান্ত-দর্শনের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং ভারতীয় দর্শনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক শংকরাচার্যের দর্শন সম্পর্কে অনেক ভ্রান্ত মত প্রচলিত। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা দূর করে মানুষকে সত্য ও মুক্তির পথ দেখানোই যে-দর্শনের উদ্দেশ্য, আজ সে-দর্শনই ভ্রান্তির বেড়াজালে বন্দি। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে সমালোচনা, প্রতিসমালোচনা, আংশিক ও দাম্ভিক ব্যাখ্যা, অসতর্ক চিত্রায়ণ ও উদ্দেশ্যমূলক মূল্যায়ন অদ্বৈত বেদান্ত-দর্শনকে যেন রহস্যাবৃত করেছে। শংকরের দর্শন সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান তার কয়েকটি নিরসন করার চেষ্টা করা হয়েছে এ প্রবন্ধে।
‘বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্মের ওপর হিন্দু ধর্মের প্রভাব পর্যালোচনা’ প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, সভ্যতার ইতিহাসে ভারতবর্ষের অবদান অপরিসীম। এখানে জন্ম নিয়েছে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখধর্ম। বৌদ্ধ, জৈন ও শিখধর্ম স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী হলেও কেউ কেউ দাবি করেন এগুলো স্বতন্ত্র কোনো ধর্ম নয়, বরং হিন্দুধর্মেরই ভিন্ন ভিন্ন শাখা। অনেকে আবার মনে করেন, হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধাচারণ করতে গিয়েই এসব ধর্মের উদ্ভব ঘটেছে। এ মতগুলো কতটা যথার্থ তা বিচার করে এ প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে, এ তিনটি ধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস হিন্দুধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস থেকে শুধু ভিন্নই নয়, এ তিনটি ধর্ম সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমÐিত। ‘শিখধর্মের ওপর হিন্দুধর্ম ও ইসলামধর্মের প্রভাব: দুটি বিরোধী মতের পর্যালোচনা’ প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, শিখধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত। এদের মধ্যে দুটো মতবাদ প্রধান। অনেকে মনে করেন শিখধর্ম নতুন কোনও ধর্ম নয়, হিন্দুধর্মেরই একটি ভিন্ন সংস্করণ মাত্র। তৎকালীন মুসলিম শাসকদের শাসন, নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে এবং হিন্দুধর্মকে ইসলামি আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে গিয়েই শিখধর্মের উদ্ভব। এ ব্যাপারে আর একটি প্রধান মত হলো, শিখধর্ম একটি সমন্বয়ী ধর্ম। হিন্দুধর্ম ও ইসলামের ভালো দিকগুলো একত্রিত ও সমন্বিত করেই এ ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ‘হিন্দু ধর্মে আত্মার স্বরূপ’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, হিন্দুধর্ম অনুসারে জীবাত্মা পরমাত্মারই প্রকাশ। জীবাত্মা দেহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও সীমাবদ্ধ। পরমাত্মা দেহের সঙ্গে কোনওভাবে সম্পৃক্ত নয় এবং সীমাবদ্ধও নয়, অর্থাৎ অসীম। জীবাত্মা দেহ, ইন্দ্রিয় ও মন থেকে স্বতন্ত্র হলেও সাধারণত দেহ ধারণ করে। তবে দেহের সঙ্গে সম্পৃক্ত অবস্থায়ও আত্মা দেহের সঙ্গে এর পার্থক্য অনুভব ও উপলব্ধি করতে পারে এবং সচেতন সত্তা হিসেবে নির্লিপ্তভাবে দেহে অবস্থান করতে পারে। হিন্দুধর্মে আত্মার স্বরূপ কী, তা বুঝতে হলে আত্মার সঙ্গে দেহ ও মনের কী পার্থক্য তা-ও বুঝতে হবে। স্বরূপত আত্মা ও দেহবিশিষ্ট আত্মার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। প্রথমটি ব্যবহারিক আত্মা আর দ্বিতীয়টি বিশুদ্ধ আত্মা।
বাঙালির সামাজিক ইতিহাসের অন্যতম গবেষক ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় ‘সৌরধর্ম, কৌলমার্গ ও অবধূত-মার্গ’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক বাংলায় এমনকি মধ্যযুগীয় বাংলায়ও সূর্য-প্রতিমার স্বাধীন স্বতন্ত্র পূজার প্রমাণ না থাকলেও গুপ্ত-পর্ব থেকেই উদীচ্যবেশী ইরানি ধ্যানকল্পনার সূর্যপূজা বাংলা দেশে প্রচলিত ছিল। সেনপর্বে এই ধর্ম রাজবংশের পোষকতা পেয়েছিল। বিশ্বরূপ ও কেশবসেন ছিলেন পরমসৌর। সৌরধর্মে বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য ধ্যানকল্পনা মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। পুরাণ-কাহিনি অনুসারে অশ্বারূঢ় এবং পরিজনসহ মৃগয়াবিহারী রেবন্ত দেবতার সঙ্গে সূর্যের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। এই রেবন্ত দেবতার কয়েকটি মূর্তি বাংলার নানা স্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রাপ্ত অসংখ্য নবগ্রহ প্রতিমা সৌরধর্মের সঙ্গেই যুক্ত। বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত ও সৌর সম্প্রদায়ের দেব-দেবী ছাড়া আরও নানা প্রকারের এমন দেব-দেবীর প্রতিমা পাওয়া গেছে যারা কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের ধ্যানকল্পনার সৃষ্টি নয়।
ইসলামি চেতনাধারী গবেষক আবুল ফাতাহ্ মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া ‘তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবর ও দ্বীনে ইলাহী’ প্রবন্ধে এই অভিমত উপস্থাপন করেছেন যে, এদেশে ধর্মীয় বৈষম্যের কারণে সৃষ্ট বিবদমান পরিস্থিতিকে সুশান্তকরণের আবেদন নিয়ে বহু নেতা ও নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটেছিল ইতিপূর্বেই। ভাববাদী একটি দল বহু পূর্ব থেকেই এদেশের ধর্মের ভেদাভেদ উঠিয়ে দিয়ে সব ধর্মের ভাবাদর্শের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি সর্বজনীন মতাদর্শ গড়ে তুলে সব মানুষকে একই সূত্রে গাঁথার কাল্পনিক স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিল। আকবরের সভাকবি আবুল ফজলের বাবা শেখ মুবারক ছিলেন ভাববাদী দর্শনের একজন বলিষ্ঠ প্রচারক। আবুল ফজলও সেই চিন্তাচেতনা নিয়েই গড়ে উঠেছিলেন। ভাববাদী মতাদর্শের চেতনার পক্ষে কাজে লাগানোর মানসে তাঁরা সম্রাটকে একটি সর্ববাদী ধর্মের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, এবং তাঁকে সকল ধর্মানুসারীদের পৌরোহিত্যের আসনে অধিষ্ঠিত করে ক্ষমতার মসনদ নিষ্কণ্টক করে তোলার জন্য এটি একটি মোক্ষম পন্থা বলে তাঁরা সম্রাটকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। সম্ভবত এই উভয়বিধ ক্ষমতালিঞ্ঝাই অক্ষরজ্ঞানহীন আকবরকে একটি নতুন ধর্ম সৃষ্টি করতে উৎসাহ জুগিয়েছিল। তুলনামূলক ধর্মতত্তে¡র গবেষক মুহাম্মদ আবদুর রহমান আন্ওয়ারী ‘বাংলাদেশে তুলনামূলক ধর্মতত্ত¡ চর্চার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’ প্রবন্ধে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ‘যত মত তত পথ’-এর ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে বলেন, সকল ধর্মই সত্য। রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ ওই বাণী সত্য জেনে তাঁর আহŸানকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর গুরুর ন্যায় বলেছিলেন: ‘মানবকে শিখাইতে হইবে যে, সকল ধর্ম একত্বরূপে সেই এক ধর্মেরই বিবিধ প্রকাশমাত্র; সুতরাং যাহার যেটি সর্বাপেক্ষা উপযোগী সেটিকেই সে বাছিয়া লইতে পারে।’ সেই সঙ্গে সকল ধর্মের সমন্বয় করে মানবতার কল্যাণে তা ব্যবহার করার আহŸান জানান, যাকে মানবধর্ম বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন: ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ তিনি নব্য বেদান্ত-দর্শনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, বলেছেন সর্বজীবেই ঈশ্বর বিদ্যমান। এ ধর্মকে তিনি সর্বজনীন বলে দাবি করেছেন। তিনি পৃথিবীর সকল ধর্মে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। আমেরিকাসহ অনেক দেশে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন ধর্মের ওপর। সকল ধর্মেই সত্য নিহিত আছে। বহুধর্মের স্বীকৃতির পাশাপাশি মানবতার কল্যাণে ঐক্য প্রয়োজন। তিনি বলতেন: ‘বহুত্বের মধ্যে একত্বই প্রকৃতির ব্যবস্থা।’ তাই তাঁর মতে, ধর্মের ক্ষেত্রেও বহুধর্মের সহাবস্থানে একত্ব অবস্থান গ্রহণই শ্রেয়। ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল হাই ‘তুলনামূলক বিশ্ব ধর্মতত্ত¡’ প্রবন্ধে বলেন, ধর্মতত্ত¡ বলতে বোঝায়, ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের তরফ থেকে ধর্মের স্বরূপ ও আচার-অনুষ্ঠানাদিকে বুদ্ধির আলোকে অনুধাবন ও উপলব্ধি করার প্রচেষ্টা। ধর্মের স্বরূপ, ক্রিয়া, জীবনে ধর্মীয় চেতনার ভ‚মিকা ও উপযোগিতা প্রভৃতির আলোচনা ও পর্যালোচনাই ধর্মতত্তে¡র কাজ। ধর্মবিশ্বাস কীভাবে ব্যক্তি ও সমাজের মনে প্রভাব বিস্তার করে, কীভাবেই-বা তা পুষ্ট ও বিকশিত হয়, আত্ম-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা কীভাবে ধর্মীয় আচার-আচরণকে প্রভাবিত করে\এসবও ধর্মতত্তে¡র আলোচনার বিষয়। এর উদ্দেশ্য হলো, এমন কিছু সত্যকে ব্যক্ত করা যেগুলো কোনও একটি নির্দিষ্ট কার্যকর মূল্যরূপে নিজেদের প্রমাণ করতে পেরেছে। ধর্মতত্ত¡ এসব সত্যকে সকলের বোধগম্য করে উপস্থাপিত করতে চায়, যাতে সেগুলোকে শেখানো যায় এবং সেগুলো কোনও ধর্ম-সম্প্রদায়ের ঐক্যের সংযোগসূত্ররূপে ক্রিয়া করতে পারে। ধর্মতত্ত¡ ধর্মবিশ্বাসকে স্বীকার করে নেয় এবং বিচারবুদ্ধির সাহায্যে তার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য সচেষ্ট হয়।
বাংলাদেশের লোকধর্মের উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস হাজার বছরের ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র একাদশ খÐে চৌদ্দজন লেখকের লোকধর্ম বিষয়ক সতেরোটি রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রথমেই রয়েছে উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারবিরোধী প্রকৃতিবিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় লেখক, ধর্মনীতি প্রণেতা অক্ষয়কুমার দত্তের ‘কবীরপন্থী সম্প্রদায়’ প্রবন্ধটি। এটি কবীরের ধর্মদেশনা অনুধাবনের অসামান্য দলিল। রামানন্দের দ্বাদশ শিষ্যের মধ্যে কবীর ছিলেন সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। সমকালীন সমাজে কবীর ছিলেন অকুতোভয় শাস্ত্রবিরোধী এক সর্বমানবিক ধর্মদর্শনের প্রবক্তা পুরুষ। পুরাণ-কোরান, পÐিত-পুরোহিত তথা মোল্লাতান্ত্রিক সকল মতের বিরুদ্ধ-স্রোতে ছিলেন কবীর। জাতপাত, কুলধর্ম পরিত্যাগকারী শাস্ত্রবিরোধী সর্বমানবিক ধর্মদর্শনে অনুগামী এক মানবধর্মে সকলকে সমবেত করতে সক্ষম হয়েছিলেন মধ্যযুগের এই সন্তপুরুষ। কবীর অনুসৃত সর্বমানবিক ধর্মানুসারীদের রীতি-আদর্শ ও অনুশাসনের স্বরূপ অন্বেষণ ও বিশ্লেষণ এই প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয়। সেইসঙ্গে কবীরের সমকালীন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সমাজ-মানসের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও অভিব্যক্ত হয়েছে। উত্তরকালে কবীরপন্থি ও তাঁর অনুসারীদের অনুসৃত কবীর-কথন কহাহি কবীর গ্রন্থে উল্লিখিত কবীর-কথিত একশোটি নীতিকাব্যের বিষয়-বিশ্লেষণ ও তাঁর সমকালীন প্রভাবও এখানে আলোচিত হয়েছে। আরও আলোচিত হয়েছে কবীরপন্থিদের অনুসৃত গোষ্ঠী সমস্ত গ্রন্থের সারাৎসার। এছাড়া আলোচিত হয়েছে কবীরপন্থিদের প্রামাণিক গ্রন্থ বীজক ও তার সংগ্রাহক কবীরের অন্যতম শিষ্য ভগদাস, কাশীর রাজার পৃষ্ঠপোষকতাসহ সমকালীন ইতিহাস-পরম্পরা।
এ খন্ডে ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের ‘শৈবধর্ম’ শিরোনামে একত্রে দুটি প্রবন্ধ বিন্যস্ত হয়েছে। এতে শিবের মাহাত্ম্য বিশ্লেষিত হয়েছে। পুরাণমতে, এই বিশ্বজগতের বিনাশকর্তা শিব। তিনি দেবাদিদেব মহাদেব। বেদেও তিনি বিনাশের দেবতা। রুদ্রমূর্তি, বিশ্বময়ী তাÐব সৃষ্টিকারী, ত্রিশূলধারী, মহাপ্রলয়ের বর্তন আনন্দের আতিশয্যে উদ্ভাসিত এই সংহারকর্তা পুরাণ, উপপুরাণসহ হিন্দুধর্মে মহিমান্বিতরূপে প্রতিষ্ঠিত। শিবের তাÐবনৃত্য ও জগতের ধ্বংস\পুরাণকারের কল্পনার এক অদ্ভুত সৃষ্টি। যিনি বিনাশের দেবতা, তাঁকে নিয়ে পুরাণকারেরা কত রূপেই-না পরিকল্পনা করেছেন। সমুদ্রমন্থনজাত হলাহলে আকণ্ঠ নিমজ্জিত বিশ্ববিলুপ্তির উদ্ধারকর্তা এই নটরাজ বুদ্ধরাজপুত্র। কৈলাসের স্বর্ণময়পুরীর রাজাধিরাজ, কামভস্মকারী মহাযোগী শিব মহাকালের মানবচিত্তে এক বিস্ময়কর দেবতা। এই জগতের ব্যথার পরমব্যথী নীলকণ্ঠ শিব-মহাভিক্ষু, রতœকাঞ্চন বিলাসত্যাগী সন্ন্যাসী, এই দিগ¦সন, বিষাণ-ডমরু বাদক দেবগৌরব হিন্দু অধ্যাত্মরাজ্যের অধিষ্ঠানে অবিনাশী অবয়বে পূজিত। তবে শিবের এই অবিনাশী অবয়বে মানবসৃষ্ট কল্পনার ঐশ্বরিক ও নৈসর্গিক যে কল্পতরু জগতে মহিরুহরূপে বিরাজিত আছে তা বুদ্ধের নির্বাণলোক প্রাপ্তির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ‘নাথপন্থা’ একটি মৌলিক গবেষণা। বৌদ্ধ মন্ত্রযান থেকে উদ্ভূত নাথপন্থা তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মানুসারীদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জীবনদর্শন। এই দর্শনের প্রধান অনুসৃত ৮৪ জন মহাসিদ্ধার নাম স্বীকৃত। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সন্ধিৎসার সিদ্ধান্তে প্রকৃতপক্ষে ৭৮ জন সিদ্ধার নাম সাব্যস্ত করেছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ তিন যুগে সমগ্র ভারতকে দিয়েছে চারটি ধর্মমত। প্রাচীনযুগে মীননাথের নাথধর্ম, মধ্যযুগে চৈতন্যদেবের বৈষ্ণবধর্ম এবং বর্তমান যুগে রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্মধর্ম ও পরমহংসদেবের সেবাধর্ম। নাথপন্থা বৌদ্ধধর্মের মহাযান শাখার শূন্যবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাংলার পালরাজাদের সময় থেকে নাথসম্প্রদায়ের মধ্যে কতকগুলো অর্ধ-ঐতিহাসিক কাহিনি প্রচলিত আছে। নাথগুরুদের অবদান এই কাহিনিগুলোর বিষয়বস্তু। এগুলোকে নাথগীতিকা বলা হয়। গীতিকাগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আলোকে এর ধর্মদর্শন আলোচিত হয়েছে এই প্রবন্ধে।
বাংলার লোকধর্মের স্মরণীয় গবেষক সুধীর চক্রবর্তীর প্রবন্ধ ‘মনের মানুষের গভীর নির্জন পথে’। প্রবন্ধটিতে দেখানো হয়েছে লোকধর্ম লোকমানসের গহিন অন্তরাত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি কোনও কৃত্রিম বিশ্বাসতাড়িত বিষয় নয়। আধুনিক জীবনে মুখোশের আড়াল থেকে উদ্ভাসিত এ এক অন্যরকম সহজ-সরল জীবনচর্চা। এ জীবনের সাথে সম্পৃক্ত উদাসীন ফকির, আউল-বাউলসহ নানা পেশায় নিমজ্জিত অসংখ্য সহজিয়া জীবন\যে জীবনে উচ্চাভিলাষ নেই, দূরাকাঙক্ষা নেই, পরশ্রীকাতরতা নেই; আছে নির্মল নৈতিক নিয়মনিষ্ঠা। কোথায় এঁদের দেখা পাওয়া যায়? নদীয়া, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া\উভয় বঙ্গের নির্জন জনপদে। প্রবন্ধকার তাঁর লোকমানসের অনুসন্ধানে এঁদের নাম দিয়েছেন ‘মনের মানুষের গভীর নির্জন পথে’। এঁদের প্রতি অন্যান্য ধর্মানুসারীদের রয়েছে অপরিমেয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। এ ভালোবাসার মেলবন্ধনে সমাজে সৃষ্টি হয়েছে অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনা।
সুধীর চক্রবর্তীর দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘যাদের গভীর আস্থা আছে আজও মানুষের প্রতি’। এ প্রবন্ধে তিনি লোকজীবনে দেহতত্ত¡বাদী মানুষের অনুসন্ধান করেছেন। বিশ্লেষণ করেছেন এঁদের স্বরূপসন্ধানী মনোজগৎ। তবে এত মানুষের ভিড়ে আসল মানুষকে চেনা যাবে কীভাবে? এই আসল মানুষদের খোঁজা হয়েছে এখানে। এজন্য প্রবন্ধকার পৌঁছেছেন আরশিনগরে। ধরেছেন নানারূপী পড়শি। লোকজীবনে আমাদের চারপাশে যাঁদের দেখতে পাই তাঁরা গোঁসাই, বৈষ্ণব, গৃহী-অগৃহী, কামিনীকাঞ্চনত্যাগী সাধুপুরুষ। বর্তমান প্রবন্ধে বঙ্গের নানা জনপদবিহারী অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে প্রকৃত মানুষ খোঁজার প্রয়াস আছে। নানা জিজ্ঞাসায়, নানা প্রশ্নের আলোকে উৎসারিত হয়েছে বর্তমান প্রবন্ধের অবয়ব। এ অবয়বে অ¤øান হয়ে আছে তাঁদের মুখ ‘যাঁদের গভীর আস্থা আছে আজও মানুষের প্রতি’। লালনের ধর্মদর্শনে যে মানববোধ প্রতিফলিত হয়েছে তার মূলমর্ম উপস্থাপিত হয়েছে মহিন শাহ রচিত ‘লালনসঙ্গীতে ধর্মদর্শনের বিকাশ ও আত্মকথন’ প্রবন্ধে। এ প্রবন্ধে তিনি দেখান, আত্মতত্তে¡র যে ধর্ম সেটা স্রষ্টার নিগূঢ়তত্ত¡। অর্থাৎ তাঁর মহান ইচ্ছা: এই আমি চিরসুন্দর। অতএব আমার সৃষ্টিও সুন্দর হোক। তাই তিনি সৃষ্টিরসে মিশে দুটি জাতিরূপে আমাদেরকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। কী চমৎকার লীলা! এক জীবের মাধ্যমে তার ভবিষ্যৎ বংশ বেঁচে থাকছে। জাত এবং সেফাত। স্রষ্টা জাত, সৃষ্টি সেফাত। স্বয়ং স্রষ্টা সৃষ্টির মূলতত্ত¡ বোঝানোর জন্য কালাম নাজিল করেছেন। আমরা আল্লাহপাকের সৃষ্টিতত্তে¡র মূলরহস্য বুঝতে না পেরে বহিরঙ্গ নিয়ে টানাটানি করছি। জাতে জাতে বিজাতীয় ভাবের নজির তৈরি করছি। এর মাধ্যমে লাভের মধ্যে এই লাভ হচ্ছে\স্রষ্টার সৃষ্টির ওপরে দোষারোপ করে তাঁর ভালোবাসার সৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
কথাসাহিত্যিক, লোকধর্ম ও লোকসংস্কৃতির বিশ্লেষক হরিশংকর জলদাস ‘কৈবর্ত সমাজের ধর্ম ও সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে কৈবর্ত সমাজের উৎপত্তি ও বিস্তার নিয়ে আলোচনা করে দেখিয়েছেন, প্রায় দুহাজার বছর আগে যিশুখ্রিস্ট যাঁকে সর্বপ্রথম খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন, তাঁর নাম ছিল পিটার। পিটার ছিলেন মৎস্যজীবী। পরবর্তীকালে সেই খ্রিস্টধর্মাবলম্বী ব্রিটিশরাই এদেশে পেশাভিত্তিক আদমশুমারি করার সময় বাউরি, চর্মকার, জেলে, মেথর প্রভৃতিকে তপসিলি জাতির অন্তর্ভুক্ত করল। এই সময়ে ব্রিটিশরা জেলেদের পদবি লিখল\পিটার। পিটার শব্দটি পরে অপভ্রংশ হয়ে ‘পাতর’-এ রূপান্তরিত হয়। ব্রিটিশ আমলের জেলেদের জায়গাজমির দলিলে ‘পাতর’ পদবির সন্ধান মিলে। যেমন: চন্দ্রমণি পাতর, যুধিষ্ঠির পাতর।
ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস প্রণেতা নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ‘শাক্তধর্ম ও তন্ত্র’ প্রবন্ধে বলেন, বিভিন্ন তন্ত্রে জাগতিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানবিজ্ঞানের পাশাপাশি এমন কিছু ধর্মীয়, দার্শনিক ও আচার-অনুষ্ঠানগত ধ্যানধারণার বিকাশ ঘটেছে যেগুলো বৈদিক আদর্শের বিরোধী, এবং সেই কারণেই তন্ত্রকে বেদবাহ্য আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আবার কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেদকে ভিত্তি করার দরুন ভারতীয় জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় জীবনে একটি স্ববিরোধিতা সৃষ্টি হয়েছে। শঙ্করাচার্য কথিত বেদান্তের চরম অদ্বয়বাদী ব্যাখ্যা বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত কোনও তরফই মানতে পারেনি, কেননা জগৎকে কোনও ধর্মব্যবস্থার পক্ষে অস্বীকার করা সম্ভব ছিল না। কাজেই তাদের প্রধান সমস্যা ছিল বিশুদ্ধ চিদ্স্বরূপ ব্রহ্মের সঙ্গে জড়জগতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার সমস্যা\তা তিনি বৈষ্ণবের বিষ্ণুই হন, শৈবের শিবই হন বা শাক্তের শক্তি হন। এতগুলো বিচ্ছিন্ন উপাদানের সমন্বয় এবং একটি বিশিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে সেগুলোকে ব্যাখ্যা করার যে-কোনও প্রয়াসের মধ্যে স্ববিরোধ থাকতে বাধ্য, কাজেই কোনও সমন্বয়ী ব্যাখ্যার চেষ্টা না করে শাক্তধর্ম ও তন্ত্রের আলোচনায় যদি গঠনকারী উপাদানগুলোকে বিশিষ্ট করে দেখা যায় এবং সেইগুলোকে তাদের ঐতিহাসিক উদ্ভবের পরিপ্রেক্ষিতে বোঝার চেষ্টা করা হয়\বিবর্তিত ও পল্লবিত রূপ থেকে আলাদা করে\তাহলেই বিষয়টির ওপর সুবিচার করা সম্ভব হবে বলে মনে হয়। শিক্ষাবিদ সমাজচিন্তক যতীন সরকার ‘বাঙালির লৌকিক ধর্মের মর্মান্বেষণ’ প্রবন্ধে বলেন, আদিতে সব ধর্মই ছিল লৌকিক ধর্ম। বাঙালির লৌকিক ধর্মে ইহজাগতিক উপলব্ধিই মুখ্য। লৌকিক ধর্মে মানুষ রেখে খোদা ভজে না। যতীন সরকার ‘বাঙালি সমাজে লোকধর্মের প্রভাব’ প্রবন্ধে বাঙালির ইতিহাস ও সমাজ বিবর্তনের ধারায় লোকধর্মের প্রভাব অপরিসীম উল্লেখ করে বলেন, লোকধর্মে প্রত্যাদিষ্ট গ্রন্থ না থাকলেও এর শক্তি সংগীতে, প্রবাদে, প্রবচনে, কিংবদন্তিতে, সাহিত্যে। আচার্য সুবোধ শাস্ত্রী ওরফে সুবোধ চন্দ্র দাস ‘সত্যের সাধনায় বহুমুখী স্রোতধারা’ শিরোনামে দীর্ঘ রচনায় বাংলাদেশের প্রায় সকল লোকধর্মের একটি সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপন করেছেন। মানুষকে জানার পদ্ধতি বহুবিধ। কেউ তাকে পরিচয় দেয় ভৌগোলিক মানদÐে, কেউ ভাষার মানদÐে, কেউবা ধর্ম কিংবা নরগোষ্ঠীর মানদÐে। কিন্তু মানুষকে জানার আরেক মানদÐ রয়েছে, তা হলো তার কৃষ্টি ও মননের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবগত হওয়া। বাঙালির মরমি সাহিত্যে পড়শিকে জানার আকুতি খুবই প্রবল, কিন্তু পড়শিকে জানতে গেলে তার মরমের কথা ও মনন-বৈশিষ্ট্যও জানা দরকার। বাঙালির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও নিম্নবর্গের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার পরিধি খুবই সীমিত, আবার উচ্চচিন্তা হৃদয়ঙ্গম করবার মতো ইচ্ছাও আমাদের নেই। আজকের বৈশ্বিকায়নের যুগে অনেক চিন্তাস্রোত হারিয়ে যাচ্ছে, তা ধরে রাখবার প্রেরণা থেকে বর্তমান রচনায় সংগৃহীত হয়েছে বিদ্যাতন্ত্রের অধ্যায়, তন্ত্র সম্পর্কে কমবেশি ধারণা, সেইসঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে তৎকালীন বৃহত্তর বঙ্গ কামরূপের সংস্কার-আন্দোলনের মহানায়ক শঙ্কর দেব, মহাপুরুষীয়া সম্প্রদায়, ব্রাহ্মসমাজ, নিম্নবর্গের জাগরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত মতুয়া, সর্বধর্ম চেতনায় সমৃদ্ধ আউল-বাউল সাঁই-সহজিয়া, কর্তাভজা, সত্যধর্ম, বলাহাড়ি মত সম্পর্কে আলোকপাত। প্রবন্ধে সংযুক্ত রয়েছে রবিদাসপন্থা, শিবনারায়ণপন্থা ও লালভোগপন্থাসহ বাংলার জনপদে আচরিত আরও কিছু লোকধর্মের লোকায়ত ধর্মদর্শন।
লোকধর্ম ও লোকসংস্কৃতি গবেষক ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী ‘লোকধর্মের সংজ্ঞা’ প্রবন্ধে বলেন, পুরনো সংজ্ঞানুযায়ী ‘লোক’ হলো আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার আলোকবঞ্চিত গ্রামীণ নিরক্ষর মানুষ\যাদের জীবন-জীবিকা কৃষিকেন্দ্রিক। ‘লোক’-এর এ সংজ্ঞা অনেকদিন থেকেই অচল, তবু ফোকলোরের পÐিত-গবেষকেরা এ-পর্যন্ত কেউই বলেননি, সব শ্রেণির মানুষই ‘লোক’। আমরা সাধারণভাবে যেটুকু বুঝি তা থেকে বলা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ‘পাস করা’ শিক্ষিতজনের বাইরে ঐতিহ্যিকসূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান, আচার-বিশ্বাস-সংস্কারকে ধারণ করে যারা একটা অভিন্ন সাংস্কৃতিক আবহে জীবন অতিবাহিত করে তারাই ‘লোক’। আবার ভারতীয় বস্তুবাদী দর্শনকে বলা হয় ‘লোকায়ত’। এ লোকায়তের দুটি অর্থ: ১. সাধারণ মানুষ, ২. ইহজগৎ। ‘লোকেষু আয়ত লোকায়ত।’ জনসাধারণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত বলেই নাম লোকায়ত। উপনিষদে বেদবিরোধী ইতরজনকেই বলা হয়েছে ‘লোক’। এদের অনুসৃত ধর্মই লোকধর্ম। এ লোককে আবার ‘ব্রাত্য’ও বলা হয়। অর্থাৎ বৈদিক পূজা-পার্বণ পালন না করে যারা স্থানীয় বা দেশীয় ব্রতাদি পালন করত তারাই ‘ব্রাত্য’। শাস্ত্রীয়ধর্মের সঙ্গে লোকধর্মের মৌল পার্থক্য হলো, শাস্ত্রীয় ধর্ম ভাববাদমিশ্রিত, ঈশ্বর ও পরকাল তথা স্বর্গ-নরক, পাপের শাস্তি ও পুণ্যের পুরস্কারে পুরোপুরি বিশ্বাসী; অন্যদিকে লোকধর্মের অধিকাংশ অনুসারী প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও শাস্ত্রবিরোধী। সাংগঠনিক ধর্মের অনুসারীরা যখন লোকায়তিকদের ধর্মদ্রোহী বলে দোষারোপ করে কিংবা সালিশ ডেকে শাস্তি দিতে চায় তখন তারা ধর্মশাস্ত্রের বাণী দিয়েই যুক্তিতর্কে অবতীর্ণ হয়। অনেক প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মজীবীর চেয়েও তাদের শাস্ত্রজ্ঞান ভালো। অবশ্য কখনও কখনও তাদের আপস করেও চলতে হয়।
