প্রকাশকের কথা
১৬টি বিষয়ে ২০৯ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে 'বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ'। বাঙালি মনীষী ও লেখকদের গত ২০০ বছরের নির্বাচিত রচনা এ গ্রন্থমালায় সংকলিত হয়েছে বটে, কিন্তু এর পরিধি, ব্যাপ্তি ও গভীরতা আরও ব্যাপক। চিন্তামূলক রচনা বলতে কী বোঝানো হয়েছে বা এই গ্রন্থমালায় কী ধরনের রচনা গৃহীত হয়েছে বলা দরকার। গল্প কবিতা উপন্যাস নাটক বা চিত্রনাট্য নিশ্চয় চিন্তা ছাড়া হয় না। সাধারণভাবে এগুলোকে সৃজনশীল রচনা বা সৃজনশীল সাহিত্য বলা হয়। এগুলো নিয়ে নানাধরনের মূল্যায়ন, বিবেচনা গৃহীত হয়েছে বাঙালির সাহিত্যচিন্তায়। সঙ্গে এমন রচনা গৃহীত হয়েছে যেগুলো কবিতা গল্প উপন্যাস নাটকের ইতিহাস তুলে ধরেছে; সাহিত্যের নানা আঙ্গিকের সূচনা, বিকাশ, বিবর্তন এবং সাহিত্যের ওপর সমাজ, রাজনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয় বা বিদ্যার প্রভাব আলোচিত হয়েছে এমন রচনাও সূচিবদ্ধ হয়েছে। 'বাঙালির ইতিহাসচিন্তা'য় ইতিহাস নিয়ে নির্বাচিত রচনা যেমন সংকলিত হয়েছে তেমনি গৃহীত হয়েছে বাঙালির লেখা বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসও। তাই অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র 'সিরাজদ্দৌলা' বা রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বাঙ্গালার ইতিহাস' পূর্ণাঙ্গ অবয়ব নিয়েই ঢুকে পড়েছে ১৮ খণ্ডের 'ইতিহাসচিন্তা'য়।

'বাঙালির দর্শনচিন্তা'য় অন্তর্ভুক্ত রচনাসমূহে বাঙালি মনীষী ও লেখকেরা শুধু দর্শন বিষয়ে লেখেননি, আলোচনা করেছেন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সময়ের দার্শনিক, তাঁদের মতবাদ ও ভিন্নমত নিয়ে। বিভিন্ন দেশের সমাজ রাজনীতি ও মানুষের ব্যক্তিজীবনে বিভিন্ন দর্শনের নানামুখী প্রভাব নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কও এতে স্থান পেয়েছে। এবং এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে মিশে আছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দর্শনের ইতিহাস। এভাবে সমাজ, ভাষা, সংগীত, শিল্প, অর্থনীতি, বিজ্ঞান প্রতিটি বিষয়ে সংকলিত রচনাসমূহ গত দুশো বছরে লেখা বটে, কিন্তু বিষয়, মূল্যায়ন, বিবর্তন, ইতিহাস সব মিলে এ গ্রন্থমালার আলোচনার বিস্তার অনেক ক্ষেত্রে দুই হাজার থেকে দুই হাজার পাঁচশো বছর। সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটলকে বাদ দিয়ে দর্শন আলোচনা অসম্পূর্ণ, অতএব 'বাঙালির দর্শনচিন্তা'র কোনও-না-কোনও রচনায় আড়াই হাজার বছর পেছনে না গিয়ে উপায় নেই। ধর্ম নিয়ে আলোচনায় প্রাচীন ধর্মগুলোকে আনতে গেলে খ্রিষ্টের জন্মের কয়েক হাজার বছর পেছনে যাওয়া ছাড়া উপায় কী? এক কথায় বললে, এ গ্রন্থমালা গ্রহণ করেছে বাঙালি লেখকদের দুশো বছরের রচনা কিন্তু এই রচনাগুলো ধারণ করেছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস বিবর্তন ও মূল্যায়ন।
২. এই প্রকল্পের কাজ একপ্রকার শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। প্রকল্পটির প্রথম লগ্ন থেকেই কাজ করছেন আলাউদ্দিন সরকার, যার নেতৃত্বে দুইশতাধিক খণ্ডের কম্পোজ এবং প্রাথমিক মেকআপ হয়ে গিয়েছিল। খণ্ডগুলোর কম্পোজ এবং মেকআপের দায়িত্বে ছিলেন মোঃ এনামুল হক এবং হজরাত আলী, তাঁদেরকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি।