‘বাউলধর্ম: চালচিত্রের সন্ধানে’ প্রবন্ধে আবুল আহসান চৌধুরী সমাজসংস্কৃতিতে বাউলের নানা চড়াই-উতরাই ও নানা নির্যাতনের ইতিবৃত্ত উপস্থাপন করেছেন। লৌকিক বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি-ধর্মে বাউল একটি বড় জায়গা জুড়ে আছে। বাউলের সাধনা ও সংগীত কয়েক শতাব্দী ধরে বাঙালি মানসের আধ্যাত্মিক ক্ষুধা ও রসতৃষ্ণা মিটিয়ে আসছে। এই বাউলদের নিয়ে আলোচনা-গবেষণা তর্কবিতর্ক কম হয়নি। বাউল মূলত মিশ্র মতবাদ\বৌদ্ধ সহজিয়া, ইসলামি সুফি ও বৈষ্ণব সহজিয়া মতের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধর্ম ও সাধনার প্রয়োজনীয় নির্যাস নিয়েই বাউলমতের সৃষ্টি ও পুষ্টি। চৈতন্যদেবের মৃত্যুর পর বাউলধর্ম তার যথার্থ স্বরূপ খুঁজে পায়। সাধকের পরিচয়ের ক্ষেত্রে ‘বাউল’ শব্দটি সাধারণত শিথিল অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই বাউল নামের খোলসের ভেতরে সংগীতাশ্রয়ী অন্যান্য মরমি সাধনপথের অনুসারীরাও অনায়াসে ঢুকে পড়েন। মিথুনাত্মক যোগসাধনাই অধ্যাত্মবাদী বাউল সম্প্রদায়ের সাধনার মূলপদ্ধতি। বাউলের সাধনা দেহকেন্দ্রিক। বাউলমতের প্রসার ও সাধনার পথ কোনওকালেই সুগম ছিল না। শাস্ত্রাচারী হিন্দু আর শরিয়তপন্থি মুসলমান উভয়ের কাছ থেকেই বাউল অবজ্ঞা-নিন্দা-বিদ্বেষ-অবিচার অর্জন করেছে। মুসলমানদের চোখে বেশরা, বেদাত, নাড়ার ফকির; আর হিন্দুর কাছে ব্রাত্য, পতিত, কদাচারী হিসেবে চিহ্নিত। শিক্ষিতজনের ধারণাও অনুক‚ল ছিল না। প্রতিক‚ল সময়ে হাজার প্রতিবন্ধকতা ও নানা অন্তরায় সত্তে¡ও গ্রামবাংলার অতি নিভৃত জীর্ণপ্রায় আখড়ায় বাউল ঐতিহ্যের দীপ এখনও প্রজ্বলিত। মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের উত্তরপুরুষ বিশিষ্ট সমাজচিন্তক কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর ‘লোকধর্মের আলোয় প্রাচীন ভারতীয় দর্শন’ প্রবন্ধে মতুয়া ধর্মমতের সংক্ষিপ্ত সারকথা উপস্থাপন করেছেন। বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম\মতুয়াধর্ম। গুরুপূজা এবং দেহসাধনার মতো দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বাদ দিলে, অন্য অনেক বিষয়ে লোকধর্মের সঙ্গে মতুয়াধর্মের ভাবনাগত বা আদর্শগত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মতুয়াধর্ম বেদবিধি, শৌচাচারবিরোধী, যাগযজ্ঞে আস্থাহীন, গার্হস্থ্যধর্মকে মনে করে সর্বধর্মসার। নারীকে দিয়েছে যোগ্য মর্যাদা; দীক্ষা, গুরুপ্রথা ও তীর্থদর্শনের এরা অভিলাষী নয়। সন্ন্যাসের বদলে কর্মে আগ্রহী। ‘হাতে কাম মুখে নাম’ই এই ধর্মের শ্রেষ্ঠ পন্থা। আত্মমুক্তি নয়, সমষ্টি মুক্তি এই ধর্মমতে কাম্য। সকলের তরে সকলে, এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত মতুয়াধর্ম। স্বর্গ মতুয়াদের লক্ষ্য নয়, মতুয়ারা চান পরমেশ্বরের পরমপদ\অর্থাৎ পরমানন্দ। কোনও কোনও সমাজতাত্তি¡ক এজন্য মতুয়াধর্মকে বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবজাত বলে মনে করেছেন। মতুয়াধর্ম প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুরের বাণী ও আদর্শ\যা শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে, তাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে আদি ভারতীয় ধর্মের একটা স্পষ্ট যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। মতুয়াধর্মের প্রতীক হলো হস্তিদমনকারী সিংহ। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে অজন্তা গুহার পাথরের ছাদে এই প্রতীকটির ছাপ আছে। এই ভাস্কর্যশিল্পের নির্মাতাও বাঙালি এবং ফরিদপুরের ওড়াকান্দিতে জন্মগ্রহণকারী মহিম নামে এক নমঃশূদ্র। অজন্তা থেকে ওড়াকান্দির পথ ও সময়ের দূরত্ব বিপুল হলেও এই নৃতাত্তি¡ক সাদৃশ্যের মধ্যেও লুকিয়ে আছে নানা অজানা রহস্য! সে রহস্য উন্মোচনের প্রয়াসও আছে এই প্রবন্ধে।
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার ‘ক্রামা ধর্ম: লোকায়ত ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ প্রবন্ধে স্বল্পপরিসরে এই ধর্মমতটির পরিচয় তুলে ধরেছেন। পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ ধর্মমতের নাম ক্রামা। এই ধর্মের উৎপত্তি আমাদের এই বাংলাদেশে। বান্দরবান জেলার পোড়োপাড়া গ্রামের মেনলে ম্রো এই ধর্ম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করেন ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে বসবাসরত ম্রো জনগোষ্ঠীর শতকরা ৫৫ জন মানুষ এই ধর্মমতে দীক্ষাগ্রহণ করেছেন। ম্রো-দের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মায়ানমারের অধিবাসী। ম্রো ভাষায় ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তাকে বলা হয় ‘তোরাই’। ম্রো জাতির মানুষ বিশ্বাস করে যে, গো-হত্যা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা সব পাপ ও বিপদাপদের হাত থেকে রক্ষা পায়। তারা জুমচাষে বেশি ফসল পাওয়ার আশায়, পরিবারের কোনও সদস্যের বা নিজের রোগমুক্তির কামনায় গো-হত্যা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মেনলে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে শুধু ক্রামাধর্মেরই প্রচলন করেননি, তাঁর গ্রাম পোড়োপাড়াতে ম্রোচ চা সাংরা নামে একটি ম্রো ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র চালু করেছিলেন। সেখানে তিনি ক্রামাধর্মে দীক্ষা নিতে আসা মানুষদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি লেখাপড়াও শেখাতেন। তিনি গো-হত্যা উৎসবসহ ম্রোদের সব প্রাকৃত উৎসব বহাল রেখেছেন।
লোকসংস্কৃতি গবেষক ও শিল্পী বাবু রহমান ‘নাগারচি সম্প্রদায়ের ধর্ম ও সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে এই বিলুপ্তপ্রায় ধর্মমতটির সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত উপস্থাপন করেছেন। ভারতবর্ষের নানা স্থানে জমিদারশ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় বাদ্যকরগোষ্ঠীর জন্ম হয়। সব উৎসব ও মাঙ্গলিক কাজে তাদের প্রয়োজন হলেও সম্প্রদায়গতভাবে চামড়াজাতীয় দ্রব্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কারণে তারা অস্পৃশ্য হিসেবে গণ্য। শ্রেণি হিসেবে তারা চতুর্থ। শূদ্র জনগোষ্ঠীর নানা পেশার লোকজন সমাজের উৎসবাদিতে অতীব জরুরি; কিন্তু সমাজে অপাঙ্ক্তেয়। নানা উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে বাদ্যকরগোষ্ঠী উপমহাদেশে এখনও আবশ্যিক; অথচ যুগের কারণে এই পেশা আজ হয়েছে খÐকালীন। বাদ্যকরদের এই পেশা কখনও পূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বারো মাসের তেরো পার্বণ আজ কথার কথা। অনুষ্ঠান আরও বাড়লেও তার চারিত্র্য পাল্টে গেছে। মুসলমান নাগারচিদের সঙ্গে বাদ্যকরশ্রেণির ধর্ম ছাড়া আর কোনও পার্থক্য নেই। এমনকি, ধর্মাচারেও তেমন একটা পার্থক্য নেই। ঢাক, ঢোল, বাঁশি, খোল ও করতাল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র কখনও একক আবার কখনও দলীয়ভাবে (ব্যান্ড) বাজিয়ে এরা জীবিকা নির্বাহ করে। তবে, চর্মকারদের মধ্যে একটি দল রিশিদাস, অন্যটি রিশি রবিদাস এবং ধর্মান্তরিত মুসলিম নাগারচি\এই তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে আছে।
লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতি গবেষক ডক্টর স্বরোচিষ সরকার ‘মতুয়া ধর্ম: অনুসারীদের যাপিত জীবন ও ধর্মাদর্শ’ প্রবন্ধে মতুয়া ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবনের কিছু অলৌকিক ঘটনা উপস্থাপন করেছেন। মতুয়াধর্ম প্রশ্নাতীতভাবে হিন্দুধর্ম নামক ধর্ম-মহামÐলীর অন্তর্ভুক্ত। মতুয়াধর্মে বিশ্বাসীদের সিংহভাগ নমঃশূদ্র ও পৌÐ্রক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ভুক্ত। এই ধর্মের আরাধ্য হরিচাঁদ ঠাকুর। অনুসারীদের নাম মতুয়া। হরিচাঁদ ঠাকুরের পিতা যশোবন্ত বৈরাগী নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। ইনি বৈষ্ণবভক্ত ছিলেন। যে বত্রিশ রকমের লক্ষণ নিয়ে হরিচাঁদ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেছিলেন, হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী তা অবতার পুরুষের লক্ষণ। গৌতম বুদ্ধের শরীরেও এই বত্রিশটি লক্ষণ ছিল বলে বৌদ্ধশাস্ত্রসমূহে উল্লেখ রয়েছে। হরিচাঁদ ঠাকুরের এই শারীরিক লক্ষণ অল্পদিনের মধ্যেই তাঁকে অবতার-পুরুষ হিসেবে প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে হরিচাঁদ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল রোগমুক্তিবিষয়ক। যে-কোনও ধরনের দুরারোগ্য রোগ নিয়ে হরিচাঁদের কাছে এলে রোগী তাঁর স্পর্শে পুনর্জীবনলাভ করত। অলৌকিকতার একটি ধরন ছিল অন্তর্যামিতা, অর্থাৎ সবার মনের কথা তিনি অনায়াসে বলে দিতে পারতেন। একটি ধরন ছিল অল্প খাদ্যে অধিক মানুষকে ভোজন করানোর ক্ষমতা। তারক সরকার রচিত হরিলীলামৃত গ্রন্থে এজাতীয় বহু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।
ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে অভিমত
সংকলন প্রসঙ্গে
বাঙালিসমাজে যুক্তিবাদের দৃষ্টিতে যাঁরা ধর্মকে বিশ্লেষণ করেছেন তাঁদের যৌক্তিক জিজ্ঞাসামূলক চিন্তাশীল প্রবন্ধসমূহ ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র দ্বাদশ খন্ডে উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিদ্যাসাগরের ধর্মদেশনার বৈপরীত্যের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের সহনীয় ও সমন্বিত অভিমতও পাশাপাশি যেমন উপস্থাপিত হয়েছে, তেমনি আস্তিক্যবাদী চিন্তাবিদদের নানা জিজ্ঞাসা ও যুক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের উপলব্ধি অনুভবে সহায়ক প্রবন্ধও সংকলিত হয়েছে। অনেক বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী লেখকের ধর্ম সম্পর্কিত চিন্তাধারা ধর্মসহিষ্ণুদের অনুক‚লে না থাকলেও তাঁদের চিন্তার যৌক্তিকতা ও সারবত্তা নিয়েও এখানে আলোচনা আছে। বর্তমান খÐের চারিত্র্য ও শিরোনামের সহায়ক চিন্তার প্রবন্ধসমূহই এখানে উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে প্রবন্ধকারদের কারও চিন্তার সপক্ষে কিংবা বিপক্ষে অভিমত উপস্থাপনের অভিপ্রায় সম্পাদকের নেই। কারও ধর্মবিশ্বাসের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন এই সংকলনের উদ্দেশ্য নয়। শুধু ভিন্নমতের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিজ চিন্তার যৌক্তিকতা ও যথার্থতা নিরূপণে সহায়ক ভাবনা থেকেই বর্তমান খÐের শিরোনাম করা হয়েছে ‘যুক্তিবাদীদের দৃষ্টিতে ধর্ম’। এই দৃষ্টি সম্পাদকের নিজস্ব নয়, এই দৃষ্টি স্ব স্ব লেখকের। বর্তমান খÐে ষোলজন লেখকের পঁচিশটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। এর মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের ‘যুক্তি ও ধর্ম’, ‘আত্মা, ঈশ্বর ও ধর্ম’, ‘আত্মা এবং ঈশ্বর’ ও ‘ধর্মের প্রমাণ প্রসঙ্গে’ শীর্ষক চারটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘আমার ধর্মবিশ্বাস’, শিবনারায়ণ রায়ের ‘নাস্তিকের ধর্মজিজ্ঞাসা’, অ¤øান দত্তের ‘ধর্ম ও যুক্তি’ ও কৃষ্ণা বসুর ‘ধর্ম ও নারী’ শিরোনামে চারটি প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হয়েছে। এ খÐে সংকলিত হয়েছে হুমায়ুন আজাদের দুটি প্রবন্ধ\‘বিশ্বাসের জগত’ ও ‘ধর্ম’। এখানে প্রবীর ঘোষের ‘আমি কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না’, হাফিজুর রহমানের ‘যে দিকে যাই হোঁচট খাই’, হোসেনুর রহমানের ‘আধুনিক মানুষের ধর্মজিজ্ঞাসা’, মেজবাহউদ্দিন জওহের-এর ‘একজন আস্তিকের জবানবন্দী’ ও কামারুজ্জামানের ‘বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্ব ও ধর্মমত বিচার’ শিরোনামে পাঁচটি প্রবন্ধ রয়েছে। বেনজীন খান প্রণীত ‘প্রসঙ্গ: নবী’, ‘প্রসঙ্গ: পবিত্র কিতাব’, ‘প্রসঙ্গ: পূজা’, ‘প্রসঙ্গ: এক ঈশ্বর’, ‘প্রসঙ্গ: স্বর্গ-নরক’, ‘প্রসঙ্গ: মোহাম্মদ’ শীর্ষক ছয়টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। এছাড়া নূরুর রহমানের ‘মূল স্রোতে ধাবমান’, সৈকত চৌধুরীর ‘স্রষ্টা এবং ধর্ম-অসংগতির প্রসঙ্গ’, অপার্থিব জামানের ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ব\সৃষ্টির যুক্তির খÐন’, মীজান রহমানের ‘হতবুদ্ধি হতবাক’ শিরোনামে চারটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এ খÐে। এসব প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয় ও যৌক্তিকতা ভ‚মিকার প্রারম্ভেই প্রাসঙ্গিকতা-সূত্রে আলোচিত হয়েছে বিধায় এগুলো নিয়ে আর আলোচনার পুনরাবৃত্তি করা হলো না।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র ত্রয়োদশ খÐটি দুই পর্বে বিন্যস্ত। প্রথম পর্ব ‘ধর্ম ও রাজনীতি’। দ্বিতীয় পর্বটি ‘ধর্ম ও রাষ্ট্র’। ধর্ম ও রাজনীতি পর্বে আঠারোজন লেখকের একুশটি লেখা সংকলিত হয়েছে। ধর্ম ও রাষ্ট্র পর্বে আটজন লেখকের এগারোটি লেখা সংকলিত হয়েছে। ধর্ম ও রাজনীতি পর্বে বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী ও সমাজচিন্তক এবনে গোলাম সামাদ ‘ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র’ প্রবন্ধে আমেরিকা, ফ্রান্স, তুরস্ক ও ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণপূর্বক ধর্মনিরপেক্ষতার স্বরূপ আলোচনা করেছেন। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রসমূহের চারিত্র্যবৈশিষ্ট্যে এমন সব রাষ্ট্রের কথা দেখানো হয়েছে যাদের ক্ষেত্রে সরকারি ধর্ম বলতে কিছু নেই। আর ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ কেবল ধর্মবিশ্বাসীদের স্বাধীনতা নয়, ধর্মে অবিশ্বাসীদেরও স্বাধীনতা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষ হলে নীতিবিহীন হবে, এমন নয়। যেমন হয়নি অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।
খ্যাতিমান সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় ‘সেকুলার স্টেট’ প্রবন্ধে সেকুলার-এর বাংলা প্রতিশব্দ ধর্মনিরপেক্ষ বা লৌকিক লিখতে রাজি নন। জওহরলাল নেহেরু দেশবিভাগের আগে ভারতে শব্দটি ব্যবহার করেন। এ প্রবন্ধে তিনি আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, তথা ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন। অন্নদাশঙ্কর রায় মনে করেন প্রজারা যদি নাস্তিক হয়, ধর্ম বলে কিছু না মানে, তাহলেও তারা রাজ্যের অধিকারী। রাষ্ট্র তাদের চিন্তায়, বাক্যে ও আইনসংগত কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ করবে না। নিছক ধর্মবিশ্বাসের দরুন কোনও নাগরিক সেই রাষ্ট্রের দরবারে ছোট বা বড় নয়, ধর্মাধিকরণে তো নয়ই। সেকুলার স্টেট-এর আদর্শ রাজতন্ত্রী আদর্শ নয়, ধর্মতন্ত্রী আদর্শ তো নয়ই। এটা ধর্মতন্ত্র ও রাজতন্ত্র উভয়ের পতনের বা নিয়ন্ত্রণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য ‘বাংলাদেশের সংবিধান ও ধর্ম’ প্রবন্ধে এই অভিযোগ উত্থাপন করেছেন যে, প্রশাসনকার্যে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রয়োজনীয়তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উপলব্ধি এবং স্বভাবতই সেইজন্য মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আদর্শবাদ হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রূপরেখায় ধর্মনিরপেক্ষতার সঞ্চারণ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধান থেকে অবলুপ্ত করে সাম্প্রদায়িক শক্তি সামরিকবাহিনীর সাহায্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও উক্ত সংশোধনী বাংলাদেশের জনসাধারণের রাজনৈতিক সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়েছে।
বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কেন?’ প্রবন্ধে বলেন, ‘ইসলাম কতদূর একটি বিশিষ্ট রাষ্ট্রের ধর্ম হতে অনুমোদন দেয়। ইসলাম একটি সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন ধর্ম, কোরানে বিধাতাকে বলা হয়েছে রাব্বুল আলামিন, সর্বমানবের বিধাতা; রাব্বুল মুসলেমিন নয়। মুসলিমদের বিধাতা নয়। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলে, ইসলাম সে-দেশের মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম অধিকারের অধীন হয়ে যাচ্ছে। ইসলাম তার সর্বজনীনতা হারাচ্ছে।’
মুক্তবুদ্ধির স্বপক্ষের লেখক ড. আহমদ শরীফের ‘সেকুলারিজম’ প্রবন্ধে ভারত ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্বাপর রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেকুলারিজম-এর প্রয়োগ-অপপ্রয়োগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিশ্লেষিত হয়েছে। লেখকের মতে, প্রাজ্ঞ মনীষা ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেকুলারিজম বাস্তবায়ন অসম্ভব।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘মৌলবাদের শক্তি কোথায়’ প্রবন্ধে বলেন, দেশে মৌলবাদ প্রবল হচ্ছে একদিকে, অন্যদিকে গণতন্ত্র আসছে না। এই দুটি বিচ্ছিন্ন নয় পরস্পর থেকে। গণতন্ত্র পাকিস্তানেও ছিল না, এখনও নেই; মৌলবাদ পাকিস্তানি আমলেও বাড়ছিল, এখনও বাড়ছে। গণতন্ত্র তো কেবল ভোট নয়, যদিও সে ভোটও বটে, গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সেইসঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। আজ অধিকারও নেই, মূল্যবোধও নেই, যার ফলে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব, অভাব সহনশীলতার; যা থেকে বোঝা যায় যে, সামন্তবাদ অর্থনীতি থেকে বিদায় নিলেও, সংস্কৃতি থেকে বিদায় নেয়নি। শিক্ষাবিদ ও কবি জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ‘সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রবন্ধে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মবিমুখতা নয়, এটা যে-কোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তি যেমন জানেন, বঙ্গবন্ধুও জানতেন। কিন্তু তাঁর তিক্ত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল এবং তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রাজনীতি একটি সুস্থ, সৃষ্টিধর্মী, অগ্রসরমুখী ধারায় প্রবাহিত হোক, সর্বান্তঃকরণে তাই কামনা করেছিলেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনীতিসচেতন সুস্থবুদ্ধির মানুষ তাঁর এই ধারণা, এই কামনার অংশীদার। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ‘ধর্মরাষ্ট্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম’ প্রবন্ধে বলেন, পৃথিবী ক্ষুদ্র হোক আর বিপুল হোক, জীবন পদ্মপত্রে নীর হোক আর জীবকোষের সমাহার হোক, এই পৃথিবীতে সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলন পরিপূর্ণ মানবজীবনের সাধনাই ইহজাগতিকতার মূল কথা। ব্যক্তি যা পারে না, রাষ্ট্র তা পারে। ধর্মের বিষয়ে মাথা না গলিয়েও রাষ্ট্র চলতে পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র সেভাবেই চলে। অন্যদিকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রবন্ধে তিনি তাঁর যৌক্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবনা শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও সেই রাষ্ট্রের তাত্তি¡ক প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। ধর্মরাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা গোপনে পালন করে যাঁরা আপাতত রাষ্ট্রধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই ভবিষ্যতের আশার পথ চেয়ে আছেন। তবে ধর্ম নিয়ে রাজনীতির পরিণাম যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তা নিশ্চয়ই তাঁদেরও অজানা নয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই একদিন এদেশের জনপ্রতিনিধিরা চেয়েছিলেন, ধর্ম ব্যক্তিগত জীবনের বিষয় হয়ে থাক, রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সংস্রব ঘটিয়ে কাজ নেই\তাতে রাষ্ট্র ও ধর্ম দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষাবিদ সনৎ কুমার সাহা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রবন্ধে বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ একটা তৈরি করা প্রতিশব্দ। উক্তি ও উপলব্ধির গরমিলের আশঙ্কা তাই একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ধ্রæবক হিসেবে শব্দটির ব্যবহার তাই অসমীচীন ও বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়ে। সেকুলারিজম বহু শতাব্দী ধরে যেভাবে আচরিত ও রূপান্তরিত হয়ে আসছে, আজ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে যদি তারই ঠিক বঙ্গানুবাদ বলে ধরে নিই, তবে শুধুমাত্র সব ধর্মের সহাবস্থানেই তার অর্থ পুরোপুরি ধরা পড়ে না। ‘ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধে তিনি দেখান, কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই পরম, দেশ-কাল নিরপেক্ষ, অভ্রান্ত নয়। অথচ নিজের ধর্ম সম্পর্কে উঁচু ধারণা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়\সে চেষ্টাই চলে আসছে। নিজের ধর্মই শ্রেষ্ঠ, এতে আত্মতৃপ্তি থাকতে পারে; কিন্তু সত্য অন্য। সত্য হলো, ‘প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই এক-একটি সমাজবাস্তবতার পরিণাম।’
শিক্ষাবিদ ড. অজয় রায় ‘শিক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধে বলেন, শিক্ষা তো শুধু ব্যক্তিত্ব বিকাশ আর মনোবিকাশ নয়, শিক্ষার সাথে উৎপাদন ও জীবিকার রয়েছে নিকটসম্পর্ক। এটিকে বাদ দিলে জীবন অসহায়।
শিক্ষাবিদ আবুল ফজল ‘রাজনীতি বনাম বুদ্ধিজীবী’ প্রবন্ধে বলেন, দেশের রাজনৈতিক অবস্থা আজ যতই কুৎসিত আর ঘোলাটে হোক-না কেন\যে জনসাধারণ শুধু রাজনৈতিক শক্তির নয় বুদ্ধিজীবীদেরও সবরকম রচনা ও প্রেরণার উৎস, তাদের খাতিরে বুদ্ধির আলোকবর্তিকা রাখতে হবে অনির্বাণ, আর এ রাখার দায়িত্ব বুদ্ধিজীবীদের। দেখতে হবে যুক্তি আর র্যাশনালিজমের পথ\এমনকি সাময়িকভাবেও যেসব সামাজিক বা রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দেয় তার ওপরও ফেলতে হবে যুক্তির ফোকাস।
লোকসংস্কৃতি গবেষক শামসুজ্জামান খান ‘মধ্যযুগের মুসলিম ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতি উদ্ভবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতি’ প্রবন্ধে দেখান, বাঙালি জাতিসত্তাই গড়ে উঠেছে ধর্মনিরপেক্ষতাকে আশ্রয় করে। ফলে, যে দেশজ চিন্তা-চেতনা ও দর্শনে বাঙালির বাঙালিত্ব বা দেশগত সত্তা, তার ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতায়; অন্যকথায় ধর্মনিরপেক্ষ না হলে বাঙালি হওয়া সম্ভব নয়। ধর্মনিরপেক্ষ না হলে গণতান্ত্রিক হওয়া যায় না। এটা একটা সর্বজনীন সত্য। বাংলার ইতিহাসেও এর প্রমাণ মেলে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. গোলাম মুরশিদ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে অভিমত দেন, ধর্মনিরপেক্ষ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিজীবনে যে-ধর্মেই বিশ্বাস করুন-না কেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করার সময়ে তিনি যদি বারংবার বিশেষ ধর্মীয় শপথবাক্য উচ্চারণ করেন (যেমন ইনশাআল্লাহ), তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতার স্পিরিট ক্ষুণœ হয় কি না, সেটাও ভেবে দেখার মতো বিষয়। আল্লাহ, গড্ বা ভগবানের নামে বারবার শপথ করলে তখন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা স্বস্তি কিংবা আত্মবিশ্বাস ফিরে পান কি না, সে-বিষয়ে সন্দেহ করার অবকাশ আছে।
শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক আবুল মোমেন ‘সেকুলারিজম: বাংলাদেশের বাস্তবতা থেকে কিছু ভাবনা’ প্রবন্ধে বলেন, এই উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রচলিত ধারণা হলো, নাগরিকদের ধর্ম থাকবে তবে রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম থাকবে না। ইংরেজি সেকুলার শব্দের বিপরীত কোনও পাল্টা শব্দ নেই। এর সহজ কারণ, রাষ্ট্রসাধনার সঙ্গে সঙ্গে ধারাবাহিক নানা সংগ্রাম-সাধনার একপর্যায়ে গণতন্ত্রের আবশ্যিক অনুষঙ্গ হিসেবে এই প্রত্যয়টি তাদের মনে তৈরি হয়েছে। পশ্চিমের সেকুলারিজমের ধারণার সঙ্গে এখানকার ধারণার একটি সংমিশ্রিত চেতনার আলোকে সেকুলারিজম শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে তিনি মনে করেন, বিশ্বাসীর সেকুলারিজমে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।
শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক অধ্যাপক যতীন সরকার ‘ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনিরপেক্ষ ধর্ম’ প্রবন্ধে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বিশ্বাস ও আচারের বিভিন্নতার ভিত্তিতেই বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেও শাস্ত্রব্যাখ্যার বিভিন্নতার জন্য উদ্ভব ঘটে একাধিক উপ-সম্প্রদায়ের। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ধর্মের এরকম বিভিন্নতাকে স্বীকৃতি দেয় না, কোনও একটি বিশেষ ধর্মের বিশেষ ভাষ্যকে একমাত্র সত্য বলে ঘোষণা করে এবং অন্য সব ধার্মিকের বিশ্বাস ও শাস্ত্রভাষ্যকে কোণঠাসা করে রাখে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের বিবেকের স্বাধীনতাও অপহরণ করে। এভাবে ধর্মীয় রাষ্ট্র পরলোক-বিশ্বাসী পবিত্র ধর্মকে ইহলৌকিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন করে ফেলে বলেই প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তি কখনও ধর্মীয় রাষ্ট্রকে মেনে নিতে পারে না। যুক্তিবাদী লেখক প্রবীর ঘোষ ‘ধর্মনিরপেক্ষতার মুখ ও মুখোশ’ প্রবন্ধে দেখান, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ কথার অর্থ, কোনও ধর্মের পক্ষে নয়। এই অর্থ বা সংজ্ঞার জোরেই আজও কিছু ভারতীয় শোরগোল তুলতে পারেন\এদেশের রাষ্ট্রনায়কেরা কেন ধর্মসভায় যাবেন, কেন ধর্মগুরুদের সঙ্গে বেশি গা-ঘষাঘষি করবেন? এ-দেশের প্রগতিশীলদের চোখে এই ধরনের রাষ্ট্রনায়কেরা প্রগতিবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হন।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ‘ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার’ প্রবন্ধে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে যুদ্ধ হলো এবং দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে বিভিন্ন সরকারের সময় এই ধর্মনিরপেক্ষতা উঠিয়ে দিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রবণতা শুরু হয়, যা আজও বহমান। বর্তমানে রাজনীতির অন্যতম নির্ভরতার আশ্রয় হচ্ছে ধর্ম। তাই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের পাশাপাশি চলছে ধর্মের অপব্যবহার। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত ‘ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মভিত্তিক মৌলবাদ মৌলবাদী জঙ্গিত্ব: কিছু প্রারম্ভ কথা’ প্রবন্ধে দেখান, ১. ‘বিশ্বাস হিসেবে ধর্ম’ এবং ‘মতাদর্শ হিসেবে ধর্ম’ এক কথা নয়; ২. ‘ধর্মপ্রাণ’ ও ‘ধর্মান্ধ’ এক কথা নয়; ৩. ‘ধর্মবিশ্বাস’ ও ‘ধর্মীয় গোঁড়ামি’ এক কথা নয়; ৪. ‘ধর্মবিশ্বাস’ ও ‘ধর্মান্ধতা’ এক কথা নয়; ৫. ‘ধর্মভীরু’ ও ‘ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ এক কথা নয়; ৬. ‘ধর্মপ্রবণ’ ও ‘ধর্মীয় কুসংস্কারপ্রবণ’ এক কথা নয়; ৭. ‘ধর্ম’ এবং ‘ধর্ম নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি’ এক কথা নয়। ধর্ম, ধার্মিক, ধর্মান্ধতার বহিঃপ্রকাশ এবং এসবের গূঢ় অর্থ নিয়ে আমাদের ভাবনাচিন্তা-সিদ্ধান্ত যথেষ্ট মাত্রায় ঘোলাটে। তিনি ‘ধর্মভিত্তিক মৌলবাদ ও মৌলবাদী জঙ্গিত্ব: রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সূত্রবদ্ধকরণ’ প্রবন্ধে এক তাত্তি¡ক বক্তব্যে বলেন, আমরা আগুন দেখতে পারি, আমরা ধোঁয়াও দেখতে পারি, কিন্তু আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক দেখতে পারি না; আগুন যে ধোঁয়ার কারণ আর ধোঁয়া যে আগুনের কার্য বা ফল এটা আমরা দেখতে পারি না। ধর্ম ও রাষ্ট্র পর্বে প্রথম লেখক শিক্ষাবিদ আবুল ফজল। তিনি ‘ধর্ম ও রাষ্ট্র’ প্রবন্ধে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের সত্যিকার স্বরূপ ও যথার্থতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র শাসিত, পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় কতগুলো আইন ও বিধিবিধানের দ্বারা\যার রচয়িতা মানুষ। আর এসব আইন ও বিধিবিধান রচিত হয়েছে রাষ্ট্রের অন্তর্গত মানুষের সুখ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও ক্রমোন্নতির দিকে লক্ষ রেখে। এ সম্পূর্ণভাবে জাগতিক পার্থিব ব্যাপার, এর সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার কোনও সম্পর্কই নেই। শিক্ষাবিদ ও ক‚টনীতিক জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ধর্ম ও রাষ্ট্র’ প্রবন্ধে দেখান, প্রাচীন রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপত্তির সময় থেকেই শাসকশ্রেণির স্বার্থে রাষ্ট্র ধর্মকে শোষণ-শাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে ধর্ম জনসাধারণের জীবনে প্রভাব বিস্তার করেছে আর সেই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে শাসকশ্রেণি তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি নিশ্চিত রেখেছে। রাজদÐের প্রভাবেই সম্ভব হয়েছে পৃথিবীব্যাপী ধর্মের প্রচার। ধর্ম থেকে রাষ্ট্রের মুক্তি আদৌ সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত শ্রেণিবিভক্ত সমাজের পরিবর্তে মানুষের সাম্য প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে। ‘ধর্ম ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’ প্রবন্ধে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, যেসব দেশের জাতীয় জীবনে এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধর্মের প্রভাব প্রবল, তারা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ধর্মকে কোনও-না-কোনওভাবে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে থাকে। শুধুমাত্র সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে গড়ে-ওঠা বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পৃথিবীর সমগ্র মানবসমাজে আর্থিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সুরক্ষা এবং সাম্য, স্বাধীনতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। একমাত্র সাম্য ও স্বাধীনতা অধিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণেই পৃথিবীর বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকার জনসাধারণের সর্বাঙ্গীণ সুরক্ষা ও বিকাশ সম্ভব।
প্রবাসী শিক্ষাবিদ মণিকুন্তলা সেনের ‘দাঙ্গা, দেশভাগ, স্বাধীনতা’ রচনাটি দেশভাগের দুঃসহ স্মৃতিরোমন্থনমূলক। এ রচনায় তাঁর অন্তিম অভিব্যক্তি ‘দ্বিজাতিতত্তে¡ কখনও আমার সায় ছিল না।... সবচেয়ে দুঃখ পেলাম যখন জানলাম আমার পার্টিও এই তত্তে¡র ভিত্তিতে দেশভাগে সায় দিয়েছে।... ভাবতেই ভয় পাচ্ছি আমরা আর একপ্রাণ ভারতবাসী নই, দুই জাতি হয়ে গেছি।’
যুক্তিবাদী লেখক শীতাংশু চট্টোপাধ্যায় ‘সেকুলার রাষ্ট্র, সেকুলারিজম ও ধর্ম’ প্রবন্ধে বলেন, শিক্ষা হবে সেকুলার অর্থাৎ ধর্মবর্জিত। কেননা ধর্ম মানুষের মনকে অন্ধবিশ্বাসে আচ্ছন্ন করে। তাতে তার সহজাত যুক্তিশীলতা অভিভূত হয়। তাছাড়া বিভিন্ন ধর্মমতে বিশ্বাসী লোকেরা স্ব স্ব ধর্মমতে অন্ধবিশ্বাসবশত অপর ধর্মমত সম্পর্কে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে; সেজন্য বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে, সামাজিক শান্তি ও সুস্থিতি বিঘিœত, জাগতিক উন্নতি ব্যাহত হয়। প্রাবন্ধিক সুদেষ্ণা চক্রবর্তীর ‘ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের তাৎপর্য ও উৎস’ প্রবন্ধের বক্তব্য, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র সোনার পাথরবাটি। ধর্ম কেবল পরলোকের কারবার করে না। ইহলোকও তার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে। বস্তুত, ইহলোকের মধ্য দিয়েই পরকালের সাধনা। ধর্মের বাধানিষেধ-নিয়মনীতি রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে বাধ্য। রাষ্ট্রের সঙ্গেও অচ্ছেদ্য বন্ধনে যুক্ত।
প্রাবন্ধিক অনন্ত বিজয় দাশ ‘প্রসঙ্গ রাষ্ট্রধর্ম’ প্রবন্ধে বলেন, রাষ্ট্রধর্মের ধারণাটি মোটামুটি প্রাচীন। সভ্যতার গঠনকালীন অবস্থায় মানবসমাজের সংগঠন ছিল উপজাতীয় আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। এখনকার মতো তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় সংগঠন বা রাজনৈতিক একক গড়ে ওঠেনি। শিক্ষাবিদ শফিকুর রহমান ‘সাম্প্রদায়িকতার সমাধান: ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র’ প্রবন্ধে বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ দেশে ধর্মপালনের স্বাধীনতা খর্বিত হয়েছে\একথা ওসব দেশ সফর করে এসে কেউ বলেননি। তাহলে ওরকম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা শুনলে ধার্মিকের রক্তচাপ বেড়ে যায় কেন? হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি পেয়ে তা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় কেন? তার একমাত্র কারণ কি এই নয় যে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক মাতলামি ও মানুষ মেরে স্বর্গে যাওয়ার চেষ্টাকে নিরুৎসাহিত করা হয়? নাকি কাউকে জিম্মি বা দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে শোষণ ও শাসন করার রাস্তা রুদ্ধ করা হয় বলে? নাকি সকল নাগরিকের সমান রাষ্ট্রীয় অধিকার দেওয়া হয় বলে? এ যদি সত্য হয় তবে আমার কথাই ঠিক যে, অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা, অগণতন্ত্র, অসাম্য ও রক্তারক্তিরই অপর নাম ধর্ম। আর যদি তা না হয় তাহলে তো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনপ্রকার আপত্তি থাকার কথা নয়।’
সুলেখক অমলকুমার মÐল ‘ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান, হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং মুসলমান সম্প্রদায়’ প্রবন্ধে ভারতীয় সংবিধানে হিন্দু জাতীয়তা ও মুসলমান সম্প্রদায়ের পারস্পরিক স্বার্থের সমন্বিত চেতনার অনুক‚লে অভিমত ব্যক্ত করে বলেছেন, জাতীয় সংহতি, দেশের অখÐতা এবং ভারতবাসীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বিষয়ে ড. আম্বেদকরের মতো কোনও ভারতীয় নেতাই ভাবেননি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদী উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের হাতে রাজক্ষমতা হস্তান্তরিত হলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার বিষয়ে তিনি যা ভেবেছিলেন তারই প্রতিফলন ঘটেছে ভারতীয় সংবিধানে। ‘নেহেরু ও তাঁর কংগ্রেস: মুসলিম ও তাঁদের লিগ’ প্রবন্ধে তিনি দেখান, জওহরলাল নেহেরু ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে পাশ্চাত্য মডেল অনুসরণ করেছিলেন, যা জাত-জর্জরিত ভারতীয় জটিল সমাজবিন্যাসে সফল মাত্রা পায়নি। ভারতের সামাজিক মূল্যবোধ আলাদা। এর মাটি আলাদা। কাজেই বিদেশ থেকে একটি গাছ এনে এ মাটিতে পুঁতলে তার ফল ভালো হবে কী করে! ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে আছে। ফলে তাঁদের নেতৃত্বাধীন ও জীবদ্দশায় ভারতে সংঘটিত হয়েছে অনেক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সর্বোপরি নেহেরু-আমলের দাঙ্গার তিক্ত প্রভাব সারা ভারতে বিস্তৃত হয়। ‘দেশভাগ: জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস, জিন্না, আজাদ ও গফফর খান’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, আবুল কালাম আজাদ, খান আবদুল গফফর খান তথা সীমান্ত গান্ধী কংগ্রেসি জাতীয়তাবাদী চেতনায় আমৃত্যু বিলগ্ন থাকলেও তাঁরাও কিন্তু জীবনের শেষের দিকে হিন্দুনেতাদের কার্যকলাপে পুরোপুরি খুশি হতে পারেননি। আজাদ সম্পর্কে বলতে গেলে নিঃসংকোচে বলা যায়, জাতীয়তাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ নেতা হিসেবে তাঁর জীবনে কোনও ভান ছিল না। অসাম্প্রদায়িক হিসেবে তিনি ছিলেন সবার কাছে শ্রদ্ধেয়। আজাদ ছিলেন একজন প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, একনিষ্ঠ ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রকৃত জাতীয়তাবাদী নেতা। স্বার্থক্লিষ্ট সংকীর্ণতা এবং সম্প্রদায়গত পক্ষপাতিত্ব তাঁর মধ্যে ছিল না। গান্ধী জীবন বিসর্জন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন তিনি মুসলমানকে ভারতাত্মার অংশ জ্ঞান করেছিলেন। তাঁর এই চিন্তার ফসল আবুল কালাম আজাদ। তিনি আবুল কালাম আজাদের মতো সৎ, সাধু, ধর্মপরায়ণ, সন্ন্যাসীকে সহযোগী যোদ্ধা হিসেবে পেয়েছিলেন।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র চতুর্দশ খÐে একুশজন লেখকের চৌত্রিশটি প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘চিত্তশুদ্ধি’ প্রবন্ধে বলেন, মানবচরিত্রের একটি মহত্তম দিক ইন্দ্রিয়সংযম। ইন্দ্রিয়ের আসক্তি নিরসনে নিরন্তর প্রয়াসী ব্যক্তিই প্রকৃত উপাস্য ব্যক্তি। ক্রমাগত অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষ ইন্দ্রিয় আসক্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে। আর ইন্দ্রিয়সংযমে সমর্থ ব্যক্তিই প্রকৃতপক্ষে ধার্মিক ও নান্দনিক। ভোগলিঞ্ঝু ব্যক্তি ধার্মিক নয়\এরা চিত্তবিকারগ্রস্তের অন্তর্ভুক্ত। এদের অন্তরে মানবিক সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয় না। মানবিক বোধবুদ্ধি তিরোহিত ব্যক্তির কোনও উপাসনাই নান্দনিকতার মধ্যে গণ্য নয়। কেননা সব ইন্দ্রিয়পরায়ণতা থেকে যিনি নিজের চিত্তের শুদ্ধি অর্জনে সমর্থ হয়েছেন তার আর ধর্মের প্রয়োজন নাই। চিত্তশুদ্ধি সব ধর্মেরই সার। তাই যাঁর চিত্তশুদ্ধি নাই তিনি কোনও ধর্মানুসারীর মধ্যে গণ্য নন। বিশিষ্ট শিক্ষাব্রতী ও সমাজসেবী অশ্বিনীকুমার দত্ত (১৮৫৬-১৯২৩) রচিত ‘ভক্তি কাহাকে বলে?’, ‘ভক্তির অধিকারী কে?’, ‘ভক্তির সঞ্চার হয় কিরূপে?’ ‘ভক্তিপথের কণ্টক ও তাহা দূর করিবার উপায়’, ‘ভক্তিপথের সহায়’, ‘ভক্তির ক্রম ও ভক্তের লক্ষণ’, ‘প্রেম’\এই সাতটি লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ লেখাগুলোর মূল লক্ষ ধার্মিকের হৃদয়ে সত্য, প্রেম ও পবিত্রতা প্রতিষ্ঠা করা। হিন্দুধর্মের আন্তরসৌন্দর্য সাধনায় ভক্তিযোগ, কর্মযোগ, প্রেমকেই প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। ধর্মের নান্দনিকতাই প্রস্ফুটিত করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ধর্মের সরল আদর্শ’ প্রবন্ধে দেখান, দিনের আলোক যেমন কেবলমাত্র চক্ষু মেলার অপেক্ষা রাখে, ব্রহ্মের আনন্দ তেমনি হৃদয়-উন্মীলনের অপেক্ষা রাখে মাত্র। আমাদের অভাব কেবল সত্যের আলোকের অভাব, অমৃতের অভাব\আমাদের জীবনের সমস্ত দুঃখ পাপ নিরানন্দ কেবল এজন্যই। সুখ যিনি চান তিনি সন্তোষকে গ্রহণ করবেন, সন্তোষ যিনি চান তিনি সংযম অভ্যাস করবেন। একথা বলবার তাৎপর্য এই যে, সুখের উপায় বাইরে নেই, তা অন্তরেই আছে\তা উপকরণজালের বিপুল জটিলতার মধ্যে নেই, তা সংযত চিত্তের নির্মল সরলতার মধ্যে বিরাজমান।
স্বামী বিবেকানন্দ ‘বিশ্বজনীন ধর্মের আদর্শ’ প্রবন্ধে এমন একটি ধর্মের প্রস্তাব করেছেন যা তাঁর মতে, ‘বিশ্বজনীন’\‘সমভাবে দর্শনমূলক, তুল্যরূপে ভক্তিপ্রবণ’, সমভাবে ‘মরমি’ এবং ‘কর্মপ্রেরণাময়’। এ-ধর্ম ‘জগতের একত্ব ও বিশ্বময় একই সত্তার অস্তিত্ব শিক্ষা’ দেওয়ার সামর্থ্য ধারণ করে। কর্মীর দৃষ্টিতে এটি ব্যক্তির সঙ্গে সমগ্র মানবজাতির অভেদ-ভাব; মরমির দৃষ্টিতে জীবাত্মা ও পরমাত্মার একত্বসাধন; ভক্তের কাছে নিজের সঙ্গে ‘প্রেমময় ভগবানের মিলন’ এবং জ্ঞানীর কাছে এটি ‘নিখিল সত্তার ঐক্য-বোধ।’ ‘বিশ্বজনীন ধর্মলাভের উপায়’ প্রবন্ধে বিবেকানন্দ মতপ্রকাশ করেন, পৃথিবীতে প্রতিটি ব্যক্তির, ধর্মের, সম্প্রদায়ের একটা স্থান রয়েছে। এসব বিচিত্র মন ও ভাবাদর্শের প্রয়োজনও আছে। বিশ্বজনীন ও আদর্শ ধর্ম প্রতিষ্ঠায় সেসবকে বর্জন করলে চলবে না বরং এক্ষেত্রে ‘গ্রহণ’ই মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। মুসলমানদের মসজিদে, খ্রিস্টানদের গির্জায়, বৌদ্ধদের বিহারে\সব ধর্মের সর্বত্র, সব ধর্মগ্রন্থের মর্মে প্রবেশ করা উচিত; যে মহাপুরুষেরা পৃথিবীতে আসেননি তাঁদের প্রতিও শ্রদ্ধা পোষণ করা উচিত।
বাংলাসাহিত্যে দর্শনের ভাষ্যকার শশীভ‚ষণ দাশগুপ্ত ‘মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম ও বেদান্ত’ প্রবন্ধে বলেন, মহাযান বৌদ্ধশাস্ত্রে এসে দেখা যায়, ‘রূপকায়’ ‘অরূপ-কায়’কে অবলম্বন করে বুদ্ধদেবের তিনটি কায়-এর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই তিনটি কায় হলো যথাক্রমে নির্মাণকায়, সম্ভোগকায় ও ধর্মকায়। তান্ত্রিক বৌদ্ধেরা এই ত্রিকায়ের সঙ্গে যুক্ত করে দিলেন ‘বজ্রকায়’ বা ‘সহজকায়’। নির্মাণকায় হলো মানুষি বুদ্ধ\রক্তমাংসের দেহে আবির্ভূত। আর সম্ভোগকায় হলো জ্যোতির্ময় আনন্দময় দেহ। বিশ্বের এমন কোথাও কিছু নেই যা এই ধর্মকায়ের বাইরে। বিশ্ব পরিবর্তনশীল কিন্তু ধর্মকায় নিত্য অবিনাশী। বুদ্ধের ধর্মকায় সম্বন্ধে এই জাতীয় বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় এই চিন্তাদর্শন আসলে ঔপনিষদিক চিন্তাধারা এবং বর্ণনার দ্বারা প্রভাবিত যা প্রকৃতপক্ষে বেদান্তের নির্বিশেষ। এ খÐে নীতিবাদী লেখক ও সমাজচিন্তক ডা. লুৎফর রহমানের পাঁচটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। ‘ধর্ম জীবন’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, মুসলমান সমাজে ইসলামধর্মের নিয়মই ধর্মে পরিণত হয়েছে। যেমন, নামাজ-রোজা ইত্যাদি। ভাবা হয়\এতে ‘সোয়াব’ হবে। আসলে এইসব নিয়ম পালনে পুণ্যের কিছু নেই। ন্যায়ের জন্য, সত্যের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য দুঃখ সহ্য করার মধ্যেই রয়েছে ধর্মের প্রকৃত সাধনা। তিনি ‘ধর্মের ব্যাখ্যা’ প্রবন্ধে দেখান, কেবল আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা ও উপাসনাই ধর্ম নয়। আত্মায় ঈশ্বরকে অনুভব করতে হবে। মিথ্যা ও অকল্যাণকে দলিত করে সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ঈশ্বরের একত্বে বিশ্বাস করতে হবে। পাপকে ঘৃণা করতে হবে। সর্বপাপমুক্ত হওয়াই ইসলামধর্মের আসল কথা। এর সঙ্গে লোক-দেখানো আনুষ্ঠানিকতার কোনও সম্পর্ক নেই। ‘ধর্মের জীবিত উৎস’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে ধর্ম অনেক বড়। অন্তরে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলাই ধর্ম। ইসলাম, খ্রিস্ট, বৌদ্ধ\সব ধর্মেই পাপপুণ্য, ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা এক। সব পাপ ও অন্যায়কে বর্জন করার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়নি, কেবল প্রার্থনা করো, নামাজই পড়ো। শুধু নামাজ পড়লেই মন্দ ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় হয়ে ওঠে না। ‘ধর্ম কি চোখে দেখলাম’ প্রবন্ধে তাঁর অভিমত, মানুষ ধার্মিক হয় আপন-আপন ধর্ম-নির্দেশিত কাজ দিয়ে, আনুষ্ঠানিক ধর্মপালনের মধ্য দিয়ে নয়। নামাজ পড়লেই ধার্মিক হয় না। ধার্মিক হয় সততা ও উৎকৃষ্ট মানবিক গুণের মধ্য দিয়ে। ‘পবিত্র আত্মা’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, পবিত্র আত্মাকে কোরানে ‘রুহে কুদ্দুস’ বলা হয়েছে। ন্যায়-অন্যায় কী, পবিত্র আত্মাই তা বুঝিয়ে দেয়। যারা পবিত্র আত্মায় অবিশ্বাসী, তাদের ধর্মহীন বলা যায়। বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির বিশিষ্ট চিন্তক ও ভাষ্যকার এস. ওয়াজেদ আলি ‘ধর্ম ও সমাজ’ প্রবন্ধে বলেন, ইসলাম ‘এলহামী’ বা অনুপ্রেরণার ধর্ম। এর বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক, ব্যবহারিক আর আধ্যাত্মিক দিক মানবসমাজের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইসলাম সন্ন্যাসধর্মকে গুরুত্ব দেয়নি, বরং উৎসাহিত করেছে সংসারধর্মকে। ব্যক্তি ও সমষ্টি\উভয়ের প্রতি ইসলামের দৃষ্টি রয়েছে। দৃষ্টি রয়েছে সংসারজীবনে মানুষের নানা সমস্যার প্রতিও। এসব মিলছে পবিত্র কোরআনেই। কাল্পনিক, অযৌক্তিক বলে একে নাকচ করে দেওয়া উচিত নয়, কারণ মানবজীবনের সঙ্গে এর নানামাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ ‘ইছলামে উদারতা’ প্রবন্ধে বলেছেন, ইসলামের বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও সাম্য\যার উৎস একেশ্বরবাদ। নারী সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি পরম ঔদার্যময়। পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রে নারীর অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও ইসলাম উৎসাহ দেয়। রাজ্যশাসনে ইসলামের বিধান সভ্যতম, কেননা, মুসলমান-অমুসলমান সব নাগরিকের সমান পৌর-অধিকার এতে স্বীকার করা হয়েছে। পরধর্মসহিষ্ণুতা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য। ইসলামের এই ঔদার্য, এই সর্বজনীনতার শিক্ষা ও প্রেরণা তার কোরান ও হাদিস। ‘ইছলামে জীবন ও মূল্যবোধ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, জীবন সম্বন্ধে ইসলাম বলেছে আলাদা কথা। ইসলামের আল্লাহ মানুষের সৃষ্টিকালেই তার ভেতরে নিজ অন্তঃপ্রকৃতি অনুপ্রবেশ করে দিয়েছেন। কাজেই মানুষ পাপের সন্তান নয়। সে কোনও খোদায়ী অভিশাপের কলঙ্কতিলক ললাটে নিয়ে এ-ধরায় আসে না, তার অন্তঃপ্রকৃতি বাসনার কালিমায় অনুলিপ্ত নয়। ‘ইছলামের মর্মকথা’ প্রবন্ধে তাঁর অভিমত এই যে, ধর্মকে ইসলাম সরল, সহজ ও প্রকৃতি-সংগত করে সর্বসাধারণের আয়ত্তের ভেতরে এনে দিয়েছে। ইসলামের মতে, ধার্মিক হওয়ার জন্য বিজন জঙ্গলে, পর্বতগুহায় বা নির্জন মরুভ‚মিতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ওসমান গনী ‘ইসলামে উদারতা ও সহনশীলতা’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, ইসলাম মানবজাতির জীবনমান উন্নয়নে ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যেসব সর্বমানবীয় কল্যাণ সুনিশ্চিত করেছে, তা ইসলামের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যের প্রকাশ। শিল্প ও সাহিত্য সমালোচক মণি বাগচি ‘শিল্পে ও সাহিত্যে বৌদ্ধধর্ম’ প্রবন্ধে বলেন, সৌন্দর্যের প্রতি অসীম অভীঞ্ঝা বৌদ্ধধর্মের একটি বড় নান্দনিক দিক। বুদ্ধদেবের একটি উপদেশ আছে: ‘যেমন এক-একটি ফুল গেঁথে গেঁথে একছড়া চমৎকার মালা হয়, তেমনি এক-একটি মানুষকে দিয়ে সমাজের মহত্ত¡র কল্যাণ সাধিত হতে পারে।’ বৌদ্ধ-দর্শনের উচ্চতর চিন্তার মধ্যে যে শিল্পবোধ, যে-সৌন্দর্যবোধ অন্তর্নিহিত, তা ভারতের জনমানসের নান্দনিক চেতনাকে আলোড়িত করেছে। বৌদ্ধ-ভারতের সৌন্দর্য-সুষমার মধ্যে আজও মানবচিত্ত উদ্ভাসিত।
নন্দনতত্তে¡র বিশিষ্ট ভাষ্যকার বিপিনচন্দ্র পাল ‘ধর্ম ও আর্ট’ প্রবন্ধে বলেন, ধর্মচেতনার সর্বোৎকৃষ্ট অনুভ‚তি নান্দনিকতা। সৌন্দর্যবিমুখ ব্যক্তির মননজগতে ধর্মের নান্দনিকতা জাগ্রত হয় না। ধর্মানুভ‚তির জন্য নান্দনিক অনুভ‚তি পারস্পরিক পরিপূরক। নান্দনিক চেতনাই মানুষের মরমি অনুভ‚তিকে আরো পরিশীলিত করে। প্রাবন্ধিক কমল সরকার ‘সমকালের চিত্রকলায় বুদ্ধদেব’ প্রবন্ধে বলেন, সুপ্রাচীনকাল থেকে ভারতশিল্পের প্রধান বিষয় বুদ্ধের জীবনকাহিনি। মথুরা, গান্ধার ও সারনাথের মূর্তিকলার বিষয় বোধিসত্তে¡র রূপকল্প। অমরাবতীর অনুপম ভাস্কর্যকলায় নান্দনিক ছন্দে উৎকীর্ণ করা হয়েছে জাতক ও বুদ্ধদেবের কাহিনি। অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ ‘ধর্মের নান্দনিকতা এবং একটি কাব্যতত্তে¡র ভ‚মিকা’ প্রবন্ধে দেখান যে, ধর্মের নান্দনিকতা আছে, কিন্তু সে-সম্পর্কে বেশির ভাগ আলেম বা ধর্মবেত্তা অবগত নন। আমাদের ধর্ম অর্থাৎ ইসলাম যিনি প্রচার করেছেন তিনি সুন্দরের অনুরাগী ছিলেন। তিনি ফুল ভালোবাসতেন, শিশুদের ভালোবাসতেন, নারীকে ভালোবাসতেন, সুগন্ধি ভালোবাসতেন। তিনি ধর্মের বিধিবিধানকে, বিশেষ করে তাঁর নিজের জীবনচর্যাকে সাজিয়েছেন সুন্দরের নীতিতে। নামাজেরও নান্দনিকতা আছে, যা না হলে নামাজ সম্পূর্ণ হয় না। নান্দনিকতার সঙ্গে সৌন্দর্য এবং আনন্দের নিবিড় যোগাযোগ আছে। কিন্তু এই আনন্দ ও সৌন্দর্যের সঙ্গে স্বার্থের কোনও লেনদেন নেই, যদিও মানুষ এই আনন্দ ও সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে।