পুরো কাজটিকে একজন গ্রন্থকর্মীর চোখ দিয়ে দেখানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন প্রধান সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। মূল লক্ষ্য খণ্ডগুলোকে একটা চূড়ান্ত রূপ দেওয়া। প্রধান সম্পাদকের অনুরোধে ২০২১ সালের জুন মাসে আমি এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হই। আমার পরামর্শে নিয়মিত কাজ করার জন্য প্রথমে যুক্ত করা হয় কবি-সাংবাদিক ফিরোজ এহ্তেশামকে এবং পরবর্তীতে কবি মাহবুব কবিরকে। এরপর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রকাশনা বিভাগের সঙ্গে আমি কখনও নিয়মিত, কখনও অনিয়মিতভাবে কাজ করে আসছি।
'বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ' কর্মযজ্ঞে সম্পাদনার বাইরেও অনেক গুণী মানুষ নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। এর মধ্যে 'বাঙালির সাহিত্যচিন্তা'র প্রথম থেকে নবম খণ্ড পর্যন্ত বিশেষ কিছু রচনা সংগ্রহ, নিরীক্ষা ও পুনর্বিন্যাসে বিশেষভাবে আমাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অধ্যাপক মাহবুব বোরহান। তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
৩. কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে 'বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ' খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি প্রকল্প। আমরা সাধারণত খুব বড় মাপের চিন্তা দেখতে পাই না। আমরা যতটুকু চিন্তা বা পরিকল্পনা করি, তার খুব কমই বাস্তবের মুখ দেখে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটি বড় চিন্তা করেছেন, সেটা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা করেছেন এবং বিস্ময়কর হলেও সত্য, সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন।
২৮ বছর আগে অধ্যাপক সায়ীদ প্রথম আলোয় একটি প্রবন্ধ লেখেন। শিরোনাম: 'চাই বাঙালি চিন্তার সংরক্ষণ'। এর সারমর্ম হল, উনিশ ও বিশ শতকে বাঙালি মনীষী, চিন্তাবিদ ও লেখকেরা তাঁদের লেখার মাধ্যমে নানা বিষয়ে যেসব চিন্তা করেছেন তা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। রচনাটি প্রকাশের অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বুঝতে পারেন, যৌবন যার বেদনাও তারই; আর কেউ সহসা এ কাজ করতে আসবে না। তাই তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। সেটিই 'বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ'।
বাঙালি লেখক-মনীষীদের দুশো বছরের নির্বাচিত রচনা সংকলনের জন্য ১৬টি বিষয় নির্ধারণ করা হয়। বিষয়গুলো হল: ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, পরিবেশ, চলচ্চিত্র, সংগীত, ভাষা, সংস্কৃতি, নারী, সমাজ ও শিক্ষা। রচনা সংকলনের প্রক্রিয়া কেমন ছিল, কীভাবে এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে? প্রথমে একটি প্রাথমিক তালিকা করা হয়। প্রয়োজনীয় যেসব বই বাজারে পাওয়া যায় সেসব কেনা হয়। যেসব বই আর বাজারে পাওয়া যায় না, সেসব বই বা বইয়ের প্রয়োজনীয় অংশ বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন পাঠাগার ও ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে আনা হয় ফটোকপি করে। ইতিমধ্যে ১৬টি বিষয়ে সম্পাদক মনোনীত করা হয় এবং সম্পাদকদের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটা সমঝোতার মধ্য দিয়ে কাজের সূচনা ঘটে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নির্বাচিত হন প্রধান সম্পাদক তথা গ্রন্থমালা সম্পাদক হিসেবে। প্রত্যেক বিষয়ের সম্পাদক/সম্পাদকগণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত রচনাসমূহ বা এর সারমর্ম পাক্ষিক/মাসিক বৈঠকে উপস্থাপন করতেন। তাতে গ্রন্থমালা সম্পাদক ও অন্য সম্পাদকেরা উপস্থিত থাকতেন। এভাবে সংকলনের জন্য যে রচনাবলি নির্বাচিত হয় সেসব রচনা দুশো খণ্ড ছাড়িয়ে যায়। পৃষ্ঠাসংখ্যা প্রায় ৭৫০০০।
রচনা নির্বাচন ও উপস্থাপনার ধরনের দিক থেকে সম্পাদক-ভেদে কিছু তারতম্য পাঠকের চোখে পড়বে। কিন্তু ১৬টি বিষয়ের জন্য একটি সমধর্মী কেন্দ্রীয় বিন্যাস নির্ধারিত হয়েছে। একটি বিষয়ের গঠন নিয়ে বললে সব বিষয়ের গঠন সহজে বোঝা যাবে। ধরা যাক 'বাঙালির দর্শনচিন্তা'। খণ্ডসংখ্যা ২০। প্রথম খণ্ডের শুরুতে রয়েছে প্রধান সম্পাদকের কথা। এটি পুরো প্রকল্পের জন্য প্রযোজ্য। তারপর রয়েছে 'দর্শনচিন্তা'র সম্পাদকের লেখা পুরো ২০ খণ্ডের জন্য প্রযোজ্য একটি মূল ভূমিকা (দুএকটি বিষয়ে মূল ভূমিকা সম্পাদক লেখেননি, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অন্য কোনও বিশেষজ্ঞের শরণ নেওয়া হয়েছে), যেখানে তিনি প্রথমত দর্শন বিষয়ে বলেছেন, দ্বিতীয়ত ২০ খণ্ডে গৃহীত রচনাবলি সম্পর্কে একটা ধারণা উপস্থাপন করেছেন। এর পরে প্রথম খণ্ডের জন্য একটি নাতিদীর্ঘ সম্পাদকীয় মুদ্রিত হয়েছে। তারপর সূচিপত্র। প্রথম খণ্ডের শেষে পুরো ২০ খণ্ডের সূচিপত্র দেওয়া হয়েছে দুভাবে : ১. বিষয় অনুযায়ী বর্ণানুক্রমিক সূচি, ২. লেখক অনুযায়ী বর্ণানুক্রমিক সূচি। এই সূচিতে চোখ বুলিয়ে পাঠক ২০ খণ্ডের কোথায় কোন রচনা বা কার লেখা আছে তা সহজে বুঝে নিতে পারবেন। এ ছাড়া, সাধারণভাবে ২০ খণ্ডে উপস্থাপিত প্রতিটি রচনার শুরুতে দেওয়া হয়েছে ওই রচনার সারসংক্ষেপ। পরের খণ্ডগুলোর শুরুতে ওই খণ্ডের জন্য একটি নাতিদীর্ঘ সম্পাদকীয়, তারপর সূচিপত্র এবং এর পরে সূচি অনুযায়ী রচনাগুলো মুদ্রিত হয়েছে। এই গ্রন্থমালা কেউ একদিনে বা ধারাবাহিকভাবে একই সঙ্গে পড়বেন না, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পড়বেন এবং কাজে লাগাবেন। সেদিক থেকে পাঠকের জন্য ১৬টি বিষয়ের প্রতিটির প্রথম খণ্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রথম খণ্ডের শেষে মুদ্রিত বর্ণানুক্রমিক সূচি এ গ্রন্থমালা ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুবই সহায়ক হবে।
৪. যে-কোনও সংকলনেরই সীমাবদ্ধতা থাকে। 'বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ' শীর্ষক এই কর্মযজ্ঞেরও আছে। সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলমান থাকবে পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে। তার প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে এবং কাজটি কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় হবে তাও নির্ধারণ করতে হবে এখনই।
জাফর আহমদ রাশেদ
কবি ও প্রকাশনা উপদেষ্টা