শিক্ষাবিদ ও ইসলামি চিন্তাবিদ ড. মো. আতাউর রহমান মিয়াজী ‘চিত্রকলার প্রতি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী: একটি সমীক্ষা’ প্রবন্ধে জানান, মুসলিম চিত্রকলার প্রকৃত মূল্যায়ন এবং বিশ্বশিল্পকলার প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব নিরূপণে যিনি পথিকৃৎ, তিনি হচ্ছেন ওধর ক. ঘ. ইরভমফঢ। তাঁর লিখিত কদণ টেধর্ভধভথ ধভ অ্রফটব গ্রন্থে সৃজনশীল শিল্প সৃষ্টিতে মুসলিম অবদানের সঠিক রূপরেখার ইঙ্গিত পরিলক্ষিত হয়। তিনি তীক্ষè মননশীলতা এবং সূ² বিচার-বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে অতি বিতর্কিত মুসলিম চিত্রকলার বিভিন্ন দিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করেন।
গবেষক এ. এন. এম. নূরুল হক ‘ধর্মে নান্দনিকতা’ প্রবন্ধে বলেন, ইসলামধর্মে নান্দনিকতার বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও এই ধর্মের ধর্মবেত্তা বা আলেমদের কাছে বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। ইসলামধর্মে নান্দনিকতার বিষয়ে আলেমসমাজের জ্ঞানের অপর্যাপ্ততা বা অনীহা, যে-কারণেই হোক-না কেন, বিষয়টি সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে প্রচার পায়নি। ফলে ধর্মের মধ্যে যে নান্দনিকতা রয়েছে, এ কথাটি নিরানব্বই ভাগ মুসলমানের কাছে পাথরে প্রাণ থাকার মতোই অবিশ্বাস্য মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। মানুষ সৃষ্টিতে আল্লাহর এক বিস্ময়কর বৈচিত্র্যও প্রকাশিত হয়েছে। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের কারও সঙ্গে কারও চেহারার হুবহু মিল নেই। এমনকি প্রতিটি মানুষের কণ্ঠস্বরেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। এটিই হচ্ছে মানুষ সৃষ্টিতে আল্লাহর কারিগরি নৈপুণ্য বা নান্দনিকতা। সুপরিমিতভাবে বিশ্বব্রহ্মাÐ সৃষ্টির মধ্যে যে অপূর্ব নান্দনিকতা রয়েছে তা অবলোকন করে অভিভ‚ত হয়েছেন ধর্মানুসারী ছাড়াও বহু চিন্তাশীল ব্যক্তি। শিক্ষাবিদ ও ইসলামি চিন্তক মুহম্মদ সিরাজুল ইসলাম ‘ইসলামের দৃষ্টিতে ললিত-কলা’ প্রবন্ধে বলেছেন, যদি পবিত্র কোরআনকে ভিত্তি করে আমরা শিল্পের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করতে বসি, তাহলে দেখতে পাই যে, কোরআন এ-সম্বন্ধে প্রায় নির্বাক। বস্তুত শিল্পের পক্ষে অথবা বিপক্ষে এমন কোনও উক্তি কোরআন শরীফে নেই, যাকে ভিত্তি করে আমরা আলোচ্য ক্ষেত্রে কোনও প্রকার স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারি। সাধারণত বলা হয়ে থাকে যে, পৌত্তলিকতা নির্মূল করার উদ্দেশ্যে হজরত মুহম্মদ (স.) নিছক শিল্পের খাতিরে নির্মিত অথবা অঙ্কিত মানুষের ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতির বিরোধী ছিলেন। যুক্তিটি অবান্তর শোনায় না। কিন্তু এই অভিমত অকাট্য সপ্রমাণ করা যায়, এমন কোনও স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ হাদিস পাওয়া যায়নি। যেসব হাদিসে তাঁকে মানুষের ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতির বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে, সেখানে তিনি পট-শিল্পের চিত্রাঙ্কনকে খোদার সৃষ্টি-ক্ষমতা অনুকরণের ধৃষ্টতা বা দুঃসাহস ও ব্যর্থ প্রচেষ্টা বলে আখ্যায়িত করেছেন। খ্যাতিমান লেখক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ‘মুসলিম চিত্রকলার আদিপর্ব’ প্রবন্ধে বলেন, বিশ্বে আমরা তিনটি প্রচারবাদী ধর্ম লক্ষ করি: ইসলাম, খ্রিস্ট ও বৌদ্ধধর্ম। এই ধর্মত্রয়ের মধ্যে একমাত্র ইসলামই প্রতিকৃতি-চিত্র ও মূর্তিশিল্পের ঘোর বিরোধী। একটি কারণ ইসলামধর্ম পৌত্তলিকতাবিরোধী। কিন্তু অন্য কারণটিও উপেক্ষণীয় নয়, সেটি হলো প্রাক্-ইসলামি আরবসমাজের ওপর ইহুদি-ঐতিহ্যের প্রবল প্রভাব। ঐতিহাসিক তথ্য এবং সমাজবিজ্ঞানের সূত্রে এর ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু পবিত্র কোরআনে সুনির্দিষ্টভাবে চিত্রকলা সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা নেই। শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. এ বি এম হোসেন ‘ইসলামী চিত্রকলা’ প্রবন্ধে ইসলামি মূল্যবোধে নান্দনিকতার গুরুত্ব এবং এর ভৌগোলিক সাংস্কৃতিক ভিন্নতার পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করেছেন। ইসলামি নন্দনতত্তে¡র গবেষক অধ্যাপক ড. রহমান হাবিব ‘ইসলাম ধর্মের নন্দনতত্ত¡’ প্রবন্ধে মুসলিমবিশ্বে নন্দনতত্তে¡র বিকাশ ও বিস্তার নিয়ে আলোচনা করেছেন। অধ্যাপক মো. আবুসালেহ সেকেন্দার ‘ভাস্কর্য নির্মাণের অনুমতি আছে কুরআনে’ প্রবন্ধে ভাস্কর্য বিতর্কের ভ্রান্ত মানসিকতার অযৌক্তিকতা কোরানের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষক এমদাদুল হক চৌধুরী ‘ইসলামে সামাজিক সৌন্দর্য’ প্রবন্ধে বিশেষত বাঙালি মুসলমানদের চিন্তাচেতনায় এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র পঞ্চদশ খÐে বারোজন লেখকের রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘ধর্ম কি?’, ‘মনুষ্যত্ব কি?’, ‘মনুষ্যে ভক্তি’, ‘ঈশ্বরে ভক্তি’ শীর্ষক চারটি প্রবন্ধে মানবীয়বোধের গুরুত্ব, পরমতসহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতিচেতনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিজ্ঞান ও প্রকৃতিবাদী লেখক রামেন্দসুন্দর ত্রিবেদী ‘নানা কথা: আনি বেসান্ট’, ‘বর্ণাশ্রমধর্ম্ম’, ‘ব্রাহ্মণ কি প্রীষ্ট্?’ শিরোনামে তিনটি প্রবন্ধে ধর্মীয় আচরণে পরমতসহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতিচেতনার ভ‚মিকা তুলে ধরেছেন। এ খÐে ‘সম্প্রীতি-চেতনা’ শিরোনামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্প্রীতিবিষয়ক একগুচ্ছ প্রবন্ধ-নিবন্ধ-বক্তব্য-অভিমত ও চিঠি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ধর্মে পরমতসহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতিচেতনা রবীন্দ্র-রচনায় নানা জায়গায় নানাভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। নানা প্রাসঙ্গিকে উপস্থাপিত এই বিষয়টি রবীন্দ্র-মানসচেতনা বিশ্লেষণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। সমগ্র রবীন্দ্র-রচনায় ছড়িয়ে আছে সম্প্রীতিভাবনায় রবীন্দ্রনাথের এসব প্রাসঙ্গিকী মন্তব্য ও অভিমত। এসব প্রাসঙ্গিকী সূত্র থেকেই সংকলিত হয়েছে রবীন্দ্র-রচনায় সম্প্রীতিভাবনার নানা দিগ্দিগন্ত।
বাঙালির ধর্মচেতনার অবিসংবাদিত ভাষ্যকার স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) রচিত ‘হিন্দু ও খ্রিস্টান’, ‘ভগবান্ বুদ্ধ’, ‘বুদ্ধের বাণী’, ‘ঈশ্বরের দেহধারণ বা অবতার’, ও ‘বৌদ্ধভারত’\এই পাঁচটি রচনা সংকলিত হয়েছে। এ রচনাগুলো পাশ্চাত্য দেশে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতার লিখিত রূপ। এ রচনাগুলোতে ভারতীয় ধর্মের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতবর্ষ সর্বদাই পরধর্মসহিষ্ণু ও ‘যত মত তত পথ’-এর অভিমুখে ধাবমান। পরমতসহিষ্ণুতাই বাঙালির ধর্মচেতনাকে সর্বমানবীয় বোধে মহিমান্বিত করেছে।
মধ্যযুগের বাঙালির ধর্মচিন্তার অন্যতম ভাষ্যকার ক্ষিতিমোহন সেন ‘আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিলন’ প্রবন্ধে দেখান, আর্য-অনার্য সম্মিলনের ফলে ব্রাহ্মণ-শূদ্রের সম্পর্ক উন্নয়ন ও তার সামাজিক প্রভাব, সর্বোপরি মানব-সম্প্রীতির বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে। তখনকার দিনে কোনও কোনও ঋষির যেমন ব্রাহ্মণী পতœী ছিলেন, তেমনি শূদ্রা পতœীও ছিলেন। এই বিপরীত বর্ণ ও গোত্রের বিবাহরীতি কীভাবে সমাজে সহিষ্ণু সম্প্রসারণে ভ‚মিকা রেখেছিল তার সামাজিক বিশ্লেষণ এ প্রবন্ধের মূল বিষয়। ঋগে¦দ, ঐতরেয়, ব্রাহ্মণ প্রভৃতি শাস্ত্র থেকে নানা দৃষ্টান্ত এনে প্রবন্ধকার বৈদিক ও অবৈদিক ধারার যুক্তবেণীর অসংখ্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে প্রাচীন ভারতীয় ধর্মদর্শনে চিকিৎসা-শিক্ষা ও শাস্ত্রের নানাবিধ সমন্বিত স্বরূপের সন্ধান দিয়েছেন, যেখানে আর্য-অনার্যের সংঘাতেরও সম্মিলনেরই সহনীয় মানবীয় স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। গান্ধীবাদী লেখক ও গবেষক শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ‘ভারতে সম্প্রীতি-ভাবনা: গান্ধি অন্নদাশঙ্কর’ প্রবন্ধে গান্ধি-অন্নদাশঙ্কর পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি-ভাবনার একটি চিত্রধর্মী বর্ণনা অভিব্যক্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অন্নদাশঙ্করের বর্ণনা এরকম: ‘গান্ধিজির সংস্পর্শে এসে আমি এই শিক্ষালাভ করি যে, মানুষের প্রাণ রক্ষা করা মানুষের মানবিক কর্তব্য\এখানে রাজনীতির প্রশ্ন ওঠে না। ওঠে না শত্রæ-মিত্রের প্রশ্ন। অথবা বাঙালি-অবাঙালি, হিন্দু-অহিন্দু, ভারতীয়-অভারতীয়ের প্রশ্ন।’ আর এই মৌলিক বিশ্বাসের অনুসিদ্ধান্ত হলো সত্যাগ্রহ। অহিংসাকে নিত্য আচরণীয় জীবনধর্ম হিসেবে স্বীকার করে নেওয়ার অর্থ নিজের আত্মমর্যাদা অথবা মূলগত মানবিক অধিকার জলাঞ্জলি দেওয়া নয়। উৎপীড়ক শোষণকারীর কুকর্মের সম্মুখে নতিস্বীকার করাও নয়। এরকম পরিস্থিতিতে আত্মসম্মান ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য গান্ধীর পথ হলো সত্যাগ্রহের। অন্যায়ের প্রতিরোধ, কিন্তু সম্প্রীতির পথে। এই চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে অন্নদাশঙ্করও ভারতে সম্প্রীতি-ভাবনার জন্য আত্মউন্নয়নের সমাধানসূত্র খুঁজেছেন গান্ধীর পথ ধরেই।
ইতিহাসবিদ গৌতম নিয়োগী ‘রামজন্মভ‚মি বনাম বাবরি মসজিদ: একটি ইতিহাস-বিরোধী বিতর্ক’ প্রবন্ধে দেখান, ইতিহাসবিরোধী মনোভাব এবং বিকৃতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গ্রহণ করছেন ভারতের প্রধান দুই ধর্মসম্প্রদায় বা হিন্দু এবং ইসলাম-ধর্মাবলম্বী মানুষদের সেই অংশ, যারা বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তিবাদী, গণতান্ত্রিক, উদার, অসাম্প্রদায়িক ও সেকুলার, মানবতাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক সাম্যবাদে বিশ্বাসী নন। এককথায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবেই ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথমেই আরও স্বীকার করতে হবে যে, বর্তমানে এই বিরোধ শুধু ইতিহাসের সাক্ষ্যপ্রমাণ বা ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি, বরং ভালোভাবে খতিয়ে দেখলে ভারতীয় রাজনীতিতে এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অধুনা যে সাম্প্রদায়িক তামসিকতার গভীর প্রভাব পড়েছে, সেই বৃহত্তর পটভূমিকা থেকেই এই বিরোধের জন্ম। ক্ষমতা ও রাজনীতির দ্ব›েদ্ব কিছু ভেদপন্থি, চতুর, সংকীর্ণ, স্বার্থান্ধ এবং মতলববাজ দল বা গোষ্ঠী যদি সাধারণ মানুষের ধর্মীয় সারল্য, ধর্মবিশ্বাস এবং মনের আবেগকে ইতিহাসের দোহাই দিয়ে আইনসিদ্ধ করার চেষ্টা করে বা তাদের বক্তব্যকে ইতিহাসনিষ্ঠ বলে চালাবার চেষ্টা করে, তখন স্বভাবতই ঐতিহাসিকদের একটা দায় থাকে সেই বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করবার। ইতিহাসবিদের পক্ষে সত্য ঘটনা তুলে ধরা আবশ্যিক কর্ম হিসেবে একান্ত জরুরি হয়ে পড়ে তখনই, যখন ক্ষমতালোভী এবং স্বার্থপর সাম্প্রদায়িক শক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ‘ইতিহাসের সাক্ষ্য’কে বিকৃত করে ব্যবহার করতে চায়। তাই, ঠিক এই যুক্তিতেই, বর্তমান প্রবন্ধটি রামজন্মভূমি-বাবরি মসজিদ প্রশ্নটি কতখানি ইতিহাসসম্মত বা আদৌ ইতিহাসসম্মত নয়, তা দেখানোর একটা আন্তরিক ও সহজ চেষ্টামাত্র।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক রশীদ-আল-ফারুকী ‘হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক’ প্রবন্ধে বলেন, যে-কোনও কারণে হোক, মুসলমানেরা যখন শিক্ষাদীক্ষায় অনগ্রসর তখন তুলনামূলকভাবে অগ্রসর সমাজের প্রতি তাদের ক্ষোভ, ভয় বা ঘৃণা থাকা স্বাভাবিক। এই অবস্থায় বঙ্গভঙ্গ তাদের মনে আশার সঞ্চার করে, তাদের সামনে ভবিষ্যৎ আত্মনিয়ন্ত্রণের পথ খুলে দেয়। এবার তারা কোনও প্রকার প্রতিযোগিতা ছাড়াই নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পায়। এ হলো মুসলমান সম্প্রদায়ের বঙ্গভঙ্গ-সমর্থনের অন্যতম দিক। অন্যদিকে সমসাময়িক হিন্দু নেতারা বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের অন্তরালে যে ধর্ম ও সম্প্রদায়বোধ প্রচ্ছন্ন রেখেছিলেন তা মুসলমানদের এই আন্দোলনের বিরোধী করে তোলার পথে সহায়তা করেছে। ফলত যে বিকৃত আবেগ নিয়ে হিন্দু নেতারা আন্দোলনটি পরিচালনা করেছেন, সেই একই বিকৃত আবেগ নিয়ে মুসলিম নেতারা তার বিরোধিতা করেছেন। এসব নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে দিয়েও এই দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের মিলনক্ষেত্রটি বিনষ্ট হয়নি। গবেষক অর্জুন গোস্বামী “হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’: সংজ্ঞার অন্বেষণে” প্রবন্ধে বলেন, বহু শতাব্দীব্যাপী মুসলিম শাসন চললেও হিন্দুধর্ম ভারতবর্ষে তার আধিপত্য বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছে। হিন্দুধর্ম ভারতবর্ষে প্রাধান্যের জায়গায় থাকলেও, মুসলিমধর্মের অবদানও ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করেছে, যদিও এই দুই ধর্মাবলম্বীরা বরাবরই নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব নিয়েই থেকেছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তারা একথাও বুঝতে পেরেছে যে, একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা ব্যতীত উভয়ের উন্নতি সুদূরপরাহত। তাই অনেকক্ষেত্রেই দেখা গেছে, একের উৎসবে অন্যের উপস্থিতি। সাহিত্যবিশ্লেষক আশিস সান্যাল ‘কবিতায় হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে বলেন, উনিশ শতকের নবজাগরণের যুগে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে ব্যাপক বিকাশ ঘটে তার কারণ ইংরেজ আমলে বাঙালি মুসলমানদের ইতিহাস, পাশ্চাত্য জ্ঞানসাধনার ক্ষেত্রে অনগ্রসরতার ইতিহাস\ইংরেজি শিক্ষা বর্জনের ইতিহাস\তার দুর্ভাগ্যের ইতিহাস। ইংরেজ এদেশে ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চার যে ব্যবস্থা করে, তা গ্রহণ করার মতো মানসিকতা, আর্থিক সংগতি বা সামাজিক পরিবেশ মুসলমানদের ছিল না। এমতাবস্থায় উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের সেতুবন্ধও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলা-সাহিত্যেও তার প্রভাব পড়ে। এ-সময়ে এই দুই সম্প্রদায়ের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যেই কেউ কেউ স্বাতন্ত্র্যবাদী ধারার সাহিত্যসৃষ্টিতেও মনোনিবেশ করেন। তবে সমন্বয়বাদী ধারাটিও টিকে থাকে। এই টিকে থাকা ধারাটির মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের সম্মিলিত সৃষ্টিধারা।
বঙ্গবন্ধু গবেষক মোনায়েম সরকার ‘আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু’ প্রবন্ধে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের কৃতিত্ব একটি ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন\যেমন ইতালিতে ম্যাটসিনি গেরিবল্ডি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতে মহাত্মা গান্ধী\তাঁরা সবাই বিশ্বের মহানায়ক। উপনিবেশবাদের কবল থেকে ভারতের স্বাধীনতার জন্য মহাত্মা গান্ধীর অবদান, কিংবা হল্যান্ডের অধীনতা থেকে ইন্দোনেশিয়া স্বাধীন করার ক্ষেত্রে সুকর্নোর ভ‚মিকার কথা স্মরণ রেখেও বলা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবদানের বৈশিষ্ট্য ও নেতৃত্বে পার্থক্য রয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, ভারত উপমহাদেশে বিদেশি শাসকের অধীনতা ছিন্ন করার স্বাধীনতা সংগ্রাম, ফরাসি অধীনতা থেকে মুক্তির জন্য আলজিরিয়ার যুদ্ধ, ভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভ‚মি ব্যাপক অর্থে এক হলেও এই উপমহাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের ধারার সঙ্গে উল্লিখিত সংগ্রামগুলোর চারিত্র্যগত পার্থক্য রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাবনা-জুড়ে ছিল হাজার বছরের বাংলাদেশ। এই জনপদের মানুষের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনবোধ, সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্য\যা ঔপনিবেশিক নানা রাজনৈতিক অভিঘাতে বিনষ্ট, তাকে পুনরুদ্ধার করে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টাই ছিল বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য। তাঁর অসম্পূর্ণ জীবনপথে এই চেষ্টার চূড়ান্ত সফলতা বাঙালিমানস এখনও না পেলেও এই চেতনাবোধের অগ্রযাত্রী তিনি। কেননা এই উপমহাদেশে ধর্ম ও রাজনীতিকে পৃথকভাবে চর্চার পথপ্রদর্শক বঙ্গবন্ধুই।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে দেখান, বাংলাদেশে ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান\এই চারটিই প্রধান ধর্ম। এ চার ধর্মের কোনওটিই বাংলাদেশের আদিধর্ম নয়। হিন্দুধর্মের সঙ্গে এদেশের মানুষের পরিচয় ঘটেছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে। এরপর বৌদ্ধধর্ম এসেছে আড়াই হাজার বছর আগে, ইসলামধর্ম এসেছে প্রায় হাজার বছর আগে এবং খ্রিস্টধর্ম এসেছে প্রায় ছয়শো বছর আগে। নজরুল এ চার ধর্মকেই মমতার বাহুডোরে বেঁধে সম্মিলনী আহŸান জানিয়েছেন: ‘যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রিস্টান।’ আবহমানকাল থেকে বাংলা ভ‚খÐে নানান জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্মমতের অনুসারীরা পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে মিলেমিশে একত্রে বসবাসের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য সংহত রেখেছে। তাই বলা চলে, এ-দেশটি সুদূর অতীত থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। বিশেষ করে বঙ্গীয় অঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাবের মাধ্যমে প্রায় হাজার বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির ভিত আরও সুদৃঢ় হয়েছে। কেননা, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনপদে অমুসলিম সংখ্যালঘু মানুষদের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদানের অপরিহার্য দায়িত্ব হলো মুসলমানদের; বাংলার মুসলমানেরা যুগ যুগ ধরে সেই দায়িত্ব অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা, মানবিকতা ও ধর্মীয় চেতনাবোধের আলোকে পালন করে চলেছেন।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র ষোড়শ খÐে আটজন লেখকের রচনা সংকলিত হয়েছে। সুলেখক ও বিচারপতি আবদুল মওদুদ ‘ওহাবী আন্দোলন’ রচনায় দেখিয়েছেন, ওয়াহাবি মতবাদ আরব-প্রত্যাগত বহু হাজির মাধ্যমে ভারতে আমদানি হয়েছে। ফরিদপুরের বাসিন্দা ও মশহুর দুদু মিয়ার পিতা হাজি শরীয়তউল্লাহ কর্তৃক এই মতবাদ নিম্নবঙ্গে প্রচারিত হয়েছিল। তাঁর অনুসারীদের বলা হয় ফারাযি।
এ খÐে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও লেখক আকবর আলি খান-এর বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ বইয়ের প্রস্তাবনাসহ সাতটি প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হয়েছে। এসব প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্তি¡কদের মধ্যে এ-বিষয়ে প্রায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে পিরদের ঐকান্তিক উদ্যোগই বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য প্রতিষ্ঠা করেছে। অনুরূপভাবে ঐতিহাসিক দলিলদস্তাবেজ থেকে দেখা যাচ্ছে যে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বত্রই মুসলিম ধর্ম-প্রচারকেরা ইসলামধর্ম প্রচার করেছেন। তবে অঞ্চলভেদে এসব পির-দরবেশের উদ্যোগের সাফল্যের তারতম্য ঘটেছিল। ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে মুসলমান পির-দরবেশদের ধর্মান্তরকরণ-উদ্যোগের ব্যর্থতা সত্তে¡ও বাংলায় তাঁরা কেন তুলনামূলক সাফল্যলাভ করেছিলেন। আধ্যাত্মিক সাধনায় সাফল্যের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অংশের পিরেরা কোনওক্রমেই বাংলার পিরদের চেয়ে নিম্নপর্যায়ের ছিলেন না।
শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ‘উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গে ব্রাহ্ম আন্দোলন’ প্রবন্ধে বলেন, আধুনিক বাংলার সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতে ব্রাহ্মসমাজের দান অপরিসীম। উনিশ শতকে বাংলাজুড়ে যে জাগরণ দেখা দেয় তার মূলে ছিল ব্রাহ্মসমাজের অনন্য ভ‚মিকা। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে মানবতাবাদী ও সমন্বয়বাদী চেতনা প্রসারণের মাধ্যমে নবযুগের সূচনা হয়েছিল সেদিন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ নানা আদর্শিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্ম আন্দোলনের যে প্রসার ঘটিয়েছিলেন তার প্রভাব পড়ে পূর্ববঙ্গে। উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অনুষঙ্গ ও উপাদান উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তার তাৎপর্য ও প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে এ প্রবন্ধে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ ফয়সল প্রণীত ‘ফারায়েজী আন্দোলনের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আদর্শ’ প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, ফরায়েজি আন্দোলনের নামটি এসেছে ইসলামের ফারায়েজ থেকে। ফরজ-এর বহুবচন ফারায়েজ। ফরজ মানে অবশ্যকর্তব্য বা অলঙ্ঘনীয়, পালনীয়। ইসলামি আইনশাস্ত্রে আল্লাহর দেওয়া কর্তব্যসমূহ\কালেমা, নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ ইত্যাদি পালন করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ। বাংলার তৎকালীন মুসলমানেরা ইসলামের এই জরুরি বিষয়সমূহ পালন করতেন না বলে হাজি শরীয়তউল্লাহ এই আন্দোলনের নাম দেন ‘ফারায়েজী আন্দোলন’। এই বিষয়ে তিনি কোরআন-সুন্নাহর ওপর নির্ভর করে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন তওহিদের প্রতি। তওহিদ মানে আল্লাহর একত্ব ঘোষণা করা ও তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করা। এ ব্যাপারে জেমস ওয়াইজ বলেন, ‘এইসব সংস্কারক তাঁদের মূল নীতি নির্ধারণ করেন ইসলামের প্রকৃত মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে।’ হাজি শরীয়তউল্লাহ যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তা ছিল কোরআন, হাদিস ও হানাফি মাজহাবভিত্তিক। তিনি নতুন কোনও ধর্ম বা আদর্শ নিয়ে কর্মকাÐ শুরু করেননি; কোরআনের বিধানাবলি ও হাদিসের নির্দেশাবলি ছিল তাঁর পাথেয়। বিভিন্ন লেখক বিভিন্নভাবে তাঁর আন্দোলনকে আখ্যা দিয়েছেন\‘ইসলামি আন্দোলন’, ‘ধর্মীয় সংস্কারমূলক আন্দোলন’, ‘বিপ্লবী’, ‘মৌলবাদী’, ‘কোরআনভিত্তিক ধর্মীয় উজ্জীবনকারী’ ও ‘শুদ্ধবাদী আন্দোলন’। এইসব আখ্যা একটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত দেয় যে, এটি একটি ধর্মীয় সংস্কারবাদী আন্দোলন।
অধ্যাপক সুকোমল সেন ‘ভারতে ইসলাম সুফীবাদ ভক্তি ও শিখধর্ম আন্দোলন’ প্রবন্ধে বলেন, ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন ধর্ম হিসেবে ঘটলেও পরে তা রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ভারতবর্ষের সমাজজীবনে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এখানকার জাতিভেদ প্রথার কঠোরতায় বন্দি হতাশাগ্রস্ত মানুষের মুক্তি ঘটানোর মধ্যেই নিহিত ইসলামের সাফল্য। হিন্দুধর্ম ও ইসলামের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মিশেলে ভারতে বেশ কটি ধর্মীয় মতবাদের উদ্ভব ঘটেছে। সুফিবাদ, আকবরের দীন-ই-ইলাহি, ভক্তি আন্দোলন, শিখধর্ম এ-সবই ভারতবর্ষে ইসলাম ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের পারস্পরিক যোগাযোগের প্রতিক্রিয়া থেকে সৃষ্ট। কিন্তু ইসলামের মতো, অধিকাংশ ধর্মীয় মতবাদই জড়িয়ে গেছে রাজনীতির সঙ্গে। শিখধর্মের বিকাশের ইতিহাসকে রাজনীতি থেকে পৃথক করাই যায় না। ‘বৃটিশ শাসন এবং ভারতে ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলন’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, মধ্যযুগে ভারতে মুসলিম-হিন্দু সম্পর্ক যেমনই হোক, উভয়েই তাদের ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে বের হতে পারেনি। এ-সময় শঙ্করাচার্যের বেদান্তভাষ্য হিন্দুসমাজকে জাতিভেদ প্রথার শৃঙ্খলে আরও তীব্রভাবে বেঁধে ফেলে। ভারতবর্ষে ইংরেজদের আগমনের পর পাশ্চাত্য শিক্ষার যে-প্রকাশ ঘটে তার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া থেকে এখানে ধর্ম ও সমাজ-সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। আঠারো শতকের শেষার্ধে ও উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতে, বিশেষত বাংলায় আলোকসঞ্চারী একটা ভাবাদর্শ ও ধর্ম-সংস্কারের প্রচেষ্টা ক্রমে বাস্তব রূপ নেয়।
ইতিহাসবিদ অধ্যাপক গৌতম নিয়োগী ‘ব্রাহ্ম আন্দোলন: সমাজ-সংস্কার ও মানব-সেবা’ প্রবন্ধে এই অভিমত দেন যে, উনিশ শতকের বাঙালি সমাজের ওপরেই ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে ব্রাহ্মসমাজের নানা ধারা এবং তাদের কর্মক্ষেত্রের পরিধি যেমন প্রাণকেন্দ্র কলকাতা ছাড়িয়ে উনিশ শতকেই ক্রমশ বাংলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল, তেমনই শতাব্দী শেষ হওয়ার আগে-পরে ওই সংস্কারমুখী আন্দোলনের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায় ভারতবর্ষের অন্যান্য অনেক প্রদেশেও। অন্যান্য প্রদেশে ব্রাহ্ম আন্দোলনের ধর্ম ও সমাজ-সংস্কারমূলক ঊর্মিপ্রবাহের অভিঘাত যেমন লক্ষণীয়, তেমনই অন্যান্য প্রদেশের সংস্কারকদের সঙ্গেও বাংলার ব্রাহ্ম আন্দোলনের যোগ ছিল। সংস্কারকরূপে এবং আধুনিকতার যুগপুরুষরূপে রামমোহন রায়ের মৌলিকতা ছিল অনন্য ও অপ্রতিদ্ব›দ্বী। সেজন্য তিনি চেয়েছিলেন সর্বাঙ্গীণ মানব-মুক্তিকামী এক সর্বজনীন, একেশ্বরবাদী, মানবতাবাদী সার্বিক আন্দোলনের সূচনা করতে। ব্রাহ্ম আন্দোলন কখনও কখনও উত্তরকালে পথ পরিবর্তন করলেও, মূলত এই ধারায় প্রবাহিত। সেজন্য সমাজ-সংস্কার ও মানবসেবা আবশ্যিক উদ্দেশ্য ও কর্ম হিসেবেও অভ‚তপূর্ব। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও ভাববাদী গবেষক ফরহাদ মজহার ‘বাংলার ভাবান্দোলন’ প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশের ভাবান্দোলনের মুসলমানিকরণের প্রয়াস হয়েছে। সেটা সফল হয়নি। এটা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশে ভাবান্দোলনের শক্তি এখনও অসামান্য। ধর্মতত্ত¡ ও মোল্লাতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস যেমন দেখা যায়, তেমনি প্রাচীন দেহতাত্তি¡ক চিন্তাকেও এই কালের নতুন বয়াতিরা যে ভাবুকতায় ও ভাষায় প্রকাশ করছেন তা রীতিমতো অসাধারণ। বাংলার ভাবান্দোলন সম্পর্কে যে-কথা তাহলে স্পষ্ট করা দরকার সেটা হলো হিন্দু-মুসলমান নামক সম্প্রদায়গত ভেদ বা পার্থক্যের জায়গায় দাঁড়িয়ে একে বোঝার চেষ্টা বৃথা এবং সাম্প্রদায়িকতা-দোষে দুষ্ট। ভাবান্দোলনের গানে গৌরতত্ত¡ ব্যবহৃত হচ্ছে নাকি নবীতত্ত¡, কৃষ্ণ-নাম উচ্চারিত হলো নাকি আল্লাহর নাম ইত্যাদি দিয়ে এর ভাবুকতার মর্মোদ্ধার করা অসম্ভব। অথচ, অন্যদিকে আবার, বিভিন্ন ধর্মের পরিপ্রেক্ষিত এবং কাহিনি জানা না-থাকলেও ধর্মতত্তে¡র সঙ্গে তার ভাবগত তৎপরতার জায়গাগুলো অনুধাবন করতে পারা দুঃসাধ্য। বাংলার ভাবান্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে, কিন্তু এই আন্দোলন কোনও পুরনো, প্রাচীন, অবলুপ্ত বা ক্ষয়িষ্ণু ধারা নয়। একথা অনস্বীকার্য যে, বাংলার ভাবান্দোলনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে শ্রীচৈতন্যের আন্দোলন। বাংলার ভাবান্দোলন শরীরকে বাদ দিয়ে নয়। তার মানে, বাংলা শুধু ভাবের কথায় খুশি নয়, কারণ শরীর ছাড়া ভাব নেই। তাহলে ভাবান্দোলনের ইতিহাসে তাদেরই আগে খোঁজ পড়বে, শরীর যাদের চিন্তা ও চর্চার কেন্দ্রীয় বিষয়, অর্থাৎ দেহতত্ত¡ এবং দেহতাত্তি¡ককরণ যাদের আন্দোলনের মূলে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক আবুল ফাতাহ্ মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়ার দেওবন্দ আন্দোলন: ইতিহাস ঐতিহ্য অবদান বই থেকে সাতটি প্রবন্ধ এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো পাক-ভারত উপমহাদেশে ধর্মান্দোলন, ধর্মসংস্কারচিন্তায় মোগল শাসনামল ও তার পরে সংঘটিত ধর্মান্দোলনের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ\বিশেষ করে দেওবন্দি ঐতিহ্য, ধারা, বিশুদ্ধ ইসলামচর্চায় ভারতবর্ষের আলেম-উলামাদের কর্মতৎপরতা এবং তাঁদের অবদানের ওপর তথ্যবহুল আলোচনা।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র সপ্তদশ খÐে এগারোজন লেখকের রচনা সংকলিত হয়েছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও যুক্তিবাদী লেখক, ধর্মচিন্তার বৈজ্ঞানিক ভাষ্যকার অধ্যাপক ড. জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধর্মের ভবিষ্যৎ গ্রন্থ থেকে আটটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়েছে। ‘ধর্মগ্রন্থের স্বরূপ’ প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন, উপজাতি-প্রধান সমাজে বৃহত্তর ঐক্য এবং রাষ্ট্র-নির্মাণের ঐতিহাসিক প্রয়োজনে ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থের উৎপত্তি ঘটেছে। ধর্মগ্রন্থগুলোই ধর্মের মূল ভিত্তি এবং আসল পরিচয়। জাগতিক-ঐতিহাসিক পটভ‚মিতে সৃষ্ট ধর্মগ্রন্থগুলোকে মানুষ এখনও অলৌকিক মনে করে একারণে যে, ধর্মগ্রন্থগুলো তারা পেয়ে থাকে জন্মসূত্রে, এবং পারিবারিক ও প্রথাগত শিক্ষা, সামাজিক চাপ ও পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে ধর্মগ্রন্থ-সম্পর্কিত বিশ্বাস একরকম শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো অনিবার্য হয়ে পড়ে। গোঁড়া হিন্দুদের বিশ্বাস যে, তাদের তিনটি ধর্মগ্রন্থ অলৌকিক উৎস থেকে উৎপন্ন হয়েছে। প্রথমটি বেদ, যাকে অপৌরুষেয় ‘শ্রæতি’ বা প্রত্যাদেশ বলে কল্পনা করা হয়। মনুস্মৃতি বলছে যে, সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং অগ্নি, বায়ু এবং সূর্য থেকে ঋগবেদ, সামবেদ এবং যজুর্বেদ সৃষ্টি করেছিলেন, যাতে যজ্ঞসমূহ যথাযোগ্যভাবে সম্পন্ন হতে পারে। দ্বিতীয়টি মনুস্মৃতি, যেটি নাকি মনু স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বরের কাছ থেকে পেয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন। আর তৃতীয়টি ভগবদ্গীতা, যেটি স্বয়ং ভগবানের অবতারের কণ্ঠ থেকে উৎসারিত বলে কল্পিত এবং সে-অবয়বেই রচিত। কিন্তু এই ধর্মগ্রন্থগুলো আদ্যন্ত পাঠ করলে একমাত্র সেসব মানুষের পক্ষেই এগুলোকে অলৌকিক বলে মেনে নেওয়া সম্ভব, যারা হয় ধীশক্তিতে প্রতিবন্ধী, অথবা যারা জন্মলব্ধ ধর্মগ্রন্থকে অন্ধবিশ্বাসে প্রশ্নাতীত জ্ঞান করেন।
‘ব্যক্তিজীবনে ধর্মের ভ‚মিকা’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলো পড়লে দেখা যায় যে, সেখানে স্বর্গের বর্ণনা তুলনাক্রমে অল্প এবং অস্বচ্ছ। কিন্তু সর্বধর্মগ্রন্থেই বিভিন্ন নরকের বর্ণনা অত্যন্ত ভয়ংকর এবং সুস্পষ্ট। এর প্রধান কারণ এই যে, কোনও মানুষই প্রকৃতপক্ষে মরে গিয়ে স্বর্গবাস করতে উৎসুক নয়। মানুষ পৃথিবীতেই চিরযৌবন নিয়ে চিরসুখে বেঁচে থাকতে চায়। এই তার অমোঘ অনিবার্য জৈবিক প্রবৃত্তি। এমনকি পৃথিবীর সব দুঃখকষ্ট সহ্য করেও সে পৃথিবীতেই বেঁচে থাকতে চায়। কাজেই শাস্ত্রের অনুশাসনগুলো যদি তার ব্যক্তিস্বার্থের প্রতিকূল হয়, তাহলে মৃত্যুর পরে স্বর্গের বেশি সুখের আশায় মানুষ সেগুলো মেনে চলবে না। মৃত্যুর পরে পৃথিবীর জীবনের মতো জীবন আবারও পেলে তার খুব-একটা আপত্তি থাকবে না। তাই শাস্ত্রের বিধান অমান্য করে যদি সে এই জীবনে সুখে থাকতে পারে, তবে মৃত্যুর পরে বেশি সুখের আশায় সে পৃথিবীতে জীবদ্দশায় শাস্ত্র মেনে কষ্ট পেতে চাইবে না। কিন্তু মৃত্যু নিশ্চিত জেনে নরকের ভয়ংকর পরিণতির ঝুঁকি সে নিতে চায় না। এই আশায়ই শাস্ত্ররচয়িতারা স্বর্গের সুখের চেয়ে নরকের অসহনীয় কষ্টকে এত বেশি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। এভাবে ইহলোকের অনিরাপত্তার সঙ্গে পরলোকের সম্ভাব্য মহাকষ্ট যুক্ত হয়ে পৃথিবীর মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করেছে।
‘ধর্ম, সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতি’ প্রবন্ধে তিনি দেখান, যে-কোনও ধর্মই যে সংস্কৃতি সৃষ্টি করে তা অন্ধবিশ্বাস ও ভক্তির সংস্কৃতি, বৌদ্ধিক সংস্কৃতি নয়। ধর্মে রয়েছে মানুষের মতো আকৃতি-প্রকৃতির ঈশ্বরে, দেবদেবীতে, দেবদূতে, ধর্মগ্রন্থে, আত্মায়, পরলোকে, পাপপুণ্যে, স্বর্গ-নরকে বিশ্বাস আর ঈশ্বরে আত্মসমর্পণ। এই বিশ্বাস, ভক্তি, আত্মসমর্পণ থেকে মানুষ দুঃখে সান্ত¡না পায়, কাল্পনিক ইচ্ছাপূরণের পথ খুঁজে পায়, ইহলোকের দারিদ্র্য-দুর্দশার মধ্যে পরলোকে সুখভোগের আশার আলো দেখে। ব্যক্তিক ও সামাজিক পরিবর্তন বা উৎকর্ষের বিপরীতে ধর্মের অবস্থান। দেহভিত্তিক নান্দনিক সংস্কৃতিকে এটি অবজ্ঞার চোখে দেখে, নিষিদ্ধও করে। ধর্মীয় সংস্কৃতি পশ্চাৎমুখী, মানুষের রুচির পরিবর্তনকে এটি অস্বীকার করে, মানুষের সৌন্দর্যবোধের মূল্য এতে নেই। এটাই অপসংস্কৃতি। ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা ধর্মসৃষ্ট অপসংস্কৃতির আরেক রূপ। মৌলবাদের অর্থ প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলোর ঐশ্বরিক উৎপত্তিতে প্রশ্নাতীত ভক্তিমূলক আস্থা এবং সেসব ধর্মগ্রন্থের অনুশাসন অনুযায়ী ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপর সার্বিক ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আদর্শ।
‘ধর্ম ও আর্থসামাজিক কাঠামো’ প্রবন্ধে তাঁর অনুসন্ধানী অভিমত, প্রতিটি ধর্মকে কেন্দ্র করে অতি প্রাচীনকাল থেকে গড়ে ওঠে পুরোহিতশ্রেণি। রাজন্যবর্গের কৃপায় এরা সুখে-শান্তিতে থাকত বলে তারা হয়ে ওঠে সমাজের প্রভু এবং এখান থেকেই ধর্মভিত্তিক বৈষম্যের শুরু। ধনী-দরিদ্র অসাম্য এভাবেই ধর্মকর্তৃক উৎসাহিত হতে থাকে। শুধু তাই নয়, নারী-পুরুষ অসাম্যেরও সমর্থন জানিয়ে এসেছে ধর্ম এবং তার পুরোহিতেরা। পুরোহিতশ্রেণি মানুষের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত বিভিন্ন ধর্মীয় তত্ত¡কে পল্লবিত করে জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করে। আর সমাজপতিদের এবং রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে শাস্ত্রে বর্ণিত পূজো-পার্বণ, ব্রত-উপাসনা, আর ধর্মীয় সহস্র ক্রিয়াকলাপকে নিত্যকর্ম হিসেবে জনসাধারণের জন্মলব্ধ অভ্যাসে পরিণত করে। অসম্ভব পৌরাণিক অতিকথাকে ইতিহাসের বাস্তব ঘটনারূপে প্রচার করে অশিক্ষিত জনসাধারণের মনে বিশ্বাস উৎপাদন করে।
‘ধর্ম বনাম মুক্তচিন্তা’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, জন্মলব্ধ ধর্ম মানুষের মুক্তচিন্তার পরিপন্থি। জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্মীয় পরিচয় মানুষের সমাজে সৃষ্টি করে বিভাজন আর ধর্মান্ধতা; সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদসহ অনেক সংকট-সংঘাতের জন্ম দেয়, যা মানুষের মুক্তচিন্তার পথে এক বড় বাধার সৃষ্টি করে। মানবসভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশের পথ এতে রুদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও রাষ্ট্রশক্তির যৌথ উদ্যোগে এমনটি ঘটে। এর মূলে রয়েছে শ্রেণিস্বার্থ\ধর্মগুরু ও রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী লোকদের বিত্তবৈভব ও আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখতে ধর্মকে এভাবে কাজে লাগানো হয়। তাই ঈশ্বরে আত্মসমর্পণ এবং রাজার কাছে আত্মসমর্পণ তুলনীয় এবং পরস্পরের পরিপূরক ছিল। মুক্তচিন্তার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ মানবসভ্যতার বৌদ্ধিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে হলে মানুষের ধীশক্তির স্বাধীন প্রকাশের ওপর থেকে ধর্মের নিয়ন্ত্রণ অপসারিত করতে হবে। আর সে-লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে প্রয়োজন হবে মানবসমাজের ঐতিহাসিক শ্রেণিবিন্যাসের আমূল পরিবর্তন। ‘পরলোকমুখী বনাম জীবনমুখী ধর্ম’ প্রবন্ধে তিনি দেখান, ধর্মের পরলোকমুখী ও জগৎমুখী রূপ মানবসভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে। ধর্ম যখন জগৎবিমুখ ও পরলোকমুখী হয়েছে তখনই সভ্যতার অগ্রগতি থেমে গেছে। অন্যদিকে ধর্ম যখনই আত্মা-পরমাত্মা এবং পরলোকে দৃষ্টি না দিয়ে মানবজীবনের জাগতিক উন্নতির দিকে নজর দিয়েছে, তখনই সভ্যতার বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছে। মানবসভ্যতার বিকাশে পরলোকমুখী অধিজাগতিক ধর্মের চেয়ে জগৎ ও জীবনমুখী ধর্ম বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যদিও ইতিহাস এটা জানায় যে, ধর্মভিত্তিক জাগতিক সভ্যতার অনেক সদর্থক বৈশিষ্ট্য থাকা সত্তে¡ও তা অনেক কলুষে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। মধ্যযুগের ইউরোপে পরলোকমুখী খ্রিস্টধর্ম রাজনীতি, অর্থনীতি ও বিজ্ঞানসহ সভ্যতার যাবতীয় উপাদানকে নস্যাৎ করে অন্ধকার যুগকে ডেকে এনেছে। মধ্যযুগ থেকে আরম্ভ করে পরলোকমুখী এবং মৌলবাদী ইসলামধর্ম ইসলামপ্রধান দেশগুলোর সভ্যতার বিকাশকে প্রতিহত করে চলেছে। ভারতবর্ষেও উপনিষদ যুগ, বৌদ্ধযুগ কিংবা মধ্যযুগে ধর্ম জগৎ ও জীবনবিমুখতাকে উৎসাহিত করে জাগতিক সভ্যতার বিকাশকে স্তিমিত করে দিয়েছে।
‘নাস্তিকতার অবদান ও পরিসীমা’ প্রবন্ধে জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুসন্ধানী সিদ্ধান্ত হলো, নাস্তিকতাবাদের অসামান্য অবদান হচ্ছে, অধিজাগতিক অলীক দর্শন থেকে মানুষের ভ্রান্ত চেতনাকে বস্তুজগৎ এবং মানবজীবনের দিকে ফিরিয়ে আনা। এর মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে মহাবিশ্ব এবং মানবজীবন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিভ‚মি। মানুষের ইতিহাস-চেতনা এবং আত্মশক্তির উন্মেষ এখান থেকেই ঘটেছে। কিন্তু শুধু নাস্তিকতা পৃথিবী, মানুষের জীবন ও সমাজকে নতুন করে গড়বার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। ধর্ম মানবজীবনে দুর্বলতা, জীবনবিমুখতা এবং শক্তিহীনতা সৃষ্টি করে মানবসভ্যতার অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে। ধর্মের প্রতি এবং ধর্ম দ্বারা ধারণ করা সমাজব্যবস্থার প্রতি শুধুমাত্র নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করলেই ভবিষ্যতের বাঞ্ছিত মানবসভ্যতার ছবি স্পষ্ট হয় না। প্রধানত জাগতিক অনিরাপত্তাবোধ এবং ইচ্ছাপূরণের তাগিদ থেকেই ব্যক্তিমানুষ ধর্মবিশ্বাসের প্রয়োজন অনুভব করে।
‘বিবর্তনের ছন্দ’ প্রবন্ধে তিনি অনুসন্ধান করে দেখিয়েছেন, মহাবিশ্বের বিবর্তনের পটে যে মানবসভ্যতার বিবর্তন এত ক্ষুদ্র ও সাম্প্রতিক, তার মধ্যেই রয়েছে ধর্মের উন্মেষ, স্থিতি ও লয়। যখন পৃথিবীতে ধর্ম ছিল না, তখনও মানবসভ্যতার বিকাশ বন্ধ হয়ে থাকেনি। যাকে আমরা ধর্ম বলি, তার উত্থান খুব সাম্প্রতিক। কালে কালে এরও ঘটেছে বিবর্তন এবং এখনকার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে এটি রূপ নিয়েছে। বিবর্তন কোনও পূর্বনির্ধারিত বিষয় নয়। একযুগের মানুষ ধর্মীয় কুসংস্কারকে অগ্রাহ্য করে জাগতিক উন্নতির কাজে মগ্ন থেকে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, আবার তার পরে ধর্মের উত্থানে মানবসভ্যতা পিছিয়ে পড়তে পারে। এমন ঈশ্বরেরও ধারণা নিয়ে আসতে পারে মানুষ, যা ধর্মের ঈশ্বর নয়।
স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ ‘স্বামী বিবেকানন্দ এবং ধর্মের নতুন সংজ্ঞা’ প্রবন্ধে বলেন, পৌরাণিক ধারণায় দেবতার চেয়ে সেই মানুষ বড়। বিবেকানন্দ যখন শ্রীরামকৃষ্ণকে ‘ভগবানের বাবা’ বলছেন, তখন বিবেকানন্দের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন দক্ষিণেশ্বরের সেই প্রায়-নিরক্ষর, দরিদ্র ব্রাহ্মণ পুরোহিত\যিনি কৃষ্ণ, বুদ্ধ, খ্রিস্ট প্রমুখের মতো ঈশ্বরের থেকেও বড় হতে পারেন। ধর্মের এই নতুন সংজ্ঞা দিচ্ছেন বিবেকানন্দ। ধর্ম মানুষকে এই জায়গায় পৌঁছে দেয়, যেখানে মানুষ ঈশ্বরের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে। মানুষ কি সত্যিই পারে এত বড় হতে? বিবেকানন্দ বলছেন: হ্যাঁ পারে, কেন পারবে না? পারবেই। বিবেকানন্দের ভাব এই যে, মানুষ স্বমহিমায় সবাইকে অতিক্রম করতে পারে। এই ভাবটি কবি নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্যে আমরা পাই। মনুষ্যত্বের তথা ধর্মের এই মহাপ্রকাশকে স্বামী বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথ পৌরাণিক আখ্যানে পেয়েছেন; পেয়েছেন রামচন্দ্রের মধ্যে, বুদ্ধের মধ্যে, খ্রিস্টের মধ্যে, চৈতন্যের মধ্যে। বিবেকানন্দ ওই ‘ঈশ্বরকে-অতিক্রম-করা’ মানুষকে প্রত্যক্ষ করেছেন।
ধর্মের বৈজ্ঞানিক ভাষ্যকার অধ্যাপক ড. অজয় রায় ‘বিজ্ঞানের ধর্ম ও ঈশ্বর প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধে বলেন, ঈশ্বরবিশ্বাসের দিক থেকে মনুষ্যশ্রেণিকে দুভাগে ভাগ করা যেতে পারে\যার একপ্রান্তে রয়েছে ব্যক্তি-ঈশ্বরবাদীরা, অর্থাৎ আস্তিকেরা র্(দণর্ধ্র) এবং অন্যপ্রান্তে রয়েছে নাস্তিক বা নিরীশ্বরবাদীরা (র্টদণর্ধ্র)। এর মাঝামাঝিতে অবস্থান করে অজ্ঞেয়বাদী ও সংশয়বাদীরা। এছাড়া রয়েছে প্রত্যাদেশবিরোধী ঈশ্বরবাদীরা (ঢণর্ধ্র)\যারা অতিপ্রাকৃত এক বুদ্ধিমত্তা-সত্তায় বিশ্বাসী, তবে তিনি এমন একটি সত্তা যিনি কেবল মহাবিশ্ব সৃষ্টি আর তার পরিচালন নীতি তৈরি করে দিয়ে নিশ্চুপ রয়েছেন, অন্য কোনও বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন না; রয়েছে সর্বেশ্বরবাদীরা (যটর্ভদণর্ধ্র), যারা অতিপ্রাকৃত ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, তবে প্রকৃতির ‘অতিপ্রাকৃত সমার্থক’ শব্দরূপে (্রলযণরভর্টলরটফ ্রহভমভহব) তারা ‘ঈশ্বর’ শব্দটি অনেক সময় ব্যবহার করে থাকে। এককথায় বলা যায়, সর্বেশ্বরবাদ হলো ‘প্রমত্ত নাস্তিকতা’র এক কাব্যময় প্রকাশ, আর প্রত্যাদেশবিরোধী ঈশ্বরবাদ হলো জল দিয়ে তরলীকৃত আস্তিকতা। ‘ধর্ম ও রিলিজিয়নের ভবিষ্যৎ’ প্রবন্ধে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক অধ্যাপক যতীন সরকারের বিশ্লেষণী অভিমত হলো, ধর্মের পক্ষে রিলিজিয়ন-নিরপেক্ষ হতে কোনও বাধা না থাকলেও, রিলিজিয়ন ধর্মনিরপেক্ষ হলেই হয়ে যায় মানবতাবিরোধী। রিলিজিয়ন এবং ধর্মকে ধারণ করেই মানুষ মানবিক ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে এসেছে। রিলিজিয়নকে মানুষ আশ্রয় করেছে ধর্মে স্থিত হওয়ার উদ্দেশ্যেই। ইহুদি, খ্রিস্ট বা ইসলামের মতো সেমেটিক রিলিজিয়নগুলোর ঐতিহ্যে এই বিশ্বাস বলবান যে, মানুষ যখন প্রকৃত ধর্ম ভুলে গিয়ে অনাচারে লিপ্ত হয়, তখনই পরম করুণাময় স্রষ্টা তাঁর একজন প্রতিনিধিকে পাঠিয়ে দেন; সেই প্রতিনিধি (প্রফেট বা নবী-রাসুল) কর্তৃক বাহিত মঙ্গল-সমাচারের মধ্যেই থাকে মানুষের জন্য অনুসরণীয় জীবন-বিধান।
বিজ্ঞানমনস্ক লেখক তারকমোহন দাস ‘বিজ্ঞানমনস্কতা আধুনিক জীবনে অপরিহার্য’ প্রবন্ধে বলেন, বিজ্ঞানের মূল স্বরূপ জানতে হলে এবং মানুষের বর্তমান সমস্যাগুলোর মূল উৎসের সন্ধান করতে হলে প্রকৃতির নিজস্ব গতিময় রূপ ও স্থিতিশীলতা সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। সৃষ্টির সূচনা থেকেই অজস্র বৈজ্ঞানিক তত্তে¡র ওপর নির্ভর করে বিশ্বপ্রকৃতি টিকে আছে। পৃথিবীর জীবন ও পরিবেশসহ বিশ্বপ্রকৃতির সবকিছুই চলছে ওই অসংখ্য বৈজ্ঞানিক তত্তে¡র ওপর নির্ভর করে। সকল বিজ্ঞানই প্রকৃতিগত। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, উদ্ভিদতত্ত¡, প্রাণীতত্ত¡, শারীরবৃত্ত, ভ‚তত্ত¡, জ্যোতির্বিদ্যা\যাই হোক-না কেন, সবকিছুর উৎসই প্রকৃতি। আমরা নিজের হাতে কোনও বিজ্ঞান তৈরি করিনি বা বিজ্ঞান সৃষ্টি করিনি। আমরা পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, প্রমাণ ও যুক্তির ওপর নির্ভর করে, নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে তা আবিষ্কার করেছি মাত্র। অতি সামান্যই এ-পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু আবিষ্কৃত তত্ত¡গুলোর ব্যবহার অনেক সময়ই উপযুক্ত সতর্কতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে করা হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে ভবিষ্যতের কথা চিন্তাভাবনা না করেই। মানুষের কাছে যা আপাত সুখকর, অর্থকরী ও লাভজনক বলে মনে হয়েছে মানুষ তাই সাগ্রহে গ্রহণ করেছে পরিণতির কথা বিবেচনা না করেই। বহুক্ষেত্রে ওইগুলোই আজ সমাজে নানা দুর্লঙ্ঘ্য সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এখানেই প্রকৃত বিজ্ঞানমনস্কতার প্রয়োজন ছিল, যার অভাবে বিজ্ঞানের এই অপব্যবহার ঘটেছে। বিজ্ঞান গবেষক আকাশ মালিকের ‘ধর্ম না কি বিজ্ঞান?’ প্রবন্ধে উত্থাপিত কতিপয় জিজ্ঞাসার সপক্ষে সন্ধিৎসা হলো, কোরান বলছে, পৃথিবী সমতল ও স্থির হয়ে আছে; বিজ্ঞান বলছে, পৃথিবী গোলাকার ও সবসময় ঘুরছে; কোরান বলছে, চাঁদ আলো বিতরণ করে; বিজ্ঞান বলছে, চাঁদের নিজস্ব আলো নেই; কোরান বলছে, চাঁদ মনজিলে মনজিলে থামে; বিজ্ঞান বলছে, চাঁদ কোথাও থামে না। পরকালের ভয়ভীতি, লোভ-লালসা, শাস্তি, পুরস্কার, স্বর্গ ও নরকের আজগুবি সব কাহিনি আর অন্ধবিশ্বাসের ওপর ধর্ম প্রতিষ্ঠিত। এর কোনও কিছুই বিজ্ঞান সমর্থন করে না, বিজ্ঞানের চলার পথে এদের কোনও প্রয়োজন নেই। সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই আদর্শের দুই মতবাদের সমন্বয় আদৌ কি সম্ভব?
আবুল হোসেন খোকন ‘ধর্মের স্বরূপ এবং বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে দেখান, ধর্মের আবির্ভাব নিয়েও রয়েছে অনেক রাখঢাক, লুকোচুরি। ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রথমে ঋষিরা কল্পনা দিয়ে ধর্মের প্রবর্তন ঘটিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে এসেছে ঋগে¦দ। পরে অন্যান্য বেদ। তারপর ঋষিদের কল্পনাকে আরও খানিকটা যুগোপযোগী করে বা সংস্কারসাধন করে জরথুস্ট্র কর্তৃক জেন-আভেস্তা ধর্মগ্রন্থের প্রবর্তন ঘটানো হয়েছে। তারপর আরও সংস্কার করে আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে আমদুয়াতের। এর ওপর আরও সংস্কারসাধন করে আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে তাওরাত-বাইবেলের। এরও সংস্কারসাধন করে আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে জবুর-বাইবেলের। মাঝখানে আরও ভিন্নভাবে যুগোপযোগী করে গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তন ঘটিয়েছেন বৌদ্ধধর্মের। এরপর আরও সংস্কারসাধন করে প্রবর্তন ঘটানো হয়েছে বাইবেলের (ইঞ্জিল) নতুন নিয়মের। সবশেষে আরও খানিকটা সংস্কারসাধন করে প্রবর্তন ঘটানো হয়েছে কোরান বর্ণিত ইসলামধর্মের। এ কারণে প্রত্যেকটা ধর্মের সঙ্গেই প্রত্যেক ধর্মের মিল, বিশেষ করে আয়াত বা ধর্মবাক্যে মিল পাওয়া যায়।
প্রাবন্ধিক ইরতিশাদ আহমদ ‘বিজ্ঞানমনস্কতা ও ধর্মবোধ’ প্রবন্ধে বলেন, বিবেকবোধ, নীতিবোধ, মূল্যবোধ, বিচারবোধ, ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা\এসবের উৎস ধর্ম নয়। ধর্মপরায়ণ না হয়েও বিবেকবান মানুষ হওয়া যায়। নরকের ভয়ে পাপকার্য থেকে বিরত থাকার, আর স্বর্গের লোভে পুণ্যকাজ করার মধ্যে যে সত্যিকারের মূল্যবোধের এবং নীতিবোধের পরিচয় পাওয়া যায় না, তা কি বুঝিয়ে বলার দরকার আছে? তাহলে ধর্মের প্রয়োজন কোথায়?
বিজ্ঞানমনস্ক লেখক মো. জানে আলমের ‘ধর্ম ও বিজ্ঞানের সহাবস্থান’ প্রবন্ধে এই অভিমত উপস্থাপিত হয়েছে যে, আজ বিশ্বমানবগোষ্ঠীর জীবনের হেন ক্ষেত্র নেই যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রবেশ করেনি। বিজ্ঞান সর্বজনীন এবং ধর্মনিরপেক্ষ। ইসলামিবিজ্ঞান, খ্রিস্টীয়বিজ্ঞান, হিন্দুবিজ্ঞান, বৌদ্ধিকবিজ্ঞান কিংবা ইহুদিবিজ্ঞান বলে কোনও বিজ্ঞান হতে পারে না। এদিক থেকে বিজ্ঞান ধর্ম অপেক্ষাও সর্বজনীন। কিন্তু পৃথিবীতে বিদ্যমান কোনও ধর্মই সর্বজনীন নয়, বরং কোনও এক ধর্মের বিশ্বাস অন্য ধর্মের বিশ্বাসকে নাকচ করে দেয় অর্থাৎ বিশ্বাসের দিক থেকেও তারা পরস্পরবিরোধী। এখানেও মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বাস যার একমাত্র ভিত্তি, সে আবার অন্যের বিশ্বাসকে নাকচ করার চেষ্টা করে যুক্তি দিয়ে। আধুনিক ধর্মবেত্তারা যতই প্রাণান্তকর প্রয়াস পাক-না কেন, বিজ্ঞান দিয়ে ধর্মকে প্রমাণ করা কিংবা বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে যৌক্তিক সমন্বয় সোনার পাথরবাটির মতো অসম্ভব একটি প্রকল্প।
যুক্তিবাদী লেখক শফিকুর রহমান ‘ঈশ্বর ও ধর্ম’ প্রবন্ধে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, মনন বা চিন্তাই কেবল মত, ধারণা, তথ্য ও তত্তে¡র বিচার করতে সাহায্য করে। কোনও কিছু জানার জন্যও প্রয়োজন চিন্তা, যুক্তি ও বুদ্ধির। ঈশ্বর-ভগবান-দেব-দেবী-ঈশ্বর-ধর্ম-পরকাল-পুনরুত্থান-স্বর্গ-নরক-পরিত্রাণ-মোক্ষ-নির্বাণ-প্রার্থনা-যাগযজ্ঞ-পূজা-অর্চনা, ভজনালয়ে গমন, তীর্থভ্রমণ ইত্যাদি সম্পর্কে চিন্তা করুন। আইনকানুন-আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি সম্পর্কে চিন্তা করুন। কীসে মানুষ ভালো বা মন্দ হয়? একটি রীতি অপর নীতি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কেন? ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে নিকৃষ্ট রীতিকেও কি উৎকৃষ্ট বলে মনে করতে হবে? ঈশ্বরের আদেশ নিষ্ঠুর ও বীভৎস হলেও কি পালনীয়? হিন্দুর ভগবান, খ্রিস্টানের পিতা-ঈশ্বর, ইহুদির জেহোভা, মুসলমানের আল্লাহ, প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত নন কি? হিন্দুর ভগবান হিন্দুকে, খ্রিস্টানের ঈশ্বর খ্রিস্টানকে, জেহোভা ইহুদিকে ও আল্লাহ মুসলমানকে অধিক ভালোবাসেন কেন? বর্ণবাদ, উৎকট জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে এর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ নয় কী? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া খুব সহজ নয়। কেননা, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে চিন্তা করতে হবে।
মুক্তচিন্তক আশরাফ হোসেনের ধর্ম বিজ্ঞান বাস্তবতা বইয়ের সব রচনা (তেরোটি) এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব প্রবন্ধে তাঁর অভিমত হলো ধর্মশাস্ত্রগুলো রচিত হয়েছে রচয়িতাদের স্বার্থের পক্ষে। এগুলো অপৌরুষেয় নয়, নয় ঐশ্বরিক। ধর্মশাস্ত্রগুলো ঈশ্বর-আদেশে প্রণীত হয়েছে\বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে তা মানা বোধবুদ্ধি-বহিভর্‚ত কাজ। সকল ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য। একসময়ে বেদমন্ত্র সম্পর্কে এমনও প্রচার করা হয়েছে যে, এগুলো অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন এবং এসব পাঠের মাধ্যমে ব্রাহ্মণ-পুরোহিতেরা পৃথিবীর বুকে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করতেন। কিন্তু বাস্তবে সত্যিই কি তাই? মোটেও নয়। কারণ আধুনিক চিন্তাবিদেরা প্রমাণ করেছেন যে, বেদমন্ত্রগুলো আদৌ সেই ধরনের কিছু নয়। এমনকি এর মাঝে কোনও অলৌকিক ক্ষমতাও নেই। এগুলো নিছক প্রকৃতি-বন্দনার শ্লোকগাথা মাত্র।
ইতিহাস অন্বেষায় মানবসভ্যতা
সভ্যতার বিবর্তনে মানুষের ধর্মবিশ্বাস
সংস্কৃতি ও সভ্যতা: স্বকীয়তায় ও আত্মস্থতায়
মানুষের সৃষ্টিশীলতায় ধর্মবিশ্বাসের প্রভাব
ধর্মবিশ্বাসে ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক প্রভাব
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র অষ্টাদশ খÐে এগারোজন লেখকের প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ এবনে গোলাম সামাদ ‘মহাচীনে ইসলাম’ প্রবন্ধে ইসলামি সংস্কৃতির বৈশ্বিক বিস্তার ও তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিশ্বমানবতা বিকাশে অনুপ্রাণিত করে, মানুষের মাঝে সর্বমানবিকবোধ জাগ্রত করে, এমন সব তথ্য-উপাত্তসমৃদ্ধ বিশ্লেষণসহ মহাচীনে ইসলামের বিকাশ ও বিস্তার প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়েছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মানবীয় গবেষক অধ্যাপক ড. জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি প্রবন্ধ এখানে সংকলিত হয়েছে। ‘সভ্যতার বিবর্তনে ধর্ম’ প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন, মানবসভ্যতার বিবর্তনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে মানুষের ধর্মবিশ্বাস। আর বিবর্তনের মধ্য দিয়েই ধর্মবিশ্বাস এবং ধর্মের জাগতিক কাঠামোর ঘটছে পরিবর্তন। একদিকে ধর্মের বিবর্তন যেমন প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থার বিকাশের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, অন্যদিকে ধর্মও মানুষের জাগতিক বিকাশকে কখনও প্রতিহত, কখনও ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হয়েছে। সভ্যতার বিবর্তনে ধর্মের পরিবর্তন এমনও হতে পারে\জ্ঞানবিজ্ঞানের অগ্রগতি, আর্থসামাজিক পরিবর্তনের ফলে ধর্ম হয় মানবসমাজ থেকে একেবারেই অপসৃত হবে, নয়তো এটি এমন চেহারা নেবে যার সঙ্গে আজকের ধর্মের কোনও মিলই থাকবে না। আবার এও সত্য যে, মানুষের জাগতিক পরিবেশ থেকে ধর্মের উদ্ভব হলেও কালে কালে ধর্ম মানুষের অবচেতন মনের গভীরে প্রবেশ করে একটা স্বকীয় চেহারা ও নিজস্ব গতিশীলতা অর্জন করে। এ অবস্থায় তার শক্তি এত বিপুল হতে পারে যে, মানুষের জাগতিক অগ্রগতিকে সে রুখে দিতে পারে।
‘ভগবদ্গীতা ও অনার্য সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন যে, ভগবদ্গীতায় বৌদ্ধধর্মের (এবং জৈনধর্মের) অহিংসা তত্ত¡কে প্রত্যক্ষভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, আর কয়েকটি নৈতিক এবং ব্যবহারিক তত্ত¡কে ব্রাহ্মণ্যধর্মের আঙ্গিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। আবার আত্মা ও পরমাত্মা তত্ত¡, জন্মান্তরবাদ, স্বর্গনরক, যাগযজ্ঞ, চাতুর্বর্ণ, বিষ্ণু অবতারের শ্রেষ্ঠত্ব এবং অসুরদের ভয়াবহ পরিণতি সম্বন্ধে অবতারের সাবধানবাণী প্রভৃতির মাধ্যমে বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের অনুসারী, ¤েøচ্ছ অনার্য, ভ‚মিপুত্র অনার্য এবং নাস্তিকসহ সব শ্রেণির অনার্য ও তাদের সংস্কৃতিকে আক্রমণ করে তাদের ওপর ব্রাহ্মণ্যধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আর্যসমাজের অন্তর্গত শূদ্রশ্রেণির অবাধ্য অংশকে আয়ত্তে আনবার চেষ্টাও ভগবদ্গীতায় সুস্পষ্ট। মহাভারতের যে বিশেষ জায়গায় ভগবদ্গীতা প্রক্ষিপ্ত এবং প্রোথিত হয়েছে, আর যেভাবে ভগবদ্গীতা শেষ এবং যুদ্ধ আরম্ভ হচ্ছে, তা থেকেই গীতা রচনার মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়।
‘ধর্মের সামাজিক বিন্যাস’ প্রবন্ধে তিনি দেখান, গীতায় শ্রেণিবিভক্ত, অসম এবং শোষণ-দমনমূলক আর্থসামাজিক কাঠামোর প্রতি সমর্থন শুধু নয়, তা অটুট এবং চিরায়ত রাখবার চেষ্টা রয়েছে। জন্মের ভিত্তিতে বর্ণ, পূর্বজন্মের কর্মফল থেকে জন্মগত স্বভাব, স্বভাব থেকে গুণ, গুণ অনুযায়ী কর্ম, কর্ম অনুসারে বর্ণ\এই ছককে প্রতিষ্ঠিত করবার প্রয়াস উপস্থাপিত হয়েছে গীতায়। এই ছক মনুষ্যসমাজে অবধারিত ও চিরন্তন\এমন কথা ভগবানের মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে। গীতায় গুণের ভিত্তিতে কর্মের ব্যাখ্যার সুবাদে অনেক বিশিষ্ট চিন্তাবিদ দাবি করেছেন যে মানুষের জন্মগত আর্থসামাজিক স্থানাঙ্ক অথবা বংশগতির সঙ্গে বর্ণভেদ প্রথার কোনও সম্পর্ক নেই। প্রকৃতপক্ষে মানুষের চারিত্রিক গুণাগুণের ভিত্তিতেই বর্ণভেদ প্রথা সৃষ্টি হয়েছিল এবং সেটা যুক্তিবিরোধী নয়। অতএব চাতুর্বর্ণ প্রথা চারিত্রিক প্রবণতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট এক বিশ্বজনীন শ্রমবিভাজন প্রথারই নামান্তর। পূর্বজন্মের কর্মফলের তত্ত¡ অনুযায়ী কর্মফলের জন্যই এই জন্মে মানুষেরা কেউ ব্রাহ্মণ, কেউ ক্ষত্রিয়, কেউ বৈশ্য আর কেউ শূদ্র হয়ে জন্মেছে। আর এই অভিনব ঘটনা ঘটেছে একমাত্র ভারতবর্ষেই, কারণ পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে বা সমাজে চাতুর্বর্ণ প্রথা বা জন্মসূত্রে মানুষের এরকম বর্ণ নির্ধারণের প্রথা প্রচলিত নেই, অতীতেও ছিল না। কিন্তু পূর্বজন্ম বা কর্মফলের যেহেতু কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, অতএব এ সিদ্ধান্ত অনিবার্য হয়ে পড়ে যে ভগবদ্গীতায় বর্ণভেদ প্রথার ঐশ্বরিক উৎপত্তির তত্ত¡ প্রাচীন ভারতে পুরোপুরি এক বিশেষ শ্রেণিস্বার্থ ও দুষ্টচক্রের আবিষ্কার। ‘নিষ্কাম কর্মের আর্থসামাজিক তাৎপর্য’ প্রবন্ধে লেখকের বিশ্লেষণী বক্তব্য এই যে, সব বর্ণের মানুষই কোনও ফলের আশঙ্কা না করে নির্দিষ্ট আর্থসামাজিক কাঠামোতে নিজ নিজ অবস্থান সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন না তুলে প্রতিদিন কর্ম করে যাবে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চাতুর্বর্ণ তাদের নিজস্ব কাজ নিষ্কামভাবে করতে থাকবে। এই নিষ্কাম কর্মের তত্ত¡ মূলত ব্রাহ্মণ্যধর্মের দমন-পীড়ন ও শোষণমূলক আর্থসামাজিক কাঠামো চিরায়ত করবার উদ্দেশ্যেই প্রণীত হয়েছে। বর্ণভেদ প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা এবং অন্যদিকে শূদ্রশ্রেণির মধ্যে বৈরাগ্য উদয় হওয়ার সম্ভাবনা ইঙ্গিত বহন করে এনেছিল আর্যসমাজের সমগ্র আর্থসামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়বার। এই পরিস্থিতিতে লোকসংগ্রহ বা সমাজরক্ষার জন্য উচ্চবর্ণের মানুষদের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল নিম্নবর্ণদের সামনে নিজ নিজ বর্ণধর্ম অনুযায়ী কর্মের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। সেজন্য শ্রীভগবান গুণকর্ম বিভাগ অনুযায়ী বর্ণাশ্রমধর্ম রক্ষায় নিজের নিরলস কর্মের উদাহরণ দিয়ে শেষে অর্জুনকে উপদেশ দিলেন: হে ভারত, অবিদ্বান লোকেরা যেমন আসক্তিবশত কর্ম করে, লোকসংগ্রহ করতে ইচ্ছুক বিদ্বান ব্যক্তির উচিত অনাসক্ত হয়ে তেমনি কর্ম করা।
‘ধর্ম ও প্রগতি’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ধর্ম যে রাজনৈতিক চেতনা ও প্রগতির পরিপন্থি তা যে-কোনও দেশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়। এ দেশে প্রাচীনকাল থেকে যারা জনসাধারণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, সে শূদ্র ও অস্পৃশ্যরা মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে এসেছে। মনুসংহিতা প্রভৃতি ধর্মশাস্ত্রে যেসব সামাজিক কৃত্যাকৃত্য ও দÐনীতি রচিত হয়েছে, তা উচ্চনীচ বর্ণ অনুযায়ী গুরুতর অসাম্য ও অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ধর্ম বিজ্ঞানের প্রগতি এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রতিহত করে। বৈজ্ঞানিক প্রগতি এবং আর্থিক ও সামাজিক বিকাশের প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে ধর্ম। স্বার্থপর, ধূর্তরা বরাবরই ধর্মকে ব্যবহার করেছে জনসাধারণকে বশীভ‚ত করার এবং ঠকানোর হাতিয়াররূপে। মানুষ তার জৈবিক অস্তিত্বের পরিপূরক এবং তাদের ইচ্ছা পূরণের মাধ্যম হিসেবে ধর্মের আফিম গিলেছে। প্রগতির স্বার্থে ধর্ম নামের এই ভ্রান্ত-চেতনার উচ্ছেদ দরকার। বিজ্ঞান এ-সমস্যার সমাধান করতে পারে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. গোলাম মুরশিদ ‘পশ্চিমের অভিঘাতে বাঙালি সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, প্রাচীন বঙ্গের লোকেরা যেমন এক ভাষায় কথা বলতেন না, তেমনি এক ধর্মও পালন করতেন না। অনেকের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মও ছিল না। এখানকার লোকেদের খাদ্যাভ্যাস, বাড়িঘর নির্মাণের পদ্ধতি এবং পোশাক-আশাকও ছিল উত্তর ও মধ্য ভারতের তুলনায় অনেকাংশে ভিন্ন রকমের। এর পেছনে ভৌগোলিক কারণ সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা পালন করেছিল। আর্যদের সঙ্গে বঙ্গদেশীয়দের নৃতাত্তি¡ক মিল তো ছিলই না, এমনকি ভাষা, ধর্ম, উৎসব, পার্বণ এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যও ছিল একেবারে ভিন্ন রকমের। ভৌগোলিক অবস্থান এবং আবহাওয়ার দিক দিয়ে বিবেচনা করলে প্রাচীন বঙ্গদেশ খুব আকর্ষণীয় জায়গা ছিল না। কিন্তু তা সত্তে¡ও এই দেশে বারবার বাইরের লোকেদের আগমন ঘটেছে। এ থেকে মনে হয় যে, এ দেশে ছিল খাদ্য এবং শস্যের প্রাচুর্য। খ্রিস্টপূর্ব আমলের সংস্কৃত শাস্ত্র এবং সাহিত্য থেকে জানা যায় যে, বঙ্গদেশকে তখন বলা হত অপবিত্র এবং ব্রাত্যদের দেশ। ব্রাত্যদের দেশ বলা হতো এইজন্যে যে, এ দেশের লোকেরা বৈদিক পূজাপার্বণ পালন না-করে স্থানীয় ব্রতাদি পালন করতেন। শাস্ত্রকারেরা সে কারণে ‘সে দেশে যেয়ো না’ বলে বিধান দিয়েছিলেন। তবু ভারতের একেবারে এক প্রান্তে অবস্থিত এই দেশে আর্যরা এসেছিলেন খ্রিস্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী আগেই। তাঁদের সঙ্গে এসেছিল আর্য-সংস্কৃতি। এঁদের সঙ্গে আদান-প্রদানের ফলে ধীরে ধীরে স্থানীয় উৎপাদনব্যবস্থা, কৃষি এবং সামগ্রিকভাবে সংস্কৃতির ওপর তাঁদের সভ্যতার বিরাট প্রভাব পড়েছিল।
সমাজ ও সংস্কৃতির গবেষক বুলবন ওসমান ‘ধর্ম ও সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, বিজ্ঞান মানুষকে যত বেশি যুক্তিনির্ভর করছে, মানুষ ততই ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রথা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তার মানসকে ধর্মীয় দর্শন তেমন করে আর নাড়া দিতে পারছে না। তবু ধর্মের টিকে থাকার পেছনে এর রীতি-প্রথাগত দিকটাই বড়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ধর্ম সবসময়ই প্রতিক্রিয়াশীল ভ‚মিকা গ্রহণ করেছে। শোষিতরা ব্যর্থ আশ্রয় নিয়েছে ধর্মে, আর শোষকেরা ধর্মকে ব্যবহার করেছে শোষণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে। সংস্কৃতির বিভিন্ন পর্যায়ে ধর্মের এমনই বিভিন্ন রূপ। সংস্কৃতি ছাড়া ধর্মের স্বাধীন কোনও সত্তা নেই। অধ্যাপক মোজাফফর হোসেন ‘ধর্মীয় আদর্শ থেকে সংস্কৃতি সমন্বয়ের পথে’ প্রবন্ধে বলেন, আজকের দিনে বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক জানাশোনা, আদান-প্রদান-সহানুভ‚তি প্রকাশের সুযোগ বেড়েছে। এ অবস্থায় নিজ নিজ ধর্মীয় গÐির সংকীর্ণতা অতিক্রম করে, অবাঞ্ছিত কুসংস্কার বর্জন করে যার কাছে যা-কিছু সৎ, মহৎ ও প্রগতিশীলতার উপাদান আছে তার ভিত্তিতে বিশ্বভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলার সুযোগও হাতে এসেছে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করলে ভবিষ্যতের মানবসমাজ অতীতের এবং একালের ধর্মীয় হানাহানির কথা ভাবলে তাদের পূর্বপুরুষদের জন্য লজ্জা ও ঘৃণাই বোধ করবে, যেমন আমরা আজ বোধ করি আমাদের নরভোজী পূর্বপুরুষদের কথা ভেবে। ভবিষ্যতের সেই সুশীল ও শান্তিবাদী সমাজ গড়তে হলে যার হাতে যে ধর্মগ্রন্থ আছে, তার মধ্যে থেকেই খুঁজে বের করতে হবে সবার পক্ষে গ্রহণযোগ্য সাধারণ শিক্ষণীয় নৈতিক উপাদানগুলো।
প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ‘রামমোহন এবং ইসলাম’ প্রবন্ধে বলেন, ভারতে ইংরেজ শাসনের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কার্ল মার্ক্স লিখেছিলেন: আরব তাতার তুর্কি মোগল প্রমুখ বর্বর বিজেতারা একের পর এক হিন্দুস্থানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং ইতিহাসের চিরাচরিত নিয়মে বিজিতদের উন্নততর সভ্যতার কাছে বিজিত হয়ে শীঘ্রই তাদের হিন্দুত্বপ্রাপ্তি ঘটেছিল।
কার্ল মার্ক্সের এই উক্তি আমার কাছে অতিমাত্রায় অসতর্ক মনে হয়েছে। হিন্দুস্থানের যে উন্নততর সভ্যতা সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, সে-ব্যাপারেও তাঁর ধারণা খুব অস্পষ্ট এবং তার প্রমাণ তাঁর আরও কিছু অসতর্ক মন্তব্যে ধরা পড়েছে। তবে সেগুলো এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক বলে আলোচনার অবকাশ নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মার্ক্স লক্ষ করেননি যে, ভারতে মুসলিম বিজেতাদের সামন্ততান্ত্রিক ও সামরিক প্রবণতার মধ্যে বর্বরতা থাকলেও ইউরোপের মধ্যযুগের বর্বরদের সঙ্গে তাঁদের একাসনে বসানো চলে না।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রেজাউল করীম ‘ভারতীয় মুসলমানের উপর হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব’ প্রবন্ধে বলেন, ভারতীয় মুসলমানদের অনুসৃত ইসলামে হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব ঐতিহাসিক। বিশেষত মোগল আমলে আরবী-পারসী-তুর্কী প্রভৃতি ইসলামি সংস্কৃতির নানা উপাদান ও অনুষঙ্গ মিশে যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে ‘খাঁটি’ ইসলামের সঙ্গে বহুলাংশে সাংঘর্ষিক হলেও সামাজিক সহনশীলতা ও সংস্কৃতি-সমন্বয়ের প্রয়োজনে পারস্পরিক আত্মস্থতায় স্থানীয় হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব মুসলমান সমাজেও বিস্তৃত হয়।
স্বামী পরদেবানন্দ ‘দেবীর ৫১ পীঠ ও তাঁর ভৈরব বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল’ প্রবন্ধে অনুসন্ধানে দেখান, ভারত উপমহাদেশে একান্নটি পীঠের কথা সর্বমান্য হলেও, পুরাণসমূহ এবং তন্ত্রসমূহে দেবীপীঠের সংখ্যা সম্বন্ধে নানা সংখ্যা উল্লিখিত হয়েছে। মৎস্যপুরাণ, স্কন্ধপুরাণ, দেবীভাগবত এবং পদ্মপুরাণে পীঠ ও উপপীঠ মিলিয়ে একশো আটটি দেবীপীঠের তালিকা আছে। সতী অঙ্গ থেকে একান্ন পীঠ উদ্ভবের একটি ব্যাখ্যা হিন্দুশাস্ত্র দান করেছে। সেই ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই তত্ত¡ সৃষ্টির পেছনে কাজ করে দুটি ক্ষেত্র\শিব ও শক্তি। শিব ও শক্তির একত্র প্রয়াসে সৃষ্টি হয় অনাহত নাদ। এই নাদ থেকে ধীরে ধীরে একান্নটি বর্ণের উদ্ভব হয়, যাকে আমরা শব্দব্রহ্ম বলে চিহ্নিত করি। সতীর একান্নটি পীঠ হলো এই মূল একান্নটি শব্দব্রহ্মের প্রতীক। যুক্তিবাদী মানুষের জিজ্ঞাসা\সতীর দেহের টুকরোগুলো কেবল বৃহত্তর ভারতবর্ষেই পড়ল, ভারতবর্ষের বাইরে নয় কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভারতীয় তীর্থ সম্বন্ধে স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতার উক্তি মনে পড়ে। নিবেদিতা বলেছিলেন, ‘এই তীর্থগুলো আধ্যাত্মিক ফলদানের সঙ্গে একটি সামাজিক ফলও দান করে। তীর্থগুলো ভারতের ঐক্য ও জাতীয়তাবোধকে জাগ্রত করে। এখন যেমন আমরা একটি মানচিত্রের মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক ধারণার জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করি, প্রাচীন ভারতের সমাজ-পরিচালকেরা ধর্মের মাধ্যমে তা করতে চেষ্টা করেছেন। সতীপীঠগুলো ভারতে গড়ে উঠবার কারণ হয়তো তাই।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক দিব্যদ্যুতি সরকারের বাংলাদেশি হিন্দু ডায়াস্পোরিক হিন্দু বই থেকে চারটি প্রবন্ধ এখানে সংকলিত হয়েছে। ‘হিন্দু ডায়াস্পোরা’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ডায়াস্পোরা শব্দের অর্থ হলো বিকীর্ণ হওয়া বা ছড়িয়ে পড়া। ইসরাইলের বাইরে অবস্থান করা ইহুদিদের বোঝাতে সাধারণত এই শব্দটি ব্যবহৃত হত। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে সমাজবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর অর্থও এখন আর শুধু ইহুদিদের বিদেশে অবস্থান করার সঙ্গে যুক্ত নেই\বরং কোনও বিশেষ ধর্মের বা ভাষার কিংবা নৃতাত্তি¡ক বৈশিষ্ট্যের জনগোষ্ঠী তার উদ্ভবস্থল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে তারা একপ্রকার ডায়াস্পোরায় পরিণত হয়। যেমন, লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কে বাস করা বাঙালি জনগোষ্ঠী হলো বাঙালি ডায়াস্পোরা। তেমনি ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে বসবাসকারী হিন্দুদের হিন্দু ডায়াস্পোরা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
‘বিশ্বব্যাপী হিন্দু জনগোষ্ঠী’ প্রবন্ধে তাঁর অভিমত, বর্তমান পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যে হিন্দুধর্ম সবচেয়ে প্রাচীন। হিন্দুধর্মের সঙ্গে একই সময়ে জন্ম নেওয়া প্রায় সবগুলো ধর্ম বহু আগেই হারিয়ে গেছে। পৃথিবীর বড় বড় ধর্মগুলোর বয়স হিন্দুধর্মের বড়জোর সিকি বা অর্ধেক। জন্মের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক হাজার বছরে হিন্দুরা তেমন কোনো প্রচারমূলক কাজে লিপ্ত হয়নি। মূলত গত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এই ধর্মটি আন্তর্জাতিক প্রচারণা শুরু করে। পৃথিবীর অন্যান্য প্রধান ধর্মগুলোর প্রচারণার ইতিহাস অনেক পুরনো; ক্ষেত্রবিশেষে দেড় থেকে দুই হাজার বছর আগে থেকেই এসব ধর্ম প্রচারকাজে লেগে আছে। অল্প সময় ধরে প্রচারণা শুরু করলেও হিন্দুধর্ম বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিমÐলে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এর ফলে হিন্দুধর্ম এখন আর শুধু দক্ষিণ এশিয়ারই একটি ধর্ম নয়, সারা পৃথিবীতে দ্রæত এই ধর্ম ছড়িয়ে পড়ছে; পৃথিবীর নানা দেশে সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু জনগোষ্ঠী।
‘হিন্দুধর্মের প্রচার ও বিশ্বায়ন’ প্রবন্ধে তিনি দেখান, বৈদিক যুগে সনাতন হিন্দুধর্ম বর্তমান কালের মতো এমন কাঠামোয় ছিল না। সেই সময়কার কাঠামোকে হিন্দুধর্মের একটি প্রারম্ভিক কাঠামো বলা যায়। মূলত ঋষি বা ধর্মসাধকশ্রেণির কিছু মানুষ নিজস্ব আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি থেকে ঈশ্বর, আত্মা প্রভৃতি বিষয়ে কিছু তত্ত¡ তৈরি করেছিলেন। বেদের ঋষিদের কার কোন এলাকায় বাড়ি ছিল সেটি এখন নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব। তবে এসব ঋষির অনেকের মধ্যে মাঝে মাঝে আলাপ হত, বিতর্কও হত; কখনও কখনও সম্মেলনের মতো অনুষ্ঠানও হত। এতদ্সত্তে¡ও এশিয়ার বিপুল এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এসব ঋষি যে নিজেদের সঙ্গে তেমন দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ পাননি, সেটি অনুমান করা যায়। ফলে তাঁদের উপলব্ধ অধ্যাত্ম তত্ত¡সমূহ সবসময়ই চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে থাকত। কিন্তু বাস্তবে সেটি হয়নি, কারণ প্রায় সব ঋষিরই ছিল এক-একটি স্কুল; যেখানে বছর বছর বেশকিছু নতুন ছাত্র এমনকি ছাত্রীও যুক্ত হত। তাঁদের মাধ্যমে জ্ঞান ও তত্ত¡ এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, এক সময় থেকে অন্য সময়ে প্রবাহিত হত। ফলে হিন্দুধর্মের একেবারে আদিস্তরে তত্ত¡ আবিষ্কার এবং তার প্রচার একইসঙ্গে চলত।
‘হিন্দুধর্মে বাঙালির অবদান’ প্রবন্ধে তাঁর অভিমত, বর্তমান বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ মিলে যে ভ‚খÐ সেটি আয়তনে এমন কিছু বড় নয়, কিন্তু অধ্যাত্ম সম্পদের শ্রেষ্ঠত্বে তা পৃথিবীর যে-কোনও অঞ্চলের চেয়ে সমৃদ্ধ। আধুনিক হিন্দুধর্মের সবচেয়ে প্রতিভাবান সাধক ও মহাত্মাদের জন্ম হয়েছে এই বাংলায়। হিন্দুধর্ম যে একটি আন্তর্জাতিক ধর্ম হয়ে উঠতে পারে, বাঙালি মহাত্মারাই সেটি প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন। বর্তমানে পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ তার নিজ জন্মভ‚মি থেকে উদ্ভব হওয়া ধর্ম পালনের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত। অন্য এলাকায় উদ্ভব হওয়া কোনও ধর্ম অনুসরণ করে তাদের জীবন পার করে দিতে হয়। অধিকাংশ দেশেরই স্বদেশি কোনও অবতার বা প্রফেট থাকে না; তাদের অবতার মহাত্মারা সব বিদেশি। বাঙালি হিন্দুরা এক্ষেত্রে অশেষ সৌভাগ্যের অধিকারী। ধর্ম আর দর্শনের জ্ঞান পেতে তাদের পৃথিবীর অন্য কোনও এলাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। এর ফলে বাঙালি হিন্দুর ধর্মানুভব তার নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে পেরেছে। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে তাই হিন্দুধর্মের কোনও সংঘাত কখনও সৃষ্টি হয় না। বস্তুত হিন্দুধর্মে বাঙালিদের অবদান বিশাল ও বহুমুখী; বিশেষত আধুনিক হিন্দুধর্মের বেশির ভাগ দর্শনই বাঙালির নিজস্ব অবদানে সমৃদ্ধ।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল হাই-এর ‘সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশে ধর্মের ভ‚মিকা’ প্রবন্ধে ভারতীয় উপমহাদেশের জনজীবনে অনুসৃত জীবনধারায় বিশেষত সিন্ধু সভ্যতা-কেন্দ্রিক উদ্ভূত ধর্মসমূহে আচরিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে সকল উপাদানের আলোকে এই জনপদগুলো বিকশিত হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর ‘ভারতবর্ষই ইসলামের প্রথম উন্মেষক্ষেত্র’ প্রবন্ধে ইতিহাস অন্বেষণের আলোকে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, আর্য কারা, কোত্থেকে এসেছিল? আর্য বা অনার্য এ-দুটি শব্দ ভাষাতাত্তি¡ক। যারা আর্য ভাষায় কথা বলত তারাই আর্য। যারা আর্য বা ঋগে¦দের ভাষায় বা সংস্কৃতে কথা বলত না তারাই অনার্য। আর্য শব্দটির জাতিগত কোনও ব্যুৎপত্তি নেই। আচারে যিনি শিষ্ট তিনিই আর্য। ব্যাপক অর্থে যারা শিষ্ট তারাই আর্য। (আর্য মানে শিষ্ট অর্থাৎ ‘শিক্ষিত’, সংস্কৃতিসম্পন্ন এই অর্থে)। যার অন্তর আকাঙক্ষাশূন্য তিনিই শিষ্ট। তিনিই শিষ্ট যিনি লোভশূন্য এবং ঔদ্ধত্য, হিংসা ও ভÐামি থেকে মুক্ত। তাদেরই শিষ্ট বলা যায় যারা পবিত্র আইন অনুসারী, বেদশাস্ত্র এবং তদনুরূপ শাস্ত্রে পারঙ্গম, যারা এইসব শাস্ত্র থেকে ধারণা আহরণে সক্ষম এবং প্রমাণ উদ্ধারে উত্তম। বর্ণভেদ, জাতিভেদ ও পদবি প্রথা ইন্দো-আর্যগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা থেকে সৃষ্ট একটি সুদূরপ্রসারী ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কার। বর্ণভেদ, জাতিভেদ ও পদবি প্রথার পত্তন ঘটে শ্রমবিভাগ ও শ্রেণিভেদকে কেন্দ্র করে। এই প্রথা ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরেও দেখা যায়। বংশানুক্রমে বৃত্তি বিভাগ ও বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে বিবাহে নিষেধ এশিয়াটিক সামন্তসমাজে কেন, প্রাচীন গ্রিসেও ছিল, রোমে ছিল। সামন্ত ইউরোপেও এই বিভেদের অস্তিত্ব যথেষ্ট দেখা যায়। তবে অন্য দেশের নানাবিধ ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতীয় সমাজ তথা হিন্দু সমাজব্যবস্থার তফাত গুণগত ও মৌলিক। পৃথিবীর আর কোনও সমাজ ঠিক এরূপভাবে জটিল ও অচ্ছেদ্য অমানবিক অধ্যায়ে পরিণত হতে পারেনি। ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, বর্তমানকালের ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, নেপালসহ সব দেশ একীভ‚ত ছিল। এই অখÐ জনপদে জন্মেছেন গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরামচন্দ্র, সাধক কবীর, গুরু নানক, শ্রীচৈতন্যসহ আরও অনেক আধ্যাত্মিক ধর্মীয় মহাপুরুষ। এমনকি ধর্মীয় মিথ অনুযায়ী পৃথিবীর প্রথম মানব আদমেরও পদচারণা ছিল এই জনপদে! ‘বাংলার জনপদে বাঙালি মুসলমান’ প্রবন্ধে মোহাম্মদ আবদুল হাই বাঙালি মুসলমানদের উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন অভিমত বিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছেন।
মানবতা ও মানবিক চেতনায় নৈতিকতার প্রভাব
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য চিন্তায় মানবতাবাদ
বাঙালির মানবতাবাদী চিন্তায় দার্শনিক ক্রমবিকাশ
সংকলন প্রসঙ্গে
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র ঊনবিংশ খÐে সতেরোজন লেখকের একত্রিশটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। এসব প্রবন্ধে উদ্ভাসিত হয়েছে ধর্মদর্শনের মানবীয় উপাদান। কেননা ধর্মের উদ্দেশ্যই হলো মানবীয় গুণাবলির উদ্ভাসন, বিকাশ ও তার প্রয়োগ। ব্রাহ্মসমাজের নেতা ও বিশিষ্ট ধর্মতাত্তি¡ক শিবনাথ শাস্ত্রী প্রণীত ‘ধর্ম কি?’ প্রবন্ধে এর বিশ্লেষণী উত্তর পাওয়া যাবে। তাঁর মতে, ধর্ম চরিত্রের বস্তু। তাই ধর্মের উৎসের সন্ধান করতে হবে মানুষের মনে।
এ খÐে স্বামী বিবেকানন্দের নয়টি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়েছে। ‘চৈতন্য ও প্রকৃতি’ প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত আধ্যাত্মিক-শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি চৈতন্যকে চৈতন্যরূপেই প্রত্যক্ষ করেন, জড়রূপে নয়। চৈতন্যই প্রকৃতিকে গতিশীল করে, চৈতন্যই সত্য বস্তু। ক্রিয়ার অস্তিত্ব প্রকৃতির মধ্যেই বিদ্যমান, চৈতন্যে নয়। চৈতন্য সর্বদা এক, অপরিণামী ও শাশ্বত। চৈতন্য ও জড় প্রকৃতপক্ষে এক, কিন্তু চৈতন্য স্ব-স্বরূপে কখনওই জড় নয়। জড়ও কখনও জড়সত্তা-রূপে চৈতন্য হতে পারে না। আত্মা কখনও ক্রিয়া করে না। কেনই-বা করবে? আত্মা বিদ্যমান\এটাই যথেষ্ট। আত্মা শুদ্ধ, সৎ ও নিরবচ্ছিন্ন। আত্মার ক্রিয়ার কোনও আবশ্যকতা নেই। ‘চৈতন্যই প্রকৃতিকে গতিশীল করে, চৈতন্যই সত্য বস্তু।’ চৈতন্যকে চৈতন্যরূপেই দেখতে হয়, জড়রূপে নয়।
‘ধর্মের অনুশীলন’ প্রবন্ধে বিবেকানন্দ মানবিক উপলব্ধি ব্যক্ত করে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে পরহিতৈষণার অর্থ জগতের দুঃখে কিঞ্চিৎ সাহায্য করা\দুঃখের উচ্ছেদ-সাধন নয়। সাধারণ লোক নাম-যশের প্রার্থী এবং নাম-যশ লাভের উদ্দেশ্যেই সে তাহার সমুদয় প্রচেষ্টা পরোপকার ও সৎকর্মের চাকচিক্যময় আবরণে ঢাকিয়া রাখে। অপরের জন্য কাজ করিতেছি, এই ভান করিয়া বস্তুত সে নিজের কাজই গুছাইয়া লয়। প্রত্যেকটি তথাকথিত পরোপকারের উদ্দেশ্য হইতেছে\যে অশুভটি নিবারণ করিতে চাহিতেছ, উহাকেই উৎসাহ-দান।’ পরহিতৈষণার মধ্য দিয়ে জগতের দুঃখে কিঞ্চিৎ সাহায্য করা চলে। জগতের প্রকৃত মঙ্গল দুঃখের উচ্ছেদসাধনেই সম্ভব। অন্যের উপকার করার চেয়ে দুঃখের উচ্ছেদসাধনই বেশি জরুরি।
‘শ্রেয়োলাভের পথ’ প্রবন্ধে তাঁর উপলব্ধি হলো, বিভিন্ন দেহে অশরীরীরূপে বর্তমান এবং অনিত্য বস্তুর মধ্যে নিত্যরূপে বিদ্যমান সেই মহান ও সর্বব্যাপী আত্মাকে জেনে ধীমান ব্যক্তি শোক করেন না। তাই আত্মাকে প্রবচন অর্থাৎ বেদাধ্যয়ন অথবা মেধা বা বহুশাস্ত্র-শ্রবণের দ্বারাও জানা যায় না। আত্মা যাঁকে বরণ করে বা অনুগ্রহ করে, তিনিই তাকে লাভ করেন, তাঁর কাছেই আত্মা নিজস্বরূপ প্রকাশ করে। যে অবিরত দুষ্কৃতপরায়ণ, যার মন শান্ত ও সমাহিত নয়, যে সতত চঞ্চল ও অস্থির, সে হৃদয়-গুহায় প্রবিষ্ট এই আত্মাকে ধারণা ও উপলব্ধি করতে পারে না। শ্রেয়োলাভের উপায় জ্ঞান। জ্ঞানের ‘অন্তশ্চক্ষু দ্বারা দর্শন করিয়া সুখ-দুঃখের অতীত হওয়া যায়। যিনি এই রহস্য অবগত আছেন, তিনি সব বৃথা বাসনা ত্যাগ করেন, এই অতীন্দ্রিয় অনুভ‚তি লাভ করেন এবং সর্বদা ধন্য হন।’ শ্রেয়োলাভের এটাই আসল পথ।
‘মুক্তির পথ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, প্রত্যেকটি মহান ধর্মের দুটি মহৎ নীতিবাক্য\ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ। আমরা সকলেই সত্য চাই, এবং জানি যে, আমরা চাই বা না-চাই সত্য আসবেই। কিছু পরিমাণে আমরা সবাই সে সত্যের (শ্রেয়) জন্য চেষ্টা করছি। ঈশ্বরকে ভালোবাসার মধ্যে মানুষের মুক্তি নিহিত। ইহজগতের সবকিছু পরিত্যাগ করে শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলে ঈশ্বর তাঁর ‘প্রেমের কিঞ্চিৎ’ যখন দান করেন, তখনই মুক্তিলাভ ঘটে। পৃথিবীর ইতিহাস মহাপুরুষ ও উপদেবতাদের ইতিহাস নয়, তা সমুদ্রের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের মতো, যেগুলো সমুদ্রের স্রোত-তাড়িত বস্তুখÐসমূহ হতে আপনা-আপনি মহাদেশরূপে গড়ে ওঠে। তাহলে প্রতি গৃহে অনুষ্ঠিত আত্মোৎসর্গের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজের মধ্যে নিহিত আছে পৃথিবীর ইতিহাস। মানুষ তার নিজস্ব বিচারবুদ্ধির ওপর নির্ভর করতে ইচ্ছা করে না বলেই ধর্ম গ্রহণ করে। ‘আমি যে আমিই’ প্রবন্ধে তাঁর বক্তব্য, প্রত্যেক বস্তুই সত্ত¡\নাম ও রূপের সমবায়ে। নাম ও রূপ আসে এবং যায়, কিন্তু সত্ত¡ চিরদিন একই থাকে। ‘কর্মরহস্য’ প্রবন্ধে বিবেকানন্দের অভিমত, সব কর্মই দাসসুলভ কাজে পর্যবসিত হয়\যদি তাতে প্রেম না থাকে। কর্মযোগের অর্থ এই যে:
মৃত্যুর সম্মুখীন হইয়াও মুখটি বুজিয়া সকলকে সাহায্য করা। লক্ষ লক্ষবার লোক তোমাকে প্রতারণা করুক, কিন্তু তুমি একটি প্রশ্নও করিও না এবং তুমি যে কিছু ভালো কাজ করিতেছ, তাহা ভাবিও না।... যথার্থ ত্যাগীর জীবন অপেক্ষা যথার্থ কর্মীর জীবন কঠোরতর না হইলেও সত্যই সমভাবে কঠিন। ‘কর্তব্য কি?’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, আমাদের কর্তব্য, যে সমাজে আমরা জন্মগ্রহণ করেছি সে-সমাজের আদর্শ ও কর্মধারা অনুসারে কাজ করা। যখন কর্তব্যের পেছনে স্বার্থপ্রেরণা থাকে না তখনই মানুষ শ্রেষ্ঠ কাজ করতে পারে।
‘জ্ঞান ও কর্ম’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদীরা সামাজিক কল্যাণের জন্য কাজ করলে তাতেও ঈশ্বরের উপাসনা হয়। ধর্ম মোটেই বুদ্ধির কচকচি নয়\ধর্ম অপরোক্ষানুভ‚তি। “যদি ঈশ্বর-বিষয়ে ‘চিন্তা’ কর, তবে তুমি নিতান্তই মূর্খ। অজ্ঞ সাধক প্রার্থনা ও ভক্তির দ্বারা দার্শনিককেও অতিক্রম করিতে পারে। ঈশ্বরকে জানিবার জন্য কোনও দর্শনশাস্ত্রের প্রয়োজন হয় না।”
‘কর্মবিধান ও মুক্তি’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, মানুষের প্রতিটি কর্ম তার উপাসনা এবং তার উদ্দেশ্য হলো মুক্তি। আত্মা মুক্ত কিন্তু শরীর বা মন স্বাধীন বা মুক্ত নয়। মানুষের মধ্যে পূর্ব থেকেই মুক্তি আছে, কিন্তু তা আবিষ্কার করতে হবে। মানুষ তো মুক্তই, তবে প্রতি মুহ‚র্তে সে একথা ভুলে যায়। জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে এই তত্ত¡ আবিষ্কার করাই প্রত্যেকটি মানুষের সমগ্র জীবন। কিন্তু জ্ঞানী ও অজ্ঞলোকের মধ্যে প্রভেদ এই যে, জ্ঞানী তা জ্ঞাতসারে আবিষ্কার করেন, আর অজ্ঞ লোক আবিষ্কার করে অজ্ঞাতসারে।
চর্যাপদের মূল্যায়নে চারজন মনীষীর অবদান সর্বাগ্রে স্মরণীয়। প্রথমজন এর আবিষ্কর্তা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১)। দ্বিতীয়জন এর বৈয়াকরণ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭)। তৃতীয়জন এর তিব্বতি অনুবাদের আবিষ্কারক প্রবোধচন্দ্র বাগচী (১৮৯৮-১৯৫৬)। আর চতুর্থজন হলেন এর ভাষ্যকার মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (১৮৮৫-১৯৬৯)। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম গ্রন্থ-নিদর্শন চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরোহ‚বজ্র রচিত দোহাকোষ, কাহ্নপাদ রচিত দোহাকোষ ও সংস্কৃতে রচিত ডাকার্ণব\এই চারটি গ্রন্থ উদ্ধার করেন। পরে তাঁর সম্পাদনায় হাজার বছরের বৌদ্ধ গান ও দোহা নামে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে তা প্রকাশিত হয়। বৌদ্ধ বজ্রযান ধারার এই দোহাগুলোই সাধারণভাবে চর্যাগীতি নামে সমধিক পরিচিত। চর্যাগীতি বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন\এগুলো রচিত হয়েছিল অষ্টম-দশম শতকের মধ্যে অর্থাৎ ধর্মপাল, দেবপাল ও মহীপালের রাজত্বকালে। চর্যার ভাষা দশম/একাদশ শতকের বাংলা। চর্যাপদ আবিষ্কারে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। উন্মোচিত হয় বাঙালির চিন্তা-চেতনায় মানবতাবোধের প্রাচীন নিদর্শনের প্রামাণ্য দৃষ্টান্ত। বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক অরবিন্দ পোদ্দার ‘চর্যাগীতির মানবতা’ প্রবন্ধে চর্যাকারদের রচনা-দৃষ্টান্তের আলোকে তাঁদের ধর্মীয় চেতনায় কীভাবে মানবীয় বোধ উন্মোচিত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করেছেন।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল ফজল ‘মানবতন্ত্র’ প্রবন্ধে বলেন, যে মানুষ লজিক বা যুক্তির সম্মুখীন হতে ভয় পায়, তার কাছে মননশীলতা বা মুক্তবুদ্ধির চর্চা নিষিদ্ধ ব্যাপার। যে মানুষ জীবনে একটা হুর সামলাতেই গলদঘর্ম, মৃত্যুর পর সে সত্তর হাজার সামলাবার অলৌকিক শক্তির অধিকারী হবে\এমনতর অদ্ভুত বিশ্বাসই সাধারণ মানুষকে মুগ্ধ ও সম্মোহিত করে রাখে। যে ধর্ম ইহকালে মানুষকে রক্ষা করতে পারেনি, পারছে না\সে ধর্ম পরকালে মানুষকে রক্ষা করবে এমন অলৌকিক বিশ্বাসে কেউ যদি স্বস্তিবোধ করেন তাতে আপত্তি করার কোনও কারণ নেই; কিন্তু আমার আপত্তি হচ্ছে অলৌকিককে লৌকিক ব্যাপারে টেনে আনায়। বলাবাহুল্য দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র এ সবই লৌকিক ব্যাপার।
ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারী ‘মানবধর্ম’ প্রবন্ধে মানুষের স্বরূপ সম্পর্কে বলেন, যে গুণ বা গুণের সমষ্টি থাকলে মানুষকে মানুষ বলা চলে, বলা উচিত\তা কী? খুব সাংঘাতিক একটা-কিছু নয়\সেটার নাম মনুষ্যত্ব। যেমন জলের জলত্ব থাকবে, অগ্নির অগ্নিত্ব থাকবে, তেমনি মানুষেরও থাকা দরকার মনুষ্যত্ব। মানুষ আর পশু প্রায় একই। মানবমাত্রই একটা জাতি। তার মধ্যে ছোট-বড় ভেদের কোনও অর্থ হয় না। মানবজাতির ধর্ম কী? মানবধর্ম। সবারই এক ধর্ম\মানবধর্ম। প্রত্যেক মতকে, প্রত্যেক ‘ইজম্’কে শ্রদ্ধা করতে হবে\এ শিক্ষাই তো মানবধর্ম দিয়ে থাকে।
শিক্ষাবিদ গবেষক ড. ওসমান গনী চারটি প্রবন্ধে মানবিক বোধ বিকাশে কোরআনে প্রতিফলিত মানবীয় দর্শনের বিশ্লেষণ ও ইসলামে তার প্রয়োগ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি হজরত মুহম্মদ (স.)-এর মানবীয় মানসের নানা ঘটনাপরম্পরা উল্লেখ করে ইসলামে মানবতা-মানবাধিকারের উৎস অনুসন্ধান করেছেন। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ‘মানুষের স্বরূপ’ প্রবন্ধে মানুষের মানবীয় দিকগুলোর শুভ-অশুভের উৎস নির্দেশ করে শুভদিকটি আলোকিত করার প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষক চিত্রিতা দেবী ‘উপনিষদের দৃষ্টিতে মানুষ’ প্রবন্ধে ভারতীয় জনজীবনে মানববোধ বিকাশে উপনিষদীয় শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। ফাদার পি. ফালো ‘খৃষ্টীয় দৃষ্টিতে মানুষ’ প্রবন্ধে মানুষের মনুষ্যত্ব ও সহিষ্ণুতা বিকাশের সপক্ষে খ্রিস্ট্রীয় চেতনা উপলব্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ‘বাংলায় মানবতাবাদ: আট থেকে আঠারো শতক’ প্রবন্ধে দেখান, ভারত উপমহাদেশে বাংলা অঞ্চলে মানবতাবাদী চিন্তা-চেতনার ইতিহাস ব্যাপক ও গভীর। ইউরোপে রেনেসাঁ-উত্তর সময়ে মানবতাবাদ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে; কিন্তু ধারণাটির অতীত ইতিহাস যে দীর্ঘ, তা এ প্রবন্ধের শুরুতে নির্দেশিত হয়েছে। মানবতাবাদের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার সূত্রপাত তো রেনেসাঁর সময় থেকে। বাঙালির আত্মশ্লাঘার বিষয় যে, বাংলায় মানবতাবাদের চর্চা রেনেসাঁরও আগে থেকে; এবং প্রশাসনিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে। বাংলায় মানবতাবাদের চর্চা পালযুগ বা চর্যাযুগ থেকে সূচিত হয়েছিল; যা অব্যাহত ছিল নাথসাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণবসাহিত্য, সুফিসাহিত্য, শাক্তপদ, বাউলগান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে।
ইসলামি চিন্তাবিদ মো. হাবিবুর রহমান তাঁর ‘মানবাধিকার ও ইসলাম’ প্রবন্ধে বলেন, সমকালীন বিশ্বে মানবাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত বিষয়। মানবাধিকারের অন্তর্নিহিত বিষয় হচ্ছে ‘মানুষ’ ও ‘অধিকার’। শব্দ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমÐিত। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, আশরাফুল মাখলুকাত। আর মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের উচ্চশিখরে উঠতে দরকার মানবাধিকার। মানবাধিকার ছাড়া মানুষের পূর্ণতা আসে না। বস্তুত, মানুষের জীবনমৃত্যু যেমন অবিচ্ছেদ্য তেমনি তার পূর্ণ বিকাশের জন্য কতিপয় মৌলিক অধিকারও অপরিহার্য। মানুষ কতকগুলো স্বতঃসিদ্ধ অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। দেশ-কাল, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য সমানভাবে কতকগুলো অধিকার প্রদান করা হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত বলেই এসব অধিকারকে প্রাকৃতিক অধিকার বলা হয়।
শব্দসৈনিক ও মুক্তচিন্তক বেলাল মোহাম্মদ ‘ধর্ম, মানুষ ও মানবতা’ প্রবন্ধে বলেন, নিজে বাঁচো এবং অপরকে বাঁচতে দাও\এই সত্য সুন্দরের মানবীয় উপলব্ধিই সকলের কাম্য, যা ধর্ম অনুশীলনের মধ্যে প্রতিভাত হওয়া প্রয়োজন।
অধ্যাপক ড. হায়াৎ মামুদ ‘মানবাত্মা কাঁদে ধর্মের প্রহারে’ প্রবন্ধে বলেন, উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সমস্যা মুখ্যত রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক; গৌণত ধর্মীয়। ইতিহাসের এক বিশেষ সময়ে ধর্মের প্রশ্নই মুখ্য ভ‚মিকা নিল এবং তার ভিত্তিতেই দেশ বিভক্ত হলো। ভাবা গিয়েছিল, এতেই পরিত্রাণ মিলবে। পরিত্রাণ যে এত সহজে মেলে না তার প্রমাণ বাংলাদেশ। আরও প্রমাণ শিখ-হিন্দু মারণোৎসব, বছরের পর বছর। এই মুহ‚র্তে আমাদের দুর্দমনীয় কামনা একটিই, মাত্রই একটি: এদেশের সমস্ত সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান দেশ থেকে বিতাড়িত হোক, নতুবা যে-পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছি সেই পদ্ধতিতে বিতাড়ন করি, এবং ভারতের বঙ্গভাষী যত মুসলমান যেখানে আছেন সবাইকে উদাত্ত নৃত্যে আহŸান করি কিংবা আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না রেখে তারা বিতাড়িত হয়ে এখানে চলে আসুন। এতে দেশ তলিয়ে যাবে কি ভাসবে সে ভাবনা আমার নয়, অন্তত মানুষ বাঁচুক।
সুলেখক সন্দীপন সেন ‘বিবেকানন্দের ধর্মচিন্তায় মানবপ্রেম’ প্রবন্ধে মানবিক বোধ উপস্থাপন করে বলেন, নরেন্দ্রনাথ থেকে বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার কালে, অর্থাৎ উনিশ শতকের শেষে তাঁর পারিপার্শ্বিক জগৎ, কলকাতা, ভারত তথা বিশ্ব পরিমÐলের ঘটনাক্রম, চিন্তাপ্রবাহ ও ব্যক্তিবর্গের আচরণ নিশ্চিতভাবে তাঁর চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল। আর এ সবকিছুর মধ্যেই তখন ধর্ম একটা বড় জায়গা অধিকার করেছিল। নানা ধর্ম, নানা মত, নানা সম্প্রদায়ের দেশ ভারত। এর মধ্যে হিন্দুধর্ম অবশ্যই প্রধান। এভাবে বিবেকানন্দ বৈদান্তিক ধর্মের আদর্শকে কর্মজীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে প্রয়োগের পথ দেখালেন। আধ্যাত্মিক জীবন আর বাস্তবের দিনচর্যা মিলেমিশে এক হয়ে গেল তাঁর ধর্মচিন্তায়। তার কেন্দ্রে স্থান গ্রহণ করল মানবরূপী ঈশ্বর, নিঃস্বার্থ প্রেম ও সেবা, যা ঈশ্বরের পূজার প্রধান উপচার। ভগিনী নিবেদিতা বিবেকানন্দের এই অভিনব ধর্মচিন্তার ব্যাখ্যায় তাই লেখেন: ‘বহু এবং এক’\যদি যথার্থই এক সত্তা হয়, তাহলে শুধু সব উপাসনাপদ্ধতিই নয়, সমভাবে সব কর্মপদ্ধতি\সব প্রকার প্রচেষ্টা, সব প্রকার সৃষ্টিকর্মই সত্যোপলব্ধির পন্থা। তাহলে আধ্যাত্মিক ও লৌকিক\এই ভেদ আর থাকতে পারে না। জীবনের পর্ব থেকে পর্বান্তরে যুক্তিবাদী, আধ্যাত্মপিপাসু, পরিব্রাজক, ধর্মপ্রচারক এবং শেষপর্যন্ত দরদি মানবপ্রেমিক বিবেকানন্দের ব্যক্তিত্বের যেন ক্রম-উন্মোচন ঘটেছে। অধ্যাপক ও গবেষক বসুধা চক্রবর্তীর চারটি প্রবন্ধের মধ্যে ‘খৃস্টধর্ম ও মানবতাবাদ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, খ্রিস্টধর্মের অভ্যন্তরীণ গÐিতে যে প্রোটেস্টান্ট আন্দোলন হলো তার পক্ষেও এ দাবি করা হয় যে, প্রচলিত খ্রিস্টধর্মে বাহ্য অনুষ্ঠান ও অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কৃপায় মুক্তিসাধনাই ছিল একান্ত। তার পরিবর্তে এ আন্দোলনে সৎকর্ম ও নৈতিক উন্নতির ওপর জোর দেওয়া হলো। তাতেই খ্রিস্টধর্মে মানবিক ধারার প্রবর্তন হলো। শুধু খ্রিস্টধর্মে নয়, অন্যান্য ধর্মেও মানুষের দুঃখ দূর করার অনুশাসন রয়েছে। মানবতাবাদীরা অতিপ্রাকৃতিক কোনও শক্তিকে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু যারা তাতে বিশ্বাস করেন তাঁরা মানুষের ভালোর জন্য যা-কিছু ভাবেন ও করেন তার সঙ্গে তাঁদের যোগ রয়েছে।
‘মানবতাবাদী চিন্তাধারার বিকাশ’ প্রবন্ধে বসুধা চক্রবর্তী বলেন, মানবতাবাদী চিন্তাধারায় বস্তুবাদ প্রাকৃতিকত্ববাদের চেয়েও অধিক প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছে। বস্তুবাদ ও প্রাকৃতিকত্ববাদ উভয়েই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও বিশ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; কিন্তু বস্তুবাদ জড়পদার্থের ওপর একচেটিয়া জোর দিয়েছে এবং এই ধারণা করেছে যে, সমস্ত সৃষ্টি যন্ত্রের ন্যায় নিয়মচালিত। বস্তুবাদী দর্শনে যান্ত্রিক ক্রিয়াকে এমন সর্বেসর্বা স্থান দেওয়া হয়েছিল যে, মানুষ ও নিষ্ক্রিয় পদার্থের মধ্যেও এ বিষয়ে কোনও পার্থক্য করা হয়নি। ইদানীং তার কিছু সংশোধন করা হয়েছে।
‘সাহিত্যে সংস্কৃতিতে মানবতাবাদ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, মানুষের প্রেম, মানুষের সুখ-দুঃখ, মানুষের প্রাণলীলাতে যেখানে ভগবানের প্রকাশ সেখানে মানুষ ভগবানের স্থলাধিষ্ঠিত যদি-বা না হয়ে থাকে তবু সে ভগবানের পর্যায়ে পৌঁছেছে; সে আর অজানা ভগবানের হাতের অসহায় ক্রীড়নক নয়। এ বৈজ্ঞানিক মানবতাবাদ নয়; মানুষ এখানে প্রেমের গৌরব লাভ করেছে, তাতে মহীয়ান হয়েছে; সে যদি মহৎ না হবে তবে প্রেমের গৌরবলাভ করবে কী করে? সৃষ্টির শরিক হিসেবে মানুষের এহেন আত্মোদ্বোধনের পরিচয় আমাদের কাব্যে, সাহিত্যে, জাতীয় মানসে ওতপ্রোত হয়ে আছে। রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনিতে সে-পরিচয় নিবিড়; ভারতের প্রায় প্রত্যেক ভাষাতে, সাহিত্যে ও শিল্পকলায় সে-পরিচয় বিধৃত। যুগ যুগ ধরে ব্যক্তিমানস তাতে সঞ্জীবিত, সে-পরিচয় মানুষকে সৃষ্টির বুকে শ্রেষ্ঠ করেছে। ধর্মে আমরা প্রকৃতির যে চিত্র পাই তাতে ভগবানেরই একাধারে দয়াল ও ভয়াল প্রকাশ ঘটছে এবং সে-প্রকাশেই প্রকৃতির একমাত্র সার্থকতা। তবে কোনও কোনও ধর্মে প্রকৃতি নিজগুণেই স্বর্গীয় সৌন্দর্যের অধিকারী বলে বর্ণিত হয়েছে, শুধু ভগবানের প্রকাশ হিসেবে নয়। মানবতাবাদী চাইছে জীবনবিকাশের সুযোগ-সুবিধা এমনি করে প্রত্যেক মানুষের আয়ত্তে এনে দিতে, যাতে বহু দুঃখ-বেদনা থেকে সে নিজেই পরিত্রাণ পেতে পারে।
‘মানবতাবাদীর পথ ও পথের শেষ’ প্রবন্ধে তিনি মানবতাবাদের বৈশ্বিক চিত্র উপস্থাপন করে বলেন, প্রকৃতি-জয়ের অভিযানে মানুষ যে-পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে তাতে সে নিশ্চিত অনুভব করছে, তার এ জয়ের সীমা নেই; নব নব জ্ঞানের সাহায্যে তার পলে পলে আত্মসৃষ্টির কোনও বাধা নেই। তবু কেন মানুষ শান্তি পাচ্ছে না, তবু কেন সে নিরন্তর আশ্রয় খুঁজে মরছে? বেদনাদগ্ধ দুর্বল মানুষ শক্তির জন্যে, সান্ত¡নার জন্যে ভগবানের পায়ে মাথা কুটে মরছে কেন? এর উত্তর এই যে, মানবজাতি এগিয়ে চলছে এবং পদে পদে বিশ্বের মোকাবিলা করছে বটে, কিন্তু ব্যক্তিমানুষ তার সঙ্গে সমতালে চলতে পারেনি, সমগ্র মানবসমাজের সঙ্গে চলবার অনুভ‚তি তার দেহমনে সঞ্চারিত হয়নি। এখানেই সমষ্টির সঙ্গে ব্যষ্টির সমন্বয়সাধনের প্রশ্ন এসে পড়ে। বর্বরতা হতে সভ্যতার যাত্রাপথে সে-ই প্রথম দেশ হতে দেশান্তরে মেষ চরিয়ে ফিরেছিল, হল-কর্ষণের রহস্য আবিষ্কার করেছিল। তারপর সে করল সমাজগঠন, ক্রমে রাজ্যেরও পত্তন। জগতের আদিকারণ সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলেছিল সে-ই, উত্তরের অবিরত সন্ধানও সে-ই করেছে। গড়ে তুলেছে নগর-নগরী, গড়েছে সভ্যতা-সংস্কৃতির অভ্রংলিহ প্রাসাদ; প্রতিদিন সে-প্রাসাদে সে নব নব প্রস্তর সংযোজন করেছে, জীর্ণ প্রস্তর ফেলে দিয়ে নতুনত্বে শূন্যস্থান ভরে তুলেছে। সেই মানুষ একাধারে হোমার, শেক্সপিয়ার, ব্যাস, বাল্মীকি, কালিদাস, নেপোলিয়ান, সিজার, হানিবল, আলেকজান্ডার, অশোক, আকবর, সক্রেটিস, প্লেটো, পেরিক্লিস, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, কান্ট, হেগেল, স্পিনোজা, ডেকার্ট, মার্কস, যিশু, বুদ্ধ, মুহম্মদ, লেনিন, গান্ধী। সেই মানুষই দেবতা, সেই মানুষই শয়তান। সেই মানুষই ভেঙেছে, গড়েছে, যুদ্ধে দুনিয়াকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে গেছে, আবার শান্তির পতাকা উড়িয়েছে। মানুষই প্রকৃতি, দোঁহে নেই কোনও ভেদ\মানুষ স্বরাট, বিশ্বভুবনে সম্রাট।
অধ্যাপক নিখিল ভট্টাচার্য্য ‘হিন্দুধর্মীয় শিক্ষা এবং মানবতা’ প্রবন্ধে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, পৃথিবীর সব ধর্মের উদ্দেশ্যই এক এবং অভিন্ন। তা হচ্ছে ঈশ্বরমুখীনতা। সব ধর্মের গন্তব্যস্থলই এক\তা হচ্ছেন স্রষ্টা। এই স্রষ্টাকে ঈশ্বর, আল্লাহ, গড, জিহোভা প্রভৃতি কত নামেই-না ডাকা হচ্ছে। তা হচ্ছে ভাষার তারতম্যের জন্য। তাঁর উপাসনা করতে কেউবা সাকার করছেন, কেউবা নিরাকারে \তা হচ্ছে চিন্তা-চেতনার তারতম্যের জন্য। সেই স্রষ্টাকে প্রীত করতে কেউবা পূজা করছেন, কেউবা নামাজ পড়ছেন, কেউবা প্রার্থনা\তা হচ্ছে সাংস্কৃতিক তারতম্যের জন্য। এই তারতম্যগুলো যেমন বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে হচ্ছে, তেমন একই ধর্মের অন্তর্গত বিভিন্ন উপধর্ম বা ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যেও হচ্ছে। একই ধর্মের অন্তর্গত বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যেকার তারতম্য বাহ্যিক; মৌলিক নয়। তাই তারতম্য থাকা সত্তে¡ও তারা সকলে একই ধর্মের। ঠিক তেমনি বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যেকার তারতম্যগুলো সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও চিন্তা-চেতনাগত। এ তারতম্য অন্তর্নিহিত নয়। কারণ সকল ধর্মের উদ্দেশ্য এক, লক্ষ্য এক এবং গন্তব্যস্থল এক। এই অর্থে পৃথিবীর সব মানুষের ধর্ম একটাই\তা হচ্ছে স্রষ্টার দিকে যাওয়া। যাওয়ার মাধ্যমও একটাই\তা হচ্ছে পবিত্র জীবনযাপন।
স্বামী সুপর্ণানন্দ ‘মহাভারতে ধর্ম, নীতি ও ন্যায়বিচার’ প্রবন্ধে দেখান, রামায়ণ-মহাভারত আমাদের জীবনের মৌলিক দিকগুলো নিয়ে, মনের প্রভ‚ত বিষয় নিয়ে নানা প্রশ্ন ও উত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়\বিশেষ করে মহাভারত, যা জটিল মনোবিদ্যার এক আকর। রামায়ণ-মহাভারত দুটিতেই মানুষের কর্তব্য কী তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সাধারণভাবে আমার কর্তব্য কী, একটি বিশেষ অবস্থায় আমার কর্তব্য কী\তা জানব কেমন করে? রামায়ণ-মহাভারত দুরকমভাবে এর উত্তর দিয়েছে। রামায়ণের বক্তব্য খুবই সরল, পরিষ্কার। কিন্তু মূলে রয়েছে দুঃখবরণ। নৈতিকতা নিয়ে কোনও দ্ব›দ্ব সেখানে একেবারেই নেই। মহাভারত কিন্তু এসবের অনেক ওপরে। কেননা মানবধর্ম এত সহজ নয়। মহাভারতে যে র্ণদধড্র শ্রীকৃষ্ণের জীবনে আছে তা জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্য এবং সেজন্যই তা অনুধাবন করাও শক্ত। প্রত্যেকেরই নিজের মূল্যবোধে জাগ্রত থাকতে হবে এবং ঠিকপথে চলতে হবে। পুস্তকে, শাস্ত্রে তাকে পাওয়া যাবে না, সেখানে চিন্তার খোরাক আছে মাত্র। সব নিজেকেই করতে হবে\অন্য কেউ করে দেবে না। মহাভারতে সব চরিত্রই কর্মের ফল ভোগ করেছে, কেউ তা এড়াতে পারেনি। র্ঋদধড্র, বমরটফর্ধহ আমাদের সজাগ রাখে, খানাখন্দে পা পড়তে দেয় না। ধর্মজীবনে এসবের অবদান অনেকখানি।
ধর্মে মানব-ঐক্য ও সমন্বয়ী চেতনা
বাঙালির ধর্মচিন্তায় মানবধর্মের উন্মেষ
সংকলন প্রসঙ্গে
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র বিংশ খÐে পনেরোজন লেখকের লেখা সংকলিত হয়েছে। সব লেখকের চিন্তায়ই উৎসারিত হয়েছে মানব-ঐক্য তথা সহমত ও সহিষ্ণুতার ভিত্তিতে সমন্বয়ী চেতনা সমুন্নত রাখার আবশ্যকতা। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ‘মনুষ্যধর্ম’ প্রবন্ধে বলেছেন, মনুষ্যসংসারে মানুষই নিত্য, মনুষ্যসমাজে মানুষই সেব্য, মানুষিক মঙ্গলই মনুষ্যধর্মের একমাত্র লক্ষ্য\এই মহাসত্যে যে-জাতির শিল্প ও সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শন, জীবন ও মরণ অনুপ্রাণিত, তার অভ্যুত্থান স্বভাবতই অনিবার্য। বিশ্বমানব যদিও অতিবাস্তব, তবু সে হাওয়ার মতো; তাকে বাদ দিয়ে বাঁচা শক্ত, অথচ তার চাক্ষুষ উপলব্ধি একেবারেই অসাধ্য। প্রাণের সৃষ্টি ও টিকে থাকা কোনও অলৌকিক বিষয় নয়। প্রাণের অস্তিত্ব দেহে, এবং দেহের বাইরের জগতের শর্তগুলো মিটিয়ে সে টিকে থাকে। দেহাতিরিক্ত ও জগতাতিরিক্ত বলে কিছু নেই। মানুষ দেহধর্মের বাইরে যেমন নয়, তেমনি নয় জগৎধর্মের বাইরেও। ফলে নিজের দেহ ও দেহের বাইরের শর্তগুলো তাকে পূরণ করতে হয়। এটাই তার ধর্ম। এমনকি মহাপুরুষ বলে যাঁরা স্বীকৃত, তারাও এর বাইরে নন। সংসারের বাইরে মানুষের কোনও মহত্ত¡ নেই। সংসার প্রশ্নোর্ধ্ব নয়।
যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী লেখক জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ধর্ম, সাম্য ও স্বাধীনতা’ প্রবন্ধে বলেন, জগৎ ও জীবনমুখী ধর্মের কিছু সুফলের সঙ্গে অনেক কুফল লক্ষ করে প্রশ্ন উঠেছে যে, ধর্মমাত্রকেই বর্জন করে নাস্তিকতাবাদকে সমাজদর্শনরূপে গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে মানবসভ্যতার বিকাশ ত্বরান্বিত, সুগম এবং সৌন্দর্যময় হয়ে উঠবে কি না। মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশের ইতিহাসে যদিও নাস্তিকতাবাদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, তথাপি কিন্তু মানুষ ধর্মবিশ্বাসের প্রতি শুধু নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করলেই সমাজ ও সভ্যতা থেকে ধর্মবিশ্বাস দূর হবে না, কারণ ধর্মবিশ্বাসের শেকড় সামাজিক কাঠামোর গভীরে নিহিত রয়েছে। আর বিশুদ্ধ নাস্তিকতার মধ্য থেকে কোনও ইতিবাচক শুভ সমাজব্যবস্থাও জন্মলাভ করতে পারে না। ধর্মবিশ্বাসের অবলুপ্তির জন্য প্রয়োজন সাম্য ও স্বাধীনতার আদর্শে সমাজব্যবস্থার এমন ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী রূপান্তর, যার ফলে মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অনিরাপত্তার বোধ দূর হতে পারে। আর এই রূপান্তর শুধুমাত্র একক ব্যক্তিমানুষের স্তরে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিকাশের মাধ্যমেও হওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য সংঘবদ্ধ গণপ্রচেষ্টার প্রয়োজন আছে। জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মরমিয়াবাদ ও মহাবিশ্বচৈতন্য’ প্রবন্ধে বলেন, ধর্মকে বর্জন করেও মননশীল মানুষের মধ্যে একধরনের মহাবিশ্বচৈতন্য জন্মাতে পারে। মানুষ যত ক্ষুদ্রই হোক, সে মহাবিশ্বেরই অধিবাসী। অন্তহীন অজানা মহাবিশ্ব তার ধীশক্তিকে আন্দোলিত করে, তার নান্দনিক চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে, তার সত্তাকে রোমাঞ্চিত করে। সে মহাবিশ্বের স্বরূপ এবং তার মধ্যে নিজের স্থানাঙ্ক জানতে চায়। এই বিরাট জিজ্ঞাসা ও আকুতি তার বৌদ্ধিক ও নান্দনিক সংস্কৃতিকে মহাবিশ্বচৈতন্যের দিকে নিয়ে যায়। সে উপলব্ধি করে যে, এই মহাবিশ্বের সূ²তম বস্তুকণা বা তরঙ্গ থেকে সুবিশাল মহাগ্যালাক্সি পর্যন্ত সবকিছু গতিময়, সৌন্দর্যময় ও ঐক্যময়।
এ খÐে আধ্যাত্মিক চিন্তক মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ খান-এর বিশ্বশান্তির পরিকল্পনা বই থেকে বারোটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। এসব প্রবন্ধে তিনি বলেন, মানুষমাত্রই শান্তিপ্রত্যাশী। কিন্তু কীভাবে আমরা এই শান্তি অর্জন ও প্রতিষ্ঠা করতে পারি? মানুষ হিসেবে আমাদের করণীয় কী? এই শান্তি শুধু ব্যক্তিক নয়; বৈশ্বিক অর্থাৎ সর্বমানবিক। আমাদের প্রত্যাশার পরিধি যদি বিস্তৃত করতে চাই তবে আমাদের জীবনে অবশ্যই ছয়টি উপাদানকে জীবনে শান্তিপ্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্যরূপে স্বাধীন ও সুচারুরূপে, সর্বোপরি ন্যায়সংগতভাবে পরিচালিত করতে হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ষাকবচের উপাদানগুলো হলো: যৌবন, স্বাস্থ্য, সচ্ছলতা, সৎসঙ্গিনী, সৎপরিবেশ ও স্বাধীনতা। লেখকের মতে, অর্থবিত্ত ও অন্যান্য শৌখিন উপাদানের ব্যবহারিক প্রক্রিয়ায় মানুষ যে সুখভোগ করে তাতে মানুষ ব্যক্তিগত সাময়িক সুখলাভ করলেও সমাজে, রাষ্ট্রে, সর্বোপরি বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই ক্ষণকালীন শান্তিকে চিরকালীন করতে হলে মানুষকে অবশ্যই সর্বমানবিক গুণাবলি ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের পরিবেশে সুখী সমাজ গঠন করতে হবে।
উপনিষদের সন্দেশ গ্রন্থের লেখক স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ‘বৈদিক দৃষ্টিকোণে বিশ্বের সার্বজনীন ঐক্য’ প্রবন্ধে জানিয়েছেন, সমগ্র বেদ এবং বিশেষ করে উপনিষদ এক স্বাধীন চিন্তাধারা ও কর্মের, আর সেইসঙ্গে মানুষের মর্যাদাবোধ এবং তার উৎকর্ষের কথা ব্যক্ত করেছে। অন্যান্য অনেক দেশের মতো এখানে কখনওই কোনও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ধর্মীয় শক্তি অথবা রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, যা স্বাধীনচিন্তা ও সত্যানুসন্ধানের অবাধ প্রচেষ্টাকে খর্ব করে দিতে পারে। তাই চিন্তা এগিয়ে গেছে\‘সত্যস্য সত্যম্’ (সত্যের সত্য)\‘একমেব অদ্বিতীয়ম্ ব্রহ্ম’ (ব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয়)-এর অনুসন্ধানের পথে। ‘বহুর মধ্যে এক’\এই দর্শনই পরবর্তীকালে ভারতীয় ঋষি, চিন্তাবিদ এবং মনীষীরা সমগ্র দেশের সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপন্থার মধ্যে সঞ্চালিত করেন, যার মূল ভাবটি হলো ‘বৈচিত্র্যের মাঝে একত্ব’\‘সমরূপের ঐক্য’ নয়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ওসমান গনী ‘কোরয়ান ও অখÐ মানবসমাজ’ প্রবন্ধে বলেন, কোরানে প্রতিফলিত হয়েছে অখÐ মানবদর্শন। বিশেষ কোনো ধর্ম-সম্প্রদায় ও জাতি-ভিন্নতার প্রাধান্য কোরানে নেই। সম্মিলিত সমাজ বিকাশে সহায়ক একটি গতিশীল সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে কোরানে। কোরানে যে সকল মানবকল্যাণ ঘোষিত হয়েছে, তা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়ের অনুক‚লে সংরক্ষিত নয়, সকল সৃষ্টিক‚লের বাঁচা-বাড়ার অনুক‚লেই ঘোষিত হয়েছে। ‘অখÐ মানব-ইতিহাসে ও মানবতায় কোরয়ান’ প্রবন্ধে তিনি কোরানে ঘোষিত এই সর্বমানবিক ও সম্মিলিত জীবনধারার সহায়ক যে সকল আয়াত রয়েছে সেগুলোর যথাযথ বিশ্লেষণসাপেক্ষে প্রতিটি ক্ষেত্রের স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য ও বক্তব্যকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে আলোচনা করেছেন।
গবেষক অমিতাভ খাস্তগীর ‘রবীন্দ্রনাথের ধর্মমত ও জীবনজিজ্ঞাসা’ প্রবন্ধে বলেন, রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা যতই বিচিত্র পথ পরিক্রমা করুক, যতই ক্ষুব্ধ নদনদী উত্তীর্ণ হোক\তা কখনও পৌত্তলিকতা বা সাকারবাদে আশ্রয় নেয়নি। ‘রূপ যদি আপনাকে ধ্রæব করিতে চায় তবে সত্যকে অস্বীকার করা ছাড়া তাহার উপায় নাই... আধ্যাত্মিক সাধনা কখনওই রূপের সাধনা হইতে পারে না’\মধ্যবয়সের এই প্রত্যয় থেকে রবীন্দ্রনাথ কখনও বিচ্যুত হননি। পৌরাণিক বহুদেববাদ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা আমৃত্যু দ্বিধাহীন ছিল, বিশেষত শাক্তধর্মসাধনা ও কালী সম্বন্ধে যৎপরোনাস্তি বিরূপ। তাঁর ধর্মদেশনায় দেখা যায় এই অখÐ আস্তিক নৈতিকতায় আস্থা স্থাপন এবং সত্যমিথ্যা ভালোমন্দের সুস্পষ্ট ভেদের স্বীকৃতি। অমিতাভ খাস্তগীর ‘রবীন্দ্রনাথ: ব্রহ্মবাদ ও মানবতাবাদ’ প্রবন্ধে জানিয়েছেন, সমস্ত দ্ব›দ্ব-সংশয় প্রশ্নব্যাকুলতা ও পালাবদলের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ কখনও সাকারবাদী নন, কোনওদিন ভক্তি-মার্গ আশ্রিত সাকারবাদের প্রতি আকৃষ্ট হননি, জীবনের কোনও পর্বে নয়। রবীন্দ্রনাথ কখনও উপনিষদের আশ্রয়চ্যুত হননি। একেবারে অন্তিম সময় পর্যন্ত উপনিষদ তাঁর জীবনের ধ্রæবতারা।
মানবতাবাদী লেখক হোসেনুর রহমান ‘আধুনিক মানুষের দৃষ্টিতে ইসলাম’ প্রবন্ধে বলেন, সত্যিকারের ইসলাম কোনও দিনই সৃষ্টিশীল হতে পারে না, তা যদি চিন্তার স্বাধীনতা না পায়। প্রতিটি মতবাদের, চিন্তার, কর্মের ক্ষেত্রে মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে, তাহলে সে ধর্ম গতিশীল হতে পারবে। ‘সুফী বনাম মুসলমান’ প্রবন্ধে হোসেনুর রহমান বলেন, সুফি ও মুসলমান এক বিশ্বাসের অন্তর্গত হলেও এক মনোজগতের বাসিন্দা নয়। সুফিরা ইসলামের মূল বাণীর সত্যিকারের অর্থ বুঝতে পেরেছে। যে-কোনও মুসলমান যে-কোনও একটি সংঘের সভ্যপদ প্রার্থনা করতে পারেন। তাঁরা যে-কোনও একটি সংঘের নাম ব্যবহার করতে পারেন। এমন সংঘ হলো কাদরি, চিস্তি, সুরাবার্দী এবং নাকশবন্দী। এমন আধ্যাত্মিক সংঘের সভ্যপদ প্রার্থীকে তার জন্মপরিচয় দিতে হয় না। হোসেনুর রহমান ‘সুফী ও মানবপন্থা’ প্রবন্ধে জানান, সুফিরা মূলত কোরানকেই অনুসরণ করে থাকে। কোরানের ভাব, আদর্শ, মানব-ঐক্য, সাম্য এসব তারা গ্রহণ করেছে। গ্রহণ করেনি কোরান-আবৃত্তিধর্মিতাকে। সুফিরা ইসলামকে কট্টরপন্থিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয় এবং তাদের নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তার ব্যাখ্যা ও বিস্তার করে। সুফি মুসলমান ভারতবর্ষে ইসলামকে সত্য তথ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে। সুফিরা তাদের মতবাদ সংগ্রহ করেছে ভারতবর্ষের যোগীদের জীবনদর্শন থেকে। তারপর তার রূপান্তর ঘটেছে চিন্তার ও আচরণের বিভিন্ন স্তরে। তারা বিশ্বাস করেছে মানুষকে পূর্ণতা লাভ করতে হবে; ঐশী সত্তা, ঐশী গুণাবলি পূর্ণতাপ্রাপ্ত মানুষের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক অধ্যাপক যতীন সরকার ‘কেবল মুসলমানের লাগিয়া আসেনি কো ইসলাম’ প্রবন্ধে ইসলামের সর্বমানবিক দর্শনের অনুক‚লে উচ্চারিত সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুলের একটি কবিতার অভিব্যক্তির আলোকে দেখিয়েছেন, ইসলামের মহানবী শুধু মুসলমানদেরই পথপ্রদর্শক নন, জগতের সকল মানুষেরই পথপ্রদর্শক ও রহমতস্বরূপ। কেননা কোরানে তাঁকে বলা হয়েছে: ‘রহমাতুল্লীল আলামীন’\‘রহমাতুল্লীল মুসলিমীন’ নয়। তাই তিনি সমগ্র বিশ্বমানবেরই রহমতস্বরূপ, শুধু মুসলমানদের জন্য নন।
অধ্যাপক গবেষক রবীন্দ্র বিজয় বড়ুয়া ‘বৌদ্ধধর্ম ও অহিংসা’ প্রবন্ধে বলেছেন, জীবনের প্রতি প্রেম বা ভালোবাসাই বৌদ্ধদর্শনে মৈত্রী। জীবপ্রেমের চারটি স্তর\মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা। এদের একত্রে ‘ব্রহ্মবিহার’ বলে। জগতে মানবতার পরিপন্থি যত প্রকার অশুভ শক্তি আছে তার মধ্যে ক্রোধ বা বিদ্বেষ সবচেয়ে ক্ষতিকর। ক্রোধের দ্বারা শান্ত সুশীতল পৃথিবী একমুহ‚র্তের মধ্যে দাবানলে পরিণত হতে পারে। সেজন্য মানবতার সাধককে সর্বপ্রকার প্রযতেœর সঙ্গে ক্ষান্তি বা ক্ষমাশীলতার অভ্যাস করতে হবে। এছাড়া দুঃখমুক্তির অন্য কোনও উপায় নেই।
গবেষক অমলকুমার মÐল ‘ভারতেতিহাসে হিন্দু-মুসলমানের সমন্বয়ী চেতনা’ প্রবন্ধে বলেন, সমন্বয়মূলক সংস্কৃতিই হলো ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্য। সমন্বয়ই ভারত ইতিহাসের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ‘স্বাতন্ত্র্যের গৌরববোধ জন্মিলেই মানুষ দুঃখস্বীকার করিয়াও আপনাকে বড় করিয়া তুলিতে চাহিবে। বড় হইয়া উঠিলে তখনই পরস্পরের মিলন সত্যকার সামগ্রী হইবে। দীনতার মিলন, অধীনতার মিলন, এবং দায়ে পড়িয়া মিলন গোঁজামিলন মাত্র।’ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আর্য-অনার্যের সময় থেকেই ক্রমাগত গ্রহণ-বর্জন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভারতে মিশ্র-সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে। এই সাংস্কৃতিক ভান্ডারে ইসলামি ঐতিহ্য একটি মূল্যবান ও বৃহত্তর সংযোজন। ভারতে যেমন বিশুদ্ধ হিন্দু-সংস্কৃতি নেই, তেমনি নেই বিশুদ্ধ ইসলামি-সংস্কৃতিও। যা আছে তা হলো সমন্বয়ী রূপ। উভয়ের সম্মিলন। ভারতবর্ষে ইসলাম যুগে যে ধর্মান্তর ঘটেছে তা ছিল মূলত ধর্মের প্রভাবে। কোনও প্রকার জবরদস্তি ছিল না। কোনও মুসলমান রাজাই হিন্দু জনগণকে ব্যাপকভাবে ধর্মান্তরিত করার পরিকল্পনা নেননি এবং হিন্দুরা তাদের ধর্মের বিপদ এমন ইঙ্গিতও পাননি, বরং হিন্দুধর্মের দার্শনিক চিন্তাধারা, শিল্প-কলা, সাহিত্য প্রভৃতির বহুমুখী বিকাশ মুসলমান যুগেই ঘটেছে। গবেষক ব্রতীশ ঘোষ ‘সূফীধর্মের আলোকে রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম’ প্রবন্ধে জানিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন ও ধর্মবোধের ভিত্তি মানব ও ঈশ্বরের অখÐতাবোধ। মানুষ বলতে কোনও ব্যক্তিমানুষ নয়, বিশ্বমানব। বিশ্বমানবকে বেষ্টন করে আছেন এক ঈশ্বর। তাঁকে জানতে পারলে ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে থাকা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ তখন আর পর থাকে না। খÐ খÐ মানুষ অখÐ মানবরূপ ধারণ করে। সুফিবাদের বিশ্বমানববোধ এবং রবীন্দ্রনাথের অতীন্দ্রিয় মানবতাবাদী ধর্ম স্বতন্ত্র। কিন্তু বিশ্বমানববন্ধনের মাধ্যমে বিশ্বকে জানা এবং সমগ্র সৃষ্টজগতের মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়া, এই দুই চিন্তাধারা যেন দেশকালের ব্যবধান লুপ্ত করে এক স্থানে মিলিত হয়েছে।
‘সুফিমতের উদ্ভব এবং ভারতবর্ষে তার বিকাশ: ইতিহাসের সূত্রানুষঙ্গ’ প্রবন্ধে গবেষক রাতুল ঘোষের বক্তব্য, ইসলামধর্মকে একটা জাতির সমাজ রাজনৈতিক ঐক্যের ভিতও বলা যেতে পারে। সেই ইসলামের কঠোর বাস্তববাদ কখনওই পারস্যের আধ্যাত্মিক আকাঙক্ষাকে পরিপূর্ণ তৃপ্ত করতে পারেনি। তাই সেখান থেকেই উঠে এসেছে মরমিয়া রহস্যবাদ। আর এই মরমিয়া রহস্যবাদ তথা সুফিমত গড়ে উঠতে সাহায্য নিয়েছে একই রকম দার্শনিক প্রেক্ষিতপূর্ণ হিন্দু এবং বৌদ্ধধর্মের। শিক্ষাবিদ গবেষক শেখ মকবুল ইসলাম ‘বেদান্ত-ইসলাম: পুনর্বোধান্বয়ন’ প্রবন্ধে বলেন, বিবেকানন্দের ইসলামপ্রীতি সুবিদিত। ভারতীয় বেদান্ত বিজ্ঞানে যে মানবীয় বোধ বিকশিত আছে তিনি তার সঙ্গে ইসলামের মানবীয় বোধের সমন্বিত বিকাশের সহায়ক বহুবিধ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই উদ্যোগে তাঁর বিখ্যাত উক্তি ‘বৈদান্তিক মস্তিষ্কে ইসলামীয় দেহ’ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে নতুন মাত্রা এনে দেয়। এই ঐক্যের অসংখ্য যোগসূত্রের সন্ধান দিয়ে বেদ ও কোরআন সমর্থিত তুলনামূলক বহু বাক্যের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে প্রবন্ধকার বিবেকানন্দের ইসলামবোধ স্পষ্ট করেছেন। এই বোধের সঙ্গে তিনি ‘যত মত তত পথ’-এর প্রবক্তা শ্রীরামকৃষ্ণের সহমতকেও সংযুক্ত করে বিশ্লেষণ করেছেন। এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরস্পরের দৃষ্টিতে বেদান্ত-ইসলামে যে সাম্যভাবনা আছে তা কোনও আধ্যাত্মিক সত্যবস্তু থেকে বিচ্যুত নয়, বরং পরস্পরের ঈশ্বরচেতনায় মানব-ঐক্যের মহান মানবিক বোধ সঞ্চারিত করে। তিনি ‘ব্রাহ্ম ধর্ম, ইসলাম ধর্ম ও ধর্ম সমন্বয়’ প্রবন্ধে বলেন, ভারতবর্ষের ধর্ম সংস্কৃতির স্বরূপ বহুরূপে বিকশিত এবং সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের ঔজ্জ্বল্যে দীপ্যমান। তবে এসব ধর্মতাত্তি¡ক সাদৃশ্য অনুধাবনে প্রয়োজন প্রজ্ঞা ও সহনীয় বোধবুদ্ধির সক্রিয়তা। এই সক্রিয়তায় সফলতা পেতে পারে বাঙালির জীবনধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত বহু কাঙিক্ষত সংস্কৃতি সমন্বয়ের ধারা। প্রবন্ধকার একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মধর্ম এবং অপৌত্তলিক ইসলামের ঐক্যসূত্র অনুসন্ধানের প্রয়াস পেয়েছেন। উভয় ধর্মমতের শাস্ত্রীয় নানা দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে তিনি ব্রাহ্মধর্ম ও ইসলামধর্মের মধ্যে একটি ধর্ম সমন্বয়ের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। সেইসঙ্গে রামমোহন প্রবর্তিত ব্রাহ্মসমাজ এবং ইসলাম অনুসারী মুসলিম সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক নানা যৌক্তিক পথ অনুসন্ধান করেছেন, যা বাঙালির ধর্ম সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে সামাজিক ঐক্য সৃষ্টি সর্বোপরি মানব-ঐক্যের পথকেও সুগম করতে পারে।
‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’ সংকলনমালার সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল হাই ‘সুফিচেতনা: মানবমিলনের উদারজমিন’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, সুফিচেতনা ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য দিক, অবিভাজ্য অঙ্গ। ইসলামের দুটি বিভাগ: জাহিরি (প্রকাশ্য) ও বাতিনি (গোপনীয়)। জাহিরি বিভাগের বিধিবিধানের নাম শরিয়ত আর বাতিনি দিকের নাম সুফিবাদ। মানুষের আত্মিক শুদ্ধতার সাধনা বিধিবদ্ধ করার জন্য সুফিবাদের উদ্ভব ঘটে। সুফি মনে করেন, প্রচলিত ধর্ম বা শরিয়তের প্রচারণা মূলত ইসলামের দর্শনকে প্রচার করে না। তা ধর্মের বাইরের রূপটি, অনুষ্ঠানটিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই আনুষ্ঠানিক ইসলাম দিয়ে দারুস সালাম বা শান্তির আলয় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সুফিরা তাই অন্তর্লোকের অনুসন্ধান করলেন, যার মধ্য দিয়েই উন্মোচিত হলো সুফিচেতনা। সুফিবাদ একটি মানবীয় চেতনার উদার ধারা, ইসলামের একটি কোমল ও স্নিগ্ধ রূপ। ঐশীবাণী থেকেই এর নির্যাস গৃহীত। সুফিরা অপ্রকাশিত জ্ঞানের ধারক ও বাহক। এঁরা গুপ্তজ্ঞানের অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজেকে ধীরে ধীরে চূর্ণ করে গলিয়ে স্রষ্টার ছাঁচে গড়ে তোলেন। এঁদের লক্ষ্য স্রষ্টার সান্নিধ্যলাভ। সুফিচেতনা সর্বদাই বেহেশতের মোহগ্রস্ততা থেকে মুক্ত। স্রষ্টার স্বরূপ উপলব্ধি এবং আপন অস্তিত্বের মূলে কী বা কে\এই মৌলিক প্রশ্নের অনুসন্ধানেই ব্যাপৃত থাকে সুফিচেতনা, নিজেকে জানার মধ্য দিয়েই মানবরহস্য জানার পথ উন্মোচিত করে। তাই বলা যায়, শুদ্ধচিত্তে শর্তহীন আত্মসমর্পণে সর্বমানবীয় বোধে বিকশিত যিনি\তিনিই সুফি। সুফির সৎকর্ম প্রকারান্তরে মানবসেবা। এই মানবসেবাই বিস্তৃত করে মানবমিলনের উদার জমিন। বিশিষ্ট চিকিৎসক প্রফেসর ডা. মো. মতিয়ার রহমান ‘মহানবীর বিদায় হজ্জের ভাষণে মানব ঐক্যের আহŸান’ প্রবন্ধে এই ভাষণের তাৎপর্য সম্পর্ক আলোকপাত করেছেন। তিনি মহানবীর ভাষণের ঐশ্বরিক প্রেরণাপ্রসূত সর্বমানবীয় বোধের বিশ্লেষণ করেছেন।
